মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
শুক্রবার, ২৫ ফেব্রুয়ারী ২০১১, ১৩ ফাল্গুন ১৪১৭
হৃদয় কেন ধরাছোঁয়ার বাইরে!
কাওসার ও টুম্পা হত্যার আসামি
রাজন ভট্টাচার্য ॥ কাউসার থেকে শুরু করে টুম্পা। দুটি হত্যা মামলার প্রধান আসামী তিনি। এর মধ্যে একটি হত্যাকাণ্ডের ছয়দিন পরেই এক সংসদ সদস্যের মেয়েকে অপহরণের অভিযোগ তার বিরুদ্ধে। এত অপকর্মের পরও এখনও বহাল তবিয়তে হৃদয়! পুলিশের ধরাছোঁয়ার বাইরে। একের পর খুনের দায় মাথায় নিয়ে তিনি পার পেয়ে যাচ্ছেন কিভাবে! এ প্রশ্নই এখন সবার সামনে। তার খুঁটির জোর কোথায়? এ নিয়ে যেমন প্রশ্ন উঠেছে, তেমনি কে এই হৃদয় এ নিয়ে আলোচনার শেষ নেই। রাজধানীর সেগুনবাগিচা এলাকায় হৃদয় যেমন আতঙ্কের নাম তেমনি তার সম্পর্কে জানতে সাধারণ মানুষের আগ্রহের কোন শেষ নেই।
এদিকে টুম্পার বাবার অভিযোগ হত্যা মামলা নিতে গড়িমসি চালাচ্ছে পুলিশ। সেই সঙ্গে মামলা ডিবিতে হস্তান্তরের ব্যাপারেও পুলিশের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ। আসামীদের ধরার ব্যাপারেও পুলিশের খুব একটা তৎপরতা নেই। আটক করা হয়নি হৃদয়ের পরিবারের কোন সদস্যদের। শাহবাগ থানার ওসি রেজাউল করিম জনকণ্ঠ'কে বলেছেন, টুম্পার পরিবারের পৰ থেকে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে দায়ের করা মামলাটি এমনিতেই হত্যা মামলা হিসেবে বিবেচনা হবে। মঙ্গলবার মামলাটি ডিবিতে পাঠানোর কথাও জানান তিনি। বলেন, আসামীদের ধরার প্রক্রিয়া অব্যাহত। দ্রম্নতই তাদের ধরা সম্ভব হবে।
কে এই হৃদয় ॥ রাজধানীর সেগুন বাগিচা এলাকার ২৬/এ/১ নম্বর বাসাটিই হৃদয়দের। পুরো নাম আসাদুজ্জামান হৃদয়। তার বাবার নাম জাকির হোসেন। তার চার ছেলেমেয়ের মধ্যে হৃদয় প্রথম। এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, হৃদয়ের বাবা এলাকায় একজন চিহ্নিত সন্ত্রাসী হিসেবে পরিচিত। তার বিরম্নদ্ধে আছে জমি দখল ও মাদক ব্যবসার অভিযোগ। স্থানীয়দের ভাষ্য বাবার সকল অপকর্মের উত্তরাধীকারী হৃদয়। বাবার আশ্রয়-প্রশ্রয়ে ছোটবেলা থেকেই বখাটে হয়ে উঠেছে সে। সকল অপকর্মে পেয়েছে বাবার শেল্টারে। ছাত্র হিসেবেও মেধাবী ছিল না হৃদয়।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সেগুনবাগিচা স্কুলের ছাত্র ছিল হৃদয়। সব বিষয়ে পাস করে ক্লাস ডিঙ্গানো তার ইতিহাসে নেই। ক্লাস নাইনে ফেলের রেকর্ড হিসেবে ডাবল হ্যাটট্রিক তার। ছয় বিষয়ে ফেল করেছিল টুম্পা হত্যার প্রধান অভিযুক্ত হৃদয়। তবে সর্বশেষ পড়াশোনা কতোদূর এ সম্পর্কে বিসত্মারিত জানা যায়নি। কারণ তাদের পাঁচতলা বাড়িতে গিয়ে দেখা গেছে, হৃদয়রা যে ফ্ল্যাটে থাকে সেটি বাইরে থেকে তালাবদ্ধ। ভাড়াটিয়ারা জানান, মালিক পৰের কেউ নেই। টুম্পা হত্যার পর থেকেই সবাই পলাতক। হৃদয়ের ব্যবহার করা মোটরসাইকেল, প্রাইভেটকার সবই গ্যারেজে তালাবদ্ধ অবস্থায় দেখা গেছে। এ নিয়ে ভাড়াটিয়ারা কেউ মুখ খুলতে চান না। নাম প্রকাশ না করার শর্তে হৃদয়ের প্রতি ধিক্কার জানিয়েছেন অনেকেই। সুষ্ঠু বিচারের দাবিও জানিয়েছেন তাঁরা।
সেগুনবাগিচা সোসাইটির নেতৃবৃন্দসহ স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, বন্ধুদের নিয়ে মোটরসাইকেলে ঘুরে বেড়ানোই ছিল বখাটে হৃদয়ের কাজ। আর এর নেপথ্য উদ্দেশ্য ছিল মেয়েদের উত্ত্যক্ত করা। একজন সফল প্রেমিক হিসেবেও এলাকায় হৃদয় অনেকের কাছে পরিচিত! এলাকার মেয়েদের প্রেম নিবেদন করা ছিল তার নিয়মিত কাজের অংশ। মেয়েদের প্রাইভেট কোচিং, স্কুলের সামনে তার জমজমাট আড্ডা দেখা যেত। বাবার অর্থ বিত্তের কারণে রাজসিক জীবনযাপন করত হৃদয়। মেয়েদের সহজেই কাবু করার কৌশলও জানত সে। মোটরসাইকেল কখনও বা প্রাইভেটকারে বন্ধু-বান্ধবদের নিয়ে ঘুরে বেড়ানো ছিল নিয়মিত রুটিনের অংশ।
স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তার বাবা একজন ফেনসিডিল ও ইয়াবা ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচিত। ২৬/এ/১ নম্বর বাড়িটিও সরকারী জায়গায় দখল করে নির্মাণ করা হয়েছে। সনত্মান হিসেবে হৃদয়ও অনেক সময় মাদক বিক্রি করত। বিশেষ করে রাতে হৃদয় এলাকার বখাটে ছেলেদের কাছে ফেনসিডিল, গাঁজাসহ ইয়াবা বিক্রি করত বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। স্থানীয় কোন স্কুল কিংবা প্রতিষ্ঠানে অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হলে হৃদয় গ্রম্নপকে দিতে হতো ৪০-৫০ প্যাকেট খাবার। নইলে দাঙ্গা-হাঙ্গামা নিশ্চিত।
কান্না থামেনি গ্রীন কটেজে ॥ সেগুন বাগিচা ৬/৪ গ্রীন কটেজের তৃতীয় তলার এফ-২ ফ্ল্যাটে এখনও কান্নার রোল। কাঁদছেন মা খায়রম্নন নাহার শিখা। চাচা আনোয়ার হোসেন চাচীসহ পরিবারের সদস্যদের কেউ টুম্পার স্মৃতি ভুলতে পারছেন না। বুধবার মা শিখা ছুটে গিয়েছিলেন সিদ্ধিরগঞ্জের রসুলবাগ এলাকায়। যেখানে মেয়ে টুম্পার মৃতদেহ পাওয়া গিয়েছিল। সেখানে সারাদিন কাটিয়েছেন তিনি। শুধু পরিবারের সদস্যরা নয় প্রতিবেশী থেকে শুরম্ন করে সেগুনবাগিচা এলাকার সাধারণ মানুষ আসছেন টুম্পার পরিবারকে সানত্ম্বনা জানাতে। আসছেন মানবাধিকার সংস্থার লোকজনও। যাঁদের অবহেলায় টুম্পাকে মরতে হয়েছে তাঁরাও আসছেন তাঁর বাবার সঙ্গে সাৰাত করতে। সোমবার টুম্পার বাবার সঙ্গে বাসায় এসে সাৰাত করেছেন অভিযুক্ত দুই থানার ওসি। তবে বাবার কথা একটাই তিনি বিচার চান। ছেলেমেয়ে হত্যার বিচারের আশায় এখন প্রশাসনের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন তিনি।
কাঁদছে বেগম রহিমা উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা ॥ টুম্পা নেই। শোকার্ত তাঁর সহপাঠী থেকে শুরম্ন করে স্কুলের শিৰকরাও। কাঁদছেন তাঁরা। ১৫ ফেব্রম্নয়ারি থেকে স্কুলটিতে বলতে গেলে কান্নার রোল। এখনও থামেনি। স্কুলের দশম শ্রেণীর ছাত্রী ছিল আয়েশা চৌধুরী টুম্পা। তাঁর অকাল মৃতু্য কোনভাবেই মেনে নিতে পারছেন না স্কুলের কেউ। ক্লাসে পরে আছে তার বসার স্থান। কিন্তু টুম্পা নেই। অসংখ্য সহপাঠীদের ভিড়ে সদা হাস্যোজ্জ্বল মেয়েটির অভাব বোধ করছে বন্ধুদের সবাই। মনমরা হয়ে ক্লাস করছে তারা। টুম্পাকে হারিয়ে তাদের হাসিও যেন থেমে গেছে। অকালে টুম্পাকে কেন হারাতে হলো এ প্রশ্ন বন্ধুদের সবার। তারা এই বর্বরোচিত হত্যাকা-ের সুষ্ঠু বিচারের দাবি জানিয়েছেন।
স্কুলের পৰ থেকে আট সদস্যের একটি শিৰক প্রতিনিধিদল সমবেদনা জানাতে এসেছিলেন গ্রীন কটেজে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে শিৰিকাদের সবাই 'টুম্পা ভাল মেয়ে' এতে সায় দিলেন। এখানেই শেষ নয় বললেন, মেধাবী ছাত্রী ছিল সে। যার মুখে হাসি সব সময় লেগেই থাকত। নম্র, ভদ্র ও বিনয়ী ছাত্রী হিসেবে টুম্পা সকল শিৰকদের প্রিয় ছিল। শিৰকদের পায়ে ধরে সালাম করা ছিল তার নিয়মিত অভ্যাস। টুম্পার কথা বলতে গিয়ে চোখে পানি ধরে রাখতে পারেননি শিৰকসহ অনেকেই। হত্যাকারীদের বিচারের ব্যাপারে তাঁরাও এক সুরে কথা বলেছেন। অবিলম্বে হত্যার সঙ্গে যুক্ত সকল আসামীদের গ্রেফতার করে দৃষ্টানত্মমূলক শাসত্মির দাবি জানিয়েছেন।
আদালতের স্বপ্রণোদিত রায় ॥ টুম্পা হত্যার বিষয়ে ২১ মার্চ রায়পুরা ও শাহবাগ থানার ওসিকে আদালতে তলব করেছে হাইকোর্ট। একই সঙ্গে তাঁর ভাই কাওসার হত্যার ঘটনা তদনত্ম করে কি ব্যবস্থা নেয়া হয়েছিল তা প্রতিবেদন আকারে দাখিল করতে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে দুটি হত্যা মামলায় কেন যথাযথ পদৰেপ নেয়া হবে না তা জানতে সরকারের প্রতি রম্নল জারি করেছে আদালত। এ ছাড়া দুটি মামলা সর্বোচ্চ গুরম্নত্ব বিবেচনা করে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়ার জন্য সংশিস্নষ্টদের নির্দেশ দেয় আদালত। জনকণ্ঠসহ আরও একটি দৈনিকে সোমবার এ সংক্রানত্ম সংবাদ প্রকাশিত হওয়ায় মঙ্গলবার বিষয়টি আদালতের নজরে আনলে হাইকোর্টের একটি ডিভিশন বেঞ্চ স্বপ্রণোদিত হয়ে এ আদেশ দেয়।
হত্যা মামলা দায়ের করতে চান টুম্পার বাবা ॥ টুম্পা হত্যাকারীদের বিরম্নদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের করতে চান টুম্পার বাবা মোঃ আমান উল্লাহ চৌধুরী। এজন্য ১৩ আসামীর নামও ঠিক করেছেন তিনি। এর মধ্যে প্রধান আসামী আসাদুজ্জামান হৃদয়। এরপর সাইদুর, নুরুল হক, রাজিব, জসিম, নাঈম, সুমন, বাবু, বাবলু, কুদ্দুছ, ইউসুফ, সালাম ও সাওন। তিনি জনকণ্ঠ'কে জানান, টুম্পা নিখোঁজ হওয়ার পর ১৪ ফেব্রম্নয়ারি শাহবাগ থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা করেন। পরদিন টুম্পার লাশ পাওয়া যায়। হত্যাকা-ের পর শাহবাগ থানায় টুম্পার পরিবারের পৰ থেকে হত্যা মামলা দায়ের করতে গেলে পুলিশ তা নিতে চায়নি। পুলিশের বক্তব্য আগের মামলাটি এখন হত্যা মামলা হিসেবে বিবেচিত হবে।
আমান উলস্নাহ চৌধুরী জানান, আসামীদের ধরতে পুলিশের তৎপরতা নেই। যে দু'জন আসামী এখন পুলিশের কব্জায় তাদের ধরতে তিনি নিজেই পুলিশকে সহযোগিতা করেছেন। হৃদয়ের কোন হদিস বের করতে পারছে না পুলিশ। শাহবাগ থানার ওসি রেজাউল করিম বলেছেন, আসামীদের ধরতে বুধবার চাঁদপুরে অভিযান চালানো হয়। রাজধানীর বিভিন্ন স্থানেও অভিযান চালানোর কথা জানান তিনি। বলেন, আসামীরা আগাম খবর পেয়ে বারবার স্থান পরিবর্তন করছে।
আয়েশা চৌধুরী টুম্পাকে ১৪ ফেব্রম্নয়ারি অপহরণ করা হয়। পরদিন তার লাশ পাওয়া যায় নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জ থানার শিমরাইলের রসুলবাগ ডিএনডি বাঁধের ব্রিজের নিচে। ২০১০ সালের ৩১ মে বড় ভাই আল কাওসার মাসুদ বাবলার লাশ নরসিংদীর রায়পুরের মেঘনার তীর থেকে ভাসমান অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। ২৬ মে অপহরণ করা হয়েছিল তাকে। দুটি হত্যা মামলার প্রধান আসামী হৃদয়। এদিকে, টুম্পা হত্যার পর পরই হৃদয় গ্রীন কটেজের বাসিন্দা কিশোরগঞ্জ-৫ আসনের সংসদ সদস্য আফজাল হোসেনের মেয়েকে অপহরণ করে হৃদয়। তার বিরম্নদ্ধে মেয়ে তুষা অপহরণের অভিযোগ এনে শাহবাগ থানায় মামলা করেছেন সংসদ সদস্য আফজাল। এদিকে, তুষা নিখোঁজ হওয়ার পাঁচদিন পেরিয়ে গেলেও তাকে উদ্ধার করতে পারেনি পুলিশ।