মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
শুক্রবার, ২৫ ফেব্রুয়ারী ২০১১, ১৩ ফাল্গুন ১৪১৭
টাইগারদের জিততেই হবে আজ
আইরিশরাও মরিয়া
মনিজা রহমান ॥ কি হলো বাংলাদেশের দর্শকদের? মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামের লাল লাল, নীল নীল বাতি জ্বলছে। আলোয় আলোয় আলোকিত চারদিক। শেরাটন হোটেল থেকে মিরপুর যাবার পথে পথে নানা স্থাপত্য নক্সা। অথচ সেদিকে তাকিয়ে দেখবার সময় নেই কারও। পার্থক্যটা এমন আকাশ পাতাল যে, নজরে না পড়ে উপায় নেই। গতকাল সৌভাগ্যক্রমে মিরপুর মাঠ থেকে বাংলাদেশ দলের বাসের ঠিক পিছনে থেকে গাড়িতে আসার সুযোগ হয়। আসতে আসতে দেখলাম, রাসত্মার মোড়ে ভিড় করে দাঁড়ানো আমজনতা হাত নেড়ে শুভেচ্ছা জানায় বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের। উৎসাহ আছে, কিন্তু তাতে আগের সেই উন্মাদনা নেই। ১৯ ফেব্রুয়ারি ভারতের বিরুদ্ধে ম্যাচের আগের রাতে যেটা দেখেছিলাম। মিরপুর মাঠ থেকে ১০ নম্বর গোলচত্বরে যেতে হয়েছিল রীতিমতো জানবাজি রেখে। অবস্থা পাল্টে গেছে। আয়ারল্যান্ডের বিরম্নদ্ধে আজ জিততে না পারলে জনতার কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে পুরো দলকে। সেটা বুঝে গেছেন অধিনায়ক শাকিব আল হাসানও। গতকাল মিরপুর স্টেডিয়ামে ৰণে ৰণে ক্যামেরার ফ্লাশ ঝিলিক দিয়ে ওঠা সংবাদ সম্মেলনে অধিনায়ক জানালেন, যে কোন উপায়ে জিততে চান তিনি এ ম্যাচে।
নিজের দেশে বিশ্বকাপ, সেই বিশ্বকাপে আবার বাংলাদেশ... বাঙালীর স্বপ্ন তাই বিশাল বিরাট আকাশছোঁয়া। তারা তা পারলে বিশ্বকাপের ট্রফি হাতে নেয়। স্বপ্ন দেখতে তো বাধা নেই। স্বপ্নের সারথিদের কাছে মানুষের চাওয়া অনেক। কিন্তু বাসত্মবতা বলেও একটা শব্দ আছে। তারই নিরিখে অধিনায়ক শাকিব বিশ্বকাপ শুরম্নর আগে আইসিসি আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ঘোষণা দিয়েছিলেন কোয়ার্টার ফাইনালে যাবার। তখনও ভারতের বিরম্নদ্ধে খেলেনি বাংলাদেশ। বুকে ছিল ২০০৭ বিশ্বকাপে মহেন্দ্র সিং ধোনি বাহিনীকে হারানোর সুমধুর স্মৃতি। কিন্তু ধোনি বাহিনীর বদলায় সেই স্মৃতি এখন বেদনা। বিশ্বকাপের অপেৰাকৃত কঠিন গ্রম্নপ বি'তে আইসিসি সহযোগী দেশগুলোর মধ্যে আছে আয়ারল্যান্ড ও হল্যান্ড। ইংল্যান্ডের বিরম্নদ্ধে ডাচদের বীরোচিত খেলা মনপ্রাণ জুড়িয়ে দিয়েছে ক্রিকেটপ্রেমীদের। আয়ারল্যান্ড আজই প্রথম মাঠে নামছে। ওদের অনুপ্রেরণা ২০০৭ বিশ্বকাপ। সেবার গ্রম্নপপর্বে পাকিসত্মানকে হারিয়ে সুপার এইটে খেলে আইরিশরা। দ্বিতীয় পর্বে এসে বাংলাদেশকে ৭৪ রানে হারিয়ে চমকে দেয়। সেই জয় নিয়ে পড়ে নেই কিন্তু আইরিশরা। গত দুই বছরে সব বিভাগে দারম্নণ উন্নতি হয়েছে ওদের। দলের মোট ১৫ ক্রিকেটারের মধ্যে ১৪ জনই পেশাদার। সাতজন পড়শী দেশ ইংল্যান্ডের মাটিতে কাউন্টি ক্রিকেট খেলেন। গত দুই মাস ধরে উপমহাদেশের কন্ডিশনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেবার অভিপ্রায়ে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে ক্যাম্প করেছে ওরা। প্রস্তুতি ম্যাচে নিউজিল্যান্ডের কাছে ৩২ রানে হারলেও পরাজিত করেছেন জিম্বাবুইয়েকে। আইরিশদের শক্তিমত্তা সম্পর্কে ভালই জ্ঞান আছে শাকিবের। তাঁর উত্তর, 'আয়ারল্যান্ড কঠিন প্রতিপৰ। ওদের দলে ক্রিকেটাররা কঠিন পরিস্থিতির চাপ নিতে সৰম।'
কেবল ২০০৭ সালের ওয়েস্ট ইন্ডিজ বিশ্বকাপ নয়, ২০০৯ সালে টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপেও আয়ারল্যান্ডের বাধা টপকাতে পারেনি বাংলাদেশ। হেরে গিয়েছিল ৬ উইকেটে। তাই বিশ্বকাপে আয়ারল্যান্ড মানেই বাংলাদেশের জন্য দুঃস্বপ্নের অন্য নাম। আজ আবারও সেই আইরিশদের মুখোমুখি শাকিব বাহিনী। তবে আর আগের দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি হবে না বলে আশাবাদী অধিনায়ক। তাঁর আশাবাদকে সমর্থন দিচ্ছে দারম্নণ একটি পরিসংখ্যান। ২০০৮ সালে এ মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামে বাংলাদেশের কাছে ৩-০ ব্যবধানে হেরে গিয়েছিল আয়ারল্যান্ড তিন ম্যাচের সিরিজে। এ অর্জনকে বিরাট অনুপ্রেরণা হিসেবে দেখা শাকিব বেশ ঔদ্ধত্য নিয়ে বলেছেন, 'আমার মনে হয় না আয়ারল্যান্ড এ কন্ডিশনে খুব বেশি সুবিধা করে উঠতে পারবে?' পরমুহূর্ত সচেতন হয়ে বলে ওঠেন, 'আমরা অবশ্যই তাদের হাল্কাভাবে নিচ্ছি না। তারা খুবই ভাল ক্রিকেট খেলে। কিন্তু উপমহাদেশের স্পিনবান্ধব কন্ডিশনে আমরাই এগিয়ে থাকব। আমাদেও বোলিং আক্রমণ খুবই শক্তিশালী। তারা স্পিন বোলিংয়ের সামনে কিছুটা দুর্বল। আর আমরা এ স্পিন দিয়েই তাদের ঘায়েল করার চেষ্টা করব।'
ভারতের কাছে ৮৭ রানে হারের পরে কোয়ার্টার ফাইনালের আশা জিইয়ে রাখতে হলে আজ আয়ারল্যান্ডের বিরম্নদ্ধে জেতার কোন বিকল্প নেই বাংলাদেশের। এটা খুবই ভালমতোই মাথায় আছে শাকিবের। 'আগামীকালের ম্যাচটা আমাদের জিততেই হবে। যদি আমরা জিততে না পারি, তাহলে কোয়ার্টার ফাইনালের টিকেট পাওয়া খুব মুশকিল হয়ে যাবে।' ওপেনিং পেস বোলার শফিউলের ইনজুরিতে বাংলাদেশের প্রথম একাদশ কেমন হবে, এ নিয়ে চারদিকে জল্পনা-কল্পনা শুরম্ন হয়ে গেছে। গত বুধবার অনুশীলনের সময় ব্যথা পান তিনি। আগেই ব্যাটিং লাইনআপের সাত নম্বরে আশরাফুলকে খেলানোর কথা বলেছিলেন অধিনায়ক শাকিব ও কোচ জেমি সিডন্স। এখন কার্যত দেখা গেছে আইরিশদের বিরম্নদ্ধে ম্যাচের আগে দলে একাধিক পরিবর্তন আসছে।
গতকাল মিরপুর স্টেডিয়াম চত্বরে একাদশ নিয়ে নানা আলোচনা শোনা যায়। তবে স্পষ্ট করে বলা হয়নি কিছুই। অধিনায়ক শাকিবের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেছেন, এখনও কিছু ঠিক হয়নি। আয়ারল্যান্ডের বিরম্নদ্ধে একজন পেসার নিয়ে খেলার পরিকল্পনার কথা শোনা গেছে। সেৰেত্রে এক প্রানত্মে রম্নবেল হোসেন ও অন্য প্রানত্মে আব্দুর রাজ্জাক বোলিং ওপেন করতে পারেন। অতীতেও বাংলাদেশ এক পেসার নিয়ে খেলেছে। ২০০৯ সালের ৩ নবেম্বর চট্টগ্রাম জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়ামে জিম্বাবুইয়ের বিরম্নদ্ধে একজন পেসার খেলেছে। সিরিজের চতুর্থ ম্যাচে নাজমুল হোসেনের সঙ্গে বোলিং ওপেন করেন রাজ্জাক। ৪৪ রানে অলআউট হয়ে যায় জিম্বাবুইয়ে। আয়ারল্যান্ডের জন্য একই ফাঁদ তৈরি করতে চায়। পেস বোলিং দিয়ে আয়ারল্যান্ডের সঙ্গে কিছু করা যাবে না। তাই স্পিন দিয়েই তাদের বধ করতে হবে। বাংলাদেশ বরাবর স্পিননির্ভর দল। একদল বাঁ হাতি স্পিনারের বিপরীতে খেলতে হবে ভেবে মাঠে নামে প্রতিপৰ। আয়ারল্যান্ডও জেনে গেছে সেটা। কিন্তু বোলিংয়ের ৯০ ভাগ স্পিনার হবে, এটা নিশ্চয়ই আশা করেনি। স্পিনারদের বহর বাড়ানোর জন্য সোহরাওয়ার্দী শুভকে দলে নেবার গুজব ছিল গতকাল দিনভর। কিন্তু বিকেলে আবার পাল্টাতে থাকে ঘটনা। ইনজুরি আক্রানত্ম শফিউল ইসলামের জায়গায় আরেকজন পেসার খেলানোর বিষয়ে আলোচনা শোনা যায়।
শফিউল আহত হওয়ায় সম্ভবত কপাল খুলছে আরেক পেসার নাজমুল হোসেনের। যদিও বাংলাদেশ অধিনায়ক বিষয়টি চেপে রাখার চেষ্টা করছেন। 'শফিউলকে শুক্রবার সকাল পর্যনত্ম দেখা হবে। তারপর চূড়ানত্ম করা হবে একাদশ।' বাসত্মবতা হলো শফিউল খেলার মতো অবস্থায় নেই। বিশেষ করে কাঁধে চোট পাওয়ার পরে বোলিং করা খুবই কঠিন তাঁর জন্য। বৃহস্পতিবার তাঁকে অনুশীলনেও দেখা যায়নি। ফিজিও মাইকেল হেনরি পরিচর্যা করেছেন। যদিও শফিউলের এঙ্রে করার প্রয়োজন মনে করছেন না ফিজিও। বরং ব্যথানাশক ওষুধ দিয়েছেন। শেষ পর্যনত্ম খেলার মতো শারীরিক অবস্থা ফিরে পাওয়া সম্ভব কিনা খোদ হেনরিও বলতে পারছেন না। শফিউলকে চোটমুক্ত করতে নিবিড় পরিচর্যা করা হচ্ছে। বুধবার ফিল্ডিংয়ের সময় ঝাঁপিয়ে ক্যাচ নিতে গিয়ে মাটিতে পড়ে ডান কাঁধে আঘাত পান শফিউল। তখন বলেছিলেন, 'ব্যথা নেই। খেলতে পারব।' কিন্তু গতকাল সকালে হতাশ কণ্ঠে সেই শফিউল বলে ওঠেন, 'খুব ব্যথা করছে। বুঝতে পারছি না কি হবে।' তিনি যে খেলতে পারছেন না ম্যানেজার তানজিব আহমেদ সাদের কথায় তা স্পষ্ট। 'শফিউলের ভাগ্য খারাপ। ও খেলতে পারছে না। ওর জায়গায় নাজমুল মাঠে নামবে।'
শফিউল ছাড়া এদিন একাদশে আরেকটি পরিবর্তন আসছে। মোহাম্মদ আশরাফুলের নিজের দেশে বিশ্বকাপে অভিষেক হবে আজ। খেলবেন মাহমুদউলস্নাহ রিয়াদের জায়গায়, সাত নম্বরে। দুটি কারণে এ্যাশকে আয়ারল্যান্ডের বিরম্নদ্ধে খেলানোর সিদ্ধানত্ম নেয়া হয়েছে। প্রথমত ব্যাটিং পাওয়ার পেস্নতে রান তোলা এবং অফস্পিন দিয়ে প্রতিপৰকে ব্যাটসম্যানের ফাঁদে ফেলা। অফ ও লেগ দুইভাবে বল করতে পারেন আশরাফুল। আয়ারল্যান্ডের ক্রিকেটার ও কর্মকর্তারাও তাঁর বোলিং সম্পর্কে খুব বেশি জানেন না। এ্যাশকে নিলে এ সুবিধা পাবে বাংলাদেশ।
এক পেসার নিয়ে খেলার চিনত্মা থেকে সরে এসে টিম ম্যানেজমেন্ট দুই পেসারেই বিশ্বাস রাখছেন। দুই পেসার রম্নবেল ও নাজমুলের সঙ্গে থাকবেন রাজ্জাক, শাকিব, নাঈম ইসলাম ও আশরাফুলের মতো স্পিনাররা। ওপেনিং ব্যাটসম্যান ইমরম্নল কায়েসও গত বুধবার অনুশীলনে চোট পেয়েছিলেন। বাঁ হাতের কনুইয়ে নিচে বল আঘাত করে। এখনও ফুলে আছে অনেকখানি জায়গা। বরফ দেয়ায় ব্যথা কমে গেছে। গতকাল নেটে ব্যাটিংও করেছেন। সেৰেত্রে শাহরিয়ার নাফিসকে অপেৰা থাকতেই হচ্ছে।
বাংলাদেশের সম্ভাব্য একাদশ ॥ তামিম ইকবাল (সহঅধিনায়ক), ইমরুল কায়েস, জুনায়েদ সিদ্দিকী, মুশফিকুর রহিম (উইকেটরৰক), শাকিব আল হাসান (অধিনায়ক), রকিবুল হাসান, মোহাম্মদ আশরাফুল, নাঈম ইসলাম, আবদুর রাজ্জাক, নাজমুল হোসেন ও রুবেল হোসেন।