মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
বুধবার, ২৯ জুন ২০১১, ১৫ আষাঢ় ১৪১৮
অটোরিক্সা চালকের হাতে জিম্মি যাত্রী ॥ সর্বনিম্ন ভাড়া এক শ' টাকা
৩ জুলাইয়ের ধর্মঘট প্রত্যাহার
রাজন ভট্টাচার্য ॥ অটোরিক্সা যেন সোনার হরিণ। ভাড়ার ৰেত্রেও চালকদের হাতে জিম্মি যাত্রীরা। সর্বনিম্ন ভাড়া এখন ১০০ থেকে ১৫০ টাকা। এর ফলে মধ্যবিত্তের নাগালের বাইরে চলে গেছে এই পরিবহনটি। সরকার নির্ধারিত ভাড়া মেনে চলতে অটোরিক্সা মালিক শ্রমিকদের প্রতি যোগাযোগ মন্ত্রণালয় আহ্বান জানালেও তা পাত্তা দিচ্ছেন না কেউ। এ ব্যাপারে অটোরিকক্সা মালিক ও চালকদের পরস্পরবিরোধী বক্তব্য রয়েছে। এদিকে সরকার নির্ধারিত জমার অতিরিক্তি অর্থ আদায় করায় ৯০ গ্যারেজ মালিকের বিরম্নদ্ধে যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ে অভিযোগ করা হলেও এ ব্যাপারে কোন পদৰেপ নেয়া হচ্ছে না। মালিকরা বলছেন, চালকরা বাড়তি ভাড়া নিলে মালিকপৰ থেকে করণীয় কিছু নেই। চালকদের বক্তব্য একদিকে সরকার নির্ধারিত জমার চেয়ে বেশি আদায় করছেন মালিকরা, পরিচালনা ব্যয় বেড়েছে আগের চেয়ে বেশি। এই প্রেৰাপটে ভাড়া পুনর্নির্ধারণের বিকল্প নেই। মালিকপৰ বলছে মিটারে ভাড়া পুনর্নির্ধারণ করা হলে জমা বাড়াতে হবে। এদিকে এই সেক্টরে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে গত চার মাসে দুই হাজার চালককে কারাদ-সহ সাড়ে আট হাজার চালককে অর্থদ- করা হলেও পরিস্থিতির দৃশ্যমান কোন উন্নতি হয়নি। এই প্রেৰাপটে অটোরিঙ্া সেক্টরে অরাজকতা বন্ধে দায় নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে?
সিএনজি গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির পর অটোরিঙ্ার ৰেত্রে নতুন ভাড়া নির্ধারণ করে সরকার। মালিক, চালকসহ শ্রমিকদের পৰ থেকে আনুষ্ঠানিক ভাবে সরকারী এই সিদ্ধানত্মের বিরোধিতা করা হয়েছে। এমনকি বেশ কয়েকটি সংগঠন সরকারী সিদ্ধানত্ম সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে। এর প্রেৰিতে বিআরটিএ ও জেলা প্রশাসনের পৰ থেকে লোক দেখানো কয়েকদিন অভিযান করা ছাড়া আর কিছুই হয়নি। সূত্রে জানা গেছে, অটোরিঙ্ার নৈরাজ্য রোধে গত ৩ মার্চ যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধানত্মের আলোকে অভিযান চালানো হয়। অভিযানে চালকদের অর্থদ-সহ জেল দেয়া হলেও পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। অতিরিক্ত জমা নেয়ার অভিযোগে চারটি গ্যারেজ সিলিগালা করে বিআরটিএ। মজার বিষয় হলো সিলগালা করার পাঁচ দিন পরই এসব গ্যারেজ ফের খুলে দেয়া হয়। পরবতর্ীতে জমার পরিমাণ আরেক দফা বাড়িয়ে সাড়ে ৭০০ টাকা করা হয়। এদিকে নানা অনিয়মের বেড়াজালের মুখেও আগামী তিন জুলাই থেকে যৌথভাবে লাগাতার অটোরিঙ্া ধর্মঘটের ঘোষণা দিয়েছিল দুটি শ্রমিক ইউনিয়ন। মঙ্গলবার যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ে এক বৈঠকের পর তারা অবশ্য ধর্মঘট প্রত্যাহারের সিদ্ধানত্ম নিয়েছে। দাবি জানানো হলেও সিএনজি চালিত অটোরিঙ্ার ভাড়া আর না বাড়ানোর সিদ্ধানত্ম নিয়েছে সরকার। যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ে বৈঠকের পর সড়ক বিভাগের সচিব মোজাম্মেল হক খান সাংবাদিকদের জানান, ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরীতে চলাচলরত সিএনজি অটোরিঙ্ার ভাড়া ও দৈনিক জমা বাড়ানোসহ নানা দাবি নিয়ে মালিক ও শ্রমিক সংগঠনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে সরকারের বৈঠক হয়েছে। ভাড়া বাড়ানোর দাবিতে আগামী ৩ জুলাই থেকে ধর্মঘটের ডাক দিয়েছিল মালিক-শ্রমিকরা। সভায় ফলপ্রসূ আলোচনা হওয়ায় ওই ধর্মঘট দুই পক্ষই প্রত্যাহারে রাজি হয়েছে।
সম্প্রতি সরকার প্রতি ঘনমিটার সিএনজির দাম ৯ টাকা বাড়িয়ে ২৫ টাকা করে। এরপর গত ১৯ মে অটোরিঙ্ার ভাড়া প্রতি কিলোমিটারে ৫০ পয়সা বাড়ানো হয়। তবে সিএনজি মালিক-শ্রমিকরা এ হার আরও বাড়ানোর দাবি জানিয়ে আসছিল। সরকার দৈনিক জমা ৬০০ টাকা করলেও তা আরও বাড়ানোর দাবি জানিয়ে আসছিল মালিকরা। শ্রমিকদের অভিযোগ, মালিকরা নির্ধারিত হারের বেশি টাকা নেন। সচিব বলেন, চালকদের কাছ থেকে দৈনিক জমা ৬০০ টাকার বেশি নিলে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। মালিকপক্ষের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সিএনজি চালিত অটোরিঙ্ার 'ইকোনমিক লাইফ' ২ বছর বাড়ানোর বিষয়ে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের সুপারিশ বাসত্মবায়ন করা হবে। সিএনজি চালিত অটোরিঙ্ার ইকোনমিক লাইফ বা চালু রাখার মেয়াদ নয় বছর পর্যনত্ম ছিল। এ সিদ্ধানত্মের ফলে তা ১১ বছর পর্যনত্ম হবে। দৈনিক জমা ৬০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৭৫০ টাকা, ইকোনমিক লাইফের বিষয়ে সুপারিশ বাসত্মবায়ন, পুলিশের চাঁদাবাজি বন্ধ, বিআরটিএ'র হয়রানি বন্ধ করাসহ ৯ দফা দাবিতে ৩ জুলাই থেকে ৪৮ ঘণ্টা ধর্মঘটের ডাক দেয় মালিকরা। ঢাকা মহানগর সিএনজি অটোরিঙ্া মালিক সমিতির সভাপতি বরকত উলস্নাহ ভুলু বৈঠকের পর সাংবাদিকদের জানান, দৈনিক জমা না বাড়লেও অন্য দাবিগুলো মেনে নেয়ায় তারা সন্তুষ্ট। শ্রমিকরা ১০ দফা দাবিতে লাগাতার ধর্মঘটের ডাক দিয়েছিল। তাদের দাবির মধ্যে ছিল- বাস/মিনিবাসের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে ভাড়ার হার পুর্নির্নর্ধারণ, মিটার টেম্পারিংরোধে বিএসটিআইয়ের মাধ্যমে সিলগালার ব্যবস্থা করা, অতিরিক্ত জমা আদায়কারী মালিকদের বিরম্নদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া, সহজ শর্তে ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রদান, পুলিশের হয়রানি বন্ধ ইত্যাদি। ভাড়া না বাড়লেও অন্য দাবিতে সাড়া মেলায় সনত্মোষ প্রকাশ করেন ঢাকা জেলা অটোরিকশা শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক মোঃ জাকির হোসেন।
অটোরিঙ্ার সংখ্যা আসলে কত ॥ বিআরটিএ'র তথ্য অনুযায়ী রাজধানীতে রেজিস্ট্রেশনপ্রাপ্ত অটোরিঙ্ার সংখ্যা ১৬ হাজারের বেশি। তবে অটোরিঙ্া মালিক ও শ্রমিক নেতৃবৃন্দ বলছেন, রাজধানীতে ভাড়ায় চলাচলের জন্য রেজিস্ট্রেশন আছে ১২ হাজার ৭১৫টি গাড়ির। এর মধ্যে প্রায় এক হাজার গাড়ি নষ্ট হওয়ার কারণে ধারাবাহিকভাবে বন্ধ থাকে। সরকারী নিয়ম অনুযায়ী ১০ বছর মেয়াদ উত্তীর্ণ হওয়ায় গত বছর ৬৪টি অটোরিঙ্া বন্ধ হয়ে গেছে। চলতি বছর ৩১ ডিসেম্বরের পর বন্ধ হবে আরও ৪ হাজার অটোরিঙ্া। এই প্রেৰাপটে অটোরিঙ্ার সঙ্কট আরও বাড়বে। পরিবহন মালিকদের অভিযোগ প্রাইভেটের নামে মিটার ছাড়া গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জের প্রায় দুই হাজার অটোরিঙ্া রাজধানীতে চলছে সার্জেন্টদের টোকেন নিয়ে। এছাড়াও পাশর্্ববতর্ী জেলা নারায়নগজ্ঞের অটোরিঙ্ার রং ঢাকার অটোরিঙ্ার সঙ্গে মিল থাকায় প্রতিদিন অনেক অটোরিঙ্া অবৈধভাবে রাজধানীতে প্রবেশ করছে। মালিক ও শ্রমিক ইউনিয়ন নেতাদের অভিযোগ নারায়ণগঞ্জ বিআরটিএ কর্মকর্তারা অবৈধভাবে দুই জেলার অটোরিঙ্ার রং এক করেছে। কিন্তু আইনে যা পুরোপুরি অবৈধ।
৯০ গ্যারেজ মালিকের বিরম্নদ্ধে অভিযোগ মন্ত্রণালয়ে ॥ নগরীতে অটোরিক্সা চালুর পর থেকেই চালকদের বিরম্নদ্ধে যাত্রীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়সহ অভিযোগের শেষ নেই। চালকদের অভিযোগ মালিকরা সরকার নির্ধারিত জমার চেয়ে অতিরিক্ত জমা নেয়ায় যাত্রীদের কাছ থেকে বেশি ভাড়া নিতে হচ্ছে। এ নিয়ে বিআরটিএ'র পৰ থেকে চালক ও মালিকদের বিরম্নদ্ধে কয়েকদফা অভিযান চালালেও কাজের কাজ কিছুই হয়নি।
সর্বশেষ গত ১৬ জানুয়ারি থেকে রাজধানীতে চলা সিএনজি চালিত অটোরিঙ্ার নতুন ভাড়া কার্যকর করেছে সরকার। পাশাপাশি অটোরিঙ্ার জমা ৬০০ টাকা নির্ধারণ করে দেয়া হয়। চালকদের অভিযোগ, মালিকরা দুই শিফটে ৯০০ থেকে এক হাজার ২০০ টাকা প্রতিদিন জমা আদায় করছেন। কিন্তু অধিকাংশ মালিক এ বিষয়টি অস্বীকার করায় অটোরিঙ্া শ্রমিক সংগঠনের পৰ থেকে অতিরিক্ত জমা আদায়কারী ৯০ গ্যারেজের তালিকা প্রস্তুত করে যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ে জমা দেয়া হয়। এর প্রেৰিতে সম্প্রতি রাজধানীর যাত্রাবাড়ী এলাকায় ৫টি গ্যারেজে অভিযান চালিয়ে অভিযোগের সত্যতা পায় বিআরটিএ ভ্রাম্যমাণ আদালত। অপরাধের প্রেৰিতে যাত্রাবাড়ী এলাকার জামায়াতের রোকন হাজী আবদুস সালামসহ ৫ গ্যারেজ মালিককে এক বছরের কারাদ-সহ প্রতিষ্ঠান সিলগালা করে দেয়া হয়। ২ দিন পর বিআরটিএ কর্মকর্তাদের সঙ্গে আপোস রফা করে দ-প্রাপ্তরা বেরিয়ে আসার অভিযোগ রয়েছে।