মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
মঙ্গলবার, ২৭ ডিসেম্বর ২০১১, ১৩ পৌষ ১৪১৮
লাখো মানুষের চোখের জলে চিরশয়ানে রাজ্জাক
বিশেষ প্রতিনিধি ॥ চোখের জলে, সব মানুষের শ্রদ্ধা আর ভালবাসায় সিক্ত হয়ে চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন গণমানুষের নেতা আবদুর রাজ্জাক। সোমবার বিকেলে বনানী কবরস্থানে পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সমাহিত করা হয় বঙ্গবন্ধুর স্নেহধন্য আওয়ামী লীগের এই জাতীয় নেতাকে। সকলের প্রিয় এই মানুষটির দাফন সম্পন্ন করার মুহূর্তে উপস্থিত সর্বসত্মরের মানুষের বুকফাটা কান্না, আর্তনাদ আর আহাজারিতে এলাকার পরিবেশও ভারি হয়ে ওঠে। লাখো মানুষের অশ্রুসিক্ত ফুলেল শ্রদ্ধা আর ভালবাসা নিয়ে দেশের মাটিতেই শেষ ঠাঁই নিলেন, যে দেশের স্বাধীনতার জন্য তাঁর অবদান চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।
বিকেল চারটায় আবদুর রাজ্জাকের আত্মার শান্তি কামনা করে দোয়া ও মোনাজাতের পর তাঁর দুই ছেলে ফাহিম রাজ্জাক ও নাহিন রাজ্জাক নিজ হাতে পিতার লাশ কবরে নামান। সকলের প্রিয় এই মানুষটির দাফন সম্পন্ন করার মুহূর্তে উপস্থিত সর্বম্দরের চোখে নেমে আসে অশ্রু। আওয়ামী লীগের প্রবীণ নেতা তোফায়েল আহমেদ, আব্দুল জলিল, আমির হোসেন আমুসহ সকলে একে একে আব্দুর রাজ্জাকের কবরে মাটি দেন। এর আগে রাষ্ট্রীয়ভাবে আব্দুর রাজ্জাককে শেষ সালাম প্রদান এবং তাঁকে গার্ড অব অনার প্রদান করা হয়।
সোমবার সকাল সাড়ে ১০টায় হেলিকপ্টারে করে ঢাকা থেকে আবদুর রাজ্জাকের মরদেহ নেয়া হয় তার নির্বাচনী এলাকা শরীয়তপুরের ডামুড্যা উপজেলায়। সেখানে লাখো মানুষের চোখের জল, শ্রদ্ধা ও ভালবাসায় সিক্ত হন জননন্দিত এই নেতা। এই এলাকার মানুষ কোনদিন তাঁদের এই প্রিয় নেতাকে নির্বাচনে হারতে দেয়নি। যতবার তিনি দাঁড়িয়েছেন উজাড় করে ভোট দিয়ে নির্বাচিত করেছে। চোখের জল আর ফুলেল শুভেচ্ছায় আবদুর রাজ্জাককে চিরবিদায় দেন শরীয়তপুরবাসী।
বাদ জোহর ডামুড্যায় জানাজা ও শ্রদ্ধা জানানোর পর আবদুর রাজ্জাকের মরদেহ পুনরায় ঢাকায় আনা হয়। বিকেল ৪টায় মরদেহ নেয়া হয় বনানী কবরস্থানে। সেখানে শেষ জানাজার পর মরহুমের দাফন সম্পন্ন করা হয়। বনানী কবরস্থানেও আবদুর রাজ্জাককে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে নেমেছিল মানুষের ঢল। এ সময় তাঁকে এক নজর দেখতে আওয়ামী লীগসহ বিভিন্ন স্তরের হাজার হাজার লোক উপস্থিত হয়। রাষ্ট্রীয় সালাম জানানোর পর তাঁকে শুইয়ে দেয়া হয় কবরে। তখন সেখানে উপস্থিত আমির হোসেন আমু, তোফায়েল আহমেদ, সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, আবদুল জলিলসহ তাঁর রাজনৈতিক সহযোদ্ধা ও স্বজনদের চোখে ছিল জল।
চিরবিদায়ের মুহূর্তে আবদুর রাজ্জাককে শ্রদ্ধা জানাতে সেখানে আরও উপস্থিত ছিলেন আওয়ামী লীগের শেখ ফজলুল করিম সেলিম, এ্যাডভোকেট ইউসুফ হোসেন হুমায়ুন, যোগাযোগমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, ড. মহীউদ্দীন খান আলমগীর, জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পীকার শওকত আলী, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম, ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ, জাতীয় পার্টি-জেপির মহাসচিব শেখ শহীদুল ইসলাম, তথ্যমন্ত্রী আবুল কালাম আজাদ, গৃহায়ন প্রতিমন্ত্রী এ্যাডভোকেট আবদুল মান্নান খান, প্রতিমন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক, আফম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাবেক আইনমন্ত্রী আবদুল মতিন খসরম্ন, ডা. মোসত্মফা জালাল মহিউদ্দিন এমপি, মৃণাল কানত্মি দাস, মীর্জা আজম এমপি, স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক টুকুসহ আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মী ছাড়াও বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও পেশাজীবী সংগঠনসহ সর্বসত্মরের হাজার হাজার মানুষ।
চিরবিদায়ের পর অশ্রম্নসিক্ত কণ্ঠে আবদুর রাজ্জাকের দীর্ঘদিনের সহযোদ্ধারা বলেন, ছাত্রনেতা, মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক, রাজনৈতিক নেতা, মন্ত্রী-এসব ছাপিয়ে আবদুর রাজ্জাকের চরিত্রের সবচেয়ে উজ্জ্বল বৈশিষ্ট্য ছিল সব সময় গণমানুষের সঙ্গে থাকা। আবদুর রাজ্জাকের মতো দৰ রাজনৈতিক সংগঠক আর সৃষ্টি হবে না।
উলেস্নখ্য, মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, আওয়ামী লীগের উপদেষ্টাম-লীর সদস্য ও বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ আবদুর রাজ্জাক গত শুক্রবার রাতে লন্ডনের কিংস কলেজ হাসপাতালে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর বয়স হয়েছিল ৬৯ বছর। তিনি দুই ছেলে নাহিন রাজ্জাক ও ফাহিম রাজ্জাক এবং স্ত্রী ফরিদা রাজ্জাকসহ অসংখ্য আত্মীয়স্বজন ও গুণগ্রাহী রেখে গেছেন। তার একমাত্র মেয়ে তানিমা রাজ্জাক রুম্পা মাত্র আট বছর বয়সে বস্নাড ক্যান্সারে মারা গেছে। শেষ ইচ্ছানুযায়ী বনানী কবরস্থানে মেয়ে রুম্পার কবরের কাছে আবদুর রাজ্জাককে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয়েছে।