মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
সোমবার, ১৪ জানুয়ারী ২০১৩, ১ মাঘ ১৪১৯
বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনে চরমভাবাপন্ন আবহাওয়া
দীর্ঘস্থায়ী শৈত্যপ্রবাহে হুমকিতে খাদ্যশস্য উৎপাদন
কাওসার রহমান ॥ বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের ধাক্কায় বদলে যাচ্ছে বাংলাদেশের আবহাওয়া। বিশ্বের চরম আবহাওয়ার বিপর্যয় এখন বাংলাদেশেও অনুভূত হচ্ছে। গ্রীষ্ম মৌসুমে তীব্র গরম অনুভবের পর চলতি শীত মৌসুমে তীব্র শীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। উন্নত দেশগুলোর এ আবহাওয়া বিপর্যয় মোকাবেলার সামর্থ্য থাকলেও, বাংলাদেশের সে সামর্থ্য নেই। ফলে আর্থিক বিচারে জলবায়ু পরিবর্তনের এ প্রভাবটিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে স্বল্পআয়ের দেশ বাংলাদেশ। চলমান এ শৈত্যপ্রবাহে সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে কৃষি, স্বাস্থ্য এবং মানুষের জীবনযাত্রার ওপর। এ তিন খাতের ক্ষতি কমাতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে না পারলে বড় বিপর্যয়ের মুখে পড়তে হবে বাংলাদেশকে।
চরম আবহাওয়া বিপর্যয়ে এ দেশের জন্য সবচেয়ে বেশি উদ্বেগের বিষয় হলো কৃষির ক্ষতি। যা বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ঠেলে দিয়েছে। গত গ্রীষ্ম মৌসুমে একই সময়ে খরা এবং বন্যায় যেমন আমন ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তেমনি এবারের তীব্র শীতে দেশের সবচেয়ে বড় ফসল বোরো মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন। ইতোমধ্যে দুই দফা শৈত্যপ্রবাহে দেশের প্রায় তিন লাখ হেক্টর এলাকার বীজতলা কমবেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম ফসল আলু এবং শীতকালীন সবজি। বাংলাদেশ ঠিক যে সময়ে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের পথে চাল রফতানির চিন্তাভাবনা করছে, সেই সময়ে আবহাওয়ার বৈরী আচরণে ফসলের ক্ষতি দেশের অর্থনীতির জন্য বিপর্যয়কর। যা বাংলাদেশকে খাদ্য নিরাপত্তা অর্জনের ক্ষেত্রে এক ধাপ পিছিয়ে দিতে পারে। অথচ বাংলাদেশ এজন্য দায়ী নয়। উন্নত দেশগুলোর ভোগবিলাসের কারণেই বৈশ্বিক উষ্ণতা বেড়ে গিয়ে আবহাওয়া এ কঠিনতম বৈরী আচরণ করছে।
এ প্রসঙ্গে দেশের বিশিষ্ট পরিবেশ বিজ্ঞানী ড. আইনুন নিশাত বলেন, ২০১২ সালে আমরা আবহাওয়ার পরিবর্তনজনিত বেশ কিছু ঘটনা বাংলাদেশে ঘটতে দেখেছি। এগুলো হলো গত বছর সুরমা নদীর পানি বিপদসীমার সর্বোচ্চ উচ্চতা দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। সুনামগঞ্জ, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা প্রভৃতি এলাকায় বন্যা। সারাদেশে নির্ধারিত পরিমাণের চেয়ে অর্ধেক বৃষ্টিপাত হয়েছে। আবার ডিসেম্বরের ১৫ তারিখে আমি কদম ফুল ফুটতে দেখেছি।
তিনি বলেন, ‘বাংলাদশে আবহাওয়ার উল্টাপাল্টা আচরণ শুরু হয়েছে। এ অস্বাভাবিক আচরণের বিরূপ প্রভাব দেশের জীববৈচিত্র্যের ওপর পড়বে। বিশেষ করে খাদ্য উৎপাদন ব্যাহত হয়ে খাদ্য নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়বে।’
ড. আইনুন নিশাত বলেন, এ ধরনের আরও দুই-তিনটি শৈত্যপ্রবাহ দেখা দিলে তা দেশের খাদ্য নিরাপত্তার ওপর সরাসরি আঘাত করবে। ইতোমধ্যে গত দুই দফা শৈত্যপ্রবাহে ফসল আবাদের এলাকাগুলোতে তাপমাত্রা ৫-৬ ডিগ্রী সেলসিয়াসে নেমে গেছে। এতে বোরো ধানের বীজতলা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নষ্ট হয়েছে আলুসহ শীতের সবজি। তবে এই শীতে গম ভাল হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
তিনি বলেন, ‘চাল আমাদের প্রধান খাদ্য। আগামী মার্চ-এপ্রিলে যে পরিমাণ গরম পড়ার কথা, তা না পড়লে ধান উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এতে আমাদের খাদ্য নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়বে।’
বাংলাদেশে এবার গত ৪৫ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি শীত অনুভূত হচ্ছে। গত কয়েকদিন ধরেই দেশের বিভিন্ন জায়গায় তাপমাত্রা ৬ ডিগ্রী সেলসিয়াসের নিচে। বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলের কয়েকটি জেলায় তাপমাত্রা তিন ডিগ্রীতে নেমে এসেছে। এবারের বৈশিষ্ট্য হলো দেশের সব এলাকাতেই তাপমাত্রা ১০ ডিগ্রীর নিচে নেমে গেছে। অতীতে এমন ঘটনা আর ঘটেনি। বাংলাদেশের বিজ্ঞানীরা এটাকে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব হিসেবে দেখছেন। তাঁরা বলছেন, বাংলাদেশে গত বছর তীব্র গরম অনুভূত হয়েছে। আবার গত বছর দেশে যে পরিমাণ বৃষ্টি হওয়ার কথা ছিল, হয়েছে তার মাত্র অর্ধেক। এ বছর আবার শীতের রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে।
এ প্রসঙ্গে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. আইনুন নিশাত বলেন, প্রক্রিয়াটা ইন্ডিকেট করে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এটা ঘটছে। কারণ আগে সাইবেরিয়া থেকে যে বাতাসটা আসত তা অনেক ওপর দিয়ে আসত। এখন মাঝে মধ্যে নিচ দিয়ে চলে আসছে। বদলে যাচ্ছে বাতাসের গতিপথ। এটা জলবায়ু পরিবর্তনের কারণেই ঘটছে।
তিনি বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব সবে শুরু হয়েছে। ভবিষ্যতে আরও কী হয় তা এখনই বলা মুশকিল।’
ঢাকার বাসিন্দাদের জন্যও এবারের শীত খানিকটা অপ্রত্যাশিত। ঢাকার মার্কেট ও ফুটপাথগুলোতে গরম জামা-কাপড় কেনার হিড়িক দেখেও সেটি বোঝা যায়। ঢাকায়ও এবারের শীতের তীব্রতা কম নয়। রাস্তা ছাড়াও বিভিন্ন অফিসে শীতের তীব্রতা বেশ অনুভূত হচ্ছে। দিনের একটি বড় সময় কুয়াশায় আছন্ন থাকে ঢাকার রাস্তা। ঢাকায় যেসব ছিন্নমূল মানুষের বসবাস তাদের জন্য এই শীতের তীব্রতা অনেক।
বাংলাদেশের বাসাবাড়ি ও অফিসগুলোতে গরম মোকাবেলার প্রস্তুতি থাকলেও শীতের জন্য কোন ব্যবস্থা নেই। বাংলাদেশ গ্রীষ্মপ্রধান দেশ হওয়ায় অফিস কিংবা বাসাবাড়িতে গরম মোকাবেলার জন্য এসি আছে, কিন্তু ঠা-ার জন্য কিছু নেই। গরম রাখার জন্য অন্য কোন ব্যবস্থা যেমন হিটার তো ব্যবহার করা হয় না।
বাইরের দেশে এমন ঠা-ায় সবার অভ্যাস থাকে। এই দেশে সেটা থাকার প্রশ্নই ওঠে না।
এ প্রসঙ্গে বিশিষ্ট পরিবেশ বিজ্ঞানী ড. আইনুন নিশাত বলেন, কানাডার মতো উন্নত দেশগুলোতে তাপমাত্রা মাইনাস ডিগ্রীর অনেক নিচে চলে গেছে। কিন্তু তাতে তাদের দেশের মানুষ ঠা-ায় কাবু হচ্ছে না। কারণ তাদের ঠা-া মোকাবেলার ব্যবস্থা আছে। তাদের ঘর, অফিস, গাড়ি, শপিং মল সব কিছুতে হিটারের ব্যবস্থা আছে। কিন্তু আমাদের দেশে ঠা-া মোকাবেলার প্রস্তুতি নেই। ফলে এবারের তীব্র ঠা-ায় মানুষ কাবু হয়ে গেছে। তাই আমাদের শীতের এই তীব্রতা মোকাবেলা করার জন্য অভিযোজন কর্মসূচী গ্রহণ করতে হবে। এ প্রসঙ্গে বিশিষ্ট স্থপতি রবিউল হোসেন বলেন, ঢাকা শহরের উচ্চবিত্তদের জন্য তৈরি কিছু ভবন ছাড়া বাকিগুলোতে শীত কিংবা গরম আবহাওয়ার মোকাবেলার তেমন কোন ব্যবস্থা নেই। বাংলাদেশের আবহাওয়ার কারণে গরমকে খানিকটা গুরুত্ব দেয়া হলেও, ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে শীতকে মোটেও প্রাধান্য দেয়া হয় না।
তিনি বলেন, ‘এটা গ্রীষ্মপ্রধান দেশ। শীতপ্রধান দেশে যে ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়, আমাদের এখানে তেমন হয় না। সিস্টেম আছে, কিন্তু আমরা সেটা অনেক কম করি। যেমন দুটি দেয়াল তৈরি করে তার মাঝে পাঁচ ইঞ্চি করে গ্যাপ দেয়া হয়। কিন্তু এটা আমরা সাধারণত করি না। কয়েকটি জায়গায় এটা করা হয়েছে, তবে এটা মনে হয় যেন বেশি বেশি করা হচ্ছে।’
একদিকে শীতের তীব্রতা অন্যদিকে লম্বা সময় ধরে এর স্থায়িত্বÑ এ দুয়ে মিলে এবারের শীত বাংলাদেশের মানুষের জন্য যেমন ব্যতিক্রম, তেমনি ফসলের জন্য ক্ষতিকর। হাড়কাঁপানো শীতে মানুষের যেমন কষ্ট হচ্ছে, তেমনি ফসলেরও ক্ষতি হচ্ছে। বিভিন্ন এলাকায় বোরো বীজতলা নষ্ট হয়ে গেছে। আলুতে পচন ধরতে শুরু করেছে।
দেশের বেশিরভাগ বোরো চাষের এলাকায়ই ঘন কুয়াশা ও পাঁচ ডিগ্রী সেলসিয়াসের নিচে তাপমাত্রা বিরাজ করছে। ফলে ওই অঞ্চলের মাঠে থাকা বোরো ধানের বীজতলা নষ্ট হতে শুরু করেছে। এতে বোরোচাষীরা বেশ বিপাকে পড়েছেন।
কৃষক বীজতলা পলিথিন দিয়ে ঢেকে দিয়ে ফসল রক্ষার চেষ্টা করছেন। অনেকে জমির পাশে বসে থেকে ধানের ওই চারা গাছ থেকে কুয়াশার পানি সরানোর চেষ্টা করে যাচ্ছেন। তাদের এই আপ্রাণ চেষ্টা হলো বোরোর বীজতলাকে রক্ষা করা। কারণ বীজতলা নষ্ট হয়ে গেলে বোরো আবাদ ব্যাহত হবে। ফলে কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কারণ নতুন করে বীজতলা তৈরি করতে গেলে বোরো আবাদ বিলম্বিত হবে। এতে খরচও বেড়ে যাবে। এমনিতেই ধানের খরচ কম। তার ওপর ডিজেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় সেচ খরচ বেড়ে গেছে। এতে বোরোর উৎপাদন খরচ বেড়ে গিয়ে কৃষককে লোকসান গুনতে হবে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছর ৪৭ লাখ ৮০ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এজন্য তিন লাখ হেক্টর জমিতে বীজতলা করা হয়েছে। ডিসেম্বর থেকে জানুয়ারি মাস পর্যন্ত কৃষক বীজতলায় ধানের চারা তৈরি করেন। শৈত্যপ্রবাহে চারা মারা যাওয়ায় অনেক এলাকার কৃষকই আগামী বোরো চাষ কীভাবে করবেন, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন।
আবহাওয়াবিদরা জানান, সাইবেরিয়া থেকে আসা হিমেল হাওয়া এবার আগের বছরগুলোর তুলনায় নিচ দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। পশ্চিম দিক দিয়ে আসা ওই হিমশীতল বায়ুপ্রবাহ হিমালয়ের নিচের দিকে বাধা পেয়েছে। ফলে এটি ধীরে ধীরে ভারত ও বাংলাদেশের ওপরে বিস্তৃতি লাভ করে এবারের শৈত্যপ্রবাহটিকে তীব্র ও দীর্ঘস্থায়ী করেছে।
শৈত্যপ্রবাহের কারণে কেবল বাংলাদেশেই নয়, ভারতের বিহার, মধ্যপ্রদেশ, পশ্চিমবঙ্গ, দিল্লীসহ বিস্তীর্ণ এলাকায় স্মরণকালের ভয়াবহ শীত নেমেছে। শৈত্যপ্রবাহটি হিমালয় পর্বতমালা অতিক্রম করে বাংলাদেশে আসায় এর তীব্রতা কিছুটা কমেছে। তিন দিন ধরে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ৩ থেকে ৫ ডিগ্রী সেলসিয়াসে ওঠানামা করছে।
এ প্রসঙ্গে আবহাওয়া অধিদফতরের উপপরিচালক শাহ আলম বলেন, কয়েক বছর ধরেই শৈত্যপ্রবাহের সময়কাল ও তীব্রতা বাড়ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণেই শৈত্যপ্রবাহগুলো তীব্র ও স্থায়ী হচ্ছে। এ অঞ্চলে তাপমাত্রা কমার প্রধান উপাদান, সাইবেরিয়ান বায়ুপ্রবাহটি আগের চেয়ে নিচ দিয়ে প্রবাহিত হতে শুরু করেছে।
শৈত্যপ্রবাহগুলো নিচ দিয়ে ধীরে প্রবাহিত হওয়ার ধরন দেখে আবহাওয়া বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, চলতি মাসের শেষের দিকে ও আগামী মাসে আরও দুই থেকে তিনটি শৈত্যপ্রবাহ দেশের ওপর দিয়ে বয়ে যেতে পারে।
প্রায় একই কথা শোনা যাচ্ছে বিশ্বের আবহাওয়া বিশারদদের মুখেও। তাঁদের মতে, বিশ্বের অনেক অঞ্চলেই এ মৌসুমে যে শীত দেখা গেছে, তা অতীত রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। ছাড়িয়ে গেছে এবার উষ্ণতার রেকর্ডও। ঠিক এ মুহূর্তে পৃথিবীর এক প্রান্তে পূর্ব রাশিয়ায় মাইনাস ৫০ ডিগ্রী সেলসিয়াস তাপমাত্রার শীতে মানুষের চলাফেরা যেমন প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে, তেমনই রেকর্ড ৪২ ডিগ্রীরও বেশি তাপমাত্রার উষ্ণতা আর দাবানলে অস্থির অস্ট্রেলিয়ার মানুষ।
আবহাওয়াবিদদের মতে, বিশ্বের চরম আবহাওয়া বিপর্যয় এখন প্রত্যক্ষ করছে পৃথিবীবাসী। আবহাওয়ার এই বৈরী আচরণ রীতিমতো ভাবিয়ে তুলছে তাঁদের। মধ্যপ্রাচ্যের অনাকাক্সিক্ষত ও পাকিস্তানের অসময়ের বন্যা, রাশিয়া, চীন ও ইউরোপের শীত এবং অস্ট্রেলিয়া ও ব্রাজিলের এ মুহূর্তে গরম কোনটাই ঠিক স্বাভাবিকভাবে দেখার সুযোগ নেই। বিশেষজ্ঞদের মতে, উদ্বেগের বিশেষ কারণ হলো বিশ্বজুড়ে আবহাওয়ার এই ‘তীব্রতা’ এখন একই সময় ঘটে চলেছে।
এ প্রসঙ্গে জেনেভায় অবস্থিত ওয়ার্ল্ড মেটেরোলজিক্যাল এ্যাসোসিয়েশনের তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের প্রধান ওমর বাদ্দার বলেছেন, ‘প্রতিবছরই আবহাওয়ার চরম আচরণ আমরা দেখতে পাই। কিন্তু প্রায় একই সময়ে বিশ্বজুড়ে আবহাওয়ার তীব্রতম চিত্র অতীতে কখনই দেখা যায়নি।’
তিনি আরও বলেন, ‘অস্ট্রেলিয়ার চলমান তাপপ্রবাহ, যুক্তরাজ্যের সর্বশেষ আকস্মিক বন্যা এবং সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্যে বন্যা ও তুষারপাতÑ চরম আবহাওয়া বিপর্যয়ের দৃষ্টিকোণ থেকে এসব ঘটনা চলতি সময়টাকে অনেক বড় করে তুলেছে।’
গত ৩০ বছরের মধ্যে এবার চীন তীব্রতম শীতকাল পার করছে। জিয়ানজিং প্রদেশে এক হাজার বাড়িঘর বরফের নিচে। মঙ্গোলিয়ায় এক লাখ ৮০ হাজার গবাদিপশু ঠা-ায় জমে মারা গেছে। পূর্ব রাশিয়ায় এবার শীত রীতিমতো নিষ্ঠুর। মাইনাস ৫০ ডিগ্রী সেলসিয়াস তাপমাত্রায় দিশেহারা মানুষ। কোথাও আবার গরমও চরম ভাবাপন্ন হয়ে উঠেছে। ব্রাজিলের তাপমাত্রা ৯৮ বছর পর রেকর্ড ভঙ্গ করেছে। মধ্যপ্রাচ্যের মরুর দেশে এক আচমকা সর্বগ্রাসী ঝড়ের প্রভাবে ঘটল বৃষ্টি, তুষারপাত এবং একইসঙ্গে বন্যা। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের বিজ্ঞানীরা সে দেশের গত বছরের গরমকালটিকে এ যাবৎকালের উষ্ণতম সময় হিসেবে রেকর্ড করেছেন।
যুক্তরাজ্যে গত বছরের হঠাৎ বন্যায় যারপরনাই অবাক হয়েছেন আবহাওয়া বিশারদরা। যুক্তরাজ্যের মানুষ ওয়ালপেপারে বন্যার যে চিত্র দেখে অভ্যস্ত, এবার তারা সেটা প্রত্যক্ষ করেছে নিজেদের জীবনেই। আবহাওয়ার ক্রুদ্ধ রূপ দেখছে এবার অস্ট্রেলিয়াবাসীও। দেশটিতে এ মুহূর্তে যে গরম পড়েছে, গত ৬৩ বছরের মধ্যে তা দেখা যায়নি। গত ৮ জানুয়ারির ১০৮ দশমিক ১ ডিগ্রী ফারেনহাইট (৪২ ডিগ্রী সেলসিয়াস) তাপমাত্রার রেকর্ডটি ১৯১০ সালের পর পঞ্চমবারের মতো রেকর্ড করা হলো। গত সেপ্টেম্বরে অসময়ের এক ভয়ঙ্কর বন্যায় ভেসে গেল পাকিস্তান। এমনটি এর আগে হয়নি। অথচ অস্ট্রেলিয়ায় এর আগে দুটি বছর ছিল আর্দ্রতম বছর। অস্ট্রেলিয়ায় অবস্থিত কমনওয়েলথ সায়েন্টিফিক এ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিসার্চ অর্গানাইজেশনের ক্লাইমেট এ্যাডাপটেশন ফ্ল্যাগশিপের পরিচালক মার্ক স্ট্যাফর্ড স্মিথ জানান, ‘অস্ট্রেলিয়ায় ১৯৫০ সালের পর থেকে প্রতি দশকেই উষ্ণতা বাড়ছে।’
দক্ষিণ আমেরিকার অবস্থাও একই। ১০৪-১০৮ ডিগ্রী ফারেনহাইটের রেকর্ড পরিমাণ তাপমাত্রার অসহ্য দাবদাহে ব্রাজিলে দুই দিনেই মারা গেছে ৩২ জন। এমন তাপমাত্রা ৯৮ বছর পর রেকর্ড করা হলো। ব্রাজিলে পানির অভাবে অনেক বিদ্যুতকেন্দ্রে বিদ্যুত উৎপাদন কমে গেছে। দেশটিতে এ বছরের গ্রীষ্মকে প্রকৃতির শাস্তি হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
এ প্রসঙ্গে আবহাওয়াবিদ বাদ্দার বলেন, ‘আবহাওয়ার এমন আচরণ যেমন তীব্র হচ্ছে, তেমনই তা ঘন ঘন হচ্ছে। এই পরিস্থিতি বুঝিয়ে দিচ্ছে, জলবায়ু পরিবর্তন কেবলই তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাওয়া নয়, বরং এটি তীব্র, অসহ্যকর ও ব্যতিক্রমী হয়ে ওঠার ব্যাপারও।’
মধ্যপ্রাচ্যে জর্ডানে এবার দেখা গেল ভয়াবহ বন্যা। প্রচ- বৃষ্টিপাত, তুষার ও শিলাবৃষ্টি অভূতপূর্ব। সিরিয়া ও লেবাননে ভয়াবহ বন্যা দেখা গেছে। সেখানে ভেসে যায় অনেক সিরীয় নাগরিকের আশ্রয়শিবির। ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনের জেরুজালেমে বন্যায় ভেসে যায় অনেক এলাকা।
আবহাওয়ার বৈরী আচরণের ব্যাপারে ইসরায়েলের হিব্রু ইউনিভার্সিটির আর্থ সায়েন্স বিভাগের শিক্ষক বেরি লিন বলেন, পুরো বিষয়টাতেই ধাক্কা লাগার মতো ব্যাপার হলো, উচ্চতর বায়ুম-লে তীব্র ও প্রলম্বিত শীত এখন নেই। আর মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের আবহাওয়ার ওপর আটলান্টিক মহাসাগরের সহনীয় প্রভাবও বেশি দিন স্থায়ী হয়নি। তিনি আরও বলেন, ‘তবে শীতের তীব্রতা অস্বাভাবিক। মনে হয়, আবহাওয়া এখন অনেক তীব্রতর হতে যাচ্ছে। অনেক চরম হতে যাচ্ছে।’
পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হচ্ছে বাংলাদেশের কৃষি ও স্বাস্থ্যের। বাড়ছে উদ্বাস্তু মানুষের সংখ্যা। কৃষির ওপর প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ প্রভাব পড়ার কারণে আগামী দিনে কৃষি সবচেয়ে হুমকির মুখে। কৃষির উৎপাদন কমে যাওয়ার কারণে দেশের খাদ্য নিরাপত্তায় এর প্রভাব পড়বে। দক্ষিণাঞ্চলে লবণাক্ততা বাড়ায়, মানুষের জীবনযাত্রা হুমকির মুখে পড়ায় মানুষ নিজের বসতভিটায় থাকতে পারছে না। তারা নিজ বসতভিটা ছেড়ে মাইগ্রেট করে শহরসহ অন্যান্য অঞ্চলে চলে যাচ্ছে। এতে উদ্বাস্তু মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। কিন্তু এ সমস্যা সমাধানে এখন পর্যন্ত কোন কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া যায়নি। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে মানুষের স্বাস্থ্যজনিত নানা সমস্যা দেখা দিচ্ছে বলেও মনে করেন জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা।
এ প্রসঙ্গে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও জলবায়ু বিশেষজ্ঞ ড. কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশে এর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব পড়ছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ বেড়ে গেছে। জীবনযাত্রায়ও পরিবর্তন ঘটছে। এসব ক্ষতি মোকাবেলায় সরকার বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। সরকার নিজস্ব অর্থায়নে জলবায়ু তহবিল করেছে। সেখান থেকে ব্যয় করা হচ্ছে আড়াই হাজার কোটি টাকা। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় বেশ কিছু প্রকল্প এখন বাস্তবায়ন হচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘সামগ্রিকভাবে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ক্ষতি মোকাবেলায় সরকার কৌশল, নীতিনির্ধারণসহ নানা কর্মসূচী নিয়েছে। সেগুলো বাস্তবায়নও হচ্ছে সরকারী অর্থায়নে। এর বাইরে যারা এই ক্ষতির জন্য দায়ী সেই উন্নত দেশগুলোর কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায়েও আন্তর্জাতিকভাবে তৎপর রয়েছে সরকার।’
বিশ্বে জলবায়ু পরিবর্তনে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর তালিকায় শীর্ষে রয়েছে বাংলাদেশ। এদেশে একাধারে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ছে, বিভিন্ন অঞ্চলে লবণাক্ততার সমস্যা দেখা দিয়েছে, হিমালয়ের বরফ গলার কারণে নদীর দিক বদলে যাচ্ছে, বন্যা, ঝড়, জলোচ্ছ্বাসসহ স্থায়ী জলাবদ্ধতা সৃষ্টি করছে। সব দিক দিয়েই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বাংলাদেশ। এছাড়া প্রাকৃতিক দুর্যোগের মাত্রাও এখন বেশি। সব মানদ-েই বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনে ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকায় শীর্ষে।
আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান জার্মান ওয়াচের গ্লোবাল ক্লাইমেট রিস্ক ইনডেক্স অনুযায়ী, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ক্ষতির বিচারে শীর্ষ ১০টি দেশের মধ্যে প্রথমেই অবস্থান করছে বাংলাদেশ। আর জলবায়ু পরিবর্তনে নেতিবাচক প্রভাবে বাংলাদেশে বৃষ্টিপাত কমে গেছে, বেড়ে গেছে লবণাক্ততা, মরুকরণ, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর হ্রাস, সুপেয় পানির অভাব, প্রাকৃতিক দুর্যোগ বৃদ্ধি, নদীভাঙন ও ভূমিধসের ঘটনা ঘটছে। ধ্বংস হচ্ছে উদ্ভিদ প্রজাতি, বিলুপ্তি ঘটছে পক্ষী প্রজাতির। সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে উপকূলীয় জনপদের মানুষ। সাতক্ষীরা-খুলনার সুন্দরবন, ভোলা, হাতিয়া, সন্দ্বীপে ঘূর্ণিঝড় বা টর্নেডো, জলোচ্ছ্বাস, স্থায়ী জলাবদ্ধতা, অতিবৃষ্টি ও তীব্র বন্যার আশঙ্কা বেড়ে যাচ্ছে।
কৃষিপ্রধান বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ঋতুর বৈশিষ্ট্য হারিয়ে যাচ্ছে। এ কারণে বৃষ্টিপাত, তাপমাত্রায় আমূল পরিবর্তন আসছে। ফলে অনিয়মিত, অপর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত, সেচের পানির অপর্যাপ্ততা, উপকূলীয় অঞ্চলে বর্ষা মৌসুম ছাড়াও বিভিন্ন সময় বন্যা ও লবণাক্ত পানিতে জমি ডুবে যাওয়াসহ নানা সমস্যায় বাংলাদেশের কৃষি চরম হুমকির মুখে পড়েছে। দিনে দিনে তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ায় যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে চাষাবাদ, তেমনি তাপমাত্রা অস্বাভাবিক কমে যাওয়ায় ক্ষতির মুখে পড়েছে কৃষি। বাংলাদেশের সোনালি আঁশ পাটের উৎপাদন কমে যাওয়ায় চাষীরা পাট চাষে বিমুখ হয়ে পড়েছেন। পাট চাষ কমে যাওয়ার জন্য বিশেষজ্ঞরা জলবায়ু পরিবর্তনকেই দায়ী করেন। রাজশাহীর বরেন্দ্র অঞ্চলে সময়মতো বৃষ্টিপাত না হওয়ায় রেশমের মৌসুমে কোন গুটি না হওয়ায় উৎপাদন মার খেয়েছে। নওগাঁয় অপ্রতুল বৃষ্টিপাতের কারণে এ এলাকার প্রধান অর্থকরী ফসল বর্ষাকালীন মরিচের চাষ ঠিকমতো হয়নি। দেশের উত্তর-পূর্বাংশে পাহাড়ী অঞ্চলের বৃষ্টিপাতের ঢলের অনিয়মিত বন্যায় পাট, আখ, ধানের বীজতলা ও অন্যান্য নিচু জমির ফসল নষ্ট হয়। এছাড়া দেশে তাপ ও শৈত্যপ্রবাহের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় গ্রীষ্মকালে রবিশস্যের আবাদ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। কখনও কখনও শীতকালের স্থায়িত্ব কমে যাওয়ায় রবিশস্যের জন্য প্রয়োজনীয় তাপমাত্রা পাওয়া যাচ্ছে না। আবার শৈত্যপ্রবাহের ফলে বোরো ধানসহ সরিষা, মসুর, ছোলা প্রভৃতি ফসলের উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। শৈত্যপ্রবাহের কুয়াশার কারণে গমসহ বিভিন্ন ফসলের পরাগায়ন ও বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এ প্রসঙ্গে বিশিষ্ট জলবায়ু বিশেষজ্ঞ ও সেন্টার ফর গ্লোবাল চেঞ্জের নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান উদ্দিন বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনে বরেন্দ্র অঞ্চলের মানুষের স্বাস্থ্য সঙ্কট বাড়ছে। তাঁর মতে, তিনটি বিষয়ে পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। প্রথমত, গড় তাপমাত্রা পরিবর্তন হয়েছে যে কোন মৌসুমের ক্ষেত্রে। দ্বিতীয়ত, বৃষ্টিপাত আগের মতো হচ্ছে না। ধরন ও সময় বদলে গেছে। তৃতীয়ত, সমুদ্রের উপরিস্থলের তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ায় লঘু চাপ ও ঘূর্ণিআবহ তৈরি হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। এর ফলে সমুদ্রে মাছ শিকারে যাওয়া জেলেরা প্রায়সময়ই ঝুঁকির মুখে পড়ছেন।
উদ্বাস্তু সমস্যা প্রসঙ্গে ড. আহসান বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে মানুষের জীবনযাত্রা পাল্টে যাচ্ছে। এসব সমস্যা মোকাবেলা একা দেশের পক্ষে সম্ভব নয়। এটা আন্তর্জাতিকভাবে মোকাবেলা করতে হবে। এজন্য শক্তিশালী দূতিয়ালি করতে হবে। পাশাপাশি পরিস্থিতি মোকাবেলায় সরকারকে কিছু পদক্ষেপ ও পরিকল্পনা নিতে হবে।