মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
বৃহস্পতিবার, ১৫ ডিসেম্বর ২০১১, ১ পৌষ ১৪১৮
বিজয়ের মাস
বিশেষ প্রতিনিধি ॥ ১৫ ডিসেম্বর, ১৯৭১। পাক হানাদারদের শেষ আশাও শেষ। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের অধিনায়ক জেনারেল নিয়াজী বুঝে গেল, মার্কিন সপ্তম নৌবহর তাকে সাহায্য করতে আসবে না। ফলে ১৫ ডিসেম্বর সকালে সব আশা ছেড়ে দিল, শর্তসাপেৰে আত্মসমর্পণের প্রস্তাব নিয়ে বিদেশী দূতাবাসের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু করল নিয়াজী। কিন্তু শর্তসাপেক্ষে আত্মসমর্পণের প্রস্তাব ভারত সরকার প্রত্যাখ্যান করলে আরও ভেঙ্গে পড়ে পাক হানাদাররা। মিত্রবাহিনী ১৬ ডিসেম্বর সকাল ৯টার মধ্যে বিনা শর্তে আত্মসমর্পণের চূড়ান্ত সময় বেঁধে দিল।
ঢাকার মার্কিন দূতাবাসের কর্মীরা সেই প্রস্তাব পাঠিয়ে দিলস্নীর মার্কিন দূতাবাসে। সেখান থেকে পাঠানো হয় ওয়াশিংটনে। এরপর ওয়াশিংটন ইসলামাবাদের মার্কিন দূতাবাসের কাছে জানতে চাইল নিয়াজীর এই প্রস্তাবে পাক প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার সমর্থন আছে কিনা। প্রস্তাবের মূল কথা_ 'আমরা যুদ্ধ বন্ধ করেছি। তবে বাংলাদেশে অবস্থানরত গোটা পাক বাহিনীকে চলে যেতে দিতে হবে, কাউকে গ্রেফতার করা চলবে না।'
জেনারেল নিয়াজী মার্কিন দূতাবাসের কাছ থেকে এই আশ্বাস পায় যে, সপ্তম নৌবহর তার লোকজনকে পশ্চিমে নিয়ে যাবে। ঢাকার অন্যান্য বিদেশী দূতাবাস কিন্তু এ সময় আত্মসমর্পণের পরামর্শ দিয়েছিল। বিদেশীরাও বুঝেছিল নিয়াজী লড়াই চালিয়ে সুবিধা পাবে না। শুধুই লোক মারা যাবে। ১৫ তারিখ দিলস্নীর মার্কিন দূতাবাসের মাধ্যমে ভারত সরকার খবর পেল নিয়াজী শর্তসাপেৰে আত্মসমর্পণ করতে চায়। কিন্তু ভারত সরকার এ প্রসত্মাব নাকচ করে দিল। ভারতীয় বাহিনী বাংলাদেশের পাক বাহিনীকে এই আশ্বাস দিতে রাজি যে, যুদ্ধবন্দীরা জেনেভা কনভেনশন অনুযায়ী ব্যবহার পাবেন।
পাকি জেনারেল নিয়াজীর শর্তসাপেৰে আত্মসমর্পণের প্রসত্মাব পেয়ে ভারতীয় বাহিনী মনে করে এটি তার কৌশল। নিয়াজীর প্রসত্মাবকে তাদের কাছে মনে হলো এটি যুদ্ধবিরতি, আত্মসমর্পণ নয়। কিন্তু মিত্র বাহিনী বিনা শর্তে আত্মসমর্পণ ছাড়া কিছুতেই রাজি নয়। এ জন্য ১৬ ডিসেম্বর সকাল ৯টা পর্যনত্ম সময় দেয়া হলো। আর এ পর্যনত্ম ভারতীয় বিমান বাহিনী কোন আক্রমণ করবে না। এর মধ্যে আত্মসমর্পণের খবর না পেলে আবার আক্রমণ শুরম্ন করা হবে।
জেনারেল মানেকশ তাঁর শেষ বার্তায় পিন্ডিকে বলেছিল, সকাল ৯টার মধ্যে আত্মসমর্পণ করতে হবে। শোনা যায়, নিয়াজী সেদিন সারারাত ইসলামাবাদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেন, দূতাবাসের সাহায্য নেন। কিন্তু পাক প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়াকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। তখন মিত্রবাহিনীর গোলার আওয়াজ বাড়তে থাকে। ঢাকার অসামরিক পাকিসত্মানীরা ও কয়েকটি বিদেশী দূতাবাসও আত্মসমর্পণের চাপ বাড়িয়ে দিল পাক হানাদার বাহিনীর ওপর। ৪০ বছর আগে একাত্তরের এদিন মধ্যরাতে পাকিসত্মান সেনাবাহিনীর চীফ অব স্টাফের কাছ থেকে শেষ নির্দেশ পান নিয়াজী। নিয়াজীকে জানানো হয়, আত্মসমর্পণের শর্ত গ্রহণ করা যেতে পারে। এ নির্দেশ পেয়ে সেনানিবাসে নিজের কৰে বসে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন কথিত পরাক্রমশালী পাকি জেনারেল নিয়াজী। কিছুটা ধাতস্থ হয়ে রাত দুইটার মধ্যে বাংলাদেশের সব জায়গায় অবস্থানরত হানাদার বাহিনীকে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দিয়ে তারবার্তা পাঠান।
আনত্মর্জাতিক পাকিসত্মান মার্কিন ষড়যন্ত্র সত্ত্বেও পাকিসত্মান সেনাবাহিনীর নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ সময়ের ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। যে কোন মুহূর্তে পাকিসত্মান সেনাবাহিনী আত্মসমর্পণ করবে। চারদিক থেকে ঢাকা অবরম্নদ্ধ। পাকিসত্মান সেনাবাহিনীর আত্মসমর্পণ না করে কোন উপায় নেই। এদিন দি গার্ডিয়ান পত্রিকায় লেখা হয়- 'ইয়াহিয়ার সৈন্যবাহিনীকে তাড়িয়ে বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন করেছে। ভারতে আশ্রয় নেয়া শরণাথর্ীরা মুক্ত বাংলাদেশে আসতে শুরম্ন করে। দেশের ভেতর বাড়ি-ঘর থেকে বিতাড়িত লোকজনও বাড়িতে ফিরে আসতে শুরম্ন করেছে।' এদিকে জামায়াতে ইসলামী, পিডিপি, নেজামী ইসলামীর নেতাকমর্ীর অনেকেই মুক্তিবাহিনীর হাতে ধরা পড়ে আবার অনেকেই আত্মগোপন করেছে।