মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
বুধবার, ২১ আগষ্ট ২০১৩, ৬ ভাদ্র ১৪২০
মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার মামলা ॥ বিশ্বে প্রথম
০ গোলাম আযমের রায়ের বিরুদ্ধে বিচারাধীন বিষয় নিয়ে বিবৃতি দেয়ায় হিউম্যান রাইটস ওয়াচের বিরুদ্ধে মামলা
০ প্রসিকিউটরদের দাবি নাৎসি পলিসি সাপোর্ট করে এমন ব্যক্তি হিউম্যান রাইটস ওয়াচে আছে
স্টাফ রিপোর্টার ॥ নিউইয়র্কভিত্তিক আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচের (এইচআরডব্লিউ) বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার অভিযোগে আবেদন দাখিল করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশনপক্ষ। মঙ্গলবার দুপুর আড়াইটার দিকে প্রসিকিউশনপক্ষ রেজিস্ট্রারের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ অভিযোগ দাখিল করে। পৃথিবীতে এটাই প্রথম এইচআরডব্লিউয়ের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার অভিযোগ।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের বিবৃতির পর আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ বলেছিলেন, সকল আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে বিচার কাজ চালানোর পরও এইচআরডব্লিউ যে বিবৃতি দিয়েছে তা একটি স্বাধীন দেশের ‘অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের’ শামিল। এর মাধ্যমে তারা (এইচআরডব্লিউ) বিচারাধীন বিষয় প্রভাবিত করতে চাচ্ছেন। মানবাধিকার সংস্থাটির বক্তব্য বিবেচনায় নিয়ে আদালত চাইলে ‘অবমাননার’ অভিযোগ আনতে পারে বলেও মন্তব্য করেন মন্ত্রী। ওই বিবৃতির চার দিন পর প্রসিকিউশনপক্ষ আদালত অবমাননার অভিযোগ এনেছেন।
অভিযোগ দাখিলের পর প্রসিকিউশনপক্ষের অন্যতম প্রসিকিউটর ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ সাংবাদিকদের বলেন, গোলাম আযমের মামলার রায় এবং ট্রাইব্যুনালের বিচারিক বিষয়ে গত ১৬ আগস্ট বিতর্কিত বিবৃতি প্রচারের প্রেক্ষিতে এ আদালত অবমাননার অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। পৃথিবীর মধ্যে এই প্রথম এইচআরডব্লিউয়ের বিরুদ্ধে এমন আদালত অবমাননার অভিযোগ আনা হয়েছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এমন একটি মানবাধিকার সংগঠন, যারা মানবাধিকার রক্ষার নামে এমন সব কর্মতৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে, যাদের কোন পর্যবেক্ষক নেই। তাদের তদন্তকারী যারা তাদের মধ্যে নাৎসিদের পলিসি সাপোর্ট করে এমন ব্যক্তিও রয়েছেন। এমনকি তাদের অর্থের উৎস কী সেটিও তারা প্রকাশ করে না।
গোলাম আযমের মামলা তো নয়ই, তারা ট্রাইব্যুনালের কোন একটি মামলাও পর্যবেক্ষণ করতে আসেনি। এ সংস্থার কোন জবাবদিহিতা নেই। তাদের অর্থায়ন যারা করে তাদের পরিচয়ও সংস্থাটি গোপন রাখে। তুরিন আফরোজ বলেন, এ সংস্থার পক্ষপাতদুষ্ট প্রতিবেদনের পর্যাপ্ত প্রমাণ আমরা পেয়েছি। তা ছাড়া হিউম্যান রাইটসের প্রত্যেকটি প্রতিবেদনই দাতাভিত্তিক। এ ক্ষেত্রে তারা দাতাদের নাম-পরিচয় গোপন রাখে। ১৬ আগস্ট হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এক বিবৃতিতে জামায়াতে ইসলামীর সাবেক আমির গোলাম আযমের বিরুদ্ধে দেয়া রায়কে ত্রুটিপূর্ণ উল্লেখ করে পাঁচটি যুক্তি দেয়। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়া অঞ্চলের পরিচালক ব্র্যাড এ্যাডামস ওই বিবৃতিতে বলেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে যে আইনে বিচার চলছে তার ভুলগুলো ধরিয়ে দিতে চাইলেও সরকার তা আমলে নেয়নি। যে রায় সরকার চেয়েছিল তা তারা পেয়েছে। কিন্তু সবার জন্য সুবিচার নিশ্চিত করতে সরকার ব্যর্থ হয়েছে।
গোলাম আযমের বিচার প্রক্রিয়ায় পাঁচটি বিষয়কে ‘ত্রুটি’ হিসেবে তুলে ধরে ট্রাইব্যুনালের বিরুদ্ধে পক্ষপাতেরও অভিযোগ আনা হয়েছে বিবৃতিতে। ‘বাংলাদেশ : আযম কনভিকশন বেজড অন ফ্রড প্রোসিডিংস’ শীর্ষক ওই বিবৃতিতে বলা হয়েছে, গোলাম আযমের রায় দেয়ার আগে ট্রাইব্যুনাল নিজস্ব উদ্যোগে তদন্ত চালানোর যে কথা জানিয়েছে, বিদ্যমান আইন অনুযায়ী ট্রাইব্যুনাল তা পারে না। স্কাইপেসহ ইন্টারনেটে প্রকাশিত কথোপকথন নিয়ে পক্ষপাতের যে অভিযোগ উঠেছে তার কোন ব্যাখ্যা ট্রাইব্যুনাল দেয়নি। আসামিপক্ষের সাক্ষীদের সুরক্ষা দিতে ট্রাইব্যুনাল ব্যর্থ হয়েছে এবং বিচারক প্যানেলেও পরিবর্তন আনা হয়েছে।
আর গোলাম আযমের রায়ে তাঁকে সন্দেহাতীতভাবে দোষী সাব্যস্ত করার ক্ষেত্রে তথ্যপ্রমাণের অভাব ছিল বলেও এইচআরডব্লিউ মনে করে।
অভিযোগগুলো কী ॥ হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলেছে, গোলাম আযমের রায়ের ক্ষেত্রে বিচারকরা প্রসিকিউশনের পক্ষে তদন্ত করেছে, যা সমীচীন হয়নি। দ্বিতীয় অভিযোগে এইচআরডব্লিউ বিচারকদের সঙ্গে প্রসিকিউটরদের যোগসাজশ ও পক্ষপাতিত্বের কথা বলেছে। তৃতীয় অভিযোগে সংস্থাটি বলেছে, আসামিপক্ষের সাক্ষীদের সুরক্ষার জন্য পদক্ষেপ গ্রহণে ট্রাইব্যুনাল ব্যর্থ হয়েছে। এইচআরডব্লিউর চতুর্থ অভিযোগ বিচার প্যানেলে পরিবর্তন নিয়ে। পঞ্চম অভিযোগে গোলাম আযমের অপরাধ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণের জন্য প্রমাণের অভাবের কথা বলেছে এইচআরডব্লিউ।
এ প্রসঙ্গে প্রসিকিউশনপক্ষ থেকে ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ পাল্টা বিবৃতি প্রদান করেন। তুরিন আফরোজ বলেছিলেন, আমাদের অভ্যন্তরীণ বিচার ব্যবস্থা নিয়ে মন্তব্য করার হিউম্যান রাইটস ওয়াচ কে? এটিও কি আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন নয়? আন্তর্জাতিক আইনের সব ধারা লঙ্ঘন করে যখন আইখম্যান বা সাদ্দাম হোসেনের বিচার হয়েছিল, তখন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ কী করেছে? তখন কি তারা তাদের কথিত আন্তর্জাতিক আইনের সুরক্ষায় কোন কথা বলেছে?
মঙ্গলবার ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ বলেছেন, তাদের পাঁচটি যুক্তির মধ্যে দুটি যুক্তি আদালতের জন্য অবমাননাজনক বলে মনে হওয়ায় প্রসিকিউশনপক্ষ অভিযোগ এনেছে। যুক্তি দুটির মধ্যে রয়েছেÑ গোলাম আযমের রায় ট্রাইব্যুনাল নিজে থেকে তদন্ত করেছে। অপরটি হলো প্রসিকিউশনপক্ষের সঙ্গে যোগসাজশে ট্রাইব্যুনাল রায় দিয়েছে। তিনি আরও বলেন, গোলাম আযমের রায় সুপ্রীমকোর্টে বিচারাধীন রয়েছে। কাজেই তাদের ওই বিবৃতি আদালত অবমাননাজনক।
তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচের (এইচআরডব্লিউ) অর্থের উৎস এবং মানবাধিকার রক্ষায় তাদের পর্যবেক্ষণ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। মঙ্গলবার দুপুরে প্রসিকউটর ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ, জেয়াদ আল মালুম, সুলতান মাহমুদ সীমন, তাপস বলসহ প্রসিকিউশন টিম ট্রাইব্যুনালের রেজিস্ট্রারের মাধ্যমে ট্রাইব্যুনাল-১-এ অভিযোগ দাখিল করেন। দাখিলের পর প্রসিকিউটর ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ সাংবাদিকদের বলেন, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ট্রাইব্যুনালের বিচারিক বিষয় এবং গোলাম আযমের মামলার রায়ের সমালোচনা করে পাঁচটি প্রশ্ন উত্থাপন করেছে। তার একটিতে গোলাম আযমের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য প্রমাণের অপর্যাপ্ততার কথা বলা হয়েছে। আর বিষয়টি যেহেতু আপীল বিভাগের এখতিয়ারের মধ্যে রয়েছে, তাই এ বিষয়ে আমরা চ্যালেঞ্জ করিনি।
তা ছাড়া আসামিপক্ষের সাক্ষীদের নিরাপত্তা এবং ট্রাইব্যুনালের বেঞ্চ পরিবর্তন বিষয়ে সংস্থাটির সমালোচনা প্রসঙ্গে প্রসিকউশনের কিছু বলার আছে বলে মনে করেন না তিনি। তাই আদালত অবমাননার অভিযোগে বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে বলে উল্লেখ করেন ড. তুরিন আফরোজ। তিনি আরও বলেন, গোলাম আযমের মামলার বিচারিক বিষয়ে প্রকাশিত বিবৃতিতে যে মন্তব্য করা হয়েছে তাতে সংস্থাটি ট্রাইব্যুনালের ভাবমূর্তিকেই শুধু আঘাত করেনি, আঘাত করা হয়েছে পুরো বিচার প্রক্রিয়াকেই।
তিনি বলেন, ট্রাইব্যুনালে যেসব অপরাধের বিচার হচ্ছে, সব কটি অপরাধই আন্তর্জাতিক অপরাধ। এ অপরাধ কোন ব্যক্তি বা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সংঘটিত হয়নি, হয়েছে গোটা মানবজাতির বিরুদ্ধে। বাংলাদেশ হচ্ছে এমন একটি রাষ্ট্র, যেখানে নিজস্ব আইনে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার করছে। বিশ্বের খুব কম রাষ্ট্রই তা করতে পেরেছে। তাই এ বিচার করে আমরা বিশ্বের বুকে একটি নজির সৃষ্টি করেছি।
এর পর প্রসিকিউটর ব্যারিস্টার তাপস বল বলেন, আমরা হিউম্যান রাইটস ওয়াচের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার অভিযোগ দায়ের করে সংস্থাটির প্রতিনিধিদের হাজির করে এ বিষয়ে তাদের ব্যাখ্যা চেয়ে নির্দেশনা চেয়েছি। উল্লেখ্য, গত ১৫ জুলাই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ জামায়াতের সাবেক আমির গোলাম আযমকে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ের ৯০ বছরের কারাদ- দেয়। বয়স বিবেচনায় ফাঁসির পরিবর্তে তাঁকে কারাদ- দেয়া হয়। আর এ বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলে গত ১৬ আগস্ট শুক্রবার এক বিবৃতি প্রচার করে নিউইয়র্কভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ।
রায়ে কী ছিল ॥ ১৫ জুলাই জামায়াতের সাবেক আমির গোলাম আযমের বিরুদ্ধে রায় ঘোষণা করেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১। চেয়ারম্যান বিচারপতি এটিএম ফজলে কবীরের নেতৃত্বে তিন সদস্যবিশিষ্ট ট্রাইব্যুনাল একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের নাটের গুরু জামায়াতের সাবেক আমির গোলাম আযমের ৯০ বছরের কারাদ- প্রদান করে। একটি সাজা শেষ হওয়ার পর আরেকটি সাজা এভাবে পর্যায়ক্রমে দ-াদেশ কার্যকর হবে। মানবতাবিরোধী অপরাধের ষড়যন্ত্র, পরিকল্পনা, উস্কানি, সহযোগিতা এবং হত্যা-নির্যাতনে বাধা না দেয়াÑ পাঁচ ধরনের অপরাধের প্রতিটিতেই গোলাম আযম সর্বোচ্চ শাস্তি পাওয়ার যোগ্য হলেও তাঁকে কারাদ- দেয়া হয়েছে বয়স ও স্বাস্থ্যের অবস্থা বিবেচনায়। বিভিন্ন মেয়াদের কারাদ- মিলিয়ে তাঁকে টানা ৯০ বছর সাজা অথবা ‘আমৃত্যু’ জেল খাটতে হবে। ট্রাইব্যুনালে অন্য দুই সদস্য ছিলেন বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেন সেলিম ও বিচারপতি আনোয়ারুল হক।
রায়ের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, জামায়াত ক্রিমিনাল সংগঠন। সরকারী-বেসরকারী পদে যেন স্বাধীনতাবিরোধীদের চাকরি না দেয়া হয়। সর্বক্ষেত্রে তাদের বয়কট করার ওপর মতামত ব্যক্ত করেছেন। একই সঙ্গে জামায়াতের নতুন প্রজন্মদের যুদ্ধাপরাধীদের দ্বারা বিভ্রান্ত না হওয়ারও জন্য মতামত দেয়া হয়েছে। দীর্ঘ ৪২ বছর পর মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের মাস্টার মাইন্ড গোলাম আযমের বিরুদ্ধে এই দ- প্রদান করা হলো। গোলাম আযমের বিরুদ্ধে অভিযোগগুলো হলো ষড়যন্ত্র, পরিকল্পনা, উস্কানি, সংশ্লিষ্টতা এবং হত্যা ও নির্যাতন। অভিযোগের সঙ্গে তাঁর বিরুদ্ধে অপরাধের দায়দায়িত্ব হিসেবে আনা হয়েছে সুপিরিয়র রেসপনসিবিলিটি (উর্ধতন নেতৃত্বের দায়)।
রায়ে ট্রাইব্যুনাল, গোলাম আযমের বিরুদ্ধে আনীত পাঁচ ধরনের অভিযোগের মধ্যে প্রথম ও দ্বিতীয় অভিযোগে ১০ বছর করে, তৃতীয় ও চতুর্থ অভিযোগে ২০ বছর করে ও পঞ্চম অভিযোগে ৩০ বছর কারাদ- দিয়েছে। গোলাম আযমের বিরুদ্ধে পাকিস্তানী বাহিনীর সঙ্গে পরিকল্পনা ও ষড়যন্ত্র-সংক্রান্ত ছয়টি, সহযোগিতা-সংক্রান্ত তিনটি, উস্কানির ২৮টি, সম্পৃক্ততার ২৩টি এবং ব্যক্তিগতভাবে হত্যা-নির্যাতনের ১টিসহ মোট ৬১টি অভিযোগ আনা হয়েছিল। রায়ে বলা হয়, গোলাম আযম যে অপরাধ করেছেন তা মৃত্যুদণ্ড তুল্য। কিন্তু তাঁর বয়স ৯১। এ বিবেচনায় তাঁকে ৯০ বছরের কারাদ- দেয়া হলো।