মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
বৃহস্পতিবার, ২০ অক্টোবর ২০১১, ৫ কার্তিক ১৪১৮
পাটগ্রাম আর চাঁপাই থেকে_
আগুন লাগাতে দেব না ॥ পাটগ্রামে বিশাল সমাবেশে শেখ হাসিনা
উত্তম চক্রবর্তী/জাহাঙ্গীর আলম শাহীন, পাটগ্রাম থেকে ॥ পাটগ্রামের বিশাল জনসমুদ্রে দাঁড়িয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিরোধী দলের নেত্রী খালেদা জিয়ার উদ্দেশ্যে বলেছেন, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকতে কাউকে মানুষের শান্তি নষ্ট করতে দেব না। রোডমার্চের নামে দামী গাড়ির প্রদর্শনী করে আপনি (খালেদা) বলেছেন, মানুষের ঘরে ঘরে আগুন জ্বালাবেন! যতদিন আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকবে কাউকে ঘরে ঘরে আগুন জ্বালাতে দেব না। কেন তিনি (খালেদা জিয়া) মানুষের শান্তি নষ্ট ও ক্ষতি করতে চান? কারণ দেশের মানুষ যখন শান্তিতে থাকে, পেট ভরে ভাত খায়, তখন বিএনপি নেত্রীর মনে অশান্তির আগুন জ্বলে।
বিএনপির দুর্নীতির কারণেই পদ্মা সেতুর অর্থায়ন বিশ্বব্যাংক স্থগিত করেছে দাবি করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, পদ্মা সেতুসংক্রান্ত আমার কাছে বিশ্বব্যাংক থেকে যে দুটি ডকুমেন্টস এসেছে, তা তাদের আমলে (বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার) যোগাযোগমন্ত্রীর বিরুদ্ধে। দু'টি ডকুমেন্টসই বিএনপির যোগাযোগমন্ত্রীর ডকুমেন্ট। আজ 'চোরের মায়ের বড় গলা।' আগামীতে কোন দুর্নীতিবাজ, সন্ত্রাসী ও যুদ্ধাপরাধী যাতে আর ক্ষমতায় আসতে না পারে সেজন্য তিনি দেশবাসীকে সজাগ ও সতর্ক থাকার আহ্বান জানান। তিনি লালমনিরহাটবাসীকে আশ্বস্ত করে বলেন, এ সরকারের আমলেই তিস্তা চুক্তির বাসত্মবায়ন, প্রতিটি ছিটমহলবাসীকে মুক্ত করা এবং সীমানা নির্ধারণের কাজ শেষ করা হবে।
একই জনসভায় সাবেক রাষ্ট্রপতি ও জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ বলেন, তিন বিঘা চুক্তির মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী অসাধ্য সাধন করেছেন, ঐতিহাসিক কাজ করেছেন। দেশের মানুষ তাঁকে চিরদিন মনে রাখবেন। 'তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া নির্বাচন নয়'_ বিরোধী দলের এমন দাবির প্রবল বিরোধিতা করে তিনি বলেন, এ ব্যবস্থা বাতিল করা হয়েছে জাতীয় সংসদের দুই-তৃতীয়াংশের বেশি সংসদ সদস্যের ভোটে। আর নির্বাচন ছাড়া সরকার পরিবর্তনের বিকল্প নেই। কেউ যদি তত্ত্বাবধায়ক সরকার আবারও ফিরিয়ে আনতে চায় তবে তাদের নির্বাচনে অংশ নিতে হবে, দুই-তৃতীয়াংশ আসনে বিজয়ী হয়ে সংসদে বিল এনে পরিবর্তন আনতে হবে।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা নিয়ে দেশে অশান্তি সৃষ্টি করা হচ্ছে এমন অভিযোগ করে সাবেক এ রাষ্ট্রপতি দেশে সংঘাতের আশঙ্কা ব্যক্ত করে বলেন, দেশের মানুষ শান্তি চায়, সংঘাত চায় না। গণতন্ত্রের জন্য শেখ হাসিনা আমার বিরুদ্ধে আন্দোলন ও যুদ্ধ করে বিজয়ী হয়েছেন। এ অর্জিত গণতন্ত্র যে কোন মূল্যে তাঁকেই রৰা করতে হবে।
বুধবার বিকেলে লালমনিরহাট জেলার পাটগ্রাম সরকারী জসমুদ্দিন কাজী আবদুল গনি কলেজ মাঠে স্থানীয় আওয়ামী লীগ আয়োজিত এক বিশাল জনসভায় সভাপতিত্ব করেন পাটগ্রাম উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি আনোয়ারুল ইসলাম নাজু। বক্তব্য রাখেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এ্যাডভোকেট সাহারা খাতুন, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপু মনি, স্বাস্থ্যমন্ত্রী অধ্যাপক ডা. আফম রুহুল হক, স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী এ্যাডভোকেট শামসুল হক টুকু, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ক্যাপ্টেন (অব) তাজুল ইসলাম এমপি, বিদু্যত প্রতিমন্ত্রী ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব) এনামুল হক এমপি, স্থানীয় সংসদ সদস্য ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী মোতাহার হোসেন, রংপুর বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক খালিদ মাহমুদ চৌধুরী এমপি, এ্যাডভোকেট ফজলে রাবি্ব মিয়া এমপি, টিপু মুন্সী এমপি, জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এ্যাডভোকেট মতিয়ার রহমান এবং জেলা আওয়ামী লীগ নেতা সিরাজুল হক।
প্রধানমন্ত্রীর আগমন উপলক্ষে গত কয়েকদিন ধরেই পুরো লালমনিটরহাট ও এর আশপাশ এলাকায় সাজ সাজ রব পড়ে। লালমনিরহাট থেকে শুরু করে পাটগ্রাম, তিন বিঘা করিডর পেরিয়ে দহগ্রাম ও আঙ্গরপোতা পর্যন্ত অসংখ্য তোরণ, ব্যানার, ফেস্টুন ও ডিজিটাল ব্যানার দিয়ে সাজানো হয়। পাটগ্রামের এ জনসভাকে কেন্দ্র করে সকাল থেকেই ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র মিছিল নিয়ে আসতে থাকেন নেতাকর্মীরা। ব্যান্ড-বাজনার তালে তালে শত শত মিছিলের তোড়ে বিকেল তিনটায় জনসভা শুরুর আগেই কলেজ মাঠ কানায় কানায় পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দহগ্রাম-আঙ্গরপোতা থেকে জনসভাস্থলে পৌঁছার আগেই বিশাল এ কলেজ মাঠ ছাপিয়ে আশপাশের প্রায় দুই কিলোমিটার রাসত্মায়, বিভিন্ন ভবনের ছাদে, গাছের ডালে সর্বত্রই ছিল মানুষ আর মানুষ। একপর্যায়ে মানুষের ঢলে জনসভাটি রীতিমতো জনসমুদ্রে রূপ নেয়। সাংগঠনিক সম্পাদক খালিদ মাহমুদ চৌধুরী ও প্রধানমন্ত্রীর এপিএস এ্যাডভোকেট সাইফুজ্জামান শিখর তিন দিন ধরে পাটগ্রাম ও ছিটমহলে অবস্থান করে সবকিছু তদারক করেন।
জনসভায় প্রধানমন্ত্রী বিরোধী দলের সমালোচনা করে বলেন, বিরোধীদলীয় নেত্রী রোডমার্চের নামে গাড়ির শোডাউন বা কারর্যালি করলেন। দুনর্ীতি করে কত টাকা কামিয়েছেন তা গাড়ির শোডাউন করে তিনি দেখিয়ে দিলেন। সব গাড়ির নাম্বার নিয়ে রেখেছি। সবকিছুর তদন্ত হবে। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকলে উত্তরাঞ্চলে মঙ্গা থাকে না; দেশের কোন মানুষ না খেয়ে কষ্ট পায় না।
তাঁর ধর্ম নিয়ে কটাৰ করায় বিরোধীদলীয় নেতার কঠোর সমালোচনা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, 'উনি (খালেদা জিয়া) আমার ধর্ম নিয়ে কথা বলেন। কিন্তু আমি আমার ১৪ পুরম্নষের নাম বলতে পারব। কিন্তু খালেদা জিয়া কী তা বলতে পারবেন? খালেদা জিয়া কী তাঁর নানার নাম বলতে পারবেন? তিনি কি জিয়াউর রহমানের বাবা-মায়ের নাম, এমনকি কোথায় তাদের কবর আছে তা বলতে পারবেন? এ সবকিছুই তিনি বলতে পারবেন না। কারণ এ দেশ ও জনগণের তিনি ভাল চান না, তাদের জন্য কোন দায়দায়িত্ব ও ভালবাসা নেই। দেশের প্রতিও তাঁর দায়িত্ব ও ভালবাসা নেই।
যুদ্ধাপরাধী, মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধকারী, মানুষ হত্যাকারী ও দুনর্ীতিবাজ রৰায় বিরোধী দলের আন্দোলন উলেস্নখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির জনককে হত্যার পরে এ অপশক্তি খুনীদের রৰায় একই ধরনের আন্দোলন করেছিল। কিন্তু তারা শেষ পর্যনত্ম বঙ্গবন্ধুর খুনীদের রৰা করতে পারেনি।
শেখ হাসিনা আরও বলেন, মানুষ শান্তিতে থাকলে বিএনপির নেত্রী অশান্তিতে ভোগেন। মানুষ কেন শানত্মিতে থাকবে এটা তাঁর কষ্ট, মনের জ্বালা। ৰমতায় থেকে দুর্নীতি করতে পারছেন না, টাকা লুট করতে পারছেন না, তাঁর ছেলেরা দুর্নীতি করে বিদেশে টাকা পাঠাতে পারছে না_ এটাই তাঁর বড় জ্বালা। তিনি বলেন, মানুষ শান্তিতে আছে বলেই বিরোধীদলীয় নেত্রী ঘরে ঘরে আগুন দিতে চান, আগুন দিয়ে সারাদেশ জ্বালিয়ে দিতে চান। প্রধানমন্ত্রী প্রশ্ন রেখে বলেন, পরের ঘরে আগুন দিতে চান কেন? আওয়ামী লীগ যতদিন ৰমতায় থাকবে ততদিন কারোর ঘরে আগুন দিতে দেয়া হবে না, কারোর শানত্মি বিনষ্ট করতে দেয়া হবে না।
যুদ্ধাপরাধী, খুনী, রাজাকার ও মানবতাবিরোধীদের রক্ষায় তিনি উঠেপড়ে লেগেছেন। ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি ভোট চুরি করে বঙ্গবন্ধুর খুনীদের তিনি (খালেদা) জাতীয় সংসদেও বসিয়েছিলেন। আর বঙ্গবন্ধুর খুনীদের নিয়ে রাতের অন্ধকারে তিনি ওই সংসদে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পাস করেছিলেন। তিনি বঙ্গবন্ধুর খুনী ও স্বাধীনতাবিরোধীদের রক্ষা করতে চান, কারণ তিনি দেশের স্বাধীনতায় বিশ্বাস করেন না, দেশের কল্যাণেও বিশ্বাস করেন না। প্রধানমন্ত্রী বলেন, দহগ্রাম-আঙ্গরপোতার যে সমস্যা তা দীর্ঘ ৬৪ বছরের। এ সমস্যা সমাধানের জন্য বঙ্গবন্ধু ও ইন্দিরা গান্ধী চুক্তি করেছিলেন। কিন্তু '৭৫-এ বঙ্গবন্ধু নিহত হওয়ার পর কোন সরকারই তা বাস্তবায়ন করেনি। দীর্ঘ ৬৪ বছর পর এখন তিন বিঘা করিডর ২৪ ঘণ্টা চালু হয়েছে। এটা আওয়ামী লীগ সরকারের অর্জন। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে সবকিছু অর্জন করে, আর বিএনপি-জামায়াত জোট ৰমতায় এসে সবকিছু বিনষ্ট করে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, আমি চাই দেশে হত্যা-খুন ও জঙ্গীবাদ যেন না থাকে, দেশে যেন শানত্মি বজায় থাকে। বিজয়ী জাতি হিসেবে আমরা বিশ্বসভায় মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে চাই; কিন্তু খালেদা চান মাথা হেঁট করে চলতে। দুর্নীতি তাঁর নীতি। তিনি জঙ্গীবাদ ও সন্ত্রাস নিয়েই থাকতে চান। বিরোধীদলীয় নেত্রীর দুই পুত্র দুনর্ীতি করে সারাবিশ্বে বাংলাদেশের মাথা হেঁট করেছে উলেস্নখ করে তিনি বলেন, তাঁর দুই পুত্রের দুনর্ীতি ও অর্থ পাচারের ঘটনা মার্কিন ফেডারেল কোর্টে এবং সিঙ্গাপুরের আদালতে প্রমাণ হয়েছে।
ছিটমহলবাসীর ৬৪ বছরের সমস্যা সমাধান করা হয়েছে উলেস্নখ করে তিনি বলেন, বিএনপি এ সমস্যা সমাধানের কোন উদ্যোগ নেয়নি। তিন বিঘা করিডর ২৪ ঘণ্টার জন্য খুলে দেয়ায় বন্দীদশা থেকে এখানকার মানুষ মুক্তি পেয়েছে। তিসত্মা নদীর ভাঙ্গনরোধে কাজ চলছে উলেস্নখ করে শেখ হাসিনা বলেন, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে উত্তরাঞ্চলে কোন মঙ্গা থাকে না। বয়স্ক, বিধবা, দুস্থ ও মুক্তিযোদ্ধাদের ভাতা দেয়া হচ্ছে। লালমনিরহাটে আড়াই শ' প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অনুমোদন দেয়া হয়েছে উলেস্নখ করে তিনি বলেন, লালমনিরহাট সরকারী কলেজে মাস্টার্স কোর্স এবং পাটগ্রাম কলেজে অনার্স কোর্স চালু এবং একটি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট স্থাপন করা হবে বলে আশ্বাস দেন প্রধানমন্ত্রী।
বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে সকল রাজনৈতিক হত্যাকা-ের পুনর্তদনত্ম করার জন্য প্রশাসনকে নির্দেশ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, হত্যা-সন্ত্রাস-দুনর্ীতি আর জঙ্গীবাদ সৃষ্টিই ছিল বিএনপির রাজনীতি। ক্ষমতায় থাকতে পাঁচ বছরে তারা আওয়ামী লীগের ২১ হাজার নেতাকমর্ীকে হত্যা করেছে। এসবের বিচার হতে হবে। কাউকে বিনা বিচারে ছেড়ে দেয়া হবে না। এ প্রসঙ্গে তিনি লালমনিরহাটে আওয়ামী লীগ নেতা ও মুক্তিযোদ্ধা শামসুল ইসলাম সুরম্নজ, সাবেক ব্যাডমিন্টন খেলোয়াড় সোহেল ও মুক্তিযোদ্ধা ভেলু হত্যাকা-ের কথা উলেস্নখ করে তিনি বলেন, এসব হত্যাকা-ের ঘটনা বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার ধামাচাপা দিয়েছে। নিজেদের দলীয় সন্ত্রাসীদের রক্ষায় কোন হত্যাকা-েরই বিচার করেনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকলে দেশে জঙ্গীবাদ, সন্ত্রাসী থাকে না। আমরা তাদের নিমর্ূল করেছি। দেশবাসীর দোয়া ও সহযোগিতা কামনা করে তিনি বলেন, আমরা আর বিদেশের কাছে ভিক্ষার ঝুলি নিয়ে চলতে চাই না। আমরা দেশকে আত্মনির্ভরশীল করে গড়ে তুলতে চাই। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে। তাই আমরা বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবই। ক্ষুধা-দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশ আমরা গড়ে তুলবই।