মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
রবিবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০১১, ২৭ ভাদ্র ১৪১৮
অবশেষে বাদ দেয়া হচ্ছে ঘুপচি বিজ্ঞাপনে নিয়োগপ্রাপ্তদের
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ॥ আন্দোলনে যাচ্ছেন চাকরিচ্যুত ৮২১ শিক্ষক-কর্মচারী
বিভাষ বাড়ৈ ॥ হাইকোর্টের রায় অনুসারে চারদলীয় জোট আমলে ভুয়া বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে নিয়োগপ্রাপ্ত ৮২১ শিৰক-কর্মকর্তা-কর্মচারীকে চাকরিচ্যুতির সিদ্ধান্ত নিয়েছে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেট। কেবল তাই নয়, সিদ্ধান্ত অনুসারে আজ রবিবার অফিস খোলার দিন থেকেই অবৈধভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত এসব কর্মকর্তা-কর্মচারীকে অব্যাহতিপত্র দেয়া হবে। আদালতের নিষেধাজ্ঞা থাকায় অপর ৪০০ কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে আপাতত ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না। হাইকোর্টের নির্দেশ বাস্তবায়নে শনিবার অনুষ্ঠিত সিন্ডিকেটের জরুরী সভায় এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। এ বিশ্ববিদ্যালয়ে মোট জনবল এক হাজার ৭৩৫ জন। এদিকে চাকরিচ্যুতির ঘটনার প্রতিবাদে আজ অফিস খোলার পরই বিৰোভ কর্মসূচী পালন করে লাগাতার ধর্মঘটে যাচ্ছে আন্দোলনকারীরা। চাকরিচ্যুতদের ঐক্যবদ্ধ সংগঠন চাকরি রৰা কমিটির ব্যানারে চলবে এই আন্দোলন। এর আগে গত ২৩ আগস্ট চারদলীয় জোট সরকার আমলে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিতর্কিত ১ হাজার ২শ' ২২ কর্মকর্তা ও কর্মচারীর নিয়োগ অবৈধ ঘোষণা করেছে উচ্চ আদালত। শুনানি শেষে বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দীন চৌধুরী মানিক ও বিচারপতি গোবিন্দ চন্দ্র ঠাকুর সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ এই রায় দেন। বিগত চারদলীয় জোট সরকারের আমলে তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক আফতাব আহমাদের সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তারা যোগসাজশে অসৎ উদ্দেশ্যে দৈনিক ইনডিপেনডেন্ট ও দৈনিক আজকালের খবর পত্রিকার জাল নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দেখিয়ে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে ১ হাজার ২শ' ২২ শিক্ষক-কর্মকর্তা ও কর্মচারী নিয়োগ দেয়া হয়। চাঞ্চল্যকর এ অবৈধ প্রক্রিয়ায় লোক নিয়োগকে কেন্দ্র করে তৎকালীন সময়ে জাতীয় বিভিন্ন দৈনিক পত্রিকায় অসংখ্য সংবাদ, সম্পাদকীয় ও উপসম্পাদকীয় প্রকাশের পর জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক সিনেট সদস্য এ্যাডভোকেট ফজলে রাব্বী মিয়া জনস্বার্থে হাইকোর্ট ডিভিশনে ৫১২৫/২০০৪ রিট মামলা দায়ের করেন। শুনানি নিয়ে ২০০৬ সালে হাইকোর্ট রিট আবেদন খারিজ এবং ওই নিয়োগকে বৈধ ঘোষণা করেন। অভিযোগ ওঠে রিট মামলায় কোন প্রমাণসাপেক্ষ বিষয় দেখার এখতিয়ার না থাকার সুযোগ গ্রহণ করে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তারা ২০০৪ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর দৈনিক ইনডিপেনডেন্ট ও একই বছরের ১১ সেপ্টেম্বর দৈনিক আজকালের খবর পত্রিকার জাল নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি এবং অন্যান্য মিথ্যা ডকুমেন্টস হাইকোর্ট ডিভিশনে জমা দেয়। এতে করে রিটের রায় চলে যায় বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের পৰে। এর পরিপ্রেৰিতে ভূমি মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি ও গাজীপুর ১ আসনের সংসদ সদস্য আ.ক.ম. মোজাম্মেল হক সুপ্রীম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের ৫১২৫/২০০৪ রিট মামলার রায়ের বিরম্নদ্ধে ২০১০ সালের অক্টোবর মাসের ১৫ তারিখে ৬৭/২০১০ রিভিউ মামলা দায়ের করলে- কেন রিট মামলার রায় বাতিল করা হবে না, মর্মে আদালত রম্নল জারি করে। রিভিউ মামলার শুনানি হয়। দীর্ঘ শুনানি শেষে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অবৈধ গণনিয়োগ সংক্রানত্ম রিট মামলার রায় বাতিল করে, গণনিয়োগ অবৈধ ঘোষণার এ আদেশ দেয় সুপ্রীম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ। তবে রায়ে কী বলা হয়েছে, তা নিয়ে দুই পক্ষের আইনজীবীদের মধ্যে গত কয়েকদিন ধরেই ছিল অস্পষ্টতা। গত বৃহস্পতিবার রায়ের অনুলিপি পাওয়ার পর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন নিশ্চিত হয়, ওই কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সরাসরি চাকরিচু্যত করতে বলা হয়েছে। রায়ে উলেস্নখ করা হয়, ২০০৩ সালের ১৭ নবেম্বর থেকে ২০০৪ সালের ৩১ আগস্ট পর্যনত্ম নিয়োগপ্রাপ্তদের ৰেত্রে চাকরিচু্যতির নির্দেশ কার্যকর হবে। রায়ের কপি পাওয়ার পর রিভিউ আবেদনকারী সাংসদ আ.ক.ম. মোজাম্মেল হক বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে দ্রম্নত ব্যবস্থা নে য়ার তাগিদ দেন। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর তিনি এ বিশ্ববিদ্যালয়ে অবৈধ নিয়োগপ্রাপ্ত হওয়ার অভিযোগ থাকা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চাকরিচু্যত করার বিষয়ে উদ্যোগ নেন।
আদালতের রায়ের পর কয়েকদিন ধরেই এ নিয়ে আলোচনা চলছিল সংশিস্নষ্ট মহলে। গত ৫ সেপ্টেম্বর শিৰা মন্ত্রণালয়ে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপৰের সঙ্গে আয়োজিত বৈঠক শেষে শিৰামন্ত্রী নুরম্নল ইসলাম নাহিদ সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন, গণনিয়োগ অবৈধ ঘোষণা সংক্রানত্ম হাইকোর্টের রায়ের কপি হাতে পাওয়ার পর আইনজ্ঞদের সঙ্গে আলোচনা করে সে অনুয়ায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে। এরই ধারাবাহিকতায় শনিবার সন্ধ্যায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ধানম-ির ঢাকা অফিসে বসে সিন্ডিকেট সভা। বিদেশে অবস্থান করায় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. কাজী শহীদুলস্নাহ সভায় উপস্থিত ছিলেন না। তবে উপাচার্যের দায়িত্বে থাকা উপউপাচার্য অধ্যাপক তোফায়েল আহমেদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে সভায় ছিলেন শিৰা সচিব ড. কামাল আব্দুল নাসের চৌধুরী, বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রেজারার অধ্যৰ কাজী শহীদুলস্নাহ, ঢাকা, বদরম্নন্নেসা কলেজের অধ্যৰসহ অধিকাংশ সিন্ডিকেট সদস্য। সভা শেষে শিৰা সচিব ড. কামাল আব্দুল নাসের চৌধুরী জনকণ্ঠকে বলেন, সভায় আদালতের রায়টি গ্রহণ করা হয়েছে। সিন্ডিকেট রায় অনুসারে অবিলম্বে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপৰকে নির্দেশ দিচ্ছে। অধ্যাপক তোফায়েল আহমেদ চৌধুরী বলেছেন, সিন্ডিকেট আদালতের রায় অনুসারে ব্যবস্থা গ্রহণের সিদ্ধানত্ম নিয়েছে।
এদিকে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরি রক্ষা কমিটি আজ রবিবার থেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ে লাগাতার অবস্থান ধর্মঘটের ডাক দিয়েছে। আন্দোলন চলবে চাকরি রৰা কমিটির ব্যানারে। কমিটির আহ্বায়ক মোঃ নুরম্নল আমিন ছাড়াও নেতৃত্বে আছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ডিন ও শিক্ষক সমিতির সভাপতি ড. ফকির রফিকুল আলম, উপ-রেজিস্ট্রার রেজাউল হাসান চৌধুরী, অফিসার্স এ্যাসোসিয়েশনের দফতর সম্পাদক মিয়া হোসেন রানা, কার্যকরী সদস্য আতাউর রহমান, জাকের হোসেন ও মাসুদুর রহমান। কমিটির নেতারা বলেছেন, এই রায়ের বিরম্নদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ আপীল করলে এবং একজন নিরপেক্ষ আইনজীবী নিয়োগ দিলে তাঁরা আলোচনায় বসবেন। অন্যথায় বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম অচল করে দেবেন তাঁরা। চাকরি রক্ষা কমিটির আহ্বায়ক নুরম্নল আমিন শনিবার সিন্ডিকেট সভার আগে উপাচার্য ও সিন্ডিকেট সভাপতির বরাবর বিশ্ববিদ্যালয়কে ধ্বংসের হাত থেকে রৰার জন্য কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চাকরিচু্যতির মতো কোন ধ্বংসাত্মক সিদ্ধানত্ম গ্রহণ না করার আবেদন জানান। তিনি বলেন, আইনী জটিলতায় ফেলে তাঁদের হয়রানি করছে একটি মহল। নিয়মনীতি মেনে এবং যোগ্যতার ভিত্তিতে তাঁরা চাকরি পেয়েছেন। অর্ধযুগের বেশি সময় চাকরি করার পর কারণ দর্শানোর সুযোগ পর্যনত্ম না দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্ধেকের বেশি কর্মকর্তা-কর্মচারীকে বিদায় করার চেষ্টা কেউ মেনে নেবে না। এদিকে আদালতের রায় নিয়ে প্রশ্ন না তুললেও অনেকে বিশ্ববিদ্যালটির ভবিশ্যত নিয়ে উদ্বিঘ্ন। ভায়াবহ সেশনজট, ভর্তি জটিলতা, পরীৰা, ফরম পূরণ, রেজিস্ট্রেশনসহ নানা সঙ্কটের মাঝে অর্ধেকের বেশি জনবলের চাকরিচু্যতি বিশ্ববিদ্যালয়টিকে আরও সঙ্কটাপন্ন করে তুলবে বলেও মনে করেন সংশিস্নষ্টরা। খোদ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনেরই অনেকে মনে করছেন, অর্ধেকের বেশি জনবল কমে গেলে কার্যক্রম স্বাভাবিকভাবে চালানোর মতো যথেষ্ট উদ্যোগও নেই সরকার ও কর্তৃপৰের।