মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
বৃহস্পতিবার, ১৫ ডিসেম্বর ২০১১, ১ পৌষ ১৪১৮
সাফাই সাক্ষাতকার প্রমাণ করে বুদ্ধিজীবী হত্যার তিনিই মূল গায়েন ॥ গো.আযমই হুকুমদাতা
০ টিক্কা খানের নির্দেশে গোলাম আযম সব সময় রাও ফরমান আলীর সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন
০ তাঁর বক্তব্য বিশ্লেষণে প্রমাণ হয় বুদ্ধিজীবীদের নাম সরবরাহকারী তিনি ও তাঁর দল

জনকণ্ঠ রিপোর্ট ॥ শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস সামনে রেখে দেশের বেশ কয়েকটি টেলিভিশন চ্যানেল গোলাম আযমের একটি সাৰাতকার প্রচার করেছে। যেভাবে এ সাৰাতকারটি প্রচার করা হয়েছে, সাংবাদিকতার বিচারে সেটাকে সাৰাতকার বলার কোন সুযোগ নেই। বলা যেতে পারে গোলাম আযমকে তার নিজের পৰে সাফাই গাওয়ার একতরফা সুযোগ করে দেয়া হয়েছে। শুধু শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস সামনে রেখে গোলাম আযমকে এ সুযোগ দেয়া হয়নি, আনত্মর্জাতিক মানবতাবিরোধী অপরাধ ট্রাইবু্যনালে যে সময়ে গোলাম আযমের বিরম্নদ্ধে ফরমাল চার্জ দাখিল করা হয়েছে তখনই এ সুযোগ গোলাম আযমকে দেয়া হয়েছে।
গোলাম আযম ওই সব টেলিভিশনকে দেয়া বক্তব্যের ভেতর দিয়ে নিজেকে সাচ্চা হিসেবে প্রমাণ করার চেষ্টা করেছেন। গোলাম আযম সাফাই গেয়েছেন_ রাজাকার, আলবদর ও আলশামস বাহিনী গঠনে তার কোন ভূমিকা নেই। ইতোমধ্যে কয়েকটি পত্রিকা প্রকাশ করেছে, আনত্মর্জাতিক আদালতের তদনত্ম কমিশনের কাছে গোলাম আযমের স্বাৰর করা ত্রিশ হাজার রাজাকারের একটি তালিকা আছে। অন্যদিকে যাঁরা এ দেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস জানেন তাঁরা সকলেই জানেন, জামায়াতে ইসলামী নেতা মওলানা ইউসুফের নেতৃত্বে প্রথমে আলবদর বাহিনী গঠিত হয় খুলনায়। এরপরে জামায়াতে ইসলামী সারাদেশে আলবদর বাহিনী গড়ে তোলে। বর্তমানে আনত্মর্জাতিক মানবাধিকার ট্রাইবু্যনালে অভিযুক্ত জামায়াত নেতা নিজামী ওই আলবদর বাহিনীর কমান্ডার ছিলেন। তৎকালীন জামায়াতে ইসলামীর ছাত্র সংগঠন 'ইসলামী ছাত্রসংঘ', যা বর্তমানে ইসলামী ছাত্রশিবির নামে পরিচালিত হচ্ছে_ ওই ছাত্রসংঘের নেতা ও কর্মীরা ছিল বদর বাহিনীর মূল সদস্য। বুদ্ধিজীবী দিবসকে সামনে রেখে যে টেলিভিশন চ্যানেলগুলো একতরফাভাবে গোলাম আযমকে নিজের পৰে সাফাই গাওয়ার সুযোগ করে দিলো, তাদের প্রশ্ন করা উচিত ছিল_ রাও ফরমান আলীর সঙ্গে কে সেদিন বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবীদের হত্যার নীলনঙ্া করেছিল? আর এ নীলনঙ্ার অন্যতম রূপকার যে জামায়াতের নেতা হিসেবে গোলাম আযম, তার অসংখ্য প্রমাণ রয়েছে। বিজয়ের পূর্বমুহূর্তে আমাদের বুদ্ধিজীবীদের কিন্তু পাকিসত্মানী সেনাবাহিনী হত্যা করেনি। বুদ্ধিজীবীদের প্রত্যেককে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে হত্যা করে আলবদর বাহিনীর সদস্যরা। শহীদুলস্নাহ কায়সারকে হত্যা করেছিল বদর বাহিনীর সদস্য খালেক মজুমদার ও তার সহযোগীরা। মুনীর চৌধুরী, ড. আলীম চৌধুরী, সাংবাদিক নিজামউদ্দিনসহ সকলকে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যায় বদর বাহিনীর সদস্যরা। বিজয়ের পূর্বমুহূর্তে আলবদর বাহিনীর সদস্যরা যে দেশের শ্রেষ্ঠসনত্মান বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করেছিল এটা ঐতিহাসিক সত্য। এ সত্য অস্বীকার করার কোন অবকাশ নেই। তবে গোলাম আযম নিজের পৰে সাফাই গাইতে গিয়ে আরেকটি সত্য কিন্তু প্রকাশ করে দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ২৫ মার্চের পরে নুরম্নল আমীনের নেতৃত্বে টিক্কা খানের সঙ্গে যে বৈঠক করেন ওই বৈঠকের সিদ্ধানত্ম অনুযায়ী টিক্কা খান নির্দেশ দেন রাও ফরমান আলী সব সময় গোলাম আযমের সঙ্গে যোগাযোগ রাখবে। বেশ কয়েকটি উদাহরণের মাধ্যমে গোলাম আযম বলেছেন, রাও ফরমান আলী তার কথা রাখতেন। অন্যদিকে এটা ঐতিহাসিক সত্য যে, যে বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করা হয়েছে তাদের তালিকা রাও ফরমান আলীর টেবিলে স্বাধীনতার পরে পাওয়া যায়। সে তালিকা পত্রপত্রিকায় ছাপাও হয়েছে। ওই তালিকা অনুযায়ী এ হত্যাকা- বাসত্মবায়ন করে আলবদর বাহিনীর সদস্যরা। আলবদর বাহিনী মানেই সকলে জামায়াতে ইসলামীর ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রসংঘ ও তাদের যুব সংগঠনের সদস্য। বাংলাদেশের মানুষের জামায়াতে ইসলামী সংগঠনটির চরিত্র সম্পর্কে কমবেশি ধারণা আছে। ক্যাডারভিত্তিক এ মৌলবাদী সংগঠনটির সকল কাজ পরিচালিত হয় সংগঠনের নির্দেশে। এ সংগঠনের প্রধানই তার দলের অন্যান্য নেতাদের নিয়ে এ সিদ্ধানত্ম নেন। তাদের সংগঠনের সিদ্ধানত্ম ছাড়া কোন কর্মী কোন কাজ করে না। তাই বুদ্ধিজীবী হত্যার ৰেত্রেও সেটাই ঘটেছে। জামায়াতের কেন্দ্রীয় নেতার নির্দেশে তাদের ছাত্র ও যুব সংগঠনের নেতারা আলবদর বাহিনীর সদস্য হিসেবে এই হত্যাকা- ঘটায়। আর যেহেতু আলবদর বাহিনী এ হত্যাকা- ঘটায় সেহেতু এটা প্রমাণিত হয় যে, সেদিন জামায়াতের নেতা হিসেবে বদর বাহিনীকে গোলাম আযমই এ নির্দেশ দিয়েছিলেন। আলবদর বাহিনীর সদস্যরা তাই যে হত্যাকা-গুলো করে সেগুলোর নির্দেশদাতা গোলাম আযম। তাছাড়া এর থেকে আরও একটি বিষয় প্রমাণিত হয়, ওই তালিকার মূল প্রস্তুতকারক গোলাম আযম ও তার দলের অন্য নেতৃবৃন্দ। কারণ, রাও ফরমান আলীর পৰে বাংলাদেশের প্রগতিশীল সকল বুদ্ধিজীবীর নাম জানা সম্ভব নয়। তাই রাও ফরমান আলীর টেবিলে যে তালিকা পাওয়া যায় এ তালিকার নাম সরবরাহকারী গোলাম আযম। কারণ যে হত্যাকা- তার দলের সদস্যরা সংঘটিত করেছে, অবশ্যই ওই নিহতদের তালিকা তার দলেরই প্রস্তুত করা এবং সেদিন গোলাম আযমই এ নামগুলো সরবরাহ করে। এ সংগঠনের নেতা হিসেবে তিনিই রাও ফরমান আলীর সঙ্গে সব সময় যোগাযোগ রাখতেন_ টেলিভিশনের সাফাই বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি সেটা স্বীকারও করেছেন। তাই যদিও এ দেশের সকল মানুষ জানে, তারপরেও আবারও প্রমাণিত হলো_ রাও ফরমান আলীর কাছে বুদ্ধিজীবীদের নাম সরবরাহকারী হলেন গোলাম আযম। আবার জামায়াতের নেতা হিসেবে রাও ফরমান আলীর তালিকার সকল বুদ্ধিজীবী হত্যার জন্য আলবদর বাহিনীকে নির্দেশদাতাও তিনি। অর্থাৎ বুদ্ধিজীবী হত্যার নীলনঙ্াও তার করা, হত্যা বাসত্মবায়নও তার।
বুদ্ধিজীবী হত্যার নীলনঙ্া প্রণয়নকারী, তালিকা প্রস্তুতকারী ও হত্যা বাসত্মবায়নকারী গোলাম আযমকে কেন এই সাফাই গাওয়ার সুযোগ দেয়া হলো বুদ্ধিজীবী হত্যা দিবস সামনে রেখে? যারা এ সুযোগ দিয়েছে, তাদের প্রতি কোন সন্দেহ না রেখেও বলা যায়, এ ঘটনার পরে বাংলাদেশের মিডিয়ার মনে হয় সচেতন হবার সময় এসেছে। কারণ মনে রাখা দরকার, এ দেশের ওপর প্রতিষ্ঠিত যত প্রচার মাধ্যম আছে সবাইকে এ দেশের সংবিধানের প্রতি অনুগত প্রতিষ্ঠান হতে হবে। আর সংবিধানের প্রতি অনুগত প্রতিষ্ঠান হতে হলে তার অবশ্যই দায়িত্ব দেশের স্বাধীনতা, তার চেতনা ও সার্বভৌমত্বের পৰে কাজ করা। এর বাইরে গেলে, স্বাধীনতাবিরোধীদের কাজে সহায়তা করলে সেটা সরাসরি সংবিধান লঙ্ঘন। অন্যদিকে আরও একটি বিষয় আছে, সেটা স্বাধীনতা ও মূল্যবোধের প্রতি দায়বদ্ধতা। কোন দেশের মিডিয়া এর বাইরে যায় না।
যুদ্ধাপরাধীদের বিচারকে সামনে রেখে জামায়াতে ইসলামী হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ করছে। সেই অর্থও তাদের আছে। '৭১-এর লুটের অর্থও তাদের কাছে। এ অর্থ দিয়ে তারা বিদেশে লবিস্ট ফার্ম নিয়োগ করছে। এখন সকলেরই সজাগ হওয়া দরকার, এ অর্থ যেন বাংলাদেশে জামায়াতকে গণহত্যা, বুদ্ধিজীবী হত্যা, নারী ধর্ষণের অপরাধের বিচার থেকে বাঁচার সুযোগ করে না দেয়। এ অর্থ যেন কোনমতেই গোলাম আযমের মতো চিহ্নিত ঘাতকদের নিজের পৰে সাফাই গাওয়ার সুযোগ না করে দেয়।