মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
শুক্রবার, ২৫ ফেব্রুয়ারী ২০১১, ১৩ ফাল্গুন ১৪১৭
কেন খুন হচ্ছে!
ডিসিসি নির্বাচন ও ওয়ার্ড কমিশনার প্রার্থী
০ ওয়ার্ড কমিশনার হলেই আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হওয়া যায়
০ সব ঠিকাদার বাড়িতে ভিড় জমায়
০ এলাকার সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা থেকেও আসে অর্থ
শংকর কুমার দে ॥ ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের ৯০টি ওয়ার্ডের আওয়ামী লীগ ও বিএনপি দলীয় বর্তমান কাউন্সিলর ও সম্ভাব্য কাউন্সিলপ্রার্থী মিলে নিরাপত্তা ঝুঁকিতে আছেন শতাধিক প্রার্থী। এর মধ্যে গত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় পালিয়ে বেড়িয়েছেন অর্ধশতাধিক ওয়ার্ড কাউন্সিলর। আওয়ামী লীগ সরকার ৰমতায় আসার পর সম্ভাব্য প্রার্থীর তালিকা বেড়ে যাওয়ায় নিরাপত্তা ঝুঁকিতে থাকা প্রার্থীর সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। ঢাকা মহানগরীর ৪১ থানার পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থা ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের বর্তমান ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও সম্ভাব্য ওয়ার্ড কাউন্সিলদের জীবনবৃত্তান্ত সংগ্রহ করে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির বিষয়টি অনুসন্ধানে এ ধরনের তথ্য বের হয়ে এসেছে।
ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের ৯০টি ওয়ার্ডে নির্বাচনে অংশ নিতে পারেন এমন বর্তমান কাউন্সিলর ও সম্ভাব্য ওয়ার্ড কাউন্সিলর প্রার্থী সংখ্যা চার শতাধিক হতে পারে। ঢাকা মহানগরীর ৪১ থানার পুলিশ আসন্ন নির্বাচনে ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের ৯০ ওয়ার্ডে বর্তমান কাউন্সিলর ও সম্ভাব্য কাউন্সিলর প্রার্থীর জীবনবৃত্তানত্ম সংগ্রহ করা তালিকায় তাদের নাম উঠে এসেছে। এর মধ্যে শতাধিক প্রার্থীর মধ্যে বর্তমান কাউন্সিলর ও সম্ভাব্য কাউন্সিলর প্রার্থীর বিরম্নদ্ধে সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা, জমিজমার বিরোধ, পূর্বশত্রম্নতা, এলাকায় আধিপত্য বিসত্মারের অভিযোগ আছে। নিরাপত্তা ঝুঁকিতে বা আতঙ্কে আছেন এমন সম্ভাব্য কাউন্সিলর প্রার্থীরা থানায় জিডি করছেন নয় তো গানম্যান চেয়ে আবেদন করছেন। এসব প্রার্থীই খুন হচ্ছেন নয় তো খুন হওয়ার হুমকি পাচ্ছেন।
বিএনপি-জামায়াত ৰমতায় থাকাকালে বিএনপি-জামায়াত সমর্থিত কাউন্সিলর ও কাউন্সিলর প্রার্থীরা খুন হয়েছেন। আওয়ামী লীগ ৰমতায় আসার পর এখন আবার আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য প্রার্থীরা খুন হচ্ছেন। ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে_ এমন খবরের ভিত্তিতে নির্বাচনে কাউন্সিলর প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দিয়ে এ পর্যনত্ম ৩ জন খুন হয়েছেন। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময় ৪ ওয়ার্ড কমিশনার খুন হয়েছেন।
ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের ওয়ার্ড কাউন্সিলর বা সম্ভাব্য ওয়ার্ড কাউন্সিলর প্রার্থীরা খুন হওয়ার কারণ কি? বর্তমান কাউন্সিলর ও সম্ভাব্য কাউন্সিলরদের নাম, ঠিকানা, পরিচয়, জীবনবৃত্তানত্ম সংগ্রহ করে তার কারণ অনুসন্ধান করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশের ৪১ থানা ও একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা। পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী যখন যে রাজনৈতিক দলের সরকার ৰমতায় আসে তখন সেই রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরাই ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের ওয়ার্ড কাউন্সিলর নির্বাচিত হচ্ছেন। প্রতিপৰ রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাকর্মীরা ভয়ভীতিতে প্রার্থী হচ্ছেন না কিংবা প্রার্থী হলেও মামলা মোকদ্দমার হয়রানিতে নির্বাচন থেকে ছিটকে পড়ছেন। ৰমতাসীন দলের প্রার্থীরা কাউন্সিলর হিসেবে জয়ী হয়ে আসছেন।
ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের ওয়ার্ড কাউন্সিলর হওয়ার জন্য জীবনবাজি রাখার এই প্রতিযোগিতা কেন? পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে দেখা যায়, ৰমতাসীন দলের ছত্রছায়ায় কোন রকমে একবার ওয়ার্ড কাউন্সিলর হতে পারলে আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হওয়া যায়। ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের যে ওয়ার্ডের কাউন্সিলর যিনি হবেন, তাঁর অধীনে ওয়ার্ডের সকল ধরনের কাজকর্মের তদারকির ভার তাঁর। ঠিকাদাররা তো তাঁর বাড়িতে রীতিমতো ভিড় জমান। ওয়ার্ড এলাকার সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসাসহ সকল ধরনের অর্থ আগমনের পথ প্রশসত্ম হয়ে যায়। এসব কারণে ওয়ার্ড কাউন্সিলর পদটিতে বিজয়ী হওয়ার জন্য জীবনবাজি রাখার এই প্রতিযোগিতা করতে গিয়ে খুনোখুনির তালিকা বৃদ্ধি হয়ে চলেছে। এমনও ওয়ার্ড কমিশনার আছেন যিনি ফুটপাথের হকার থেকে কোটিপতি হয়েছেন তার নজিরও আছে।
বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার ৰমতায় আসার পর ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে তাতে দেখা গেছে, আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা মেয়র পদসহ ওয়ার্ড কাউন্সিলর পদে নির্বাচনে অংশগ্রহণই করতে পারেননি। বিএনপি-জামায়াত প্রার্থীরা নির্বাচিত তো হয়েছেনই, এমনকি সন্ত্রাসী প্রার্থীরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়ে দেশবাসীকে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন। ফলে ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনের এক বছর না যেতেই বিএনপি-জামায়াত সমর্থক নির্বাচিত ৪ ওয়ার্ড কাউন্সিলর খুন হন। তখন খুন হন ৮নং ওয়ার্ড কমিশনার সাইদুর রহমান নিউটন, ৭২নং ওয়ার্ড কমিশনার বিনয়কৃষ্ণ সরকার, ৯০নং ওয়ার্ড কমিশনার শাহাদাত হোসেন, ৪৪নং ওয়ার্ড কমিশনার কেএম রাজু আহমেদ। সন্ত্রাসীদের গুলিতে গত বছর খুন হন ৭০নং ওয়ার্ড কমিশনার হাজী আলী আহাম্মদ হোসেন।
আওয়ামী লীগ সরকার ৰমতায় আসার পর ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচন অনুষ্ঠানের এখনও দিনৰণ নির্ধারণ করা হয়নি। খুব শীঘ্রই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে এ ধরনের খবরের ভিত্তিতে ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে প্রার্থিতা ঘোষণা দেয়া হচ্ছে। সম্ভাব্য ওয়ার্ড কাউন্সিলর প্রার্থীরা ঘোষণা দেয়ার পর প্রতিপৰের হাতে খুন হচ্ছেন নয় তো বা খুনের হুমকি দেয়া হচ্ছে। আওয়ামী লীগ দল ৰমতায় থাকায় বর্তমানে আওয়ামী লীগদলীয় সম্ভাব্য ওয়ার্ড কাউন্সিলর প্রার্থী খুন হয়েছেন ৩ জন। এর মধ্যে আগারগাঁও এলাকার ৪১নং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ফজলুল হক সন্ত্রাসীদের হাতে খুন হয়েছেন। ফজলুল হক ওয়ার্ড কাউন্সিলর পদে নির্বাচন করার ঘোষণা দিয়েছিলেন। ওয়ার্ড কাউন্সিলর নির্বাচনের ঘোষণা দেয়ার কারণেই তাঁকে হত্যা করা হয়েছে বলে প্রাথমিক তদনত্মে তথ্য মিলেছে। ফজলুল হক খুন হওয়ার আগে একই ওয়ার্ডের সভাপতি ও সম্ভাব্য ওয়ার্ড কাউন্সিলর নূর মোহাম্মদ গুলিবিদ্ধ হন। সর্বশেষ খুন হয়েছেন শ্যামপুর-কদমতলী এলাকার আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি মোহাম্মদ উলস্নাহ। বুধবার দিনেদুপুরে তাঁকে সন্ত্রাসীরা গুলি করে খুন করার সময় তাঁর গাড়ির চালক হারম্নন অর রশীদকেও খুন করা হয়। ওয়ার্ড কমিশনার পদে আওয়ামী লীগদলীয় হিসেবে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার ঘোষণা দিয়েছিল মোহাম্মদ উলস্নাহকে। তিনিও ওয়ার্ড কাউন্সিলর হিসেবে প্রার্থীর ঘোষণা দিয়ে এলাকায় নির্বাচনী কাজকর্ম শুরম্ন করছিলেন।
মিরপুর এলাকায় ওয়ার্ড কাউন্সিলর পদে নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দিয়ে এলাকায় নির্বাচনী কাজ শুরম্ন করেছেন এমন এক প্রার্থী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, ওয়ার্ড কাউন্সিলর পদে প্রার্থীর ঘোষণা দেয়ার পর পরই তাঁকে হত্যার হুমকি দেয়া হচ্ছে। তিনি এ ব্যাপারে জিডি করেছেন সংশিস্নষ্ট থানায়। নিরাপত্তার কারণে নাম প্রকাশ করতে রাজি হননি তিনি। সূত্রাপুর এলাকায় নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেক সম্ভাব্য ওয়ার্ড কাউন্সিলর প্রার্থী বলেছেন, ওয়ার্ড কাউন্সিলর প্রার্থীর ঘোষণা দেয়ার পর থেকে ক্রমাগত হুমকি আসছে। রীতিমতো আতঙ্কের মধ্যে আছি। আওয়ামী লীগ সমর্থিত ওয়ার্ড কাউন্সিলর প্রার্থীরাই নির্বাচনে অংশ নিতে আগ্রহী দেখা যাচ্ছে বলে জানান তিনি।
বিগত নির্বাচনে ওয়ার্ড কাউন্সিলর পদে পরাজিত হয়েছেন এমন মোহাম্মদপুর এলাকার আওয়ামী লীগ সমর্থিত এক ওয়ার্ড কাউন্সিলর প্রার্থী জানিয়েছেন, তিনি এবারের সিটি কর্পোরেশনের ওয়ার্ড কাউন্সিলর পদে নির্বাচন করার ঘোষণা দিয়েছেন। সন্ত্রাস দমন ও মাদক প্রতিরোধের জন্য ঘোষণা দিয়ে তিনি প্রার্থী হচ্ছেন বলে জানিয়েছেন।
বিএনপি সমর্থিত বর্তমান ওয়ার্ড কাউন্সিলর জানিয়েছেন, এবারের ওয়ার্ড কাউন্সিলর পদে নির্বাচনে তিনি অংশ নিবেন না। নির্বাচনে অংশ নিলেই হত্যা করা হবে বলে হুমকি দেয়া হয়েছে। আওয়ামী লীগের প্রার্থীর পৰ থেকে মামলা মোকদ্দমা দিয়ে হয়রানি করার আশঙ্কাও আছে। আশঙ্কা আছে এলাকাছাড়া করারও। আওয়ামী লীগ প্রার্থীদের মধ্যেই ওয়ার্ড কাউন্সিলর সম্ভাব্য প্রার্থীর ছড়াছড়ি বলে অভিযোগ করেছেন তিনি।
ডেমরা এলাকার এক সম্ভাব্য ওয়ার্ড কাউন্সিলর প্রার্থী বলেছেন, অনেকেই দল বদল করে ও নির্দলীয় সেজে ওয়ার্ড কাউন্সিলর পদে নির্বাচন করার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
ঢাকা মহানগর পুলিশের এক উর্ধতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের ওয়ার্ড কাউন্সিলর পদে যাঁরা নির্বাচিত হবেন তাঁরা জনসেবা করবেন। জনসেবা করার জন্য ওয়ার্ড কাউন্সিলর প্রার্থীরা এখন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নির্বাচনে প্রার্থী হচ্ছেন। ওয়ার্ড কাউন্সিলর পদটি এখন আর্থিক ও সামাজিকভাবে খুবই লোভনীয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। যাঁরাই ওয়ার্ড কাউন্সিলর হচ্ছেন তাঁদের বেশিরভাগই সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও মাদক ব্যবসায় মদদদান করে রাতারাতি কোটিপতি বনে যাচ্ছেন। জমিজমা সংক্রানত্ম বিরোধ, এলাকার আধিপত্য বিসত্মারের ফলে ওয়ার্ড কাউন্সিলর পদটি একদিকে যেমন লোভনীয়, তেমনি আরেকদিকে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে।
গোয়েন্দা সংস্থার এক কর্মকর্তা বলেছেন, ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনে সম্ভাব্য ওয়ার্ড কাউন্সিলররা প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দিয়ে এলাকায় যেতেই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অবনতি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। শতাধিক সম্ভাব্য ওয়ার্ড কাউন্সিলর প্রার্থী আছেন যাঁদের বিরম্নদ্ধে সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা, জমিজমা সংক্রানত্ম বিরোধ, এলাকায় আধিপত্য বিসত্মার ও বিভিন্ন অপরাধী কার্যক্রমে মদদদানের অভিযোগ আছে। এসব প্রার্থীর পৰে অনেক অপরাধী-সন্ত্রাসীরাও মাঠে প্রকাশ্যে আসছে। এতে পৰ-প্রতিপৰ তৈরি হয়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানোর আশঙ্কা দেখা দেয়ার পাশাপাশি তা প্রতিরোধের ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য উদ্যোগ নেয়ার পরামর্শ দেয়া হয়েছে।