মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
মঙ্গলবার, ২১ মে ২০১৩, ৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪২০
‘জানি এখানে কোন লাশ নাই, তবুও মনডারে একটু বুঝ দিবার লাইগা... আসি’
স্বজনহারাদের আকুতি রানা প্লাজার সামনে
সৌমিত্র মানব, সাভার থেকে ॥ ‘আমরা আমাগো মানুষটারেই খুঁইজা পাইলাম না, এখন আর আমাগো সাহায্য কে করব? কতজন ছবি উঠাইল, কত জায়গায় ছবি-ঠিকানা লিইখা নিল কিন্তু আমাগো নিখোঁজ মানুষটার কোন খোঁজ পাইলাম না। তারে যে কোথায় খুঁজুম, কোথায় যে যামুÑ কিছুই বুঝবার পারতাছি না। জানি, এইখানে আর কোন লাশ নাই। তবুও, মনডারে একটু বুঝ দিবার লাইগা প্রতিদিনই রানা প্লাজার সামনে চইলা আসি।’
রানা প্লাজা ধসে হতাহতদের উদ্ধারাভিযান ১৩ মে সমাপ্তি ঘোষণা করে স্থানটি কাঁটাতার দিয়ে ঘিরে দেয়ার এক সপ্তাহ অতিবাহিত হলেও এখন অব্যাহত রয়েছে স্বজনহারাদের আগমন। খুঁজে না পাওয়ার বেদনায় আবেগ-আপ্লুত হয়ে তারা এ কথাগুলো বলেন।
বড় বোন আর কয়দিন দেখব? ॥ ‘আমার আর আমার ৬ বছরের মাইয়া কেয়ামনিরে আমার বড় বোন আর কয়দিন দেখব? তারা আর কয় টাকা কামায়? তাগোও তো সংসার আছে। স্বামীর লাশটাও পাইলাম না। আর, লাশ শনাক্ত না হইলে কোন সাহায্যও পামু না মনে হইতাছে। আমি মাইয়াডারে নিয়া এখন কার কাছে গিয়া দাঁড়ামু, কিভাবেই বা বাঁচুম- তার কিছুই বোঝবার পারতাছি না। আমারে সাহায্য করার কি কেউ নাই? ’
রানা প্লাজার সামনে স্বামীর ছবি বুকে ধরে একমাত্র মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে কাঁটাতার ঘেরা রানা প্লাজার খালি জায়গার সামনে দাঁড়িয়ে কাঁদতে কাঁদতে এ কথাগুলো বলছিলেন নিখোঁজ স্বামী আঃ করিমের (৩৩) খোঁজে আসা তার স্ত্রী সোনা বানু। করিম দিনাজপুর ঘোড়াঘাট থানার ভেলাইন গ্রামের আঃ ছালাম প্রধানের পুত্র। এক ভাই ও ৩ বোনের মধ্যে তিনি সবার ছোট। ভাই সাভারের রাজাশন রোডে রিকশা চালায়। বড় দু’বোনের বিয়ে হয়ে গেছে।
সোনা বানু জানান, তারা সাভারের চাপাইন তালতলা এলাকায় থাকে। তার স্বামী গত কোরবানি ঈদের পর রানা প্লাজার ৬ষ্ঠ তলার পোশাক কারখানায় চাকরি নেয়। সবমিলিয়ে বেতন পেত ৬ হাজার টাকার মতো। এ টাকা দিয়েই একমাত্র মেয়েকে নিয়ে দু’মুঠো ডাল-ভাত খেয়ে কোন রকম বেঁচেছিল। দুর্ঘটনার পর থেকেই তার স্বামীর মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। জীবিত তো দূরের কথা, অদ্যাবধি তিনি তার স্বামীর লাশেরও কোন সন্ধান পাননি। পাননি কোন আর্থিক সাহায্য। বড় বোন নাজমা ও বোন জামাই আমিরুল ইসলাম এখন তাদের দেখাশোনা করছেন। বোন সাভার টেক্সটাইলে কাজ করেন। আর, বোন জামাই সিআরপি এলাকার একটি প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তারক্ষী। তিনি বলেন, এ দুর্ঘটনার খবর পেয়েও তার শ্বশুর-শাশুড়ি সাভারে আসেননি। তার মা নেই। বাবাও বিছানায় পড়া। বড় বোন আর তার স্বামী কত টাকা আর বেতন পান। তাদেরও তো সংসার আছে। তারা ক’দিন আর তাদের দেখবেন। মেয়েকে নিয়ে তিনি এখন কোথায় গিয়ে দাঁড়াবেন, কোথায় হবে তাদের ঠিকানাÑ এর কিছুই জানেন না তিনি।
দুই শিশুকে নিয়ে চরম বিপাকে নানি ॥ ‘যদি টাকার দরকার হয়, তাহলে চাকরিতে এস। না হলে বাড়িতে ঘুমাও। আজকে না এলে এ মাসের বেতন পাবে না।’
আগের দিন ফাটল ধরায় পরদিন ২৪ এপ্রিল কারখানায় যেতে চায়নি সুলতানা (২৫)। কিন্তু মোবাইল ফোনে এ ধরনের হুমকি পাওয়ার পর বাধ্য হয়েই সে শঙ্কিত চিত্তে কারখানায় যায়। দুর্ঘটনার পর থেকে তার আর কোন খোঁজ মেলেনি।
শাশুড়ি জাহানারা জানান, তাদের গ্রামের বাড়ি পাবনার সিরাজগঞ্জ থানার কাশিনাথপুর গ্রামে। ১৯৮৮ সালে বন্যার পর তারা সাভার আসেন। থাকেন কামাল গার্মেন্টস রোডের বিনোদবাঈদ এলাকায়। তার স্বামী আজিজ মস্তিষ্ক বিভ্রাটের কারণে যত্রতত্র ঘুরে বেড়ায়। ছেলে রফিকুল ইসলাম কাউকে কিছু না বলে বছর খানেক পূর্বে বাসা থেকে চলে যায়। পরে ছেলের বউ সুলতানা রানা প্লাজার ৫ম তলার পোশাক কারখানায় চাকরি নেয়। সবমিলিয়ে বেতন পেত মাসে ৭-৮ হাজার টাকা। সেই ছিল সংসারের একমাত্র চালিকাশক্তি। দুর্ঘটনার দিন সে বাসায় মোবাইল ফোন রেখে যায়। শুধু কার্ড সঙ্গে নিয়ে যায়। তিনি বলেন, এ পর্যন্ত তিনি সুলতানার কোন সন্ধান পাননি। দু’ নাতি শুভ (৭) ও সাগরকে (৫) নিয়ে তিনি পড়েছেন চরম বিপাকে। সারাক্ষণ তারা শুধু মাকে দেখার জন্য কান্নাকাটি করে।‘মা আসতেছে’Ñ শিশু ২টিকে সব সময় এ মিথ্যে সান্ত¡নাই দিতে হচ্ছে। এ কূলে তার আর এখন কেউ নেই। কোথায় যাবেন, কিভাবে বাঁচবেনÑ তা জানেন না। লাশ না পাওয়া যাওয়ায় কোথাও থেকে কোন সাহায্যও পাচ্ছেন না।
ভাইয়ের খোঁজে বোন ॥ স্বামীর সন্ধান না পাওয়ায় স্ত্রী এখন শয্যাশায়ী। তাই, বড় বোন একাই ভাইয়ের সন্ধান চালিয়ে যাচ্ছেন। যেহেতু এখন আর জীবিত পাওয়ার কোন সম্ভাবনা নেই, তাই লাশটি ফিরে পাওয়ার দাবি তার।
বড় বোন শাপলা আক্তার জানান, তার ভাই সোলায়মান হোসেন হজরত গ্রামের বাড়িতে চাষাবাদ করত। কিন্তু, এতে সংসার চলত না বলে স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে বেঁচে থাকার তাগিদে সাভার চলে আসে এবং এপ্রিল মাসে রানা প্লাজার তৃতীয় তলায় ‘নিউ ওয়েভ বটমস্ লিমিটেড’ কারখানায় চাকরি নেয়। দুর্ঘটনার পর থেকে এ পর্যন্ত তিনি তার ভাইয়ের কোন সন্ধান পাননি। ভাইয়ের স্ত্রী শাবনা এখন শয্যাশায়ী। ৩ শিশুসন্তান ফোয়ারা (১০), ইব্রাহীম (৬) ও ইমরানকে (২ বছর ৬ মাস) তিনি রয়েছেন চরম বিপাকে। ভাইকে তাকেই খুঁজে ফিরতে হচ্ছে। এ পর্যন্ত কারোর কাছ থেকে কোন আর্থিক সাহায্যও পাননি।
ছোট মেয়ের পাঠানো টাকাতেই চলত সংসার ॥ ‘ছোট মাইয়া পেপেতুয়া হাঁসদা (২২) প্রতিমাসে ২-৩ হাজার টাকা পাঠাতি। আর, ওই টাকা দিয়াই চলতাম আমরা। এখন পর্যন্ত মাইয়ার কোন খোঁজ পাইলাম না। কে এখন আমাদের খরচের টাকা পাঠাইব? কিভাবেই আমরা এখন বাঁইচা থাকুম?’
রানা প্লাজার সামনে কাঁদতে কাঁদতে এ কথাগুলো বললেন দিনাজপুরের বিরল থানার সাফইরবেঙ্গা গ্রামের খ্রীস্টান সম্প্রদায়ের রাফায়েল হাঁসদা। তিনি বলেন, তার মেয়ে ও জামাই আলবার্ট একই কারখানায় কাজ করত। দুর্ঘটনার পর পরই আলবার্ট বের হয়ে আসতে সমর্থ হয়। কিন্তু, তার মেয়ের কোন সন্ধান নেই। মেয়ের চাকরির বয়স ৫ বছর। মাস ছয়েক আগে প্রেম করে বিয়ে করে। তার কোন ছেলে নেই। ছোট মেয়ের পাঠানো টাকাতেই তারা চলতেন। সবমিলিয়ে তার মেয়ে প্রতিমাসে ১৩ হাজার টাকার মতো বেতন পেত।
ছোট ভাইয়ের খোঁজে বড় ভাই ॥ বড় ভাই ভ্যানচালক সাইফুল নিখোঁজ ছোট ভাই সাইদুলের ছবি হাতে এসেছেন রানা প্লাজার সামনে।
মানিকগঞ্জের শিবালয় থানার ঠুসুম কয়লা গ্রামের লবু মিয়ার পুত্র সাইফুল জানান, সাইদুল বছরখানেক আগে রানা প্লাজার ৪র্থ তলার পোশাক কারখানায় চাকরি নেয়। এখনও পর্যন্ত তিনি তার ভাইয়ের কোন সন্ধান পাননি। তার বাবা-মা এখন পাগলপ্রায়।