মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
রবিবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০১১, ২৭ ভাদ্র ১৪১৮
৯/১১ আজ দশক পূর্তি লাদেন মুক্ত বিশ্বে
কাওসার রহমান ॥ আজ ৯/১১। যুক্তরাষ্ট্রে ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলার দিন। মানব ইতিহাসের সেই ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলার এক দশক পূর্তি। এবার এমন একটি পরিবেশে নাইন ইলেভেনের এক দশক পালন করা হচ্ছে, যখন আন্তর্জাতিক সন্ত্রাস ও জঙ্গীবাদের শীর্ষ নেতা ওসামা বিন লাদেন নেই। বিশেস্নষকরা বলছেন, বিশ্ববাসী এবার লাদেনমুক্ত পরিবেশে সন্ত্রাসী ও জঙ্গীবাদের মূলোৎপাটনে নতুন শপথ নেবে। সেই সঙ্গে তারা আশা করছে, আঞ্চলিক সন্ত্রাস ও জঙ্গীবাদের বিরম্নদ্ধে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যে উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন তার প্রতি বিশ্ব সম্প্রদায়ের সমর্থন। সহযোগিতা চেয়েছেন বাংলাদেশকে একটি সন্ত্রাস ও জঙ্গীবাদমুক্ত দেশে পরিণত করতে।
এবার যুক্তরাষ্ট্রে কড়া সতর্কতার মধ্যদিয়ে সন্ত্রাসী হামলার শোকগাথার এক দশক পূর্তি পালনের প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে রাখা হয়েছে সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায়। বাংলাদেশেও আর যাতে কোন সন্ত্রাসী হামলা না ঘটে সেজন্য নিরাপত্তা বাহিনীকে সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায় রাখার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেস্নষকরা। তাঁরা আশা করছেন, লাদেনকে হত্যার মধ্যদিয়ে বিশ্বে সন্ত্রাস ও জঙ্গীবাদের মূলোৎপাটনে যে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, অচিরেই তা সম্পন্নের মধ্যদিয়ে বিশ্ব একটি শান্তিযোগ্য বাসস্থানে পরিণত হবে।
এ প্রসঙ্গে সাবেক রাষ্ট্রদূত ওয়ালিউর রহমান বলেন, 'প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সন্ত্রাসবিরোধী ভূমিকার কারণে বাংলাদেশ এখন সামনের কাতারে চলে এসেছে। তিনি চেষ্টা করছেন শুধু বাংলাদেশই নয়, দৰিণ এশিয়াকে সন্ত্রাসমুক্ত করতে। তাঁর এই উদ্যোগকে সফল করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সমর্থন নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে।'
২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর এই দিনটিতে চারটি আত্মঘাতী বিমান সুপরিকল্পিতভাবে আঘাত করেছিল যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনে। ওই আঘাতে ধূলিস্যাত হয়ে যায় নিউইয়র্ক শহরের ১১০তলা ভবনের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার। টুইন টাওয়ার নামের ওই ঐতিহ্যবাহী ভবনটি সন্ত্রাসীদের বিমান হামলায় সঙ্গে সঙ্গেই ধংসস্তুপে পরিণত হয়। যাকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্দের পর সবচেয়ে বড় হামলা হিসেবে অভিহিত করা হয়। এতে নিহত হয় দুই হাজার ৭৫২ জন। আহত হয় আরও কয়েক হাজার। সরাসরি এই হামলার দায়িত্ব কেউ স্বীকার না করলেও ধর্মভিত্তিক মৌলবাদী গ্রুপ আল কায়েদাকে এই হামলার জন্য দায়ী করা হয়। সেই থেকে আল কায়েদা প্রধান সৌদি বংশোদ্ভূত ওসামা বিন লাদেন যুক্তরাষ্ট্রের 'মোস্ট ওয়ান্টেড' তালিকার শীর্ষে উঠে আসে।
এই হামলার পর গত দশ বছরে বিশ্বে মৌলবাদী সন্ত্রাসী ও জঙ্গী হামলা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যায়। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে বিশ্বজুড়ে শুরম্ন হয় সন্ত্রাসের বিরম্নদ্ধে নতুন যুদ্ধ। সেই যুদ্ধে ইরাক ও আফগানিসত্মানে আক্রমণ হয়। দেশে দেশে চলে স্থানীয় ও আঞ্চলিক সন্ত্রাসী গ্রুপের বিরুদ্ধে অভিযান। কিন্তু তাতেও সন্ত্রাসী ও জঙ্গীবাদকে পৃথিবী থেকে উৎখাত করা যায়নি। বরং এই দশ বছরে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বেশ কয়েকটি বড় সন্ত্রাসী হামলা হয়েছে। ২০০২ সালের ১২ অক্টোবর ইন্দোনেশিয়ার বালিতে নাইট ক্লাবে বোমা হামলায় ২০০ নিহত হয়েছে। ২০০৩ সালের ১৭ আগস্ট বাগদাদে জাতিসংঘ সদর দফতরে বোমা হামলায় নিহত হয় ১৯ জন। ২০০৪ সালেল ১১ মার্চ স্পেনের মাদ্রিদে চারটি কমু্যটার ট্রেনে বোমা হামলায় নিহত হয় ১৯১ জন। ২০০৫ সালের ৭ জুলাই সেন্ট্রাল লণ্ডনে চারটি আত্মঘাতী বোমা হামলায় নিহত হয় ৫২ জন। একই বছর ২৩ জুলাই মিসরে তিনটি বোমা বিস্ফোরণে নিহত হয় ৮৮ জন। ২০০৭ সালের ১১ ডিসেম্বর আলজিরিয়ায় দুটি গাড়িবোমা বিস্ফোরণে ৩০ জন নিহত হয়। ২০০৮ সালের ২৬ নবেম্বর ভারতের মুম্বাই শহরে সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত হয় ১৬৬ জন। ২০১০ সালের ১১ জুলাই উগান্ডায় দুটি বোমা বিস্ফোরণে নিহত হয় ৭৪ জন।
সন্ত্রাসের বিরম্নদ্ধে অভিযানে সবচেয়ে বড় সফলতা এসেছে চলতি ২০১১ সালে। গত পহেলা মে বিশ্ববাসী ভয়ঙ্কর সন্ত্রাসী ওসামা বিন লাদেনের মৃতু্য সংবাদ শুনেছে। মার্কিন বাহিনীর এক সামরিক অভিযানে পাকিসত্মানের এ্যাবোটাবাদে নিহত হয়েছে আল কায়েদার প্রধান শীর্ষ সন্ত্রাসী বিন লাদেন। কিন্তু তারপরও জঙ্গী সন্ত্রাসী হামলার অবসান হয়নি। সর্বশেষ গত ৭ সেপ্টেম্বর দিলস্নীতে একটি হাসপাতালে বোমা হামলার ঘটনাই তার প্রমাণ।
বিশ্বজুড়ে মৌলবাদী সন্ত্রাসী গ্রম্নপের এই উত্থানে এক পর্যায়ে বাংলাদেশেও জঙ্গীবাদ আস্থানা গাড়ে। বিশেষ করে ২০০১ সাল থেকে ২০০৫ সাল পর্যনত্ম সময়ে বাংলাভাই নামক এক মৌলবাদী সন্ত্রাসীর নেতৃত্বে সারাদেশে জঙ্গীবাদ ছড়িয়ে পড়ে। নাইন ইলেভেনের পর বাংলাদেশেও চারটি বড় জঙ্গী হামলার ঘটনা ঘটে। এ সময়ে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার ওপর গ্রেনেড হামলা ও দেশের ৬৩ জেলায় একযোগে বোমা হামলার ঘটনায় অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের শানত্মিপ্রিয় মানুষ নিরাপত্তাহীনতায় উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে। শুধু তাই নয়, প্রতিবেশী দেশের বিচ্ছিন্নতাবাদী গ্রম্নপও তাদের সন্ত্রাসী হামলার কাজে বাংলাদেশকে ব্যবহারের সুযোগ পায়। ফলে দেশের ভেতর থেকেই দাবি ওঠে সন্ত্রাসী জঙ্গীবাদের বিরম্নদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের। সরকারও তৎপর হয়ে ওঠে সন্ত্রাসী কর্মকা- প্রতিরোধে। ফলে গ্রেফতার করা সম্ভব হয় বাংলাভাই নামক ভংঙ্কর সন্ত্রাসী গডফাদারকে। ইতোমধ্যে বিচারে তার ফাঁসি ও তা কার্যকর হয়েছে। কিন্তু বাংলাভাইয়ের মৃতু্যর পরও বাংলাদেশ সন্ত্রাস ও জঙ্গীবাদমুক্ত হয়নি। ফলে বর্তমান মহাজোট সরকার ৰমতায় এসে সাঁড়াশি অভিযান শুরম্ন করে জঙ্গীবাদের বিরম্নদ্ধে। ইসলামী জঙ্গী সংগঠনগুলো নিষিদ্ধসহ জঙ্গীদের গ্রেফতার করা হয়েছে। ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে প্রতিবেশী দেশগুলোর বিচ্ছিন্নতাবাদী গ্রম্নপগুলোর ঘাঁটিগুলো। মূলত সন্ত্রাসবাদের বিরম্নদ্ধে প্রতিশ্রম্নতি থেকেই বর্তমান সরকার জঙ্গীবাদ ও সন্ত্রাসের বিরম্নদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে হাতে হাত মিলিয়ে আনত্মর্জাতিক সন্ত্রাসবাদের বিরম্নদ্ধে কাজ করছে বাংলাদেশ। মুসলিম অধু্যষিত দেশগুলোর মধ্যে সন্ত্রাসের বিরম্নদ্ধে ভূমিকার ৰেত্রে বাংলাদেশ অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে। অভ্যনত্মরীণ সন্ত্রাস দমনে এক ধাপ এগিয়ে আছে এই দেশটি। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে হাতে হাত মিলিয়ে জঙ্গীবাদের বিরম্নদ্ধে একযোগে কাজ করছে। এ প্রসঙ্গে রাষ্ট্রদূত ওয়ালিউর রহমান বলেন, 'নাইন ইলেভেনের' পর বিশ্বে একটি বড় পরিবর্তন ঘটে গেছে। পরিবর্তন এসেছে যুদ্ধের থিওরিতে। এখন সন্ত্রাসের বিরম্নদ্ধে যুদ্ধ জোরদার হয়েছে। দৰিণ এশিয়ার মধ্যে পাকিসত্মানের অবস্থা খুব খারাপ। সেখানে তালেবানরা হামলা করছে। তাই বাংলাদেশকে সতর্ক থাকতে হবে যাতে জঙ্গী-সন্ত্রাসীরা বাংলাদেশের মাটি ব্যবহার করতে না পারে। সন্ত্রাসের বিরম্নদ্ধে আমাদের একত্রে কাজ করতে হবে।
তিনি বলেন, আমরা বরাবরই সন্ত্রাসবাদের বিরম্নদ্ধে। তবে 'নাইন ইলেভেনের' প্রভাব এখনও আছে। এজন্য আমাদের সতর্ক থাকতে হবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সন্ত্রাসবিরোধী ভূমিকার কারণে বাংলাদেশ এখন সামনের কাতারে চলে এসেছে। তিনি চেষ্টা করছেন শুধু বাংলাদেশই নয়, দৰিণ এশিয়াকে সন্ত্রাসমুক্ত করতে। তাঁর এই উদ্যোগকে সফল করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সমর্থন নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে।