মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
সোমবার, ১৪ জানুয়ারী ২০১৩, ১ মাঘ ১৪১৯
আখেরি মোনাজাত
বিশ্ব এজতেমার প্রথম পর্ব শেষ
আমিন আমিন ধ্বনিতে মুখরিত তুরাগ তীর
ফিরোজ মান্না/ মোস্তাফিজুর রহমান টিটু/নূরুল ইসলাম ॥ পরকালের সুখ-শান্তি লাভে ধর্মপ্রাণ মুসল্লিরা আল্লাহর দরবারে হাত তুলে ‘আমিন আমিন ছুম্মাআমিন’ আর কান্নার মধ্য দিয়ে নাজাত চাইলেন। দীর্ঘ ১৭ মিনিট আখেরী মোনাজাতে তুরাগ তীরে এমনই এক বিনম্র পরিবেশ বিরাজ করে। অবনত মাথায় যে যেখানে যে অবস্থায় ছিলেন সেই অবস্থায় আল্লাহর দিদার লাভে হাত তুলে ধ্যানমগ্ন হন। মোনাজাতের মধ্য দিয়ে মুসল্লিরা নিজেদের আল্লাহর কাছে সমর্পণ করেন। এবার আখেরী মোনাজাতে ৮৭ দেশের প্রায় ১২ হাজার বিদেশীসহ লাখ লাখ মুসল্লি অংশগ্রহণ করেন। দ্বিতীয় পর্বের বিশ্ব এজতেমা শুরু হবে ১৮ জানুয়ারি। চলবে ২০ জানুয়ারি পর্যন্ত। দ্বিতীয় পর্বের এজতেমা শেষ হওয়ার পর আবার এক বছর পরে অনুষ্ঠিত হবে বিশ্ব এজতেমা।
প্রথম পর্বের মোনাজাতে মুসলিম উম্মাহর ঐক্য, শান্তি, সমৃদ্ধি, ইহলৌকিক ও পারলৌকিক মুক্তি এবং দ্বীনের দাওয়াত পৌঁছে দেয়ার তৌফিক কামনা করা হয়েছে। জীবনের সব পাপ-অন্যায় থেকে মুক্তির জন্য, পরম দয়াময় আল্লাহর দরবারে মোনাজাতে অংশ নেন মুসল্লিরা। ক্ষমা লাভের আশায় লাখো মানুষের সঙ্গে একত্রে হাত তুলতে দূরদূরান্ত থেকে হেঁটে ও বিভিন্ন যানবাহনে ধর্মপ্রাণ মানুষ এজতেমাস্থলে রবিবার ভোর থেকে আসতে শুরু করেন। বহু মানুষের অংশগ্রহণে ইহলোকের মঙ্গল, পরলোকের ক্ষমা, দেশের কল্যাণ, মুসলিম উম্মাহর ঐক্য ও বিশ্বশান্তি কামনার মধ্য দিয়ে তবলীগ জামাতের বিশ্ব এজতেমার প্রথম পর্ব শেষ হয়েছে।
ভারতের বুজুর্গ মাওলানা জোবায়রুল হাসান মোনাজাত পরিচালনা করেন। তিনি দুপুর ১টা থেকে মোনাজাত শুরু করেন এবং তা চলে ১টা ১৭ মিনিট পর্যন্ত। মোনাজাত শুরু হতেই পুরো এলাকায় নেমে আসে গভীর নীরবতা। খানিক পর পর শুধু ভেসে আসে ‘আমিন, ছুম্মা আমিন, আল্লাহুম্মা আমিন।’ অনুতপ্ত মানুষের কান্নার আওয়াজে আকাশ বাতাস ভারি হয়ে ওঠে। গত শুক্রবার (১১ জানুয়ারি) থেকে শুরু হয়েছিল বিশ্ব এজতেমার প্রথম পর্ব।
রবিবার মোনাজাতের আগে চলে হেদায়াতি বয়ান। হেদায়াতি বয়ান করেন ভারতের মাওলানা সা’দ আহমেদ। বয়ানে মাওলানা সা’দ বলেন, নামাজ হলো সবচেয়ে উঁচু আমল। নামাজ ছাড়া ইসলাম কল্পনা করা যায় না। আল্লাহর ভা-ার থেকে কিছু নেয়ার সবচেয়ে বড় উপায় হলো নামাজ। কাফের নামাজ পড়বে না এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু একজন মুসলমান নামাজ পড়বেন না, এটা চিন্তা করা যায় না। টাকা পয়সা দিয়ে নিশ্চিতভাবে দুনিয়ার কোন সমস্যার সমাধান হয় না। কিন্তু আল্লাহ্র আমল সব সমস্যা সমাধান হবে এটা নিশ্চিত। ইসলামে নামাজের গুরুত্ব মানুষের শরীরে মাথার শামিল। নামাজ মানুষকে সকল হারাম কাজ করা থেকে বিরত রাখে। নামাজের পর দোয়া কবুল হয়। হেদায়াতি বয়ানের আগে রবিবার বাদ ফজর বয়ান করেন বাংলাদেশের মাওলানা জমির উদ্দিন শেখ। বয়ানে তিনি বলেন, মসজিদে ও ঘরে দ্বীনি আমলের তালিম আনতে হবে। একাজে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ৮ ঘণ্টা, কমপক্ষে আড়াই ঘণ্টা দ্বীনের দাওয়াতির মেহনত করতে হবে। দাওয়াতে মেহনতের কাজে হেঁটে চললে আল্লাহর গোস্সা কমে। রাতের ইবাদতের কথা তুলে ধরে বলেন, আল্লাহর কাছে হাত উঠিয়ে কান্নাকাটি করলে আল্লাহ ফরিয়াদকারীকে ফিরিয়ে দিতে লজ্জা পান।
আখেরী মোনাজাতে অংশ নিতে রবিবার ভোর থেকেই টঙ্গীর এজতেমা অভিমুখে শুরু হয় মানুষের ঢল। টঙ্গীর পথে শনিবার মধ্যরাত থেকেই ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে মোটর চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। ফলে মোনাজাতে অংশ নিতে চার দিক থেকে লাখ লাখ মুসল্লি হেঁটেই এজতেমাস্থলে পৌঁছেন। সকাল ১০টার আগেই এজতেমা মাঠ কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে মুসল্লিরা মাঠের আশপাশের রাস্তা,অলি-গলিতে অবস্থান নেন। এজতেমাস্থলে পোঁছুতে না পেরে কয়েক লাখ মানুষ ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে মোনাজাতের জন্য পুরনো খবরের কাগজ, পাটি, সিমেন্টের বস্তা ও পলিথিন শীট বিছিয়ে বসে পড়েন। এছাড়াও পার্শ্ববর্তী বাসা-বাড়ি-কলকারখানা-অফিস- দোকানের ছাদে, যানবাহনের ছাদে ও তুরাগ নদীতে নৌকায় মুসল্লিরা অবস্থান নেন। যে দিকেই চোখ যায় সেদিকেই দেখা যায় শুধু টুপি-পাঞ্জাবি পরা মানুষ আর মানুষ। সবাই অপেক্ষায় আছেন কখন শুরু হবে সেই কাক্সিক্ষত আখেরী মোনাজাত। এজতেমাস্থলের চারপাশের ৩-৪ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে কোথাও তিল ধারণের ঠাঁই ছিল না। আখেরী মোনাজাতের জন্য রবিবার আশপাশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, কলকারখানাসহ বিভিন্ন অফিস-আদালতে ছিল ছুটি। কোন কোন প্রতিষ্ঠানে ছুটি ঘোষণা না করলেও কর্মকর্তাদের মোনাজাতে অংশ নিতে বাধা ছিল না। নানা বয়সী ও পেশার মানুষ এমনকি মহিলারাও ভিড় ঠেলে মোনাজাতে অংশ নিতে রবিবার সকালেই টঙ্গী এলাকায় পৌঁছেন।
বিশেষ ব্যবস্থায় মোনাজাতে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর অংশগ্রহণ ॥ রাষ্ট্রপতি মোঃ জিল্লুর রহমান বঙ্গভবন থেকে এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গণভবন থেকেই টঙ্গীর তুরাগ তীরে বিশ্বের মুসলমানদের দ্বিতীয় বৃহত্তম জমায়েত বিশ্ব এজতেমার আখেরী মোনাজাতে অংশ নেন।
গণভবন সূত্র জানায়, মোনাজাতে অংশ নেয়ার সময় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তাঁর পরিবারের সদস্য, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও গণভবনের কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও শামিল হন। ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী সাহারা খাতুন, রেলপথ মন্ত্রী মুজিবুল হক, বেবী মওদুদ এমপি, লুৎফুন নাহার লাইলী এমপি, প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব আবুল কালাম আজাদ, প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী আবদুস সোবহান গোলাপ এ সময় উপস্থিত ছিলেন।
প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব আবুল কালাম আজাদ জানান, প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ও জনগণের অসুবিধার কথা বিবেচনা করে শেখ হাসিনা গণভবন থেকেই আখেরী মোনাজাতে শামিল হন।
বিরোধীদলীয় নেতার মোনাজাতে অংশ গ্রহণ ॥ টঙ্গীর এটলাস (হোন্ডা) কারখানার ছাদে বিশেষভাবে তৈরি মঞ্চে বসে বিরোধীদলীয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া, সেলিমা রহমান, মির্জা আব্বাস, অধ্যাপক এমএ মান্নান, আমানউল্লাহ আমান, হাসান উদ্দিন সরকার, একেএম ফজলুল হক মিলন আখেরী মোনাজাতে অংশ নেন। টঙ্গীর টেশিস মাঠের পুলিশ কন্টোলরুমে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ড. মহীউদ্দীন খান আলমগীর ও প্রতিমন্ত্রী সামছুল হক টুকু, আমির হোসেন আমু, আকম মোজাম্মেল হক, সাংসদ জাহিদ আহসান রাসেল, আজমত উল্লাহ খান, সাবেক আইনমন্ত্রী আব্দুল মতিন খসরুসহ তাদের সমর্থিত রাজনৈতিক সহকর্মীরা আখেরী মোনাজাতে অংশ নেন বলে জানিয়েছেন গাজীপুরের পুলিশ সুপার আব্দুল বাতেন।
টেলিভিশন-মোবাইল ও ওয়্যারলেস সেটে মোনাজাত ॥ এজতেমা মাঠে না এসেও মোনাজাতের সময় হাত তুলেছেন অসংখ্য মানুষ। গাজীপুরের চান্দনা চৌরাস্তা মসজিদ মাঠ, নলজানি ওয়্যারলেস মাঠ, ভুরুলিয়া ওয়াপদা মাঠ, কালিয়াকৈর উপজেলার রতনপুর, আন্দারমানিক, সফিপুর বাজারসহ বিভিন্ন এলাকায় ওয়্যারলেস সেটে, মোবাইল ফোনে ও টিভি চ্যানেলে মোনাজাত প্রচার করা হয়। এসব স্থানে নারীদের ব্যাপক উপস্থিতি ছিল। আবার টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতে সরাসরি সম্প্রচার করার কারণে অনেকে বাসায় বসে মোনাজাতে অংশ নিয়েছেন।
এজতেমায় ভারতের নাগরিকসহ ১৩ মুসল্লির মৃত্যু ॥ গত দু’দিনে ৯ জন মুসল্লিসহ এবারের প্রথম দফায় ১৩ জন মুসল্লির মৃত্যু হয়েছে। তাঁরা হলেনÑ ভারতের কলকাতার ২৪ পরগনার কাতালবাজার রোড এলাকার রবিয়াল হকের ছেলে রফিক উদ্দিন (৫০), সিরাজগঞ্জের বেলকুচি এলাকার জালাল মোল্লা (৬৫), নরসিংদীর আলগীকান্দাপাড়া এলাকার চাঁন মিয়া (৬০), রংপুর সদরের জলফর এলাকার খলিলুর রহমান (৮০), ফরিদপুরের বোয়ালমারি ময়োন্দিয়া এলাকার আলাউদ্দিন শেখ (৪৬), যশোরের মনিরামপুর থানার তেতুলিয়া এলাকার সৈয়দ আলী খান (৬০), চাঁদপুর সদরের দাসদি এলাকার আবুল খায়ের পাটোয়ারী (৪০), যশোরের কেশবপুর রাজনগর এলাকার আনসার আলী মিস্ত্রি (৬৪)। এর আগে গত বৃহস্পতি ও শুক্রবার মৃত্যু হয়েছে আরও চার জনের। তাঁরা হলেন চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গা থানার কয়রাডাঙ্গা এলাকার ফজলুর রহমান মোল্লা (৬৫), চট্টগ্রামের হাটহাজারী থানার ঘরদুয়ারা এলাকার আ. মোতালেব (৬০), কিশোরগঞ্জের নিকলী থানার পষা এলাকার আব্দুল হামিদ (৭৫), নরসিংদীর রায়পুরা থানার বড়চর এলাকার মোঃ সামছুল হক (৬০) ও শেরপুরের তারাকান্দি গ্রামের ওস্তর আলী ওরফে তারা মিয়া (৫০)। এদের মধ্যে ভারতের নাগরিক রফিক উদ্দিনের লাশ রবিবার ভারতীয় হাইকমিশনের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে বলে একটি সূত্র জানিয়েছে।
ভ্রাম্যমাণ আদালত ॥ গাজীপুরের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) শাহনওয়াজ দিলরুবা খান জানান, এজতেমা এলাকায় ১২টি মোবাইল কোর্ট পরিচালিত হয়েছে। তারা এজতেমাস্থলের আশপাশের বিভিন্ন খাবার দোকানে অভিযান চালিয়ে ৪২টি মামলা ও ১ লাখ ৮৯ হাজার ১শ’ টাকা জরিমানা আদায় করেছেন।
টঙ্গী হাসপাতালে চিকিৎসা ॥ টঙ্গী হাসপাতাল ও সিভিল সার্জনের তত্ত্বাবধানে ফ্রি মেডিক্যাল ক্যাম্পে গত ১০ জানুয়ারি থেকে ১৩ জানুয়ারি (শুক্রবার) সকাল ৮টা পর্যন্ত বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত প্রায় ১০ হাজার মুসল্লি চিকিৎসা নিয়েছেন। এদের মধ্যে শ্বাসকষ্ট ও হৃদরোগ জনিত ২৫ জনকে ঢাকায় পাঠানো হয়েছে এবং ৮৪ জনকে টঙ্গী হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন, গাজীপুরের সিভিল সার্জন সৈয়দ হাবিব উল্লাহ। এছাড়া আশপাশের বিভিন্ন ফ্রি মেডিক্যাল ক্যাম্পে আরও কয়েক হাজার মুসল্লিকে চিকিৎসা দেয়া হয়েছে।
মহিলাদের অংশগ্রহণ ॥ এদিকে বিশ্ব এজতেমার আখেরী মোনাজাতে আগের তুলনায় মহিলাদের অংশগ্রহণ অনেক বেড়েছে। পুরুষের পাশাপাশি বিভিন্ন বয়সী মহিলাদের মাইলের পর মাইল হেঁটে টঙ্গী পৌঁছে মোনাজাতে অংশগ্রহণ করতে দেখা গেছে। টঙ্গী, গাজীপুর ও সাভারের সব পোশাক কারখানা বন্ধ থাকায় হাজার হাজার মহিলা শ্রমিক মোনাজাতে যোগ দেন।
ফিরতি যাত্রায় বিড়ম্বনা ॥ আখেরী মোনাজাত শেষ হওয়ার পর একসঙ্গে লাখ লাখ মানুষ ফিরতে শুরু করলে সর্বত্র মহাজটের সৃষ্টি হয়। টঙ্গী রেলওয়ে স্টেশনে ফিরতি যাত্রীদের জন্য অপেক্ষমাণ ট্রেনগুলোতে উঠতে মানুষের জীবনবাজির লড়াই ছিল উদ্বেগজনক। ট্রেনের ভেতরে জায়গা না পেয়ে ছাদে ও দরজা-জানালায় ঝুলে শত শত মানুষ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ফিরতে দেখা যায়। একপর্যায়ে মানুষের উপচেপড়া ভিড়ে ট্রেন ঢাকা পড়ে যায়। ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক ও আশুলিয়া সড়কে যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকায় ফিরতি মুসল্লিদের বিড়ম্বনা ও কষ্টের সীমা ছিল না। ৪/৫ দিন ধরে টঙ্গীতে জমায়েত হওয়া মুসল্লিরা জোহরের নামাজের পর একযোগে নিজ নিজ গন্তব্যে ফিরতে চাইলে অবর্ণনীয় দুর্ভোগের শিকার হন। হাজার হাজার বৃদ্ধ শিশু কিশোর ও মহিলা মাইলের পর মাইল ঁেহটে মোনাজাতে শরিক হন এবং একইভাবে ফেরেন।