মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
মঙ্গলবার, ২১ মে ২০১৩, ৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪২০
মাহমুদুর তথ্য হ্যাকিং ও নীতিমালা না মেনে অপপ্রচারে লিপ্ত ছিলেন
১৫ সম্পাদক না জেনেই বিবৃতি দিয়েছেন ॥ তথ্যমন্ত্রী
বিশেষ প্রতিনিধি ॥ হ্যাকিংয়ের অপরাধে আমার দেশ পত্রিকার সম্পাদক মাহমুদুর রহমানকে গ্রেফতার করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু। তিনি বলেন, তাঁর অফিসে হ্যাকিংয়ের বিভিন্ন আপত্তিকর যন্ত্রপাতিও পাওয়া গেছে। কিন্তু আমার দেশ পত্রিকা বন্ধ করা হয়নি। এটি প্রচার করতে আইনগত কোন বাধা নেই। সংবাদপত্রের স্বাধীনতাকে কাজে লাগিয়ে নিজের ও বিভিন্ন গোষ্ঠীর স্বার্থে তা ব্যবহার করেছেন তিনি। তিনি বলেন, সম্পাদক মাহমুদুর রহমান বিভিন্ন তথ্য হ্যাকিং করেছেন এবং নীতিমালা না মেনে একের পর এক অপপ্রচারে লিপ্ত ছিলেন। তিনি সাংবাদিক কুলে কলঙ্কজনক অধ্যায় রচনা করেছেন। যে ১৫ জন সম্পাদক তাঁর মুক্তির দাবিতে বিবৃতি দিয়েছেন তাঁরা হয়ত সবকিছু না জেনেই দিয়েছেন। আশা করি ভবিষ্যতে তাঁরা মাহমুদুর রহমানের পক্ষে আর ওকালতি করবেন না। তিনি আরও বলেন, নীতিমালার সুস্পষ্ট লঙ্ঘনের অভিযোগে দিগন্ত ও ইসলামিক টেলিভিশন দুটি সম্প্রচার সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। সোমবার তথ্য অধিদফতরে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা বলেন।
যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে গণজাগরণের বিপক্ষে দাঁড়ানো আমার দেশের সম্পাদক মাহমুদুর রহমানকে গ্রেফতার এবং পত্রিকাটির ছাপাখানা বন্ধ করার ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে গত শনিবার ১৫টি দৈনিক ও একটি অনলাইন পত্রিকার সম্পাদক বিবৃতি প্রদান করেন। তারা মাহমুদুর রহমানের মুক্তি এবং বন্ধ আমার দেশ, দিগন্ত টেলিভিশন ও ইসলামিক টিভি খুলে দেয়ার দাবি জানান। ওই বিবৃতিতে ফেসবুকসহ সোস্যাল মিডিয়ায় তীব্র প্রতিক্রিয়া হয়। সেক্টর কমান্ডারস ফোরাম ও সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটসহ চার সংগঠনের নেতারা রবিবার এক বিবৃতিতে সম্পাদকদের বক্তব্যের প্রতিবাদ করেন। এর পর সোমবার তথ্য অধিদফতরের সম্মেলন কক্ষে সংবাদ সম্মেলন ডাকেন মন্ত্রী হাসানুল হক ইনু।
তিনি বলেন, ১৫ জন সম্পাদক এ বিষয়ে ওয়াকিফহাল না হয়ে, পুরো বিষয়টি খতিয়ে না দেখেই ওই বিবৃতি দিয়েছেন। মাহমুদুর রহমান সংবাদপত্র জগতে কলঙ্কজনক অধ্যায় রচনা করেছেন। সাংবাদিকতার সুযোগ নিয়ে তা ব্যক্তি ও গোষ্ঠী স্বার্থে কাজে লাগিয়েছেন। তাঁরা এভাবে বিবৃতি দেয়ায় গণমাধ্যম কর্মীদের ভাবমূর্তিও খুন্ন হয়েছে বলে মন্তব্য করেন জাসদ সভাপতি ইনু। তিনি বলেন, না জেনে বিবৃতি দিয়ে সাফাই গাওয়া গণমাধ্যমের জন্য মঙ্গলজনক নয়। আশা করব তারা আমাদের যুক্তি গ্রহণ করবেন এবং ভবিষ্যতে মাহামুদুরের পক্ষে আর ওকালতি করবেন না।
আমার দেশের ছাপাখানায় তল্লাশি চালানো এবং দুটি টেলিভিশন চ্যানেলের সম্প্রচার সাময়িকভাবে বন্ধের বিষয়ে আইনের বিভিন্ন ধারা উল্লেখ করে সরকারের পদক্ষেপের বিশদ ব্যাখ্যা দেন তথ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘হ্যাকিং করে বিকৃত তথ্য প্রচার, মিথ্যাচার, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করে এমন সব বিষয় প্রচার করার দায়ে’ আমার দেশের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। আর মাহমুদুর রহমানকে গ্রেফতার করা হয়েছে সুনির্দিষ্ট ফৌজদারি অভিযোগে।
উপযুক্ত ‘ওয়ারেন্ট’ নিয়েই আমার দেশের ছাপাখানায় তল্লাশি চালানো হয়েছে এবং সেখানে ‘আপত্তিকর সরঞ্জাম’ পাওয়া গেছে দাবি করে ইনু বলেন, সেখানে আরও তল্লাশি চালানো হবে। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত আমার দেশের ছাপাখানা খোলা হবে না। তিনি বলেন, আমার দেশের ডিক্লারেশন বাতিল করা হয়নি। তল্লাশি শেষ না হলে ছাপাখানা খুলে দিতে পারছি না। অন্য ছাপাখানা থেকে তারা পত্রিকা ছাপাতে পারে। ইনু বলেন, অন্য ছাপাখানা থেকে পত্রিকা ছাপাতে হলে যে প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয় তা না করায় সংগ্রামের ছাপাখানার বিরুদ্ধেও পদক্ষেপ নিতে সরকার বাধ্য হয়েছে। আমার দেশ ছাপাতে আইনগত কোন বাধা নেই মন্তব্য করে তথ্যমন্ত্রী বলেন, আমরা গণমাধ্যমের স্বাধীনতায় বিশ্বাস করি বলেই আমার দেশের ডিক্লারেশন বাতিল করা হয়নি।
যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারকের কথিত স্কাইপ কথোপকথন প্রকাশ এবং রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে আমার দেশের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মাহমুদুর রহমানকে গত ১১ এপ্রিল গ্রেফতার করে পুলিশ। ওই দিনই পুলিশ পত্রিকাটির ছাপাখানায় তালা ঝুলিয়ে দেয়। অন্যদিকে ৫ মে গভীর রাতে দিগন্ত টেলিভিশন ও ইসলামিক টিভির সম্প্রচার ‘সাময়িকভাবে’ বন্ধ করে দেয়া হয়।
মন্ত্রী বলেন, দিগন্ত ও ইসলামিক টিভির সম্প্রচার সাময়িকভাবে বন্ধ করে তাদের কারণ দর্শাও নোটিস দেয়া হয়েছে। এর পর তারা যে জবাব দিয়েছে, তা পরীক্ষা করে দেখা হচ্ছে। তাদের উত্তরে প্রশাসন সন্তুষ্ট হলেই আবার সম্প্রচার শুরুর অনুমতি দেয়া হবে। তিনি বলেন, তারা সম্প্রচারের শর্ত লঙ্ঘন করেছে। এ শর্তের ব্যাপারে যতক্ষণ পর্যন্ত তাদের কাছ থেকে আশ্বস্ত হতে না পারছি ততক্ষণ খুলে দিতে পারছি না।
মন্ত্রী বলেন, টেলিভিশন চ্যানেল সম্প্রচার বন্ধের ঘটনা নতুন নয়। ইতোপূর্বে ব্যাংকে বন্ধক রাখা, ব্যাংক কর্তৃক পাওনা টাকা আদায়ে যন্ত্রপাতি নিলামে বিক্রি করায় টেলিযোগাযোগ আইনের ২০০১-এর ৫৫(৪) ধারা লঙ্ঘিত হওয়ায় ২০১০ সালের ২৭ এপ্রিল বিটিআরসি চ্যানেল ওয়ানের সম্প্রচার বন্ধ করে দেয়। এর পর ২০১০ সালের ২৫ আগস্ট বিটিআরসি যমুনা টেলিভিশনের অনুমতি ছাড়া পরীক্ষামূলক সম্প্রচার বন্ধ করে দেয়। এর আগে ফোকাস মাল্টিমিডিয়া কোম্পানি লিঃ (সিএসবি) ভুয়া ও জাল অনাপত্তিপত্র জমা দিয়ে বিটিআরসি থেকে প্রতারণামূলকভাবে তরঙ্গ বরাদ্দ নেয়ার ঘটনাটি ধরা পড়ায় ২০০৭ সালের ৬ সেপ্টেম্বর তাদের অনাপত্তি ও তরঙ্গ বাতিল করা হয়। এরও আগে আপীল বিভাগের রায়ে ২০০২ সালের ২৯ আগস্ট একুশে টিভির সকল সম্প্রচার বন্ধ করা হয়েছিল। পরবর্তীতে ২০০৫ সালের ১১ এপ্রিল একুশে টেলিভিশন শুধু সাটেলাইট চ্যানেল হিসেবে সম্প্রচারের অনুমতি পায়।
এ দুটি টেলিভিশন চ্যানেলের বিষয়ে ১৫ সম্পাদকের উদ্বেগের জবাবে ইনু বলেন, আমার দেশ, দিগন্ত ও ইসলামিক টেলিভিশনের বিরুদ্ধে যে পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে তার সঙ্গে সংবাদপত্রের স্বাধীনতার কোন সম্পর্ক নেই। আইন তার নিজস্ব গতিতেই চলছে। সরকার সংবাদপত্র ও আদালতের ওপর কোন হস্তক্ষেপ করছে না, করার অবকাশও নেই।
এক থেকে দেড় সপ্তাহের মধ্যে বেসরকারী টেলিভিশন নীতিমালা চূড়ান্ত করা হবে জানিয়ে তথ্যমন্ত্রী বলেন, নীতিমালাটি জারি হওয়ার পর টেলিভিশনগুলো তার আলোকেই চলবে।