মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
শুক্রবার, ২৫ ফেব্রুয়ারী ২০১১, ১৩ ফাল্গুন ১৪১৭
পারমাণবিক বিদ্যুত কেন্দ্র নির্মাণে রাশিয়ার সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর
স্টাফ রিপোর্টার ॥ রূপপুর পারমাণবক বিদ্যুত কেন্দ্র নির্মাণের জন্য রাশিয়ান ফেডারেশনের সঙ্গে সরকার একটি চুক্তি অনুস্বাৰর করেছে। বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন মিলনায়তনে বিজ্ঞান তথ্য যোগাযোগ ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব মোঃ আব্দুর রব হাওলাদার এবং রাশিয়ান স্টেট এ্যাটোমিক এনার্জি কর্পোরেশন (রোসাট্রাম)-এর ডেপুটি ডিরেক্টর জেনারেল নিকোলী এসপাসকি নিজ নিজ সরকারের পৰে চুক্তিতে অনুস্বাৰর করেন। এপ্রিলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রাশিয়া সফরের সময় চূড়ানত্ম চুক্তি স্বাৰরিত হবে। চুক্তির আওতায় রাশিয়া সরকারের সহায়তায় রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুত প্রকল্প এলাকায় দু'টি পারমাণবিক বিদ্যুত কেন্দ্র নির্মাণ করবে। প্রতিটি কেন্দ্রের উৎপাদন ৰমতা হবে এক হাজার মেগাওয়াট। উভয় দেশের সরকারী পর্যায়ে চুক্তি অনুস্বাৰরের ফলে প্রকল্প বাসত্মবায়নের প্রয়োজনীয় অর্থসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হলো। চুক্তিতে বিদু্যত কেন্দ্র দু'টির আজীবন প্রয়োজনীয় জ্বালানি সরবরাহ এবং বর্জ্য রাশিয়া ফেরত নেয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। রূপপুর পারমাণবিক বিদু্যত কেন্দ্র পরিচালনা এবং রৰণাবেৰণের জন্য রাশিয়ান ফেডারেশন প্রয়োজনীয় দৰ জনবল সৃষ্টি করবে।
রূপপুর পারমাণবিক বিদু্যত কেন্দ্রের উপযুক্ত কতর্ৃপৰ (কমপিটেন্ট অথোরিটি) হিসেবে কাজ করবে বিজ্ঞান, তথ্য যোগাযোগ এবং প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং রোসাট্রাম। ঠিকাদার হিসেবে কাজ করবে জয়েন্ট 'স্টক কোম্পানি অব এটমস্ট্রয়এঙ্পার্ট।' বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন গ্রাহক হিসেবে কাজ করবে।
চুক্তি স্বাৰর অনুষ্ঠানে বিজ্ঞান, তথ্য যোগাযোগ এবং প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী ইয়াফেস ওসমান, বাংলাদেশে নিযুক্ত রাশিয়ান রাষ্ট্র দূত ড. গ্যান্নাডি পি. ট্রসনিকে পরমাণু শক্তি কমিশনের চেয়ারম্যান ড. ফরিদউদ্দিন আহমেদসহ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পরমাণু শক্তি কমিশন, রাশিয়ান ফেডারেশন সরকারের উর্ধতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। বুধবার চুক্তি অনুস্বাৰরের বিষয়ে সাত সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল ঢাকায় আসে। আজ শুক্রবার প্রতিনিধি দল রূপপুর পরিদর্শন করবে।
মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, আনুষঙ্গিক অন্যান্য প্রক্রিয়া শেষে ২০১২ সালে বিদু্যত কেন্দ্র নির্মাণ কাজ শুরম্ন হবে। এখান থেকে ২০১৭-২০১৮ সালে এক হাজার মেগাওয়াট বিদু্যত পাওয়া যাবে। দুই দেশের সরকারের মধ্যে চুক্তির পরে কেন্দ্রের অর্থায়ন সংগ্রহ করা হবে। রাশিয়া এ প্রকল্পে অর্থসংস্থানের প্রাথমিক আশ্বাস দিয়েছে বলে জানা গেছে।
বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও তথ্য যোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী ইয়াফেস ওসমান এ প্রসঙ্গে জনকণ্ঠকে বলেন, এতদিন রাশিয়া বাংলাদেশে একটি পারমাণবিক কেন্দ্র স্থাপনের বিষয়ে সম্মতি দিয়েছিল। কিন্তু এবারের চুক্তিতে রূপপুরেই কেন্দ্র নির্মাণের বিষয়টি অনত্মভর্ুক্ত হলো। তিনি বলেন, এ চুক্তির মাধ্যমে আমরা বিদু্যত কেন্দ্র নির্মাণের বিষয়ে একধাপ এগিয়ে যাব। এরপর আর্থিক দিক নিয়ে আলোচনা করা হবে। তবে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে প্রকল্পের ব্যয় দেড় থেকে দুই বিলিয়ন ডলারের বেশি হবে না। পরমাণু থেকে উৎপাদিত বিদু্যতের দাম নির্ধারণের জন্য পিডিবিকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। বিদু্যত কেন্দ্রে ৪০০ প্রকৌশলী কাজ করবেন। এদের আলাদাভাবে প্রশিৰণেরও প্রয়োজন হবে। রাশিয়াই এদের প্রশিৰণ দেবে। চূড়ানত্ম চুক্তির সকল বিষয় নিয়ে আগামী ২ মার্চ প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। রূপপুর পারমাণবিক বিদু্যত কেন্দ্র নির্মাণ পর্যবেৰণের জন্য প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে মন্ত্রিসভার জ্যেষ্ঠ সদস্যদের নিয়ে পৃথক একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
স্বাধীনতার আগে ১৯৬৬ সালে রূপপুরে পারমাণবিক বিদু্যত কেন্দ্র নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয়। কিন্তু সুদীর্ঘ সময় শুধু আলাপ-আলোচনা আর সমঝোতা স্মারকের মধ্যে বিষয়টি সীমাবদ্ধ ছিল। বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর পারমাণ বিক বিদু্যত কেন্দ্র নির্মাণের জন্য রাশিয়ার সঙ্গে পুনরায় আলোচনা শুরম্ন করে। রাশিয়ার সঙ্গে বিদু্যত কেন্দ্র স্থাপনের আইনগত ও কারিগরি বিভিন্ন বিষয়ে ইতোপূর্বে বাংলাদেশ সম্মত হয়েছে।
সরকার অগ্রাধিকার ভিত্তিতে প্রকল্পটি বাসত্মবায়নের সিদ্ধানত্ম নিয়েছে। বিদু্যত কেন্দ্র নির্মাণের জন্য ২০০৯ সালের ১৩ মে রোসাট্রামের সঙ্গে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন একটি সমঝোতা স্মারক স্বাৰর করে।
পরবর্তীতে গত বছরের ২১ মে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং বিজ্ঞান ও তথ্য যোগাযোগ প্রতিমন্ত্রীর রাশিয়া সফরের সময় বাংলাদেশে এবং রাশিয়ার মধ্যে আরও একটি প্রটোকল স্বাৰরিত হয়। এ ধারাবাহিকতায় গত বছরের সেপ্টেম্বরে চুলিস্ন স্থাপনের জন্য একটি চুক্তির খসড়া রাশিয়ায় পাঠানো হয়। নিরীক্ষিত খসড়ায় রাশিয়া পারমাণবিক চুলিস্নর বর্জ্য সে দেশে নিয়ে যাওয়ার জন্য বাংলাদেশের প্রসত্মাবে রাজি হয়। প্রকল্পের জীবনকাল ৮০ বছর পর্যনত্ম এ বর্জ্য রাশিয়ায় নিয়ে যাওয়া হবে। জানা যায়, প্রথমে এক হাজার মেগাওয়াট বিদু্যত উৎপাদনের রি-এক্টর স্থাপন করা হবে। পরবর্তী ধাপে রূপপুরেই আরও এক হাজার মেগাওয়াটের একটি রি-এক্টর বসানো হবে। প্রতিটিতে খরচ পড়বে দেড় মিলিয়ন ডলারের বেশি।
অন্যদিকে, চুলিস্ন স্থাপনে স্থান পরিদর্শনে আনত্মর্জাতিক এটমিক এনার্জি এজেন্সির (আইএইএ) মহাপরিচালকসহ আইএই ও রাশিয়ার কয়েকটি প্রতিনিধি দল গত বছরের বিভিন্ন সময় বাংলাদেশ ঘুরে গেছে। পরমাণু শক্তি কমিশনের সমীক্ষা অনুযায়ী, পারমাণবিক চুলিস্ন থেকে উৎপাদিত বিদু্যতের দাম গ্রাহক পর্যায়ে ইউনিটপ্রতি পড়বে ৬৩ পয়সা। ১৫ বছরের মধ্যে পস্ন্যান্টের ব্যয় উঠে আসবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
স্বল্পব্যয়ে বিদু্যত পাওয়া সম্ভব এজন্য উন্নয়নশীল প্রায় ৬০টি দেশ পারমাণবিক বিদু্যত কেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে। তবে সবচেয়ে বিপজ্জনক বিষয় হচ্ছে জ্বালানি বর্জ্য, যা মাটির অনেক গভীরে রাখতে হয়। রাশিয়া রূপপুর বিদু্যত কেন্দ্রের বর্জ্য নিয়ে যাওয়ার বিষয়ে সম্মতি দিয়েছে। রাশিয়া ইতোমধ্যে ভিয়েতনাম এবং মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশে পারমাণবিক বিদু্যত কেন্দ্র স্থাপনের চুক্তি করেছে।
অতীত উদ্যোগ ॥ ১৯৬১ সালে প্রকল্পটি শুরম্নর উদ্যোগ নেয়া হয়। তখন ঈশ্বরদী উপজেলার পদ্মা নদীর তীরে হার্ডিঞ্জ ব্রিজের প্রায় এক হাজার মিটার পূর্ব-দক্ষিণ কোণে এ প্রকল্প স্থাপনের সিদ্ধানত্ম হয়। এজন্য তৎকালীন সরকার ২৫৯ দশমিক ৯০ একর জমি অধিগ্রহণ করে। ওই সময় প্রকল্পের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের জন্য ৩৫ লাখ টাকায় কোয়ার্টার নির্মাণ করা হয়। সুদীর্ঘ সময়ে প্রায় ৪৯ বছরে প্রকল্পটি নিয়ে আলোচনা হয়েছে কানাডা, সুইডেন, নরওয়ে, রাশিয়া, ফ্র্রান্স, ব্রিটেন, জার্মানি, দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে। ১৯৬৩ সালে ৭০ মেগাওয়াট পারমাণবিক চুলিস্ন স্থাপনের সিদ্ধানত্ম হয়। ১৯৬৪ সালে কানাডা সরকারের সঙ্গে চুক্তির ব্যাপারে আলোচনা হয়। ১৯৬৬ সালে কানাডা, সুইডেন ও নরওয়ের সঙ্গে আলোচনা হয় ১৪০ মেগাওয়াট পারমাণবিক চুলিস্ন স্থাপনের। ১৯৭৩ সালে বঙ্গবন্ধু সরকার ২০০ মেগাওয়াট পারমাণবিক চুলিস্ন স্থাপনের জন্য রাশিয়ার সঙ্গে আলোচনা করে। তবে '৭৫-এ বঙ্গবন্ধু নিহত হওয়ার পর প্রকল্পটি আর এগোয়নি। পরবর্তীতে বিভিন্ন সরকারের সময় এ নিয়ে আলোচনা হলেও কার্যকর কিছু হয়নি।