মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
সোমবার, ১৪ জানুয়ারী ২০১৩, ১ মাঘ ১৪১৯
ক্ষতিগ্রস্তদের ঘরের মূল্য নির্ধারণে দুর্নীতি গচ্চা যাবে ৫০ কোটি টাকা
পদ্মা সেতুর জন্য জাজিরায় অধিগ্রহণ করা ভূমির ওপর ঘরের মূল্য ১০ গুণ বেশি ধরে তালিকা ॥ দুই কোটি টাকা ঘুষ নেয়ার অভিযোগ
আবুল বাশার, শরীয়তপুর থেকে ॥ পদ্মা সেতু প্রকল্প এলাকা শরীয়তপুরের জাজিরার নাওডোবায় চলছে ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ দেয়ার কাজ। অধিগ্রহণকৃত ভূমির ওপর স্থাপনার মূল্য নির্ধারণের কাজ করছে শরীয়তপুর গণপূর্ত বিভাগ। এ কাজে গণপূর্ত বিভাগের প্রকৌশলীদের বিরুদ্ধে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। গণপূর্ত বিভাগ থেকে মূল্যতালিকা সংগ্রহ করে রবিবার সকালে নাওডোবা এলাকায় সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, অধিকাংশ ঘরের মূল্য ১০ থেকে ২০ গুণ বৃদ্ধি করে মূল্যতালিকা জমা দেয়া হয়েছে। শরীয়তপুর গণপূর্ত বিভাগের একজন উপ-সহকারী প্রকৌশলীর নেতৃত্বে কয়েক দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা মোটা অঙ্কের ঘুষ গ্রহণের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্তদের ঘরের প্রকৃত মূল্যের চেয়ে ১০ থেকে ২০ গুণ বেশি নির্ধারণ করে তালিকা প্রস্তুত করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এতে সরকারের গচ্চা যাবে প্রায় ৫০ কোটি টাকা। ইতোমধ্যে বাড়তি সুবিধার লোভ দেখিয়ে ক্ষতিগ্রস্তদের কাছ থেকে প্রায় ২ কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগ উঠেছে শরীয়তপুর গণপূর্ত বিভাগের ওই দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে। আবার যারা ঘুষ দিতে ব্যর্থ হয়েছে তাদের ঘরের প্রকৃত মূল্যের চেয়েও কম মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
শরীয়তপুর জেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, পদ্মা সেতুর গাইডবাঁধের জন্য জাজিরা উপজেলার নাওডোবা ও দিয়ারা নাওডোবা মৌজার ১৫৫ দশমিক ১৩ একর ভূমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। ২০১১ সালের ১৪ আগস্ট অধিগ্রহণ কার্যক্রম শেষ হয়। অধিগ্রহণকৃত এলাকায় ৪৩০টি পরিবারের বসবাস। জেলা প্রশাসন ও সেতু বিভাগ গত বছর ১ নবেম্বর ভূমির ওপরে স্থাপনার তালিকা প্রস্তুত করে। সে তালিকা অনুযায়ী স্থাপনার মূল্য নির্ধারণের জন্য জেলা প্রশাসন গত ১৬ জুলাই শরীয়তপুর জেলা গণপূর্ত বিভাগকে চিঠি দেন। গত ২০ ডিসেম্বর গণপূর্ত বিভাগ থেকে মূল্য তালিকা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে জমা দেয়া হয়েছে। জেলা প্রশাসন তালিকা যাচাইবাচাই করে অনুমোদনের জন্য সেতু বিভাগের কাছে পাঠাবে। গণপূর্ত বিভাগের প্রস্তুত করা এ মূল্য তালিকায় ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে।
গণপূর্ত বিভাগের উপ-সহকারী প্রকৌশলী মোহাম্মদ মনিরুল ইসলাম, উপ-সহকারী প্রকৌশলী আলী নুর, উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী মনিরুজ্জামান, কার্য সহকারী আবু তাহের খান ও নির্বাহী প্রকৌশলী জাকির হোসেন ক্ষতিগ্রস্তদের ঘরের মূল্যতালিকা প্রস্তুত করেন। উপ-সহকারী প্রকৌশলী মনিরুল ইসলামের বাড়ি প্রকল্প এলাকার পাশে জাজিরা উপজেলার বিলাসপুর গ্রামে। এ সুবাদে ওই এলাকার মানুষ তাঁর চেনাজানা। এ কারণে তিনি মাঠ পর্যায়ে মূল্য নির্ধারণ কাজের নেতৃত্ব দেন।
নাওডোবা মৌজার ৭৬১নং দাগের উপরে মোতালেব জমাদ্দার, তার পুত্র রাজা মিয়া ও সুরুজ মিয়ার ৩টি টিনের বসতঘর রয়েছে। ১৫ ফুট দৈর্ঘ্য ও ১২ ফুট প্রস্থ এই ৩টি ঘরের বর্তমান বাজার দর অনুযায়ী মূল্য রয়েছে ৫ লাখ হতে ৮ লাখ টাকা। কিন্তু এই ৩টি ঘরের মূল্য নিধারণ করা হয়েছে ৫০ লাখ ৬৫ হাজার ৮৪৪ টাকা। তাঁর বাড়ির পেছনে পদ্মা নদীর তীরে পরিত্যক্ত জায়গায় ২টি পাটকাঠির ঘর, ৩টি টিনের ছাপরা ঘর রয়েছে। ঘরগুলো বাঁশ দিয়ে নির্মিত। পরিত্যক্ত এ ঘরগুলোতে কেউ বসবাস করে না। বর্তমান বাজারমূল্য অনুযায়ী ঘরগুলোর দাম রয়েছে ২ লাখ থেকে ৩ লাখ টাকা মাত্র। কিন্তু মূল্য তালিকায় মোতালেব জমাদ্দারের পুত্রবধূ জোসনা বেগমের নামে ঘরগুলো লেখা হয়েছে এবং ঘরের মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৩২ লাখ ২৩ হাজার ৪৫৯ টাকা।
জানতে চাইলে জোসনা বেগম বলেন, ঘরের মূল্য কত হয়েছে জানি না। মনির ইঞ্জিনিয়ারের সঙ্গে আমার স্বামী যোগাযোগ করে মূল্য তালিকায় আমার নাম উঠিয়েছে। পাটখড়ির নির্মিত এমন ৫টি ঘর নির্মাণ করতে কত টাকা ব্যয় হতে পারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ২ লাখ থেকে ৩ লাখ টাকা লাগতে পারে।
এসব বিষয়ে মোতালেব জমাদ্দার, রাজা মিয়া ও সুরুজ মিয়া কোন মন্তব্য করতে রাজি হননি।
জমির হাওলাদার কান্দি গ্রামের ইব্রাহিম খান। তাঁর বাড়িতে ১২ ফুট দৈর্ঘ্য ও ৮ ফুট প্রস্থ ২টি টিনের ছাপরা ঘর রয়েছে। বাঁশ ও কাঠের অবকাঠামোর উপরে টিন দিয়ে ঘরগুলো নির্মিত হয়েছে যার আনুমানিক মূল্য ২ থেকে ৩ লাখ টাকা হতে পারে। তার একটিতে জেনারেটরের মাধ্যমে এলাকায় ৬০টি পরিবারের মধ্যে বিদ্যুত সরবরাহের ব্যবসা করেন। ঘরের মূল্য তালিকায় ইব্রাহিম খানের নামে ৩১ লাখ ৭৬ হাজার ৫৫১ টাকা উঠেছে।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ইব্রাহিম খান বলেন, ৩৫০টি বাড়িতে জেনারেটরের সংযোগ আছে এমন তথ্য মনিরুল ইসলাম ইঞ্জিনিয়ারকে দিয়ে লিখিয়েছি। সে কত টাকা বিল করেছে জানি না। একটু বেশি বিল করার কথা। কেন বেশি বিল করার কথা প্রশ্ন করলে কোন মন্তব্য করতে রাজি হননি তিনি।
জৈনউদ্দিন মাদবর কান্দিগ্রামের আবদুল হালিম মাদবরের ১৬ ফুট দৈর্ঘ্য ও ১০ ফুট প্রস্থ একটি টিনের ঘর রয়েছে। কাঠের অবকাঠামোর উপরে ঘরটি নির্মিত। মূল্যতালিকায় ঘরটির দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ২১ হাজার ১২৯ টাকা। বর্তমান বাজার দর অনুযায়ী ঘরটির মূল্য রয়েছে ২ লাখ ৫০ হাজার হতে ৩ লাখ টাকা। একই মাপের তার পাশের তোতা মাদবরের একটি ঘরের মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৮ লাখ ৪১ হাজার ৯১৪ টাকা।
আবদুল হালিম মাদবরের পুত্র চঞ্চল মাদবর বলেন, মূল্যতালিকা প্রস্তুত করার সময় গণপূর্ত অধিদফতরের ইঞ্জিনিয়ার মনিরুল ইসলাম আমার কাছে ১ লাখ টাকা চেয়েছিল। আমরা গরিব মানুষ টাকা দিতে পারিনি। এ কারণে ঘরের মূল্য কম লিখেছে।
গণপূর্ত বিভাগ থেকে মূল্যতালিকা সংগ্রহ করে রবিবার সকালে নাওডোবা এলাকায় সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, অধিকাংশ ঘরের মূল্য ১০ থেকে ২০ গুণ বৃদ্ধি করে মূল্যতালিকা জমা দেয়া হয়েছে। পদ্মার তীরবর্তী এলাকা হওয়ায় ওই এলাকার বেশির ভাগ ঘর পাটকাঠি, বাঁশ ও কাঠের অবকাঠামো ও টিন দিয়ে নির্মিত। ব্যবসায়ীরা জানান, বর্তমান বাজার মূল্য অনুযায়ী কোন ঘরের মূল্যই ৬ লাখ টাকার উপরে নেই। গাইড বাঁধের জন্য ভূমি অধিগ্রহণ করার পর ক্ষতিপূরণ পাওয়ার জন্য অনেকে ফসলি জমি ও বাগানে ঘর নির্মাণ করেছে। সে সকল ঘরেরও মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে। শরীয়তপুর গণপূর্ত বিভাগের উপ-সহকারী প্রকৌশলী মোহাম্মদ মনিরুল ইসলাম বলেন, প্রকল্প এলাকার পাশে আমার বাড়ি হওয়ায় ক্ষতিগ্রস্তরা পরিচিত। তাদের অনুরোধে মূল্য সামান্য কিছু বৃদ্ধি করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে কোন অনিয়ম করা হয়নি। কারও কাছ থেকে আর্থিক কোন সুবিধাও নেয়া হয়নি। পাটকাঠি ও বাঁশের নির্মিত ঘরের মূল্য লাখ লাখ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে কেন এমন প্রশ্ন করলে মনিরুল ইসলাম উত্তেজিত হয়ে এ প্রতিবেদককে গালিগালাজ করেন। এ বিষয়ে কোন সংবাদ পরিবেশন করা হলে এ প্রতিবেদককে দেখে নেয়ার হুমকি দেন।
শরীয়তপুর গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী জাকির হোসেন বলেন, সরকারী নীতিমালা অনুযায়ী মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে। কোন অনিয়ম করা হয়নি। আমাদের উপ-সহকারী প্রকৌশলীরা মাঠ পর্যায়ে কাজ করেছেন।
শরীয়তপুরের জেলা প্রশাসক রাম চন্দ্র দাস বলেন, মূল্য তালিকাটি জমা হওয়ার পরে আমাদের কাছে মনে হয়েছে নিয়মের কিছু ব্যত্যয় ঘটেছে। এ কারণে তালিকাটি যাচাইবাছাই চলছে। যাচাইবাছাই শেষ করে অনুমোদনের জন্য সেতু বিভাগে পাঠানো হবে।