মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
মঙ্গলবার, ২৭ ডিসেম্বর ২০১১, ১৩ পৌষ ১৪১৮
ঝরে পড়া কমছে
০ পাল্টে যাচ্ছে শিশু শিক্ষার বেহাল চিত্র
০ আড়াই বছরে ৪৩ থেকে ২১ শতাংশে নেমেছে
বিভাষ বাড়ৈ ॥ পঞ্চম শ্রেণী পার হতেই ঝরে পড়ে ৪৮ থেকে ৫০ শতাংশ। বছরের পর বছর ধরে প্রাথমিক শিৰা থেকে শিশুদের ঝরে পড়ার এই বেহাল চিত্র পাল্টে যাচ্ছে। সমাপনী পরীক্ষায় প্রতি বছর শিৰার্থী যেমন বাড়ছে তেমনি দ্রুত কমে যাচ্ছে অকৃতকার্য শিৰার্থীর সংখ্যা। অকৃতকার্য শিৰার্থীর সংখ্যার সঙ্গে রীতিমতো পাল্লা দিয়ে কমছে বিদ্যালয়ে নিবন্ধন করেও পরীৰায় অনুপস্থিতির সংখ্যা। সমাপনীর প্রথম তিন বছরের ফলই বলে দেয় ঝরে পড়ার এই ইতিবাচক চিত্রটি। ২০০৯ সালের প্রথম সমাপনী পরীক্ষায় যেখানে ঝরে পড়েছিল সোয়া ৫ লাখ শিক্ষার্থী। দুই বছরের ব্যবধানে এবারের পরীৰায় সেই সংখ্যা মাত্র ১ লাখ ৯০ হাজার ৬৫২। প্রথম পরীৰায় বিদ্যালয়ে নিবন্ধন করেও যেখানে পরীক্সার হলে আসেনি ৩ লাখ ৭ হাজার শিশু, এবার সেখানে অনুপস্থিত ছিল মাত্র ১ লাখ ৩০ হাজার শিশু। প্রথম পরীৰায় ফেল করেছিল ২ লাখ তিন হাজার, এবার ফেল করেছে মাত্র ৫৯ হাজার শিশু।
ঝরে পড়ার হার কমে যাওয়ার বিষয়টিকে শিৰার জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক বলে মনে করছেন সংশিস্নষ্টরা। সরকারের সংশিস্নষ্ট কর্মকর্তা ও বিশেষজ্ঞরা বললেন, প্রায় শতভাগ শিৰার্থীর বিদ্যালয়ে ভর্তি নিশ্চিত করা গেলেও তাদের সকলকে শিৰায় ধরে রাখা যাচ্ছে না একথা সত্য। তবে বিনামূল্যের পাঠ্যবই, সমাপনী পরীক্ষার গুরুত্ব সম্পর্কে ধারণা পাওয়া, শিক্ষকদের বিদ্যালয়ের দায়িত্ব পালন নিশ্চিত করা ও প্রশিৰণসহ নানা উদ্যোগের ফলে কমছে ঝরে পড়ার হার। শিৰার এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি নিয়ে এখন পর্যন্ত যতটুকু গবেষণা হয়েছে তাও বেসরকারী পর্যায় পর্যনত্মই সীমাবদ্ধ। আবার যে গবেষণা হয়েছে তাও মূলত প্রাথমিক সত্মরকে ঘিরেই। বিভিন্ন শিৰাবোর্ড প্রতি শিৰা বর্ষে ঝরে পড়ার একটা সংখ্যা নির্ধারণের চেষ্টা করলেও ঝরে পড়ার কারণ নিয়ে সুনির্দিষ্টভাবে তেমন কোন কাজ হয়নি আজ পর্যন্ত। তবে প্রাথমিক থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত ঝরে পড়াসহ শিৰা বঞ্চিতদের নিয়ে সরকারী ও বেসরকারীভাবে যাঁরা কাজ করছেন তাঁরা সকলেই মনে করছেন, যত কারণই আসুক না কেন পরিবারের আর্থিক সঙ্কটই ঝরে পড়ার সবচেয়ে বড় কারণ। পরিবারের অর্থনৈতিক যোগান দিতে শিশুশ্রমে যোগ দেয়া, নিরাপত্তাহীনতাসহ নানা সামাজিক সঙ্কটে মেয়েদের অল্প বয়সে বিয়ে হয়ে যাওয়াসহ বিভিন্ন কারণে শিৰা থেকে অব্যাহতভাবে ঝরে পড়ছে লাখ লাখ শিৰার্থী। পরিস্থিতি এতদিন আশাব্যঞ্জক ছিল না বলেই মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। জানা গেছে, নানা সঙ্কটের মধ্য দিয়ে প্রথম শ্রেণীতে ভর্তি হলেও পঞ্চম শ্রেণী অতিক্রম করার আগেই শিৰা থেকে ৪৮/৫০ শতাংশ শিশু ঝরে পড়ার চিত্র ছিল বহুদিন। ফলে প্রতি ১০০ শিশুর মধ্যে নূ্যনতম প্রাথমিক শিৰার সুযোগ পায় মাত্র ৫২ শিশু। ২০০৯ সালের শুরম্নতে দেশের সকল প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পঞ্চম শ্রেণীতে ভর্তি হয়েছিল ২০ লাখ ৬৯ হাজার ২৪২ শিশু। কিন্তু ঐ বছরই প্রথম সমাপনী পরীৰায় অংশগ্রহণের জন্য নিবন্ধন বা রেজিস্ট্রেশন করে ১৯ লাখ ৭৯ হাজার ৮৯৫ জন। পরীৰার হলে উপস্থিত ছিল ১৮ লাখ ২ হাজার ৪৬৫। আর পরীৰায় পাস করেছিল ১৬ লাখ ২ হাজার ৫৪ শিশু। শিৰা থেকে ছিটকে পড়ে ৫ লাখ শিশু। ২০১০ সালের জানুয়ারিতে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে (ইবতেদায়ী মাদ্রাসাসহ) পঞ্চম শ্রেণীতে ভর্তি হয়েছিল প্রায় ২৫ লাখ শিশু। পরীৰার জন্য রেজিস্ট্রেশন করে ২৪ লাখ ৮৮ হাজার ১৪৮ জন। কিন্তু পরীৰার হলেই আসেনি দুই লাখ ৮১ হাজার ১২১ জন। ফেল করে ১ লাখ ৯১ হাজার ১৯১। ফলে কেবল পঞ্চম শ্রেণী অতিক্রম করার আগেই শিৰা থেকে প্রায় ৫ লাখ শিশুর ঝরে পড়ার আশঙ্কা দেখা দেয়। শিৰা অধিদফতর ও বিভিন্ন গবেষণা সংস্থার একাধিক জরিপে দেখা গেছে, প্রাথমিক সত্মরের পরীৰায় ফেল করা কিংবা আগেই যেসব শিশু স্কুল ছেড়ে দেয় পরবর্তী বছর তাদের মধ্যে মাত্র ৫ শতাংশ আবার স্কুলে ফিরে আসে। বাকি ৯৫ শতাংশ শিশুই শিৰা থেকে ঝরে পড়ে। গেল বছর জানুয়ারি থেকেই ঝরে পড়ার বিষযটিতে অত্যনত্ম গুরম্নত্বের সঙ্গে নিয়ে ইতোমধ্যেই কিছু উদ্যোগ হাতে নেয় সরকার। সবার জন্য মানসম্মত শিৰা নিশ্চিত করার অঙ্গীকার বাসত্মবায়নের জন্য শিৰাথর্ীদের ঝরে পড়া রোধে বিশেষ উদ্যোগ নেয়ার সুপারিশ করে জাতীয় শিৰানীতি প্রণয়ন কমিটি। রবিবার দেশব্যাপী প্রকাশিত সমাপনী পরীৰায় সবচেয়ে আলোচিত বিষয় ছিল অনুপস্থিত ও ফেল বা ঝরে পড়ার সংখ্যা লৰণীয়ভাবে কমে যাওয়ার বিষয়টি। অনুপস্থিত এবার মাত্র এক লাখ ৩০ হাজার ৭৭৪ যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় অর্থেক। অন্যদিকে এবার ফেল করেছে মাত্র ৫৯ হাজার ৮৭৮ শিশু। প্রাথমিক শিৰা অধিদফতরের মহাপরিচালক শ্যামল কানত্মি ঘোষ জানালেন, সমাপনী পরীৰার গুরম্নত্ব সম্পর্কে ধারণা পাওয়া, শিৰকদের বিদ্যালয়ের দায়িত্ব পালন নিশ্চিত করা ও তাদের প্রশিৰণ_ এই বিষয়গুলো আমাদের শিশুদের ভাল ফলের পেছনে কাজ করেছে। প্রাথমিক শিৰায় ঝরে পড়া নিয়ে দিনের পর দিন কাজ করছেন গণসাৰরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী। তিনিও মনে করেন, ঝরে পড়ার চিত্র অনেক পাল্টে গেছে। এটা অত্যনত্ম আশার কথা। শিৰকরা এখন অনেক বেশি বিদ্যালয়ে সময় দিচ্ছেন। শিৰক শিৰার্থীর অনুপাত অনেক কমে গেছে। এর প্রভাব ইতিবাচক। মন্ত্রী ডা. আফছারম্নল আমীন ঝরে পড়ার ইতিবাচক পরিবর্তন সম্পর্কে বলেন, প্রথম শ্রেণীতে শতভাগ শিৰার্থীর বিদ্যালয়ে ভর্তি নিশ্চিত করা গেলেও তাদের সকলকে শিৰায় ধরে রাখা যাচ্ছে না একথা সত্য। কিন্তু সরকারের গত আড়াই বছরের নানা উদ্যোগের ফলে ঝরে পড়ার হার ৪৩ শতাংশ থেকে কমে দাঁড়িয়েছে ২১ শতাংশে।