মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
শুক্রবার, ২৫ নভেম্বর ২০১১, ১১ অগ্রহায়ন ১৪১৮
বিদ্যুতের পাইকারি দাম দুই ধাপে বাড়ল সাড়ে ৩৩ ভাগ
স্টাফ রিপোর্টার ॥ সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার ১৩ দিনের মাথায় বিদ্যুতের পাইকারি দাম (বাল্ক রেট) বৃদ্ধি করা হয়েছে। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় এক সংবাদ সম্মেলনে দুই ধাপে ৩৩ দশমিক ৫৭ ভাগ বিদু্যতের দাম বৃদ্ধির ঘোষণা দিয়েছে। এ সময় জানানো হয়েছে আগামী ১০ থেকে ১৫ দিনের মধ্যে বিদ্যুতের গ্রাহক পর্যায়ে (খুচরা) দাম বৃদ্ধি করা হবে।
কমিশন আদেশে বলে, এখন বিদ্যুতের গড় পাইকারি মূল্য প্রতি ইউনিট (কিলোওয়াট/ঘণ্টা) দুই টাকা ৮০ পয়সা থেকে প্রথম দফায় ১৬ দশমিক ৭৯ ভাগ বেড়ে তিন টাকা ২৭ পয়সা হবে। পরবর্তীতে ওই দামের ওপর ১৪ দশমিক ৩৭ ভাগ বৃদ্ধি করে তিন টাকা ৭৪ পয়সা হবে। প্রথম ধাপ বৃদ্ধি আগামী পহেলা ডিসেম্বর এবং দ্বিতীয় ধাপ আগামী পহেলা ফেব্রুয়ারি কার্যকর হবে। অর্থাৎ দুই দফায় প্রতি ধাপে ৪৭ পয়সা করে প্রতি ইউনিটে মোট ৯৪ পয়সা বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি করা হলো।
শুধুমাত্র রেন্টাল এবং কুইক রেন্টাল তেলভিত্তিক বিদ্যুত কেন্দ্রের প্রভাবে চলতি বছর ফেব্রুয়ারির পর নবেম্বরে এসে আবারও বিদু্যতের দাম বৃদ্ধি করা হলো। বিগত যে কোন সময়ের চেয়ে এই দাম বৃদ্ধি অস্বাভাবিক। সূত্র জানায়, বুধবার রাতে বিদু্যতের দাম বৃদ্ধির খবর ছড়িয়ে পড়ে ওই দিন সন্ধ্যায় কমিশনের ১০ থেকে ১২ ভাগ বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির বিষয়ে একমত হয়। কিন্তু রাত থেকে সংশিস্নষ্ট পৰের কয়েক দফা দেন দরবারের পর বৃহস্পতিবার বিকেলে কমিশন ৩৩ দশমিক ৫৭ ভাগ বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত জানায়। কমিশন তার আদেশে জানিয়েছে, এরপরও পিডিবিকে সরকারের সরাসরি পাঁচ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হবে।
কমিশন চেয়ারম্যান সৈয়দ ইউসুফ হোসেন সংবাদ সম্মেলনে বলেন, পাইকারি দাম বাড়ার অনেক দিন পর খুচরা দাম বাড়লে বিতরণ কোম্পানির ওপর চাপ বাড়ে এ জন্য খুব শীঘ্র খুচরা দাম বৃদ্ধি করা হবে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ১০ থেকে ১৫ দিনের মধ্যে খুচরা দাম বৃদ্ধি করা হবে। ইতোমধ্যে সকল বিতরণ কোম্পানির বিদু্যতের দাম বৃদ্ধির গণশুনানি করা হয়েছে।
কমিশনের সদস্য ড. সেলিম মাহমুদ বলেন, পাইকারি দাম বাড়ায় এখনই গ্রাহককে বিদু্যত বিল বাবদ বেশি দাম দিতে হবে না। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সাধারণত পাইকারি দামে বৃদ্ধির ৬০ ভাগ বিতরণ কোম্পানি পর্যায়ে বাড়ে। তবে এখনও কমিশন এ বিষয়ে সিদ্ধানত্ম নেয়নি বলে জানান তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে কমিশনের অপর সদস্য এমদাদুল হকসহ কমিশনের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
কমিশনের আদেশ অনুযায়ী সকল বিতরণ কোম্পানিকে ১৩২ কেভি লাইনে পিডিবির কাছ থেকে বিদু্যত কিনতে পহেলা ডিসেম্বরে দাম দিতে হবে তিন দশমিক ৫৬৫০ টাকা এবং ফেব্রম্নয়ারিতে সে দাম বেড়ে হবে চার দশমিক ২০৫০ টাকা। ৩৩ কেভি লাইনের জন্য ঢাকার দুটি বিদু্যত বিতরণ কোম্পানি ডেসকো এবং ডিপিডিসির ৰেত্রে একই দাম নির্ধারণ করা হয়েছে। এ ৰেত্রে ডিসেম্বরে তিন দশমিক ৬০৫০ ফেব্রম্নয়ারিতে ৪ দশমিক ২৪৫০ টাকা দরে বিদু্যত কিনতে হবে। আরইবির ৩৩ কোভি লাইনের জন্য ডিসেম্বরে দুই দশমিক ৯১৫০ টাকা ফেব্রম্নয়ারিতে তিন দশমিক ১৭৫০ টাকা, ওজোপাডিকোর জন্য ডিসেম্বরে তিন দশমিক ১৫৫০ টাকা এবং ফেব্রম্নয়ারিতে তিন দশমিক ৪৭৫০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এছাড়া বাংলাদেশ বিদু্যত উন্নয়ন বোর্ড, নর্থ ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি এবং ভবিষ্যত সৃষ্ট বিতরণ কোম্পানির জন্য ৩৩ কেভিতে একই দাম নির্ধারণ করা হয়েছে। কোম্পানিগুলোকে ডিসেম্বরে তিন দশমিক ৪২৫০ এবং ফেব্রম্নয়ারিতে তিন দশমিক ৯৮৫০ টাকা ইউনিট প্রতি পরিশোধ করতে হবে।
কমিশন আদেশে বলে, গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর আর্থ-সামাজিক অবস্থা বিবেচনা করে রেয়াতি মূল্যহার স্থির করা হয়েছে। কমিশন চেয়ারম্যন বলেন, আরইবির অধিকাংশ সমিতি লোকশান করছে। তাদের বাঁচিয়ে রাখার জন্য বিশেষ এ ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।
দফায় দফায় বিদু্যতের দাম বৃদ্ধি সরকারের অদূরদর্শী কুইক রেন্টাল বিদু্যত কেন্দ্রের জন্য কি না জানতে চাইলে কমিশন চেয়ারম্যান সৈয়দ ইউসুফ হোসেন স্পষ্ট করে কিছু বলতে রাজি হননি। তিনি বলেন, সরকার যেন এখন থেকে আর রেন্টাল-কুইক রেন্টাল বিদু্যত কেন্দ্রের কাছ থেকে বিদু্যত না কেনে কমিশন সে সুপারিশ করবে।
কমিশন দাম বৃদ্ধির আদেশের ৭ পৃষ্ঠার ৫ দশমিক ৪ অনুচ্ছেদে বলে, পর্যালোচনায় দেখা গেছে পিডিবির নিজস্ব বিদু্যত উৎপাদন কমেছে দুই ভাগ। একই সময়ে সরকারী মালিকানাধীন বিদু্যত কেন্দ্রের উৎপাদন কমেছে ২০ ভাগ। অন্যদিকে ভাড়াভিত্তিক বিদু্যত কেন্দ্রের উৎপাদন বেড়েছে ১৫০ ভাগ। পিডিবি এবং সরকারী বিদু্যত কেন্দ্রের উৎপাদন খরচ অনেক কম। প্রৰানত্মরে ভাড়াভিত্তিক বিদু্যত কেন্দ্রের উৎপাদন ব্যয় বহুমাত্রিক বেশি। বিশেষ প্রয়োজনে এ ধরনের বিদু্যত কেনার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিলেও কমিশন মনে করে ব্যবস্থাপনার উন্নতি, সাশ্রয়ী পদৰেপ গ্রহণ এবং গ্যাস এবং কয়লাভিত্তিক বিদু্যত উৎপাদন বৃদ্ধি করলে ব্যয়বহুল বিদু্যত কেনার প্রয়োজনীয়তা হ্রাস পাবে।
কমিশনের পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, গ্যাসের ৰেত্রে আনত্মর্জাতিক তেল গ্যাস কোম্পানির (আইওসি) কাছ থেকে পাওয়া গ্যাসের ওপর সরাসরি কোন শুল্ক ধরা হয় না। একই ভাবে জ্বালানি শুল্কমুক্ত হলে বিদু্যতের উৎপাদন খরচ অনেক কমে আসবে।
কমিশনের স্টাফ ফাইন্ডিসের সুপারিশে দেখা যায় ভতর্ুকি ব্যতীত ২০১১-১২ অর্থবছরের জন্য রাজস্ব আদায়ের সুপারিশ করা হয়েছে এক লাখ ১৯ হাজার ৮৫৬ দশমিক ৮৩ মিলিয়ন টাকা। এ অবস্থায় পিডিবিকে ১৫ হাজার মিলিয়ন টাকা ভতর্ুকি দিলে মূল্যহার সহনীয় পর্যায়ে থাকবে। এতে বর্তমান মূল্যহারের ২৩ দশমিক ৫৭ ভাগ বৃদ্ধি করতে হবে। কিন্তু ১০ নবেম্বর জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পর পিডিবি মূল্য সমন্বয়ের প্রসত্মাব দিলে তা পরিবর্তন করা হয়।
পিডিবি তাদের দাম বৃদ্ধির আবেদনে সঞ্চালন ৰতি তিন দশমিক ৪৫ ভাগ ধরা হয়েছে। কিন্তু এ ৰেত্রে পাওয়ার সেলের অনুমোদিত সঞ্চালন ৰতি দুই দশমিক ৬৫ ভাগের মধ্যে রাখার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
কমিশন তাদের আদেশে বলে, গত ফেব্রম্নয়ারিতে দাম বৃদ্ধির সময় কমিশন পিডিবিকে যেসব নির্দেশনা দিয়েছিল সে বিষয়ে পিডিবি কোন তথ্য কমিশনে সরবরাহ করেনি। এমনকি বিদু্যত উন্নয়ন ফান্ড গঠনের কথা বলা হয়েছিল তাও করেনি। আদেশে আরও বলে, দেশে সরকারী বিদু্যত কেন্দ্রের পস্নান্ট ফ্যাক্টর ৪০ থেকে ৫০ ভাগ। অন্যদিকে বেসরকারী বিদু্যত কেন্দ্রের ব্যয় বেশি হলেও তাদের পস্নান্ট ফ্যাক্টর ৮০ থেকে ৯০ ভাগ। এ ৰেত্রে সরকারী বিদু্যত কেন্দ্রের পস্নান্ট ফ্যাক্টর বৃদ্ধি করার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।
প্রসঙ্গত, গত ১৩ নবেম্বর বিইআরসিতে অনুষ্ঠিত গণশুনানিতে পিডিবি চার দফায় ২০১৩ সালের শুরম্ন থেকে বিদু্যতের বাল্ক রেট ৭৬ দশমিক ০৭ শতাংশ বাড়ানোর জন্য কমিশনের কাছে প্রসত্মাব করে। পিডিবির প্রসত্মাবে বলা হয়, তরল জ্বালানি ব্যবহার বাড়ায় বিদু্যতের উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যয় বাড়ছে। বর্তমানে প্রতি ইউনিট বিদু্যতের সরবরাহ ব্যয় ৪ টাকা ৮৬ পয়সা। কিন্তু গড়ে প্রতি ইউনিট বিদু্যত পিডিবিকে দুই টাকা ৮১ পয়সায় বিক্রি করতে হয়।
পিডিবি'র প্রসত্মাবে প্রতি ইউনিট বিদু্যতের বাল্ক রেট ২০১১ সালের নবেম্বর থেকে প্রতি ইউনিট বিদু্যতের দাম ৩ টাকা ২৪ পয়সা, ২০১২ সালের মার্চ থেকে ৩ টাকা ৭২ পয়সা, একই বছরের জুলাইতে ৪ টাকা ২৮ পয়সা আর ২০১৩ সালের জানুয়ারিতে ৪ টাকা ৮৬ পয়সা করার জন্য প্রসত্মাব করা হয়। প্রসত্মাবনায় বলা হয়, প্রসত্মাবিত দাম বাড়ানোর পরও চলতি বছরে পিডিবি'র ঘাটতির পরিমাণ হবে পাঁচ হাজার ৭২২ কোটি টাকা।
চলতি বছর আরও দুই ধাপে বিদু্যতের দাম বৃদ্ধি করা হয়। গত পহেলা ফেব্রম্নয়ারিতে দুই টাকা ৩৭ পয়সা থেকে প্রতি ইউনিট বিদু্যতের দাম ১১ ভাগ বাড়িয়ে দুই টাকা ৬৩ পয়সা নির্ধারণ করা হয়, যা গত পহেলা আগস্ট থেকে ৬ দশমিক ৬৬ ভাগ বেড়ে এখন বিক্রি হচ্ছে দুই টাকা ৮০ পয়সায়।
বিদু্যতের দাম বৃদ্ধিতে উদ্বেগ ॥ বিদ্যুতের পাইকারি মূল্য বৃদ্ধিতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন তৈরি পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ-এর ভারপ্রাপ্ত সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান। তিনি বলেন, তৈরি পোশাক শিল্প এখন একটি সঙ্কটের মধ্যে রয়েছে। সম্প্রতি জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পর পর বিদু্যতের দাম বৃদ্ধি পোশাক শিল্প খাতকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।