মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
সোমবার, ১৪ জানুয়ারী ২০১৩, ১ মাঘ ১৪১৯
ডাক্তার হওয়ার আগেই ঝরে গেল জেরিন, এ কি হত্যাকা- না দুর্ঘটনা!
স্টাফ রিপোর্টার ॥ চিকিৎসক হয়ে ওঠা হলো না মীর জেরিনা আরাদিন জেরিনের। আর মানবসেবার মতো মহৎ কাজেও নিজেকে জড়াতে পারলেন না। অকালেই ঝরে পড়লেন। ছোট ভাইদের প্রতি কর্তব্যটুকুও পালনের সুযোগ পেলেন না। বয়ফ্রেন্ডের সঙ্গে রেললাইনে হাঁটতে গিয়ে ট্রেনের ধাক্কায় প্রাণ গেল জেরিনের। তার মৃত্যু নিয়ে নানা রহস্য ঘুরপাক খাচ্ছে। পুলিশ জেরিনের মৃত্যুরহস্য উদ্ঘাটনে বয়ফ্রেন্ড মহিউদ্দিন স্মরণকে গ্রেফতার করেছে। মাদকাসক্ত স্মরণ ধাক্কা দিয়ে জেরিনকে ট্রেনের নিচে ফেলে দিয়ে হত্যা করতে পারে বলে দাবি করেছে পুলিশ।
জেরিনের পিতা মীর কায়কোবাদ বাবলু। মা মীর মেরী। ২ ভাইয়ের একমাত্র বোন জেরিন। সে সবার বড়। পুরো পরিবার কানাডা প্রবাসী। আপনজন বলতে বাংলাদেশে তার আছে একমাত্র খালু। তাও অনেকটাই দূরের। বড় সন্তান হিসেবে জেরিনকে কাছে পেতেই চেয়েছিলেন কানাডা প্রবাসী পিতামাতা। এজন্য জেরিনকে কানাডায় নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন। কিন্তু জেরিন দেশ ভালবেসে দেশেই রয়ে যান। ডাক্তার হয়ে মানবসেবায় নিয়োজিত করতে চান। নেহায়ত যদি কোন অসুবিধা অনুভব হয় তখন কানাডায় যাবে বলে তার পিতামাতাকে জানায়।
জেরিনের এমন ইচ্ছায় পিতামাতা বাঁধা দেননি। কথা রাখেন তার পিতামাতা ও ভাইরা। তারা সবাই কানাডা চলে যান। আর জেরিন রয়ে যায় বাংলাদেশে। সে ভর্তি হয় রাজধানীর উত্তরার উইমেন্স মেডিক্যাল কলেজে। প্রথম বর্ষে পড়াশুনা করছিল। কলেজের হোস্টেলেই বসবাস শুরু করে সে।
আর সমসাময়িক বয়স হওয়ার সূত্র ধরে পারিবারিকভাবেই পরিচয় হয় মহিউদ্দিন স্মরণের (২৫) সঙ্গে। মহিউদ্দিনের পিতা একজন উর্ধতন সরকারী কর্মকর্তা। স্মরণদের গ্রামের বাড়ি কুমিল্লার মুরাদনগর থানায়। তারা রাজধানীর বিমানবন্দরের কাছেই দক্ষিণখান থানাধীন এলাকায় নিজেদের বাড়িতে বসবাস করে। লন্ডন থেকে এমবিএ শেষ করে বাংলাদেশে এসেছে বলে দাবি করেছে স্মরণ। দীর্ঘ দিনের পরিচয়ের সুবাদে স্মরণের সঙ্গে জেরিনের প্রেমের সম্পর্ক হয়। সেই সূত্র ধরেই শনিবার স্মরণ ও জেরিন ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট রেলওয়ে স্টেশনে রেডিসনের পেছনে রেললাইন ধরে হাঁটছিলেন। হাঁটার এক পর্যায়ে জেরিন ট্রেনে কাঁটা পড়ে।
জেরিনকে প্রথমে স্মরণ উদ্ধার করে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করে। কিন্তু সেখানে জেরিনের অবস্থার অবনতি হয়। এমন পরিস্থিতিতে জেরিনকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করে চিকিৎসকরা। ডিএমসিতেই চিকিৎসাধীন অবস্থায় জেরিনের মৃত্যু হয়। জেরিনের মৃত্যু সম্পর্কে অসংলগ্ন তথ্য দিতে থাকলে মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পুলিশ ফাঁড়ির উপ-পরিদর্শক তাপস স্মরণকে আটক করেন। পরে তাকে শাহবাগ পাঠানো হয়। রাতেই এ ব্যাপারে রেলওয়ে থানায় মামলা হয়। শাহবাগ থানা পুলিশ স্মরণকে রেলওয়ে থানা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করে। এদিকে রাতেই জেরিনের খালু ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ মর্গে যোগাযোগ করেন। তবে জেরিনের খালু নিজের কোন পরিচয় দেননি। তাঁর নাম পর্যন্ত প্রকাশ করেননি।
কমলাপুর রেলওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ আলাউদ্দিন জনকণ্ঠকে জানান, শনিবার বিকেলে ওই জায়গায় বেড়াতে যায় তারা। সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে ঘটে দুর্ঘটনা। স্মরণকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। প্রাথমিক তদন্তে এবং জিজ্ঞাসাবাদে স্মরণ মাদকাসক্ত বলে জানা গেছে। লন্ডনে এমবিএ পড়াকালীন স্মরণ নানা ধরনের নেশায় জড়িয়ে পড়ে। ক্লাসে অনিয়মিত ছিল। এমন নানা কারণেই লন্ডনের ওই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্মরণকে বের করে দেয়। স্মরণ ইয়াবা ও হেরোইনে আসক্ত।
পুলিশ কর্মকর্তা আরও জানান, জেরিনের মৃতদেহ যে অবস্থায় উদ্ধার করা হয়, তাতে মনে হয় স্মরণ জেরিনকে ধাক্কা দিয়ে ট্রেনের নিচে ফেলে দিয়েছে। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। ইতোমধ্যেই জেরিনের খালুর মাধ্যমে কানাডায় জেরিনের পরিবারের কাছে খবর পৌঁছানো হয়েছে।
এদিকে আটকের পর স্মরণ দাবি করেছে, জেরিনের সঙ্গে তার বিয়ে ঠিক হয়েছিল দুই পরিবারের সম্মতিতে। তারা স্বামী-স্ত্রীর মতোই চলাফেরা করত। আহত অবস্থায় হাসপাতালে নিয়ে স্মরণ রেজিস্ট্রারে জেরিনকে স্ত্রী বলে উল্লেখ করে।
স্মরণের মা ঘটনার দিন একটি পত্রিকাকে জানান, স্মরণ কোন মতেই জেরিনকে হত্যা করতে পারে না। কারণ আমাদের দুই পরিবারের সম্মতিতে তাদের বিয়ে ঠিক হয়ে আছে। আগামী মাসে জেরিনের বাবা-মা কানাডা থেকে এসে তাদের বিয়ে দিতে চেয়েছিলেন। তিনি জানান, শুক্রবার রাতেও জেরিন তাঁর বাসায় আসে। এরপর রাতে তাকে হোস্টেলে পৌঁছে দেয় স্মরণ।