মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
শুক্রবার, ২৫ নভেম্বর ২০১১, ১১ অগ্রহায়ন ১৪১৮
জনরোষে অলি_ চট্টগ্রাম আদালত রণক্ষেত্র, জুতো ও ঝাঁটা প্রদর্শন
মহিলা এমপি সম্পর্কে অশস্নীল মন্তব্যের জের ॥ গাড়ি ভাংচুর আহত ২০
স্টাফ রিপোর্টার, চট্টগ্রাম অফিস ॥ বেফাঁস বক্তব্য দিয়ে চট্টগ্রামে মানহানি মামলায় আদালতে হাজিরা দিতে এসে জনরোষের মুখে পড়লেন জাতীয় সংসদের পরিকল্পনা বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের স্থায়ী কমিটির সভাপতি এলডিপি প্রধান কর্নেল (অব) অলি আহমদ বীর বিক্রম। বৃহস্পতিবার সকালে তাঁর উপস্থিতিকে কেন্দ্র করে চট্টগ্রাম আদালত প্রাঙ্গণ পরিণত হয় রীতিমতো রণক্ষেত্রে। আওয়ামী লীগ ও যুবলীগের বিক্ষুব্ধ কর্মীরা অলিকে লক্ষ্য করে জুতা ও ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে। মহিলারা প্রদর্শন করেন ঝাঁটা। ব্যাপক হাঙ্গামার মধ্যে অলি আহমদ চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির হয়ে জামিন নেন। তবে এর আগে এবং পরে আওয়ামী লীগ ও এলডিপি সমর্থকদের মধ্যে চলে দফায় দফায় সংঘর্ষ। এতে দুই সাংবাদিকসহ অন্তত ২০ জন আহত হন। ভাংচুর হয় অলিকে বহনকারী গাড়িসহ কয়েকটি যানবাহন।
চন্দনাইশের দায়িত্বপ্রাপ্ত মহিলা সংসদ সদস্য চেমন আরা তৈয়ব এবং এলাকার যুবকদের জড়িয়ে অশালীন বক্তব্য রাখার অভিযোগে দায়ের করা মানহানির মামলায় হাজিরা দিতে বৃহস্পতিবার আদালতে আসেন সংসদ সদস্য অলি আহমদ। বেলা ১১টার দিকে তিনি মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মাহবুবুর রহমানের আদালতে উপস্থিত হন। কিন্তু এর আগে থেকেই আদালতপাড়ায় চলে পাল্টাপাল্টি শোডাউন। কর্নেল অলির পক্ষে শোডাউনের জন্য তাঁর নির্বাচনী এলাকা চন্দনাইশ থেকে আনা হয় কর্মী সমর্থকদের। অপরদিকে অলি আসছেন এ খবরে আদালত এলাকায় প্রস্তুত ছিল আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। অনেক মহিলার উপস্থিতিও ছিল। চলে পাল্টাপাল্টি সেস্নাগান। এ সময় পুলিশ উপস্থিত থাকলেও পরিস্থিতি ছিল তাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে।
পুলিশ ও দলীয় নেতাকর্মী পরিবেষ্টিত অবস্থায় অলি আহমদ আসেন চট্টগ্রাম আদালতে। তবে প্রবেশ পথেই তাঁর গাড়ি লক্ষ্য করে হামলে পড়তে দেখা যায় আওয়ামী লীগ ও যুবলীগ সমর্থকদের। তারা অলিকে লক্ষ্য করে জুতা ও ইটপাটকেল ছুড়তে থাকেন। এজলাসে যখন শুনানি চলছিল তখনও বাইরে ছিল পাল্টাপাল্টি অবস্থান। পুলিশ দু'পক্ষের মাঝামাঝি অবস্থান করে পরিস্থিতি সামলে রাখার চেষ্টা করে।
বিচারক ২০ হাজার টাকার মুচলেকায় আইনজীবী এ্যাডভোকেট কফিল উদ্দিন চৌধুরী এবং এলাকার এক বিশিষ্ট ব্যক্তির জিম্মায় অলি আহমদ বীর বিক্রমের জামিন মঞ্জুর করেন। একই আদেশে বিচারক আগামী ২৭ নবেম্বর পরবতর্ী শুনানির দিন ধার্য করেন।
জামিন নিয়ে বের হওয়ার পর আদালত প্রাঙ্গণে সাংবাদিকদের উদ্দেশে কিছু বক্তব্য রাখতে চাইলে সেখানেও প্রতিরোধের মুখে পড়েন অলি আহমদ। বিক্ষুব্ধরা তাঁর ওপর চড়াও হয়। এ সময় ঢিলের পাশাপাশি এসে পড়তে থাকে জুতা স্যান্ডেল। তাঁকে উদ্দেশ করে ঝাঁটা উঁচিয়ে ধরতে দেখা যায়। বিক্ষুব্ধরা অলি আহমদকে বহনকারী গাড়ির পেছনের কাঁচ ভেঙ্গে দেয় এবং জেলা আইনজীবী সমিতি মিলনায়তনের কাঁচ ও কয়েকটি মোটরসাইকেল ভাংচুর করে। ইটের আঘাতে আহত একজনের মাথা থেকে রক্ত ঝরতে দেখা যায়। সংঘর্ষে আহতদের মধ্যে ২ জন সাংবাদিকও রয়েছেন। তাঁরা হলেন এটিএন বাংলার ক্যামেরাম্যান ফরিদ ও সময় টিভির ক্যামেরাম্যান বিপস্নব। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে হিমশিম খেতে হয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে। বেলা ১২টার দিকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে। একপর্যায়ে অলি আহমদ অনেকটা দৌড়ে গাড়িতে উঠে আদালত প্রাঙ্গণ ত্যাগ করেন। পরে তিনি নিজ বাসভবনে সংবাদ সম্মেলন করেন। তবে এর আগে প্রায় একঘণ্টার জন্য এদিন চট্টগ্রাম আদালতের অন্যান্য এজলাসেও বিচারকার্য বিঘি্নত হয়।
উলেস্নখ্য, সংরক্ষিত মহিলা আসনের সংসদ সদস্য চেমন আরা তৈয়বকে চন্দনাইশের দায়িত্ব দেয়ায় ক্ষুব্ধ হন অলি আহমদ বীর বিক্রম। গত ১৮ নবেম্বর চন্দনাইশে এলডিপি ও অঙ্গ সংগঠনগুলোর সম্মেলনে কর্নেল অলি বলেন, এক মহিলা এমপি দিয়ে চন্দনাইশের হাজার যুবকের সমস্যার সমাধান হবে না। গোপালগঞ্জের টুঙ্গীপাড়া থেকে সুন্দরী মহিলাদের এনে চন্দনাইশে দিলে এলাকার যুব সমাজের কল্যাণ হবে। তাঁর এ বক্তব্য পরদিন স্থানীয় দৈনিকে প্রকাশিত হয়। এলাকার সংক্ষুব্ধ যুবক এবং আওয়ামী লীগ নেতা আফতাব আহমদ শিমুল এ জন্য চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মানহানির মামলা করেন। আদালত মামলাটি আমলে নিয়ে সাতদিনের মধ্যে কর্নেল অলিকে আদালতে হাজির হওয়ার নির্দেশ দিয়ে সমন জারি করে।
সাংবাদিক সম্মেলনে অলি আদালত থেকে বেরিয়ে নগরীর লালদীঘির পাড়স্থ নিজ বাসভবনে কর্নেল (অব) অলি আহমদ সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে বলেন, পুলিশের সহযোগিতায় যুবলীগের নেতাকমর্ীরা পরিকল্পিতভাবে এ হামলা চালিয়েছে। তিনি অভিযোগ করেন, কোতোয়ালি থানার ওসি আবুল কালাম আজাদের সঙ্গে বৈঠকে বুধবার রাতে এ পরিকল্পনা হয়। আদালতে এ হামলাকে ন্যক্কারজনক অভিহিত করে তিনি প্রধানমন্ত্রীর কাছে এ ঘটনার বিচার বিভাগীয় তদনত্মের দাবি জানান। যুবলীগের হামলায় এলডিপির কমর্ী ও আইনজীবীসহ কমপক্ষে ৩০ জন আহত হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন। হামলার কারণ উলেস্নখ করতে গিয়ে তিনি বলেন, আমি আওয়ামী লীগের সঙ্গ ছাড়ায় এ হামলার ঘটনা ঘটেছে। আওয়ামী লীগ আমাকে বিভিন্নভাবে দলে টানতে চেয়েছিল। কিন্তু আমি রাজি হইনি। কারণ এ সরকার গণতন্ত্রকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। সর্বশেষ গত ২৯ নবেম্বর বিএনপির সঙ্গে সরকারবিরোধী আন্দোলনে যাবার ঘোষণা দেয়ায় পরদিনই মানহানির মামলাটি দায়ের করা হয়। মামলায় আনীত অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, কখনও কোন ভদ্র মহিলার বিরুদ্ধে বক্তব্য দেইনি। স্থানীয় পত্রিকায় আমার বক্তব্য ভিন্নভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। এ সংবাদের প্রতিবাদ জানানোর আগেই আমার বিরুদ্ধে শুরু হয়ে গেছে বিষোদগার। একজন বীর বিক্রম খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা হয়ে জামায়াতের সঙ্গে গেলেন কেন এ প্রশ্নের জবাবে অলি বলেন, আওয়ামী লীগ যদি জামায়াতের সঙ্গে আন্দোলনে যেতে পারে আমার যেতে দোষ কোথায়। সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন এলডিপি নেতা এয়াকুব আলী, এ্যাডভোকেট কফিল উদ্দিন চৌধুরী প্রমুখ।
দ্রুত বিচার আইনে মামলা ॥ আদালত এলাকায় পুলিশের ওপর হামলা, দায়িত্ব পালনে বাধা ও ভাংচুরের অভিযোগে এলডিপি সভাপতি কর্নেল (অব) অলি আহমদের বিরুদ্ধে দ্রুত বিচার আইনে একটি মামলা রাতে প্রক্রিয়াধীন ছিল বলে জানা গেছে।