মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
শুক্রবার, ২৫ ফেব্রুয়ারী ২০১১, ১৩ ফাল্গুন ১৪১৭
লিবিয়ায় হামলায় ৩৭ বাংলাদেশী হত, এক শ' আহত
জনকণ্ঠ ডেস্ক ॥ লিবিয়ার মিসরাতা এলাকায় এক হামলায় ৩৭ বাংলাদেশী নিহত হয়েছে বলে জার্মান সংবাদ মাধ্যম ডয়চে ভেলের এক খবরে জানানো হয়েছে। রাজধানী ত্রিপোলি থেকে নয় শ' কিলোমিটার দূরে মিসরাতা এলাকায় বাংলাদেশী শ্রমিকদের একটি ক্যাম্পে সন্ত্রাসীরা হামলা চালালে এই মর্মানত্মিক ঘটনা ঘটে। ডয়চে ভেলের খবরে বলা হয়, সেখানে আটকেপড়া দুই বাংলাদেশী নাগরিক বুধবার টেলিফোনে সংবাদ মাধ্যমকে এই খবর জানিয়েছে। এদিকে ত্রিপোলি থেকে ৫০ কিলোমিটার পশ্চিমে আলমামুরা এলাকার একটি কনস্ট্রাকশন কোম্পানিতে চার হাজার বাংলাদেশী শ্রমিক আটকা পড়েছেন। তাঁদের মধ্যে প্রায় ১০০ জন এক হামলায় আহত হয়েছেন। সেখানে অবস্থানরত বাংলাদেশী শ্রমিক মোঃ ইব্রাহীম খলিল এবং ইমরান হোসেন ডয়চে ভেলেকে এ তথ্য জানিয়েছেন। তাঁরা বাংলাদেশ সরকারের কাছে তাদের উদ্ধারে আকুল আবেদন জানিয়েছেন। তবে বাংলাদেশ সরকারের কোন সূত্র হতাহতের খবরের সত্যতা নিশ্চিত করেনি। লিবিয়ায় বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত এবিএম নূরম্নজ্জামান জানিয়েছেন, দেশটিতে কোন বাংলাদেশী নিহত হওয়ার খবর দূতাবাসের কাছে নেই। রাষ্ট্রদূত বলেন, 'প্রতিদিন আমার কাছে তিন থেকে চার শ' ফোন আসে। কিন্তু লিবিয়ার কোথাও বাংলাদেশীদের হত্যার কথা কেউ আমাকে বলেনি। আমরা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্মরত বাংলাদেশীদের কাছ থেকে ওইসব কোম্পানির ক্যাম্পে খাবার ও পানির সঙ্কট বিষয়ে অভিযোগ পেয়েছি।'
অপরদিকে সংঘাতপূর্ণ বেনগাজির কাছে দারনা সিটিতে আটকেপড়া ১৭ বাংলাদেশীসহ প্রায় দেড় শ' জনকে উদ্ধারের পর মিসর সীমানত্মে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। আটকেপড়াদের একজন শফিউদ্দিন বিশ্বাস বৃহস্পতিবার সকালে বলেন, বিদেশীদের উদ্ধারে অভিযান চালাচ্ছে সে দেশের সেনাবাহিনী। তিনি জানান, অস্থির লিবিয়ায় গত শুক্রবার সরকারবিরোধী বিক্ষোভকারীরা শতাধিক বাংলাদেশীসহ প্রায় তিন শ' বিদেশীকে জিম্মি করে। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত জানান, কোরীয় কোম্পানি ওউনে কমর্রত প্রায় ৪৫০ বাংলাদেশী ইতোমধ্যে মিসর সীমানত্মে পৌঁছেছে। ওই শ্রমিকরা লিবিয়ার বেনগাজি এলাকায় কাজ করতেন। তিনি বলেন, 'তারা যেন ভিসা ছাড়াই মিসরে প্রবেশ করতে পারে সে জন্য আমরা মিসর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করছি। এ ছাড়া চীনা কোম্পানি চায়না স্টেট আমাদের আশ্বসত্ম করেছে, সেখান থেকে চীনা শ্রমিকদের সরিয়ে নেয়ার সময় বাংলাদেশী শ্রমিকদেরও সরিয়ে নেয়া হবে। এ জন্য তারা জাহাজ পাঠাবে।' লিবিয়ায় আটকেপড়া বাংলাদেশীদের দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া প্রায় শেষ করেছে সরকার। এছাড়া লিবিয়ার বিরাজমান পরিস্থিতির কারণে একটি কন্ট্রোল রম্নম খুলেছে প্রবাসী ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়। উলেস্নখ্য, চার দশক ধরে ৰমতায় থাকা মুয়াম্মার গাদ্দাফির পদত্যাগের দাবিতে গত ১৬ ফেব্রম্নয়ারি থেকে উত্তাল উত্তর আফ্রিকার দেশ লিবিয়া। খবর ডয়চে ভেলে, বিডিনিউজটোয়েন্টিফোর-ডটকম ও বাংলানিউজ-টোয়েন্টিফোরডটকম।
মিসরাতায় বাংলাদেশীদের নিহত হওয়ার খবর দিয়ে সাইফুল ইসলাম এবং আব্দুল মজিদ নামের দুই বাংলাদেশী টেলিফোনে জানান, মিসরাতার মোকায়েমপুর এলাকার একটি কারখানায় প্রায় ৮০০ বাংলাদেশী শ্রমিক আটকা পড়েছেন। তাঁদের মধ্যে প্রায় ৩০০ শ্রমিক একটি ক্যাম্পে রয়েছেন। সেখানে রাতে সন্ত্রাসীরা হামলা চালায়। এ পর্যনত্ম হামলায় ৩৭ জন বাংলাদেশী নিহত হয়েছেন। তাঁরা জানান, আহত হয়েছেন অনেকে। কিন্তু চিকিৎসার কোন ব্যবস্থা নেই। আর তারা কোন খাবার দাবারও পাচ্ছেন না। তারা জানান, ত্রিপোলিতে বাংলাদেশ দূতাবাস তাদের কোন খোঁজখবর এখনও নেয়নি। আর তাঁরাও দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছেন না। সাইফুল ইসলামের বাড়ি ফরিদপুর আর আব্দুল মজিদের বাড়ি নোয়াখালী।
এদিকে আলমামুরায় অবস্থানরত বাংলাদেশী শ্রমিক মোঃ ইমরান হোসেন জানান, তিনি সেখানে আটকাপড়ে এখন মানবেতর জীবনযাপন করছেন। সেখানে খাবার নেই, চিকিৎসা নেই। ইমরান হোসেনের বাড়ি কুমিলস্নায়। তিনি ২ বছর ধরে সেখানে একটি কোরীয় কনস্ট্রাকশন কোম্পানিতে কাজ করছেন। একই প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন বগুড়ার ইব্রাহীম খলিল। তিনি জানান, তাঁরা ৪ হাজার বাংলাদেশী আটকা পড়েছেন। হামলায় এ পর্যনত্ম এক শ' জনের মতো আহত হয়েছেন। তাদের চিকিৎসার কোন ব্যবস্থা নেই। আর কোম্পানির কর্মকর্তারাও তাঁদের ফেলে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যাচ্ছেন। তাঁরা জানান, লিবিয়ায় বাংলাদেশী দূতাবাসের সঙ্গে তারা কোন যোগাযোগ করতে পারছেন না। ঢাকায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, লিবিয়ায় অবস্থানরত বাংলাদেশীদের তৃতীয় কোন দেশে সরিয়ে নেয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। এজন্য আনত্মর্জাতিক অভিবাসী সংস্থার সঙ্গে আলোচনা চলছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানায়, বৈঠকে লিবিয়া থেকে বাংলাদেশী নাগরিকদের সরিয়ে নেয়ার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। তিনি বলেন, 'আমরা বাংলাদেশের মিসর দূতাবাসকে ওই দেশে বাংলাদেশীদের প্রবেশে অনুমতি দেয়ার অনুরোধ জানিয়েছি, যাতে তারা কায়রো থেকে বিমানে উঠতে পারে। আমরা তিউনিসিয়ার কাছেও একই অনুরোধ জানাব, কারণ বাংলাদেশীরা ওই দেশের সীমানত্ম দিয়ে লিবিয়া ছাড়তে পারে।'
বাংলাদেশীদের ঢাকায় আনার প্রক্রিয়া ॥ লিবিয়ায় আটকেপড়া বাংলাদেশীদের দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া প্রায় শেষ করেছে সরকার। সড়ক বা জলপথে লিবিয়া থেকে তিউনিসিয়া ও মিসরের কোন বিমানবন্দরে নিয়ে যাওয়ার পর তাদের বিমানযোগে ঢাকা নিয়ে আসা হবে। প্রক্রিয়া শেষ হলে এবং মাঝপথে নতুন সিদ্ধানত্ম নেয়া না হলে রবিবার থেকেই বাংলাদেশী নাগরিকদের ঢাকায় আসা শুরম্ন হতে পারে। পররাষ্ট্র এবং প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ পর্যায়ের বিশ্বসত্ম সূত্র এ তথ্য জানায়।
সংশিস্নষ্ট সূত্রমতে, লিবিয়ায় আটকে পড়ে জীবন সংশয়ের মুখে পড়েছে এমন বাংলাদেশীদের দেশে আনার পর পরিবেশ স্বাভাবিক হলে আবারও লিবিয়ায় কাজে ফিরিয়ে নেয়া হবে এমন শর্তেই এসব বাংলাদেশীকে ঢাকায় আনছে সরকার।
লিবিয়া পরিস্থিতি নিয়ে সচিবালয়ে কন্ট্রোল রুম ॥ লিবিয়ার বিরাজমান পরিস্থিতির কারণে একটি কন্ট্রোল রম্নম খুলেছে প্রবাসী ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়। বৃহস্পতিবার এক সরকারী তথ্য বিবরণীতে জানানো হয়, সচিবালয়ের ৭ নম্বর ভবনে প্রবাসী ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের ৪১৮ নম্বর কক্ষে এই কন্ট্রোল রম্নম খোলা হয়েছে।
কন্ট্রোল রম্নমে যোগাযোগের ফোন নম্বর ৭১৬৮৬০৬, মোবাইল ফোন ০১৯১৪-৮৭১১১৮, ০১৫৫২-৩৬৮৫৫১ ও ০১৮১৯-২৬২১৭৫, এবং ফ্যাঙ্ নম্বর ৭১৬০৬৮৮। এছাড়া ই-মেইলে যোগাযোগের ঠিকানা লং@ঢ়ৎড়নধংযর.মড়া.নফ, লং.বসঢ়@ঢ়ৎড়নধংযর.মড়া.নফ ও ধযসশধসধষ২০২০@ুধযড়ড়.পড়স
এদিকে বৃহস্পতিবার রাত সোয়া ৮টায় কন্ট্রোল রম্নমের ফোন নম্বরে ফোন করে ওই লাইনটি দীর্ঘক্ষণ ব্যসত্ম পাওয়া যায়। পরের তিনটি মোবাইল ফোন নম্বরে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও কেউ তা ধরেনি।
লিবিয়ার রাজধানী এখন কার্যত এখন বিচ্ছিন্ন। বিরোধীদের দখলে প্রধান শহর। সরকারবিরোধী বিক্ষোভকারীরা দেশটির তৃতীয় বৃহৎ শহর মিসরাতা দখলে নেয়ার পর নিজেদের বিজয় ঘোষণা করেছেন। সেনাবাহিনীকে হটিয়ে বিরোধীরা মিসরাতা শহরটি নিজেদের দখলে নেন বলে প্রত্যক্ষদর্শী ও বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যম সূত্রে জানা যায়। এভাবে তারা একের পর এক প্রধান শহরগুলো দখল করে নিলেও বৃহস্পতিবার সকালে লিবিয়ার রাজধানী ত্রিপোলিতে ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র। তবে রাজধানী ত্রিপোলির চিত্র সম্পূর্ণই ভিন্ন। বিরোধীরা শহরটি থেকে পালিয়ে যাওয়ার কারণে বৃহস্পতিবার ভোরে সেখানে অস্বসত্মিকর নীরবতা নেমে আসে। নিরাপত্তার স্বার্থে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বাসিন্দা বলেন, 'রাসত্মায় কোন মানুষ নেই, কেউই ঘর থেকে বের হওয়ার চেষ্টা করছেন না, এমনকি জানালা দিয়ে তাকাতেও তাঁরা ভয় পাচ্ছেন। এটা এক প্রকার ভয়াবহ একটি ঘটনা।'
এদিকে দশম দিনের মতো দেশটিতে অব্যাহত বিক্ষোভের কারণে বিভিন্ন দেশ তাদের নাগরিকদের লিবিয়া থেকে সরিয়ে আনছে। একই সঙ্গে গাদ্দাফিকে বিক্ষোভকারীদের ওপর সেনা হামলা বন্ধেরও আহ্বান জানান বিশ্ব নেতারা। লিবিয়ায় চলমান বিক্ষোভে আন্দোনলকারীদের ওপর নির্যাতনের প্রতিবাদ জানিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা বুধবার বিশ্বকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। লিবিয়ায় বিক্ষোভবারীদের ওপর নির্বিচারে হামলা চালানো প্রসঙ্গে হোয়াইট হাউসে ওবামা বলেন, 'এটি অত্যনত্ম জঘন্য ঘটনা। কিছুতেই তা মেনে নেয়া যায় না।'
দেশটির শাসক মুয়াম্মার গাদ্দাফির সমর্থক ও সেনাবাহিনীর হামলায় এ পর্যনত্ম এক হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন বলে বুধবার লিবিয়ার সাবেক মন্ত্রী উলেস্নখ করেছেন। এদিকে, গাদ্দাফির ছেলে সাদি গাদ্দাফি বৃহস্পতিবার ফিনান্সিয়াল টাইমসকে দেয়া এক সাক্ষাতকারে বলেন, 'সেনাবাহিনী এখনও খুব শক্তিশালী। আমরা যদি শুনতে পাই, তবে সেনা পাঠাব, আর তাদের দেখলে জনগণ ভয় পেয়ে যাবে।'
অব্যাহত সহিংসতার ফলে বুধবার দিনের শেষে যুক্তরাষ্ট্র, ইতালি, ব্রিটেনসহ অন্যান্য দেশও লিবিয়া থেকে নিজ দেশের জনগণকে বিমান ও জাহাজ পাঠিয়ে ফিরিয়ে আনতে শুরম্ন করেছে। লিবিয়ার স্বৈরশাসক গাদ্দাফির চার দশকের শাসনের অবসানের দাবিতে দেশটিতে বিক্ষোভ চলছে।