মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
বৃহস্পতিবার, ১৫ ডিসেম্বর ২০১১, ১ পৌষ ১৪১৮
একাত্তরের মতোই জেগেছে মানুষ, স্মৃতিসৌধে ঢল
শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসের আরও ছবি ৩-এর পাতায়
জনকণ্ঠ রিপোর্ট ॥ যেন একাত্তরের মতোই জেগে উঠেছিল দেশের মানুষ। শোকের দিনে পথে পথে প্রবল গণজাগরণ, গণবিস্ফোরণ! দেশ মাতৃকার শ্রেষ্ঠ সন্তানদের হন্তারক রাজাকার-আলবদরদের প্রতি লাখো মানুষের এমন তীব্র ঘৃণা ও ধিক্কারের বহিপর্্রকাশ আর 'নরঘাতক যুদ্ধাপরাধী'দের বিচারের এমন বজ্রকঠিন দাবি গত চল্লিশ বছরেও দেখেনি দেশের মানুষ। স্বাধীনতাবিরোধী ও তাদের দোসরদের বিরুদ্ধে স্মৃতিসৌধে নতুন প্রজন্মের এমন বাঁধভাঙ্গা স্রোতও অতীতে দেখা যায়নি। নতুন প্রজন্মসহ দেশমাতৃকার সেই শ্রেষ্ঠ সন্তানদের অমর স্মৃতির প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাতে আসা লাখো শোকার্ত মানুষের কণ্ঠে ছিল অভিন্ন আওয়াজ_ 'অবিলম্বে যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসি চাই, রাজাকারমুক্ত বাংলাদেশ চাই।'
'রাষ্ট্রদ্রোহী হায়েনা রাজাকার-আলবদর-যুদ্ধাপরাধী, বাঙালী তোদের ৰমা করবে না, তোদের বিচার হবেই এ বাংলায়'_ মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধের প্রবেশপথেই একটি সাদাকালো ব্যানারে লেখা ছিল এই দীপ্ত শপথ বাণী। শুধু ব্যানার নয়, বুধবার দিনভর হৃদয়ের গভীর শ্রদ্ধা, ভালবাসার সঙ্গে স্মরণ করতে আসা লাখো শোকার্ত মানুষের কণ্ঠেও ছিল সেই একই দাবি। পাশাপাশি স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তি ও তাদের মদদদাতাদের প্রতি তীব্র ঘৃণা-ধিক্কার জানিয়েছেন নানাভাবেই। মানুষের বিনম্র শ্রদ্ধায় ফুলে ফুলে ভরে উঠেছিল মিরপুর ও রায়েরবাজার শহীদ বৃদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধ প্রাঙ্গণ।
বাংলার যে সূর্য সন্তানদের বুকের তাজা রক্তের মূল্যে অর্জিত হয়েছে বাংলাদেশের স্বাধীনতা, দেশমাতৃকার সেই শ্রেষ্ঠ সনত্মানদের অমর স্মৃতির প্রতি কৃতজ্ঞ জাতি অপরিসীম বিনম্র শ্রদ্ধা-ভালবাসার মধ্য দিয়ে বুধবার যথাযোগ্য মর্যাদায় ও ভাবগম্ভীর পরিবেশে পালন করল 'শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস'। শোকার্ত মানুষ মিরপুর এবং রায়েরবাজার শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে ফুলে ফুলে নিবেদন করেছেন তাদের প্রাণের অর্ঘ্য। এ দুটি স্থানে একটি বা দুটি ব্যানার নয়, পাক হানাদার ও তাদের এ দেশীয় দোসর হায়েনাদের দেশমাতৃকার শ্রেষ্ঠ সনত্মানদের নৃশংসভাবে হত্যার পর বধ্যভূমিতে ফেলে রাখার অসংখ্য নিষ্ঠুর ও ভয়াবহ আলোকচিত্র শ্রদ্ধা জানাতে আসা হাজারও বাঙালীকে শিহরিত করে তুলেছিল।
বিরোধীদলীয় নেত্রী খালেদা জিয়াও সকালে মিরপুর বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা নিবেদন করতে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের পৰে নতুন প্রজন্মের এমন গণজাগরণের দৃশ্য ভাল করেই অবলোকন করেছেন। মাত্র ক'দিন আগেই যুদ্ধাপরাধীদের পৰ নিয়ে তাঁর বক্তব্য ও দলের অবস্থানে দেশের মানুষ কতটা যে বিৰুব্ধ হয়েছে তা ভালভাবেই অাঁচ করতে পেয়েছেন বিরোধীদলীয় নেত্রী। স্মৃতিসৌধে দলীয় নেতাকমর্ীদের নিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদনের সময় চতুর্দিকে শ্রদ্ধা নিবেদন করতে আসা নতুন প্রজন্মের হাজার হাজার মানুষের যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে গগনবিদারী সেস্নাগান, ঘৃণা-ধিক্কার পুরো এলাকার পরিবেশই পাল্টে দিয়েছিল। বিচারের দাবিতে সেস্নাগানে সেস্নাগানে প্রকম্পিত ছিল স্মৃতিসৌধ প্রাঙ্গণ।
শ্রদ্ধা নিবেদন করতে আসা লাখো শোকার্ত বাঙালীর এ প্রাণের দাবির প্রতি একত্মতা প্রকাশ করে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করে বলেন, বর্তমান সরকারের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই যুদ্ধাপরাধীদের বিচার সম্পন্নের মাধ্যমে আদালতের রায় কার্যকর করা হবে।
বাঙালী জাতি এবার এক অন্যকরম পরিবেশে শহীদ বুদ্ধিজীবীদের শ্রদ্ধা জানাল। যখন কারাগারে অনত্মরীণ হয়ে বিচারের মুখোমুখি হওয়ার অপেৰায় রয়েছে একাত্তরের ঘাতক যুদ্ধাপরাধী নিজামী-মুজাহিদ-সাঈদী গং। মুক্ত পরিবেশে মুক্তিযুদ্ধের শাণিত বাণী উচ্চারিত হয়েছে সর্বত্র। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে স্বীকৃত রাষ্ট্রদ্রোহী ও যুদ্ধাপরাধীরা রক্তস্নাত পতাকা উড়িয়ে শ্রদ্ধা নিবেদনের নামে এ দুটি পবিত্র স্থানকে কলুষিত করেছিল। কিন্তু স্বাধীনতাবিরোধী জামায়াতে ইসলামীর কোন নেতা বর্তমান মহাজোট সরকারের আমলে মিরপুর বা রায়েরবাজার বধ্যভূমি স্মৃতিসৌধ এলাকায় যাওয়ার দুঃসাহস দেখাতে পারেনি। বরং এবারের বুদ্ধিজীবী দিবসে মুক্তিযোদ্ধাদের পাশাপাশি তরম্নণ প্রজন্মের জোরাল 'যুদ্ধাপরাধীদের দ্রম্নতবিচার চাই' এই সেস্নাগানে।
বুদ্ধিজীবী স্মরণে বুধবার বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধ সকাল থেকেই জনতার ঢল নামে। ফুলে ফুলে ভরে ওঠে শহীদ বেদি। বিভিন্ন সামাজিক রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন বেদিতে ফুল দিয়ে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে। এছাড়াও শ্রদ্ধা জানানোর পাশাপাশি এসব সংগঠনের পৰ থেকে আলোচনা সভা, সেমিনার, মিলাদ এবং দোয়া মাহফিলেও আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ টেলিভিশন, বাংলাদেশ বেতার এবং বেসরকারী টেলিভিশন ও রেডিওতে বিশেষ অনুষ্ঠানমালা প্রচার করা হয়। দিবসটির তাৎপর্য তুলে ধরে সংবাদপত্রে বিশেষ ক্রোড়পত্র প্রকাশ করা হয়।
প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেত্রী ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের শ্রদ্ধা ॥ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সকাল ৬টা ৩৭ মিনিটে মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে এসে ফুল দিয়ে বাঙালীর শ্রেষ্ঠ সনত্মান শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান। পুষ্পসত্মবক অর্পণের পর প্রধানমন্ত্রী দেশের এই কীর্তিমান সনত্মানদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে কিছু সময়ের জন্যে সেখানে নীরবে দাঁড়িয়ে থাকেন। এ সময় মন্ত্রিপরিষদের সদস্য, সংসদ সদস্য এবং তিন বাহিনীর প্রধানরা উপস্থিত ছিলেন। পরে শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগ সভানেত্রী হিসেবে দলীয় নেতৃবৃন্দকে সঙ্গে নিয়ে শ্রদ্ধা জানান।
শ্রদ্ধা নিবেদনকালে কৃষিমন্ত্রী বেগম মতিয়া চৌধুরী, রেলমন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, স্থানীয় সরকারমন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলামসহ কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। এরপর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে কথা বলেন। এ সময় মুক্তিযোদ্ধারা তাদের বিভিন্ন সমস্যার কথা জানালে প্রধানমন্ত্রী তাদের সমস্যা সমাধানের প্রতিশ্রম্নতি দেন। একজন মুক্তিযোদ্ধা যুদ্ধাপরাধীদের বিচার দ্রম্নত শেষ করার দাবি জানালে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের মানুষ সেই (বুদ্ধিজীবী হত্যাকারীদের) সব হত্যাকারীর বিচার চায়। স্বাধীনতার প্রাপ্তির ঠিক আগে এ জাতির শ্রেষ্ঠ সনত্মানদের হত্যা করেছে যারা এ দেশ তাদের বিচার চায়।
পরে প্রধানমন্ত্রী ধানম-ির ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘরের সম্মুখে স্থাপিত জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতিতে পুষ্পসত্মবক অর্পণ করেন। এ সময় উপস্থিত ছিলেন সংসদ উপনেতা সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী, কৃষিমন্ত্রী বেগম মতিয়া চৌধুরী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন, এলজিআরডি মন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম, আওয়ামী লীগ উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য আমির হোসেন আমু এমপি, রেলমন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, যোগাযোগমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, তথ্যমন্ত্রী আবুল কালাম আজাদ, নৌপরিবহনমন্ত্রী শাহজাহান খান, খাদ্যমন্ত্রী ড. আবদুর রাজ্জাক, ভূমিমন্ত্রী রেজাউল করিম হিরা, স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক টুকু, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ক্যাপ্টেন (অব) এবি তাজুল ইসলাম, আইন প্রতিমন্ত্রী কামরম্নল ইসলাম, নারী ও শিশুবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী ও জাতীয় সংসদের চীফ হুইপ আবদুস শহীদ।
মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে ঢাকা উত্তর ও দৰিণ সিটি কর্পোরেশনের দুই প্রশাসক, মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিলের পৰ থেকে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হয়। সকাল ৭টা থেকে স্মৃতিসৌধ সবার জন্য খুলে দেয়া হয়। একে একে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সামাজিক-সাংস্কৃতিক ও পেশাজীবী সংগঠনের পৰ থেকে স্মৃতিসৌধে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানো হয়। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলগুলোর পাশাপাশি শিৰাপ্রতিষ্ঠান, সাহায্য সংস্থা, এনজিও, পেশাজীবী সংগঠন, শ্রমিক সংগঠন, ছাত্র সংগঠন, স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাসহ সর্বসত্মরের মানুষ স্মৃতিসৌধে এসে শ্রদ্ধা জানায়।
ভোরের সূর্য ওঠার আগেই হাজারো মানুষ ভিড় করতে থাকে মিরপুরের শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধের সামনে। সবার হাতে ফুলের তোড়া, কালো ব্যানারে শহীদ বুদ্ধিজীবীদের স্মরণে লেখা 'বুদ্ধিজীবীর স্মরণে ভয় করি না মরণে' বুদ্ধিজীবীদের রক্ত বৃথা যেত দেব না। জামায়াত, শিবির, রাজাকার এই মুহূর্তে বাংলা ছাড়।' সবার মাঝে ছিল একই দাবি যুদ্ধাপরাধীদের বিচার দ্রম্নত শেষ করতে হবে। জাতি আর এ কলঙ্ক বহন করতে চায় না।
রায়েরবাজার স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা জানিয়ে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম বলেন, আজ থেকে ৪০ বছর আগে পাকিসত্মানী হানাদার, রাজাকার, আলবদরদের সহায়তায় বুদ্ধিজীবী হত্যাকা- হয়েছিল। যারা এ হত্যাকা-ে জড়িত, তাদের দৃষ্টানত্মমূলক শাসত্মি দেয়া হবে উলেস্নখ করে তিনি বলেন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের কাজ শুরম্ন হয়েছে। তবে বিএনপি যুদ্ধাপরাধীদের রৰার জন্য আন্দোলন শুরম্ন করেছে।
তিনি বিএনপির এ আন্দোলনের বিরম্নদ্ধে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, পুরো জাতির সঙ্গে আজ আমরা বুদ্ধিজীবী দিবস পালন করছি। তিনি বলেন, প্রধান বিরোধী দল বিএনপি যুদ্ধাপরাধীদের পৰ নিয়ে জাতিকে বিভক্ত করার চেষ্টা করছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরম্ন করা হয়েছে। এ বিচার শীঘ্রই সম্পন্ন হবে ইনশাআলস্নাহ। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের পৰে দেশবাসীকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
সকাল পৌনে ৮টায় বিরোধীদলীয় নেত্রী বেগম জিয়া শহীদ বেদিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান। এ সময় বাইরে এবং স্মৃতিসৌধ প্রাঙ্গণে বিভিন্ন ব্যানারে শ্রদ্ধা নিবেদন করতে আসা অজস্র সংগঠন যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে গগনবিদারী সেস্নাগানে চারদিক প্রকম্পিত করে তোলে। এ সময় দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরম্নল ইসলাম আলমগীরসহ কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ তাঁর সঙ্গে ছিলেন।
শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে ফখরম্নল ইসলাম আলমগীর সাংবাদিকদের বলেন, আমরা সব সময়ই বলছি, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চাই। তবে সেটা অবশ্যই স্বচ্ছ ও নিরপেৰ হতে হবে। এ বিচার যেন প্রশ্নবিদ্ধ না হয়, সেজন্য প্রক্রিয়া চালাতে হবে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়ার জন্য সরকারী দলের ভূমিকা মুখ্য। আমরা প্রত্যাশা করি, সরকার সে ভূমিকা পালন করবে।
এর আগে সকাল সাড়ে ৭টায় জাতীয় পার্টির (এ) চেয়ারম্যান এইচএম এরশাদ দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে ফুল দিয়ে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান। এইচএম এরশাদ বলেন, 'আজকের এ দিনের শোককে আমাদের শক্তিতে পরিণত করতে হবে। মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচার ত্বরান্বিত করতে হবে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রশ্নে কোন ছাড় দেয়া ঠিক হবে না। এ সময় তিনি বর্তমানে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার যে প্রক্রিয়ায় চলছে তাতে সনত্মোষ প্রকাশ করেন।
শহীদ বুদ্ধিজীবীদের স্মরণে বুধবার সকাল থেকেই মিরপুর বুদ্ধিজীবী স্মৃতি এবং রায়েরবাজার বধ্যভূমি স্মৃতিসৌধ লাখো মানুষের শ্রদ্ধায় ভরে ওঠে ফুলে ফুলে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন ছাড়াও নানা বয়সী মানুষ শহীদ বেদিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানায়। মুক্ত আবহে মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধ ও রায়েরবাজার বধ্যভূমির গণকবরে কৃতজ্ঞ বাঙালীর ঢল নেমেছিল শীতের মধ্যেও সেই কাকডাকা ভোর থেকে। সকাল সোয়া ৭টায় মুক্তিযোদ্ধা কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিলের ফুল দেয়ার মধ্য দিয়ে এ স্মৃতিসৌধে আনুষ্ঠানিক শ্রদ্ধা নিবেদন শুরম্ন হয়। মুক্তিযুদ্ধ প্রতিমন্ত্রী ক্যাপ্টেন (অব) এবি তাজুল ইসলামের নেতৃত্বে শহীদ পরিবারের সদস্যরা এবং উপস্থিত মুক্তিযোদ্ধারাও বুদ্ধিজীবীদের ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পৰ থেকে উপাচার্য অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক, মোহাম্মদপুর-আদাবর-শেরেবাংলা থানা আওয়ামী লীগের পৰ থেকে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।
এ দুটি স্থানেই নামে লাখো শোকার্ত মানুষের ঢল। দেশবাসী গভীর কৃতজ্ঞতায় স্মরণ করে জাতির বিবেক শহীদ ওই বুদ্ধিজীবীদের। যাদের পবিত্র রক্ত লেগে আছে আমাদের এ রক্তস্নাত লাল-সবুজ জাতীয় পতাকায়। রাজধানীর বাইরেও সারাদেশের বধ্যভূমি, সমাধি ও স্মৃতিসত্মম্ভগুলো বুধবার ফুলে ফুলে ছেয়ে যায়। রায়েরবাজার স্মৃতিসৌধে দুই পুত্রকে সঙ্গে নিয়ে শ্রদ্ধা জানাতে আসা এনজিও কর্মকর্তা শফিকুল আজিজ তাঁর প্রতিক্রিয়ায় বলেন, দেশের স্বাধীনতা-সংগ্রামের সত্যিকারের ইতিহাস যেন পরবর্তী প্রজন্ম জানতে পারে সেজন্যই সনত্মানদের সঙ্গে করে নিয়ে এসেছি। তিনি বলেন, যে করেই হোক দেশকে রাজাকারমুক্ত করতে হবে। এ সরকারের আমলেই একাত্তরের ঘাতক যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবি জানান।
মিরপুর ও রায়েরবাজার বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও পেশাজীবী সংগঠন শ্রদ্ধার্ঘ্য অর্পণ করে। শ্রদ্ধা নিবেদন করে মইনুদ্দীন খান বাদলের নেতৃত্বে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ-ইনু), মনজুরম্নল আহসান খানের নেতৃত্বে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি, রাশেদ খান মেননের নেতৃত্বে বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি, মুক্তিযোদ্ধা সাংবাদিক হারম্নন হাবিব ও সুব্রত ঘোষের নেতৃত্বে সেক্টর কমান্ডারস ফোরাম, ন্যাপ (মোজাফফর), গণফোরাম, সাম্যবাদী দল, বিপস্নবী ওয়ার্কার্স পার্টি, জাকের পার্টি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়, প্রকৌশলী আতাউল মাহমুদের নেতৃত্বে ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন, ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, ছাত্রলীগ, মহিলা আওয়ামী লীগ, যুব মহিলা লীগ, শ্রমিক লীগ, তাঁতি লীগ, স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদ, বাংলা একাডেমী, উদীচী, ছাত্র ইউনিয়ন, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি, বিএফইউজে, ডিউজে, ঢাকা মহানগর সড়ক পরিবহন শ্রমিক লীগ, জাতীয় গণতান্ত্রিক লীগ, বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব পরিষদ, ন্যাপ (ভাসানী), ইসলামিক ফাউন্ডেশন, আওয়ামী বাস্তুহারা লীগ, বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোট, জাতীয় যুবজোট, মওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, বঙ্গবন্ধু সৈনিক লীগ, উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়, ভাসানী স্মৃতি সংসদ, আওয়ামী তরম্নণ লীগ, যুব মৈত্রী, উদীচী, কেন্দ্রীয় খেলাঘর আসর, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি, বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান, একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি, মহিলা পরিষদ, তরিকত ফেডারেশন, পেশাজীবী সমন্বয় পরিষদ, অপরাজেয় বাংলাদেশ, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল_ জেএসডি, ওয়েস্ট ধানমন্ডি হাইস্কুল, মোহাম্মদপুর প্রিপারেটরি উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়, ৪২ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগ, বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি, রায়েরবাজার উচ্চ বিদ্যালয়, বাংলাদেশ আওয়ামী মুক্তিযোদ্ধা লীগ, বাংলাদেশ আওয়ামী মুক্তিযোদ্ধা প্রজন্ম লীগ, শহীদ বুদ্ধিজীবী আইডিয়াল একাডেমী, বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোট, স্বাধীনতা শিৰক পরিষদ, প্রশিকা মানবিক উন্নয়ন কেন্দ্র, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়, প্রজন্ম একাত্তরসহ অজস্র সংগঠন শহীদ বুদ্ধিজীবীদের প্রতি শ্রদ্ধা জানায়।