মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
বুধবার, ২৯ জুন ২০১১, ১৫ আষাঢ় ১৪১৮
টিআইবির সংসদ পর্যালোচনা ॥ '৯১-এ সংসদ বর্জন ছিল ৩৪ শতাংশ বর্তমানে ৭৫ শতাংশ
০ বিরোধীদলীয় নেত্রী মাত্র ৫ দিন উপস্থিত ছিলেন
০ দু'বছরে সবদিন উপস্থিত ছিলেন নীলফামারী-৪ আসনের মারুফ সাকলান
স্টাফ রিপোর্টার ॥ সংসদীয় গণতন্ত্র চর্চায় প্রধান বিরোধী দল ও জোটের সংসদ বর্জনের হার উদ্বেগ জনকহারে বাড়ছে। বর্তমান নবম সংসদের সপ্তম অধিবেশন পর্যন্ত বিরোধীদলীয় জোট ইতোমধ্যে মোট কার্যদিবসের ৭৪ শতাংশ বর্জন করেছে। ১৯৯১ সালের পঞ্চম সংসদে মোট কার্যদিবসের শতকরা ৩৪ ভাগ বর্জন করে প্রধান বিরোধী দল। '৯৬ সালে ৭ম এবং ২০০১ সালে ৮ম সংসদে তা যথাক্রমে দাঁড়ায় ৪৩ ও ৬০ শতাংশে। নবম সংসদের প্রধান বিরোধী দল ১৩৫টি কার্য দিবসের মধ্যে ১২২ কার্যদিবসই সংসদে অনুপস্থিত ছিল, যা সংসদের মোট ব্যয়িত সময়ের ৮৩ ভাগ। অন্যদিকে সংসদ বর্জন রীতির সঙ্গে কোরাম সঙ্কটও অব্যাহতভাবে বাড়ছে বলে টিআইবির এক গবেষণা প্রতিবেদনে উলেস্নখ করা হয়েছে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য সংসদে অনুপস্থিতির জন্য সদস্যপদ বাতিলের সময় ৯০ কার্যদিবস থেকে কমিয়ে ৩০ কার্যদিবস করার সুপারিশ করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। একইসঙ্গে সংসদ সদস্য আচরণ বিল ২০১০ পাস এবং সদস্যদের স্বাধীনভাবে মত প্রকাশের সুযোগ করে দিতে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধনসহ ১৬ দফা সুপারিশ তুলে ধরে সংস্থাটি।
সোমবার টিআইবি পরিচালিত জাতীয় সংসদ কার্যক্রমের ওপর এক গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। জাতীয় প্রেসক্লাবে পার্লামেন্ট ওয়াচ শীর্ষক এ প্রতিবেদনে নবম সংসদের দ্বিতীয় থেকে সপ্তম অধিবেশন পর্যনত্ম টিআইবির পর্যবেক্ষণ তুলে ধরা হয়। নবম সংসদের প্রথম অধিবেশনের ওপর পর্যবেৰণমূলক প্রতিবেদন ২০০৯ সালের ৪ জুলাই প্রকাশ করা হয়। এছাড়া সংস্থা ২০০১ সাল থেকে অষ্টম সংসদের সর্বমোট ২৩টি অধিবেশনের ওপর বিভিন্ন পর্যায়ে ৬টি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এবারের প্রতিবেদনে দেখানো হয় ১৯৯১ সালের পঞ্চম সংসদের তুলনায় ২০০৯ সালের নবম সংসদের ৭ম অধিবেশন পর্যনত্ম প্রধান বিরোধী দল বা জোটের সংসদ বর্জনের হার উর্ধমুখী। সংসদ বর্জনে প্রতিষ্ঠানটির পৰ থেকে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলা হয় সংসদ বর্জনের প্রবণতা জাতীয় সংসদের কার্যকারিতা হারাচ্ছে। জাতীয় সংসদের কার্যকারিতার স্বার্থে অনতিবিলম্বে প্রধান বিরোধী দলকে সংসদে যোগদানের আহ্বান জানানো হয় টিআইবর পৰ থেকে।
টিআইবির সাবেক চেয়ারম্যান ও ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদ বলেন, জনগণের প্রতিনিধি হয়ে সংসদ সদস্যরা জাতীয় সংসদে যান না। কিন্তু সদস্যদের জানতে হবে তাদের দায়িত্ব কি। সংসদের গিয়েই তাদের জনগণের কথা তুলে ধরা উচিত। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বিরোধী দল সংসদের বাইরে এসে বাজেট পেশসহ বিভিন্ন দাবিদাওয়া গণমাধ্যমের কাছে তুলে ধরছে। বিরোধী দল বা সরকারী দল জনগণের সামনে তাদের কথা তুলে ধরতে পারে। এতে আমরা স্বাগত জানাই। কিন্তু এটা কখন সংসদে যাওয়ার বিকল্প হতে পারে না। তিনি বলেন, সংবিধানে বাধ্যবাধকতা থাকলেও আনত্মর্জাতিক চুক্তি সংসদে উত্থাপন করা হয় না। কোন সদস্যও চুক্তি উত্থাপনের কথা বলেন না। ফলে জনগণ অন্ধকারে থাকে এসব চুক্তির ব্যাপারে। টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারম্নজ্জামান বলেন, সংসদের প্রতি জনপ্রতিনিধিদের আগ্রহ অনেক কম। সংসদের বাইরেই তারা বেশি সময় দেন। সংসদ বর্জনের রাজনীতি বর্জন করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, সংসদীয় গণতন্ত্রে সরকার ও বিরোধী দলের সম্পূরকতা বিশ্বজনীন বৈশিষ্ট্য হলেও গত দু'দশক ধরে অব্যাহতভাবে প্রধান বিরোধী দলের সংসদ বর্জনের উর্ধমুখী প্রবণতা গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করার পথে প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়িয়েছে। টিআইবির ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান সুলতানা কামাল বলেন, রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে কোন জবাবদিহিতা বোধ নেই। দলীয় বা ব্যক্তিস্বার্থের তাড়নায় তারা এসব করছে। সরকারী দল বা বিরোধী দলের সবাই জনগণের প্রতিনিধি। জনগণের প্রতি দায়িত্ববোধ বা অঙ্গীকার থেকেই তাদের সংসদে যেতে হবে। এখানে কারও সংসদে যোগ দেয়ার আহ্বান জানানোর কিছু নেই। তিনি বলেন, আমরা সংসদকে কার্যকর দেখতে চাই। সংসদে উপস্থিত হয়ে পারস্পরিক আলোচনার ভিত্তিতেই সব সমস্যার সমাধান করা সম্ভব।
টিআইবির গবেষণা প্রতিবেদনে বাংলাদেশ বেতার কর্তৃক সম্প্রচারিত সংসদ কার্যক্রম, মনিটরপূর্বক তথ্য সংগ্রহ ছাড়াও সংসদীয় বুলেটিন, সরকারী গেজেটসহ সংবাদপত্রে প্রকাশিত বিভিন্ন তথ্যের গ্রন্থনা ও পর্যালোচনার মাধ্যমে নবম সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশন থেকে ৭ম অধিবেশন পর্যনত্ম পর্যবেৰণমূলক তথ্য সনি্নবেশিত করা হয়েছে। মোট ১০টি বিষয়ের ওপর পর্যবেৰণ করা হয়েছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে সদস্যদের উপস্থিতি, সংসদ বর্জন ও কোরাম সঙ্কট, আইন প্রণয়ন সংক্রানত্ম কার্যাবলী, জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠায় সংসদীয় স্থায়ী কমিটির ভূমিকা, প্রশ্নোত্তর পর্ব ও জনগুরম্নত্বপূর্ণ নোটিসের ওপর আলোচনা, বাজেট আলোচনা, রাষ্ট্রপ্রতির ভাষণের ওপর আলোচনা, সংসদে নারী সদস্যদের অংশগ্রহণ, স্পীকারের ভূমিক, অনির্ধারিত আলোচনা ও অপ্রাষঙ্গিক বিষয়।
প্রতিবেদনে দেখানো হয়েছে কোরাম সঙ্কটের কারণেও সংসদে অধিবেশন বিলম্বিত হচ্ছে। কোরাম সঙ্কটের কারণে অধিবেশন চলাকালে দৈনিক গড়ে ৩৩ মিনিট ৰতি হয়। নবম সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশন থেকে সপ্তম অধিবেশন পর্যনত্ম মোট ৭৪ ঘণ্টা ১৫ মিনিট কোরাম সঙ্কটের কারণে ব্যয় হয়েছে। যার আর্থিক মূল্য দাঁড়ায় প্রায় ১৯ কোটি টাকার মতো। সংসদীয় স্থায়ী কমিটির ভূমিকায়ও তেমন সফলতা নেই। প্রতিবেদনে উলেস্নখ করা হয়েছে, ৩৭টি স্থায়ী কমিটির মধ্যে কেবল ১১টি কার্যপ্রনালী বিধি অনুযায়ি বৈঠক করতে সমর্থ হয়েছে। তিনটি স্থায়ী কমিটির কোন বৈঠকই হয়নি। কয়েকটি কমিটির সদস্যদের সম্পর্কে ব্যক্তিগত স্বার্থসংশিস্নষ্টতার অভিযোগ এসেছে। সংসদে অপ্রাষঙ্গিক বিষয়ের অবতারণা অব্যাহত রয়েছে। দলীয় প্রশংসা ও প্রতিপৰের সমালোচনায় বেশি সময় ব্যয় করেছে। ফলে স্পীকারকে ৪৬ বার মাইক বন্ধ করতে হয়েছে। এছাড়া সতর্ক করা হয়েছে ৭৬৬ বার।
দ্বিতীয় অধিবেশন থেকে সপ্তম অধিবেশন পর্যনত্ম চারটি অধিবেশন বিরোধী দল পুরোপুরি বর্জন করে। প্রথম অধিবেশনের পর ৬৪ কার্যদিবস অনুপস্থিত থাকার পর চতুর্থ অধিবেশনে বিরোধী দল যোগ দেয়। এ সংসদে সরকারী দলের সদস্যদের উপস্থিতির হার ১৯ ভাগ থেকে শতভাগ পর্যনত্ম রয়েছে। কিন্তু বিরোধীদলীয় সদস্যদের হার ৩ থেকে ২৬ ভাগ পর্যনত্ম। সংসদ নেতার উপস্থিতি ৭২.৪ ভাগ (১২৬ দিন)। অপরদিকে এই সংসদে বিরোধী নেতার উপস্থিতির হার মাত্র ২.৯ ভাগ (৫ কার্যদিবস)। অষ্টম সংসদে এ হার ছিল ১২ ভাগ। প্রথম দু বছরে সব কার্যদিবসে উপস্থিত ছিলেন মাত্র একজন। নীলফামারী-৪ আসনের এমপির এএ মারম্নফ সাকলান। এরপরেই একমাত্র স্বতন্ত্র সদস্য মোহাম্মদ ফজলুল আজিমের সক্রিয় উপস্থিতি রয়েছে (৬৮ ভাগ)। তবে প্রধানমন্ত্রীর প্রশ্নোত্তর দিবসে সদস্যদের উপস্থিতির হার বেশি। আর বেসরকারী দিবসে সদস্যদের উপস্থিতির হার সবচেয়ে কম লৰ্য করা গেছে।
প্রতিবেদনে উলেস্নখ করা হয়েছে, বিরোধীদলীয় নেতা কার্যোপদেষ্টা কমিটির বৈঠকে একদিনও উপস্থিত ছিলেন না। আইন প্রণয়নে নারীর অংশগ্রহণ ছিল ১৭.২০ শতাংশ। আইন প্রণয়নে ব্যয়িত সময়ের প্রায় ৭ শতাংশ সময় পেয়েছে নারী সদস্যরা। নারী সদস্যদের জন্য সময় বৃদ্ধির আবেদন জানানো হয়েছে টিআইবির পৰ থেকে।
বিরোধীদলের ২শ' ৪৫টি মুলতবি প্রসত্মাবের একটিও গৃহীত হয়নি। এর মধ্যে ৩৫টি নোটিস বিধিসম্মত না হওয়ায় স্পীকার বাতিল করেছেন। বাকিগুলো নোটিসদাতার অনুপস্থিতির কারণে বাতিল করা হয়। ৬টি কারণে বিরোধী দলের সংসদ থেকে ওয়াকআউট দেখানো হয়েছে। এর মধ্যে সরকারী দলের অসৌজন্যমূলক বক্তব্যের কারণে ৫০ শতাংশ ওয়াকআউট করেছে বলে উলেস্নখ করা হয়েছে। সপ্তম অধিবেশন পর্যনত্ম মোট বিল পাস হয়েছে ৯৮টি। প্রায় ৩৭ ঘণ্টা আলোচনার পর ১শ' ৩৫টি কার্যদিবসে এ বিল পাস হয়। আইন প্রণয়নে মোট ব্যয়িত সময়ের প্রায় এক-চতুর্থাংশ সময় ব্যয়িত হয় বিলের ওপর আপত্তি এবং সংশোধনী বিষয়ক বক্তব্যে। আইন প্রণয়নে বিরোধী দল ১২ কার্যদিবসে প্রায় ৫ ঘণ্টা আলোচনায় অংশ নিলেও অনুপস্থিতির কারণে তাদের দেয়া সংশোধনী প্রসত্মাব উত্থাপিত হয়নি।