মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
মঙ্গলবার, ২৭ ডিসেম্বর ২০১১, ১৩ পৌষ ১৪১৮
ইসি নিয়োগে আইন তৈরি ও সার্চ কমিটি গঠনের প্রস্তাব
রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সংলাপ
বিশেষ প্রতিনিধি ॥ নতুন নির্বাচন কমিশন নিয়োগ নিয়ে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সংলাপে সংবিধান অনুযায়ী আইন প্রণয়ন ও তিন সত্মরবিশিষ্ট সার্চ কমিটি গঠনের প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি। পাশাপাশি নির্বাচন কমিশনকে শক্তিশালী করতে ২০০৮ ও ২০০৯ সালে ইসির দেয়া সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়নেরও পরামর্শ দিয়েছে। আর জাতীয় পার্টি-জেপি সময়ানুযায়ী নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠনের প্রস্তাব দিয়ে গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করার জন্য কমিশনকে নিরপেক্ষ ও শক্তিশালী করার প্রসত্মাব দিয়েছে। দুটি দলই দু'একদিনের মধ্যে নতুন নির্বাচন কমিশন নিয়োগের জন্য নামের তালিকা রাষ্ট্রপতির কাছে দিতে সম্মত হয়েছে।
নির্বাচন কমিশন গঠন নিয়ে ধারাবাহিক সংলাপের অংশ হিসেবে রাষ্ট্রপতি মোঃ জিল্লুর রহমান সোমবার বঙ্গভবনে এ দুটি রাজনৈতিক দলের নেতাদের সঙ্গে পৃথকভাবে আলোচনা করেন। আজ মঙ্গলবার সকাল ১১ টায় লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি) ও দুপুর ১২টায় বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) নেতাদের সঙ্গে সংলাপ করবেন রাষ্ট্রপতি। সংলাপে রাষ্ট্রপতিকে সহযোগিতা করেন রাষ্ট্রপতি কার্যালয়ের সচিব মোহাম্মদ শফিউল আলম, সামরিক সচিব মেজর জেনারেল কাজী ফখরুদ্দীন আহমেদ, প্রেসসচিব একেএম নেছার উদ্দিন ভূঞা ও রাষ্ট্রপতির একান্ত সচিব ফজলুল হক।
সংলাপের সূচনা বক্তব্যে রাষ্ট্রপতি মোঃ জিলস্নুর রহমান বলেন, সংবিধানের ১১৮ অনুচ্ছেদে প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অন্যান্য নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ করার জন্য রাষ্ট্রপতিকে ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। কিন্তু তিনি বিষয়টিকে অতি গুরুত্ব দিয়ে দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলের নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে চান। রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে তাঁদের বিজ্ঞ মতামত নতুন নির্বাচন কমিশন গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। সংলাপের সময় রাষ্ট্রপতি দুই দলের নেতাদের কাছে কমিশনে নিয়োগের জন্য নাম চাইলে তারা দু'একদিনের মধ্যে তালিকা পাঠাবেন বলে জানিয়েছেন।
বৈঠকে উপস্থিত ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন জানান, রাষ্ট্রপতি জিলস্নুর রহমান নির্বাচন কমিশন নিয়ে সংবিধানের ১১৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী আইনের প্রয়োজনীয়তার কথা স্বীকার করেছেন। তিনি এ বিষয়ে সরকারকে প্রসত্মাব দেয়ার কথা জানিয়েছেন। আইন পাস করতে সংসদে উত্থাপনসহ বিভিন্ন সত্মরের কর্মকা-ের কথা রাষ্ট্রপতি উলেস্নখ করলে ওয়ার্কার্স পার্টির পৰ থেকে জানানো হয়, প্রয়োজন হলে অর্ডিন্যান্স জারি করে এ বিষয়ে সিদ্ধানত্ম নেয়া যায়।
ওয়ার্কার্স পার্টির নেতারা নির্বাচন কমিশন গঠনে রাষ্ট্রপতির কাছে সার্চ কমিটির গুরম্নত্ব তুলে ধরে বলেন, সাংবিধানিক পদে রয়েছেন এমন ব্যক্তিদের নিয়ে একটি সার্চ কমিটি গঠন করা যেতে পারে। কমিটিতে প্রধান বিচারপতি, মহাহিসাব নিরীৰক, সরকারী কর্মকমিশনের (পিএসসি) চেয়ারম্যান, এ্যাটর্নি জেনারেল, দুনর্ীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যান থাকতে পারেন। এই সার্চ কমিটি কমিশনের প্রতিটি পদের বিপরীতে ৩ জনের নাম প্রসত্মাব করবে। প্রসত্মাবিত নাম জাতীয় সংসদের কার্যোপদেষ্টা কমিটিতে উত্থাপনের পরে কমিটি প্রেরিত তালিকার শুনানি করে রাষ্ট্রপতির কাছে মনোনীত নাম পাঠাবে। এরপর নিয়োগ দেয়া যেতে পারে নির্বাচন কমিশনকে।
বৈঠক শেষে আনোয়ার হোসেন মঞ্জু সাংবাদিকদের জানান, রাষ্ট্রপতি নির্বাচন কমিশনে নিয়োগের জন্য দেশপ্রেমিক, গণতন্ত্রমনা, সৎ ও কর্মদৰতার ওপর গুরম্নত্ব দিচ্ছেন। রাষ্ট্রপতি তাঁর দলের কাছে নির্বাচন কমিশনে নিয়োগের জন্য নাম চেয়েছেন। বলেছেন, তাঁরা নাম দিলে সেটা গ্রহণযোগ্য নাও হতে পারে, এই দ্বিধা তাদের মনে থাকা উচিত নয়। তিনি বলেন, সংবিধানের ১১৮ অনুচ্ছেদে নির্বাচন কমিশন বিষয়ে যে আইনের কথা উলেস্নখ আছে তার প্রক্রিয়া এগিয়ে চলেছে বলে রাষ্ট্রপতি তাদেরক জানিয়েছেন। তবে সেটা সময়সাপেৰ হওয়ার কারণে সকল দলের মতামতের ভিত্তিতে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন কমিশন গঠনের জন্য সংলাপের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
সকাল ১১টা থেকে ১২টা পর্যনত্ম বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন এমপির নেতৃত্বে তাঁর দলের ৮ সদস্যের প্রতিনিধি দল এবং ১২ থেকে ১টা পর্যনত্ম জাতীয় পার্টি-জেপির চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর নেতৃত্বে তাঁর দলের ১২ সদস্যের প্রতিনিধি দল রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সংলাপে অংশ নেন। ওয়ার্কার্স পার্টির প্রতিনিধি দলে ছিলেন সাধারণ সম্পাদক আনিসুর রহমান মলিস্নক, পলিটবু্যরোর সদস্য বিমল বিশ্বাস, নূরম্নল হাসান, শফিউদ্দিন আহমেদ, নূর আহমেদ বকুল, হাজেরা সুলতানা ও কামরম্নল আহসান। জাতীয় পার্টি-জেপির প্রতিনিধি দলে ছিলেন মহাসচিব শেখ শহীদুল ইসলাম, প্রেসিডিয়াম সদস্য আব্দুর রহিম, শাহ রফিকুল বারী চৌধুরী, কর্নেল (অব) আব্দুল লতিফ মলিস্নক, মফিজুল হক বেবু, মিসেস আমেনা বারী, আবু সাঈদ খান, এ্যাডভোকেট বদরম্নদ্দোজা আহমেদ সুজা, এজাজ আহমেদ মুক্তা, অতিরিক্ত মহাসচিব সাদেক সিদ্দিকী ও দফতর সম্পাদক এম সালাউদ্দিন আহমেদ।
বৈঠক শেষে বেরিয়ে বঙ্গভবনের সামনের সড়কে অপেৰমাণ সাংবাদিকদের কাছে প্রেস ব্রিফিংয়ে ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন এমপি বলেন, তাঁরা সংবিধানের ১১৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী নির্বাচন কমিশন গঠনে আইন প্রণয়ন ও তিন সত্মরবিশিষ্ট সার্চ কমিটির দাবি জানিয়েছেন। তিনি জানান, এর আগে ২০০৮ সালে তত্ত্ব্বাবধায়ক সরকারের আমলে এবং ২০০৯ সালে কমিশন গঠন ও সংস্কারে নির্বাচন কমিশন যে প্রসত্মাবনা দিয়েছিল সেটি বাসত্মবায়নে সিদ্ধানত্ম নেয়ার জন্য তারা রাষ্ট্রপতিকে বলেছেন। তবে তার দল বর্তমান কমিশনকে রাখার পৰে কোন মত দেয়নি বলে জানান তিনি।
চলমান সংলাপে প্রধান বিরোধী দলের অংশগ্রহণে অনিশ্চয়তা সম্পর্কে এক প্রশ্নের জবাবে রাশেদ খান মেনন বলেন, প্রধান বিরোধী দল সবসময় বলেছে নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠনে তাদেরসহ সকল রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনার জন্য। এখন যখন আলোচনা শুরম্ন হয়েছে তখন তাদের না আসাটা ঠিক হবে না। 'রাষ্ট্রপতি এ ধরনের সংলাপ ডাকতে পারেন না'- বিএনপির এমন দাবি সম্পর্কে তিনি বিএনপির নেতাদের সংবিধানের ১১৮ অনুচ্ছেদ ভাল করে পড়ে দেখার আহ্বান জানান। মেনন বলেন, সংলাপ ছাড়া কোন সমস্যার সমাধান হয় না। নির্বাচন কমিশন ও তত্ত্বাবধায়ক সরকার দু'টো আলাদা বিষয়। দু'টি নিয়ে আলাদা আন্দোলন হতে পারে। তবে একটির সঙ্গে অন্যটিকে যুক্ত করা ঠিক নয়।
জাতীয় পার্টি-জেপির ব্রিফিং সংলাপ থেকে বেরিয়ে একই স্থানে জাতীয় পার্টি-জেপি চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন মঞ্জু অপেৰমাণ সাংবাদিকদের বলেন, নির্বাচন কমিশনের মেয়াদ প্রায় উত্তীর্ণ। নতুন নির্বাচন কমিশন গঠন করতে হবে। এর কোন বিকল্প নেই। তিনি বলেন, রাষ্ট্রপতি এ বিষয়ে সকল দলের সঙ্গে আলাপ আলোচনার ভিত্তিতে সিদ্ধানত্মে পেঁৗছতে চান। তাই সংলাপে যোগ দিয়ে এই এজেন্ডার বাইরে অন্য কোন এজেন্ডা নিয়েও আলোচনা করা যেতে পারে।
প্রধান বিরোধী দলের সংলাপে অংশগ্রহণে অনিশ্চয়তা প্রসঙ্গে মঞ্জু বলেন, কোন ভিন্নমত থাকলে সংলাপে যোগ দিয়ে বিএনপি তা তুলে ধরতে পারে। প্রতিবাদ করতে পারে। ওয়াকআউট করতে পারে। একেবারে না আসাটা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার জন্য সহায়ক হবে না উলেস্নখ করে তিনি বলেন, গণতন্ত্রে বিশ্বাসী সকলকেই এই সংলাপে আসা উচিত।
সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন কমিশন গঠনে আইন প্রণয়ন করতে রাষ্ট্রপতিকে কোন প্রসত্মাব দিয়েছেন কি না জানতে চাইলে আনোয়ার হোসেন মঞ্জু বলেন, ৪০ বছরেও যেটা করা হয়নি, সেটা কি এই দেড় মাসে করা সম্ভব? সব দায়-দায়িত্বই কি বর্তমান সরকার ও রাষ্ট্রপতির ওপর পড়বে? তিনি বলেন, আইন ও বিধিমালার বিষয়ে রাষ্ট্রপতি একমত। তবে সেটা সময়সাপেৰ বলে মনত্মব্য করেছেন।
বর্তমান কমিশনকে বহাল রাখার বিষয়ে একটি দলের প্রসত্মাব সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে সাবেক এই মন্ত্রী বলেন, এই নির্বাচন কমিশন দিয়ে এরশাদ উপকৃত হয়েছেন। তবে আমার দল বর্তমান কমিশনকে বহাল রাখার কোন প্রসত্মাব দেয়নি। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে ঠিক রাখতে ও উন্নত করতে নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন করতে হবে বলে মনত্মব্য করেন তিনি।
বিএনপি ও আ'লীগের কাছে রাষ্ট্রপতির চিঠি ॥ নতুন নির্বাচন কমিশন গঠন নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে চলমান সংলাপে বসার আমন্ত্রণ জানিয়ে ৰমতাসীন দল আওয়ামী লীগ এবং প্রধান বিরোধী দল বিএনপির কাছে পৃথক পৃথক চিঠি পাঠিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মোঃ জিলস্নুর রহমান। আগামী ১১ জানুয়ারি বিএনপিকে এবং ১২ জানুয়ারি আওয়ামী লীগকে সংলাপে বসার আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।
সোমবার প্রধান দুই দলের কাছে বঙ্গভবন থেকে চিঠিটি পাঠানো হয়। ফ্যাঙ্ ও বিশেষ ডাকে রাষ্ট্রপতির আমন্ত্রণ পাওয়ার কথা স্বীকার করেছেন দুই দলের নেতারা। আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় উপ-দফতর সম্পাদক মৃণাল কানত্মি দাস চিঠি পাওয়ার কথা স্বীকার করে জনকণ্ঠকে জানান, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক বরাবরে আসা রাষ্ট্রপতির আমন্ত্রণ পত্রে আগামী ১২ জানুয়ারি সকাল ১১টায় ১০ সদস্যের প্রতিনিধি দল নিয়ে বঙ্গভবনে সংলাপে বসার কথা বলা হয়েছে।
বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, বেলা ৩টায় ফ্যাঙ্ েএবং বিকেল ৪টায় বিশেষ ডাকে রাষ্ট্রপতির সংলাপের চিঠি আমাদের কার্যালয়ে এসেছে। নয়াপল্টনে বিএনপির প্রধান কার্যালয়ে বিএনপির মহাসচিব বরাবরে পাঠানো চিঠিটি সোমবারই দলের চেয়ারম্যান বেগম খালেদা জিয়ার কাছে পাঠানো হয়েছে বলে জানান তিনি।