মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
রবিবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০১১, ২৭ ভাদ্র ১৪১৮
কোন ঝুঁকি নেই খিলগাঁও ফ্লাইওভারে
হাল্কা যানের জন্য খুলে দেয়া হয়েছে ॥ বিশেষজ্ঞদের মত_ দৃশ্যত প্রকৌশলগত ত্রুটি নেই
স্টাফ রিপোর্টার ॥ ১৭ ঘণ্টা পর হাল্কা যানবাহন চলাচলের জন্য খুলে দেয়া হয়েছে রাজধানীর খিলগাঁও উড়ালসেতু (ফ্লাইওভার)। শনিবার বেলা একটার দিকে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শে ফ্লাইওভার দিয়ে যান চলাচল শুরু হয়। এদিকে পরিদর্শন শেষে বিশেষজ্ঞ দলের প্রাথমিক প্রতিবেদনে বলা হয়, সেতুতে দৃশ্যত প্রকৌশলগত কোন ত্রুটি এবং ঝুঁকি নেই। তাই আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। ভবিষ্যত সতর্কতার জন্য সর্বৰণিক মনিটরিং রাখতে হবে। যেটুকু সমস্যা হয়েছে তা নির্মাণ অভিজ্ঞতার অভাবে শুরুতেই হয়ে থাকতে পারে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞ কমিটি। এদিকে ডিসিসির দাবি উড়াল সেতুটি রৰণাবেৰণে কাজ করেছে তারা, কোন গাফিলতি নেই। তবে নির্মাণ প্রতিষ্ঠান ত্রুটির জন্য ডিসিসিকে দায়ী করে বলেছে, ভারি যানবাহন চলা ও নজরদারির অভাবেই সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দ্রুততম সময়ের মধ্যে ত্রুটির কারণ বের করে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়ার। এদিকে বিশেষজ্ঞ কমিটি জানিয়েছে, সড়ক দুর্ঘটনা এড়াতেই প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে দুই সপ্তাহ আগে থেকে মহাখালী ও খিলগাঁও ফ্লাইওভারে ভারি যানবাহন চলাচল বন্ধ রাখা হয়েছে। তবে ফ্লাইওভারগুলো ভারি যানবাহন চলাচলের উপযোগী বলে জানান বিশেষজ্ঞরা। চলমান ত্রুটি আরও বড় আকার ধারণ করে কি-না এ জন্য মনিটরিং চলবে।
শুক্রবার সন্ধ্যা থেকে ফ্লাইওভার দিয়ে সকল প্রকার যানবাহন চলাচল বন্ধ করায় রাত থেকে ওড়াল সেতুর দু'পাশে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। শনিবার সকাল থেকে তা আরও তীব্র আকার ধারণ করে। সেতুর একপাশে বাসাবো বৌদ্ধমন্দির পর্যন্ত ছিল গাড়ির দীর্ঘ বহর। অপর পাশে তা বিস্তৃত হয় মালিবাগ রেল গেট পর্যন্ত। অন্যদিকে শাহজাহানপুরের গাড়ির জটলা ছিল মালিবাগ মোড় পর্যন্ত। একেকটি সিগন্যালের জন্য আটকে থাকতে হয়েছে দীর্ঘ সময়। পথচারীসহ পরিবহন চালকরা জানিয়েছে, এক থেকে দেড় ঘণ্টা যানজটে আটকে থাকতে হয়েছে শনিবার সকাল থেকে।
তদন্ত কমিটির পরিদর্শন ॥ শনিবার দুপুর ১২টার দিকে ঘটনাস্থল পরিদর্শনে যান ফ্লাইওভারে ত্রুটির কারণ অনুসন্ধানে গঠিত পাঁচ সদস্যের তদন্ত দল। এ দলের সদস্য বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক মুনাজ আহমেদ নূর সাংবাদিকদের বলেন, দেবে যাওয়া স্থানটি অনেক আগে থেকেই এই অবস্থায় ছিল। প্রাথমিক তদনত্মে আতঙ্কিত হওয়ার মতো কিছু আমরা পাইনি। রক্ষাণাবেক্ষণে ত্রুটির কারণে এ সমস্যা হয়নি বলেও দাবি করেন তিনি। স্থানীয় প্রযুক্তিতে নির্মাণ করা হয়েছে বলে সেতুটি অনেক জায়গায় উঁচু-নিচু বলে জানান তিনি।
আপাতত হালকা যান চলাচলে ঝুঁকি নেই_ তদনত্ম দলের কাছ থেকে এমন সুপারিশ পাওয়ার পর ফ্লাইওভার খুলে দেয়ার ঘোষণা দেন ডিসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আবুল কালাম আজাদ। স্থানীয় সরকার ও প্রকৌশল অধিদফতরের (এলজিইডি) তত্ত্বাবধানে নির্মিত দেশের বৃহত্তম এই ফ্লাইওভার ২০০৫ সালের মার্চে চলাচলের জন্য খুলে দেয়া হয়। এর নকশা ও নির্মাণকাজ তত্ত্বাবধানেও ছিলেন স্থানীয় প্রকৌশলীরাই। ১ দশমিক ৯ কিলোমিটার দীর্ঘ এবং ১৪ মিটার প্রশসত্ম এই উড়াল সেতু নির্মাণে সব মিলিয়ে ব্যয় হয় ৮১ কোটি ৭৫ লাখ টাকা।
বিশেষজ্ঞ দলে ছিলেন ডিসিসির প্রধান প্রকৌশলী ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবুল হোসেন, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক আবদুল জব্বার খান ও অধ্যাপক ড. মুনাজ আহম্মেদ নূর, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতরের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (এলজিইডি) সৈয়দ মাহবুবুর রহমান, অধ্যাপক ড. মোয়াজ্জেম হোসেন, কর্নেল ডিএসএম মহিদুল ইসলাম, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতরের প্রাক্তন সিনিয়র টেকনিক্যাল এ্যাডভাইজার এএএম আঃ হামিদ, প্রকৌশলী মোঃ হায়দার আলী ও ডিসিসি-১ এর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (পুর) মোহাম্মদ আবুল হাসনাত।
এদিকে প্রকৌশলী অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরী মনে করেন, ত্রম্নটি যত সামান্যই হোক, দ্রম্নত এর কারণ খুঁজে বের করে পরবর্তী পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন। তিনি বলেন, ফ্লাইওভারের ভিত্তিতে (ফাউন্ডেশন) কোন ত্রম্নটি আছে কি-না এখনই তা খুঁজে বের করা দরকার। তা না হলে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এখনও পর্যনত্ম ঝুঁকি মনে না হলেও ঝুঁকি বিবেচনা করেই পরবর্তী পদক্ষেপ নিতে হবে। অবশ্য প্রকৌশলীদের দাবি, নকশায় কোন ঝামেলা নেই।
শুক্রবার রাতে ক্ষতিগ্রসত্ম অংশ পরিদর্শন করে স্থানীয় সরকার ও প্রকৌশল অধিদফতরের (এলজিইডি) প্রধান প্রকৌশলী ওয়াহিদুর রহমান বলেছেন, 'ভয়ের কিছু' তাঁরা পাননি।
ভারি যানবাহনের কারণে দেবে যাওয়ার দাবি সকালে ক্ষতিগ্রসত্ম ফ্লাইওভার পরিদর্শন করেন এর নির্মাণের সময় প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্বে থাকা প্রকৌশলী হায়দার আলী। এরপর তিনি সাংবাদিকদের বলেন, অতিরিক্ত ভারবাহী যান চলাচলের কারণেই রাজধানীর খিলগাঁও ফ্লাইওভারের একাংশ দেবে গেছে।
নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান 'ডেভেলপমেন্ট কনস্ট্রাকশনের' প্রধান প্রকৌশলী নুরম্নল আমীন বলেন, দীর্ঘদিন এ ফ্লাইওভারের নজরদারি করা হয়নি। চলাচলকারী যানবাহনের গতি নিয়ন্ত্রণের কথা বলা থাকলেও এখানে কোন নির্দেশনা নেই। ফ্লাইওভারের বিভিন্ন বাঁকে উচ্চগতি নিয়ে ভারি যানবাহন চলাচল ও দীর্ঘদিন অবহেলার কারণে এ ক্ষতি হয়েছে বলে মনে করেন তিনি।
তিনি বলেন, ২০০৫ সালে ঢাকা সিটি করপোরেশনের (ডিসিসি) কাছে হসত্মানত্মরের সময় আমরা বলে দিয়েছিলাম, ফ্লাইওভারে চলাচলকারী গাড়ির সর্বোচ্চ ওজন হবে ১০ টন। কিন্তু এর ওপর দিয়ে অতিরিক্ত ভারবহনকারী যান চলাচল করত নিয়মিত। লোহার রডবাহী একটি ট্রাকের ওজন ২৪ থেকে ২৭ টন পর্যনত্ম হয়ে থাকে জানিয়ে হায়দার আলী বলেন, এ ধরনের ট্রাক নিয়মিত এই ফ্লাইওভারের ওপর দিয়ে চলাচল করে।
উড়াল সেতুর পরামর্শক (সিনিয়র টেকনিক্যাল এ্যাডভাইজার) প্রকৌশলী আব্দুল হামিদ বলেন, সিটি করপোরেশনের অবহেলা এর মূল কারণ। মেরামত বা নজরদারি না করায় বেয়ারিং এ ধুলা জমে তা উপর-নিচ করতে না পারায় এ ঘটনা ঘটেছে।
ডিসিসির সংবাদ সম্মেলন খিলগাঁও ফ্লাইওভার নিয়ে কোন ধরনের ঝুঁকি নেই বলে দাবি করেছেন বিশেষজ্ঞরা। যে ত্রম্নটি ধরা পড়েছে তা নির্মাণ সময়ের। আর এটি অতি সামান্য ত্রম্নটিই। শনিবার রাজধানীর নগর ভবনে খিলগাঁও ফ্লাইওভার নিয়ে ঢাকা সিটি করপোরেশন (ডিসিসি) আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বিশেষজ্ঞরা এ দাবি জানান।
বিশেষজ্ঞরা আরও বলেন, কমিটি ফ্লাইওভার পরিদর্শন করেছে। এ সময় কোন ধরনের ত্রম্নটি পাওয়া যায়নি। ফ্লাইওভারটিতে যানবাহন চলতে পারবে। আর ভারি যানবাহন চলতে না দেয়ার কথা বিশেষজ্ঞরা বলেননি। এটি উচ্চপর্যায়ের সিদ্ধানত্ম। একই সিদ্ধানত্মে অন্য ফ্লাইওভারগুলোতেও ভারি যানবাহন চলতে দেয়া হয় না।
সংবাদ সম্মেলনে ফ্লাইওভার দেবে যাওয়া নিয়ে ডিসিসির গঠিত কারিগরি কমিটির সদস্য বুয়েটের অধ্যাপক মুনাজ আহমেদ নুর বলেন, আমরা কারিগরি কমিটির সদস্যরা পরিদর্শন করে প্রাথমিকভাবে কোন সমস্যা নেই বলে মনে করছি। রক্ষণাবেক্ষণজনিত কোন ত্রম্নটিও নেই। যদি তা থাকত তাহলে বড় ধরনের সমস্যা হতো।
তিনি আরও বলেন, পরিদর্শন শেষে আমরা ফ্লাইওভারটির ঐ অংশকে ডিসিসিকে পর্যবেক্ষণে রাখতে বলেছি। যদি পর্যবেক্ষণের সময় কোন ত্রম্নটি না বাড়ে তাহলে ফ্লাইওভারটির কোন সংষ্কারেরও প্রয়োজন নেই। আর যদি ত্রম্নটি বাড়ে, তবে তা মেরামতের জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি আমাদের রয়েছে। তাঁর ভাষায় এটি একটি ফিনিশিংজনিত ত্রম্নটি। উন্নত বিশ্বেও এ ধরনের স্থাপনার শতভাগ ফিনিশিং হয় না বলে দাবি করেন তিনি।
ফ্লাইওভারটিতে ভারি যানবাহন চলতে না দেয়ার সিদ্ধানত্ম প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এটি উচ্চপর্যায়ের সিদ্ধানত্ম। এটি আমাদের সিদ্ধানত্ম নয়। আসলে ভারি যানবাহনগুলো তাদের ধারণ ক্ষমতার অনেক বেশি ওজন তুলে চলাফেরা করে। এতে দুর্ঘটনা ঘটার পাশাপাশি ফ্লাইওভারটিও ক্ষতিগ্রসত্ম হতে পারে। মূলত সড়ক দুর্ঘটনা রোধেই ফ্লাইওভার দিয়ে ভারি যানবাহন চলতে দেয়া হচ্ছে না। তিনি বলেন, সব ফ্লাইওভারে ভারি যানবাহন পার্কিং থাকলেও কোন সমস্যা হওয়ার কথা নয়। কারণ সেতুগুলোর নকশা এভাবেই তৈরি করা হয়েছে। সমস্যা না থাকায় জনস্বার্থে যানবাহন চলাচলে সেতুটি উন্মুক্ত করে দেয়া হয়েছে। পর্যবেৰণ চলবে। সমস্যা বাড়লে কিংবা নতুন করে অন্য কোন সমস্যা দেখা দিলে পরবর্তীতে তা দেখা যাবে।
ডিসিসি মেয়র সাদেক হোসেন খোকা বলেন, ফ্লাইওভার নির্মাণের পরবর্তী এক বছর দেখভাল করেছে এলজিইডি। আমাদের দেয়ার পর থেকে আমরা নিয়মিত দেখভাল করছি। এক প্রশ্নের জবাবে খোকা বলেন, আমরা নিয়মিতই ফ্লাইওভারটি রৰণাবেৰণে কাজ করে যাচ্ছি। ফ্লাইওভারের উপরে নিয়মিত বাতি লাগানো ও নষ্ট হওয়া ল্যাম্প পোস্ট সংস্কার করা হচ্ছে। দীর্ঘ সময়ে ফ্লাইওভারের এই ত্রম্নটি কেন চোখে পড়েনি? জবাবে খোকা বলেন, প্রকৌশলীরা সাংবাদিকদের মতো ঘুরে বেড়ায় না। তাঁরা দাফতরিক কাজ করেন। সংবাদ সম্মেলনে কারিগরি কমিটির সদস্যসহ ডিসিসির উচ্চপর্যায়ের কর্তাব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।
সংবাদ সম্মেলনে কারিগরি কমিটির দেয়া প্রাথমিক প্রতিবেদন সাংবাদিকদের হাতে তুলে দেয়া হয়। আর এ বিষয়গুলোই ওই প্রতিবেদনে স্থান পেয়েছে। শুক্রবার রাতে রাজধানীর খিলগাঁও ফ্লাইওভারের একাংশ দেবে যায়। এ ঘটনার পর ফ্লাইওভারটিতে সব ধরনের যানবাহন চলাচল বন্ধ করে দিয়েছেল পুলিশ। ওই ঘটনার ব্যাপারে কারিগরি কমিটি গঠন করা হয়। প্রাথমিক প্রতিবেদনে কারিগরি কমিটি ভবিষ্যতে সতর্কতা অবলম্বনের লক্ষে ত্রুটির বিষয়টি সর্বৰণিক মনিটরিং করার পরামর্শ দিয়েছে।