মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
বুধবার, ২৯ জুন ২০১১, ১৫ আষাঢ় ১৪১৮
অর্থ সংস্থান নেই অথচ একের পর এক প্রকল্প পাস
রাজনৈতিক চাপের মুখে দিশেহারা পরিকল্পনা কমিশন
হামিদ-উজ-জামান মামুন ভয়াবহ অর্থ সঙ্কটে পড়ছে উন্নয়ন প্রকল্প। ইতোমধ্যেই অনুমোদন দেয়া কিছু প্রকল্পে অর্থের সংস্থান ছাড়াই পাস করা হয়েছে আগামী অর্থবছরের নতুন বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচী (এডিপি)। তার ওপর এখনও জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় একের পর এক অনুমোদন দেয়া হচ্ছে নতুন নতুন প্রকল্প। বর্তমান সরকারের মেয়াদকালের মধ্যবর্তী সময় হওয়ায় ব্যাপকহারে প্রকল্প প্রবাহ বেড়েছে পরিকল্পনা কমিশনে। এগুলো অনুমোদন দেয়ার ৰেত্রে রাজনৈতিক চাপের কারণে দিশেহারা হয়ে পড়েছে কমিশন। এর মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রম্নত বিশেষ প্রকল্পও রয়েছে। ফলে বাধ্য হয়েই নিয়মের বাইরে এসে উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদন করতে গিয়ে পরিকল্পনা কমিশনের শৃঙ্খলা ভেঙ্গে পড়েছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা জানান, সরকারের এ সময়ে এসে এ রকম অর্থ সঙ্কট আগে কখনও হয়েছে বলে মনে হয় না। এদিকে বিভিন্ন প্রকল্পভুক্ত ঠিকাদারদের পাওনা কাজের বিলের কাগজ জমা হচ্ছে। সেগুলো পরিশোধেরও কোন পথ খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।
পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে, ফলাফল নির্ণয় ও পর্যালোচনা না করেই আগামী অর্থবছরের (২০১১-১২) নতুন বাজেটে মধ্যমেয়াদী বাজেট কাঠামোর (এমটিবিএফ) আওতায় নিয়ে আসা হয়েছে সবগুলো মন্ত্রণালয় ও বিভাগকে। এর আগে চলতি অর্থবছরে (২০১০-১১) ৩৩টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগ এর আওতায় আনা হয়। এমটিবিএফের মূল কথা হচ্ছে আগে বাজেটে ১ বছরের জন্য মন্ত্রণালয়গুলোকে অর্থ বরাদ্দ দেয়া হতো। এখন ১ বছরের অর্থ বরাদ্দ দেয়ার পাশাপাশি আগামী ৫ বছরের জন্য একটি আর্থিক প্রৰেপণ দেয়া আছে, আগে বাজেটে সরকারের নীতি আদর্শের মিল রেখে বাজেট করা কষ্টকর ছিল এখন সরকারের নীতি আদর্শের সঙ্গে সম্পদের এবং সম্পদের সঙ্গে পরিকল্পনার সংযোগ ঘটানো হচ্ছে, মন্ত্রণালয়গুলো স্বাধীন হবে এবং নিজেরাই নিজেদের উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করতে পারবে, আগে কেন্দ্রীয়ভাবে বাজেট তৈরি করা হতো আর অফিসাররা স্বাৰর করতেন। এখন বাজেট তৈরির প্রক্রিয়া ওপর থেকে নিচে এবং নিচে থেকে আবার ওপরে আসবে ফলে সবার অংশগ্রহণ থাকবে। কিন্তু এমটিবিএফের নির্ধারিত সীমা মানছে না কোন মন্ত্রণালয়ই। এমটিবিএফকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে ইচ্ছে মতো প্রকল্প তৈরি করে তা একনেকে অনুমোদন প্রক্রিয়া শেষ করতে প্রসত্মাব পাঠানো হচ্ছে পরিকল্পনা কমিশনে। শুধু প্রসত্মাব পাঠিয়েই ৰানত্ম থাকছে না। এ প্রকল্পগুলো বাধ্যতামূলক পাস করাতে মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, সচিব ও সংসদ সদস্যসহ বিভিন্ন পর্যায় থেকে চাপ অব্যাহত থাকছে। যার কারণেই উন্নয়ন প্রকল্প বাসত্মবায়নে ভয়াবহ অর্থ সঙ্কট সৃষ্টি হচ্ছে। পাশাপাশি বহুল আলেচিত এই এমটিবিএফের ফল পাওয়া যাচ্ছে না। ব্যাহত হচ্ছে এর মূল উদ্দেশ্য।
সূত্র জানায়, এমটিবিএফের আওতায় পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের ৰেত্রে যে অর্থের সীমা বেঁধে দেয়া হয়েছে তার চেয়ে অতিরিক্ত ১২ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প ইতোমধ্যেই একনেকে অনুমোদন করিয়ে নেয়া হয়েছে। গত ৩ মের হিসাব অনুযায়ী এ তথ্য পাওয়া গেলেও এরপর আরও কিছু প্রকল্প অনুমোদন এবং অনুমোদন প্রক্রিয়ার জন্য পরিকল্পনা কমিশনে প্রসত্মাব করা হয়েছে। শুধু পানিসম্পদ মন্ত্রণালই নয় এ রকমভাবে অর্থের নির্ধারিত সীমা কমবেশি প্রায় প্রতিটি মন্ত্রণালয় অতিক্রম করেছে। ফলে অনুমোদন হওয়া কোন কোন প্রকল্পের বাসত্মবায়নকাল শুরম্ন হয়ে গেলেও কাজ শুরম্ন করা যাচ্ছে না। এ অবস্থা চলতে থাকলে বিলম্বে বাসত্মবায়নের কারণে প্রকল্পের সময় ও ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
অথচ পরিকল্পনা কমিশনের প্রকল্প অনুমোদন সংক্রানত্ম পরিপত্রে বলা হয়েছে, যে প্রকল্পের বিপরীতে অর্থের সংস্থান থাকবে শুধু সেই প্রকল্প অনুমোদন দেয়া হবে। কিন্তু প্রবল রাজনৈতিক চাপের কারণে পরিকল্পনা কমিশনের পৰে এ নিয়ম মানা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে কমিশনের প্রকল্প অনুমোদন সংক্রানত্ম শৃঙ্খলা ভেঙ্গে পড়েছে।
এভাবে প্রয়োজনীয় অর্থের যোগান দিতে না পারায় বহুল আলোচিত সরকারের অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত 'একটি বাড়ি একটি খামার' প্রকল্প বাসত্মবায়নে জটিলতার সৃষ্টি হয়। ফলে ১ হাজার ১০০ কোটি টাকার এ প্রকল্পটির ব্যয় বেড়েছে কয়েকগুণ। বর্তমানে পূর্বের ব্যয় বাড়িয়ে ৫ হাজার ৯শ' কোটি টাকা প্রাক্কলিত ব্যয় ধরে এবং বাসত্মবায়নের মেয়াদ বাড়িয়ে ২০১৩ সাল পর্যনত্ম করে সংশোধনের জন্য পরিকল্পনা কমিশনে প্রসত্মাব পাঠানো হয়েছে। ইতোমধ্যে এ প্রকল্পটির ওপর পরিকল্পনা কমিশনে প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। অথচ এমটিবিএফের আওতায় এ প্রকল্পের জন্য কোন অর্থই বরাদ্দ নেই। অর্থের সংস্থান ছাড়াই এটি একনেকের যে কোন সভায় সংশোধনী আকারে অনুমোদন দেয়া হবে।
অপরদিকে হাইমচর ও চাঁদপুরে মেঘনা নদীর ভাঙ্গন প্রতিরোধ প্রকল্পের ৰেত্রে দেখা গেছে_ ইতোমধ্যেই এ প্রকল্পটি বাসত্মবায়নে নিয়োগপ্রাপ্ত ঠিকাদার ১৬০ কোটি টাকা ব্যয় করে ফেলেছে এবং ব্যয়িত অর্থের বিলের কাগজ পরিকল্পনা কমিশনে জমা দেয়া হয়েছে। কিন্তু চলতি বছরের জুন পর্যনত্ম এ প্রকল্পের বিপরীতে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে মাত্র ৭০ কোটি টাকা। এই পরিমাণ অর্থ সম্পূর্ণ ঠিকাদারের বিল পরিশোধে ব্যয় করা হলেও বাকি ৯০ কোটি টাকা কোথা থেকে আসবে এ বিষয়ে কেউই জানেন না। এ রকম বহু প্রকল্পে টাকার অভাবে ঠিকাদাররা কাজ করতে পারছেন না। অনেক প্রকল্পের কাজও মাঝপথে বন্ধ রয়েছে।