মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
রবিবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০১১, ২৭ ভাদ্র ১৪১৮
কিডনি বেচাকেনা চক্রের আরও ১০ সদস্যকে ধরতে সাঁড়াশি অভিযান
১০ দিনের রিমান্ড চেয়ে বাবুল চৌধুরীকে জয়পুরহাট আদালতে সোপর্দ করা হচ্ছে
গাফফার খান চৌধুরী ॥ অসৎ উদ্দেশ্যে কিডনি বেচাকেনা ও পাচার চক্রের আরও ১০ সদস্যকে গ্রেফতারে সাঁড়াশি অভিযান চালাচ্ছে পুলিশ, র্যাব ও গোয়েন্দারা। সুস্থ স্বাভাবিক থাকার জন্য একটি কিডনিই যথেষ্ট, এমন ধারণা দিয়েই গ্রেফতারকৃত কিডনি পাচারকারীরা অশিক্ষিত এবং খুবই ঋণগ্রস্ত দরিদ্রদের কিডনি বিক্রিতে উৎসাহ যোগাত। খুবই ঋণগ্রস্ত ও অশিৰিত দরিদ্ররাই ছিল কিডনি পাচারকারীদের প্রধান টার্গেট। কিডনি বিক্রেতাদের অধিকাংশই নানা রোগে আক্রান্ত। কিডনি বিক্রির পর নানা রোগে ভুগছেন এমন ৭ জনের জবানবন্দী দ-বিধির ১৬১ ধারায় রেকর্ড করা হয়েছে। অসৎ উদ্দেশ্যে কিডনি বিক্রি ও পাচারের বিষয়ে আরও তথ্য জানতে আজ বাবুল চৌধুরীকে ১০ দিনের রিমান্ড চেয়ে জয়পুরহাট জেলা আদালতে সোর্পদ করা হচ্ছে।
গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, রাজধানীসহ সারাদেশে দীর্ঘদিন ধরেই কিডনি বেচাকেনা ও পাচার চক্রের সদস্যরা সক্রিয়। এ ব্যবসার সঙ্গে সারাদেশে অন্তত ৭টি গ্রুপ জড়িত। প্রতিটি গ্রুপে সদস্য সংখ্যা নূ্যনতম ১০ জন। চক্রের মূল টার্গেট খুবই ঋণগ্রস্ত সহজ সরল অশিৰিত দরিদ্র মানুষ। প্রতিটি কিডনি পেতে চক্রটি ৩-৪ লাখ টাকা করে খরচ করত। সর্বশেষ ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের হাতে গ্রেফতার হয়ে তারেক আজিম ওরফে বাবুল চৌধুরী সাংবাদিকদের জানায়, সে ২০০৬ সাল থেকে এ ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। রাজধানীর ইউনাইটেড হাসপাতাল, বারডেম হাসপাতাল, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়, কিডনি ফাউন্ডেশন, ল্যাবএইড হাসপাতালে কিডনি প্রতিস্থাপনের অস্ত্রোপচার করা হত। খ্যাতনামা অনেক চিকিৎসক ও রাজধানীর পান্থপথের এক ব্যবসায়ীও এরসঙ্গে জড়িত। রাজধানীর বাইরে বাবুল চৌধুরীর ৩০ জনের একটি দালাল চক্র রয়েছে।
দালালরা বিক্রেতাকে টার্গেট করে প্রতিটি কিডনি বিক্রি বাবদ ৩-৪ লাখ করে খরচ করত। কিডনি বিক্রেতাকে কিডনি প্রতি এক লাখ থেকে দুই লাখ টাকা দেয়া হতো। দালালরা কিডনি প্রতি পেত ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা। কিডনি বিক্রেতাদের আকৃষ্ট করতে বিভিন্ন সময় এসব চক্র চটকদার বিজ্ঞাপন দিত। পুরো চক্রের সঙ্গে বেশকিছু চিকিৎসক ও আইনজীবীও জড়িত।
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের উত্তর জোনের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার মনিরম্নজ্জামান জনকণ্ঠকে জানান, অসৎ উদ্দেশ্যে কিডনি পাচার ও বেচাকেনার সঙ্গে জড়িত ১০ জনকে শনাক্ত করা হয়েছে। তাদের মধ্যে আইনজীবী, বিজ্ঞাপনদাতা ও চিকিৎসকও রয়েছে। তাদের গ্রেফতারে অভিযান চালানো হচ্ছে। শনিবার রাতেই কিডনি পাচার চক্রের অন্যতম হোতা তারেক আজিম ওরফে বাবুল চৌধুরীকে জয়পুরহাট জেলার কালাই থানা পুলিশের কাছে হসত্মানত্মর করা হয়েছে।
কালাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ফজলুল করিম জনকণ্ঠকে জানান, কালাই উপজেলার অনেক মানুষ প্রতারকদের প্রলোভনে পড়ে একটি করে কিডনি বিক্রি করেছেন। এদের অনেকেই নানা ধরনের জটিল রোগে আক্রানত্ম। উপজেলার এমন দুই পরিবারের সন্ধান পাওয়া গেছে, যে দুইটি পরিবারের প্রত্যেক পরিবারের ৫ জন করে মোট ১০ জন প্রতারক চক্রের কবলে পড়ে একটি করে কিডনি বিক্রি করে দিয়েছেন। বিক্রেতারা কিডনি প্রতি দেড় থেকে ২ লাখ টাকা করে পেয়েছেন। পরিবার দুইটির কিডনি বিক্রি করা ১০ জনই বর্তমানে নানা রোগে আক্রানত্ম। কিডনি বিক্রি করা পরিবারের মধ্যে উপজেলার ভেরেন্ডী গ্রামের একই পরিবারের জাহান আলী ও তার দুই ছেলে মেহেরম্নল ইসলাম, শাহারম্নল ইসলাম ও ছেলে বৌ সেলিনা বেগমসহ ৫ জন গত ২ বছরে পর্যায়ক্রমে তাদের একটি করে কিডনি বিক্রি করেছেন।
অপর পরিবারের মধ্যে রয়েছে গ্রেফতারকৃত আব্দুস সাত্তারের পরিবার। আব্দুস সাত্তার নিজে একটি কিডনি বিক্রি করেছে। পুরো বিষয়টি জানার পর আব্দুস সাত্তারকে নানাভাবে হুমকি দেয় কিডনি পাচার চক্র। শেষ পর্যনত্ম আব্দুস সাত্তারও জড়িয়ে পড়ে কিডনি পাচার চক্রের সঙ্গে। আব্দুস সাত্তারের প্রলোভনে পড়ে শেষ পর্যনত্ম আব্দুস সাত্তারের ভাই শুক্কুর আলী, স্ত্রী আছিয়া বেগম, ভায়রা মান্নান ও তার ছেলে সাজ্জাদ প্রতারক চক্রের হাতে একটি করে কিডনি বিক্রি করে দেয়। কিডনি বিক্রি করে নানা জটিল রোগে ভুগছেন এমন ৭ জনের জবানবন্দী দ-বিধির ১৬১ ধারায় রেকর্ড করা হয়েছে। জবানবন্দীতে বেরিয়ে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। জবানবন্দীদাতারা জানান, তারা কিডনি বিক্রির পর থেকেই নানা রোগে ভুগছেন। কোনক্রমেই তাদের রোগ ভাল হচ্ছে না। প্রথম তারা গ্রাম্য চিকিৎসকদের শরণাপন্ন হতে থাকেন। কিন্তু চিকিৎসক তাদের রোগ ধরতে পারেন না।
এমন পরিস্থিতিতে স্বাভাবিকভাবেই চিকিৎসক রোগীর কাছে রোগ সম্পর্কিত নানা বিষয়াদি জানতে চায়। এক পর্যায়ে রোগী চিকিৎসককে জানায়, তার একটি কিডনি বিক্রি করে দেয়া হয়েছে। এভাবেই আসত্মে আসত্মে বিষয়টি প্রকাশ পেয়ে যায়। কিডনি পাচার ও বেচাকেনার এমন তথ্যের ভিত্তিতেই আইনশৃঙ্খলা রৰাকারী বাহিনীর হাতে বাগেরহাট জেলার মোলস্নারহাট থেকে গ্রেফতার হয় সাইফুল ইসলাম দাউদ। তার তথ্য মতে, গ্রেফতার করা হয় আব্দুস সাত্তার, গোলাম মোসত্মফা, মোশারফ হোসেন ও আব্দুল করিমকে। সর্বশেষ গত ৮ সেপ্টেম্বর ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের হাতে গ্রেফতার হয় চক্রের অন্যতম মূলহোতা তারেক আজিম ওরফে বাবুল চৌধুরী। হালানাগাদ এ চক্রের ৬ জন গ্রেফতার হলো। বাকিদের গ্রেফতারে অভিযান অব্যাহত আছে।
গ্রেফতারকৃতদের বরাত দিয়ে কালাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আরও জানান, জবানবন্দীদাতারা অধিকাংশই ঋণগ্রসত্ম এবং অশিৰিত। বিভিন্ন সময় কিডনি পাচার চক্রের সদস্যরা কিডনি বিক্রেতাদের বুঝাতো সুস্থ এবং স্বাভাবিক থাকার জন্য একটি কিডনিই যথেষ্ট। একটি কিডনি থাকলে কোন সমস্যা হয় না। একটি কিডনি বিক্রির করলে শরীরে কোন প্রকার ঝামেলা হওয়ার সম্ভাবনা নেই। এটি পরীৰিত বিষয়। এভাবেই কিডনি বিক্রেতাদের উৎসাহিত করত গ্রেফতারকৃত কিডনি পাচারকারীরা। একটি কিডনি বিক্রি করলে কিছুই হয় না বিক্রেতাদের মনে এমন সাহস যোগাতে প্রতারকরা নানা কৌশলের আশ্রয় নিত। কৌশল হিসেবে প্রতারকরা নামকরা চিকিৎসকদের ভিজিটিং কার্ড ছাপিয়ে নিত। কার্ডে দেয়া প্রতারক চক্রের সদস্যদের মোবাইল নম্বর ব্যবহার করা হতো। কিডনি বিক্রেতা সরল বিশ্বাসে বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার জন্য ভিজিটিং কার্ডে থাকা মোবাইল ফোনে কিডনি বিক্রি সংক্রানত্ম তথ্য জানার চেষ্টা করত। আগ থেকেই নিয়োগকৃত প্রতারক চক্রের সদস্যরা কিডনি বিক্রেতার সঙ্গে চিকিৎসক সেজে কথা বলত। কিডনি বেচাকেনা ও পাচার সংক্রানত্ম আরও তথ্য জানতে আজ বাবুল চৌধুরীকে ১০ দিনের রিমান্ড চেয়ে আদালতে সোর্পদ করা হচ্ছে।