মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
শুক্রবার, ১১ ফেব্রুয়ারী ২০১১, ২৯ মাঘ ১৪১৭
সংসদে ফিরে যাবার পথ খুঁজছে বিএনপি
নইলে সদস্যপদ থাকবে না ॥ মান রক্ষায় ডাকের অপেক্ষা-
শরিফুল ইসলাম ॥ সংসদে যাওয়ার পথ খুঁজছে বিএনপি। সদস্যপদ রৰা করতে আর বাইরে থাকা সম্ভব নয় বিধায় নবম জাতীয় সংসদের চলতি ৮ম অধিবেশনে বিএনপিকে যেতেই হবে। কিভাবে নিজেদের মানমর্যাদা রৰা করে সংসদে যাওয়া যায় সে পথই খুঁজজে তারা। আর এ লৰ্যেই প্রথমে তারা ১২ দফা দাবি উত্থাপন করে তা পূরণ করা হলে সংসদে যোগদানের কথা বলে। অবশ্য পরে তা ভুলে গিয়ে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে কারাবন্দী সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীকে নিয়ে সংসদে যাওয়ার কথা বলে এবং সর্বশেষ স্পীকার কার্যালয়ের সামনে অবস্থান ও স্মারকলিপি পেশ করে সরকারী দলের সঙ্গে সমঝোতার কৌশল গ্রহণ করে। এতেও কাজ না হলে জনরোষ থেকে রৰা পেতে ভিন্ন পথ অবলম্বন করে বিএনপি সংসদে ফিরে যাবে বলে সংশিস্নষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
সূত্র মতে, সদস্যপদ রৰা করার ব্যাপারে বিএনপি দলীয় অধিকাংশ সদস্যই এখন উদগ্রীব। তাই যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সংসদে যোগ দিয়ে তাঁরা নিরাপদ থাকতে চান। লাল পাসপোর্টের ব্যবহার, সরকারী অর্থে বিদেশ ভ্রমণ ও জাতীয় সংসদ থেকে মোটা অঙ্কের বেতন-ভাতাসহ বিরাজমান সুযোগ-সুবিধা হাতছাড়া করতে চান না তাঁরা। তাই নবম জাতীয় সংসদের মেয়াদ এখনও ৩ বছর বাকি থাকাতে কোন অবস্থাতেই তাঁরা সদস্য পদ হারাতে চান না।
নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, জাতীয় সংসদের চলতি অধিবেশনে যোগদানের ব্যাপারে বিএনপি প্রস্তুত থাকলেও তার আগে সরকারী দলের সঙ্গে সমঝোতা করতে চায় তারা। এ কারণেই তারা সরকারী দল বা স্পীকারের ডাকের অপেৰায় রয়েছে। সংসদে যোগদানের ব্যাপারে এর আগেই বিএনপি যে ১২ দফা পেশ করেছে তার অনত্মত দু'একটিও যদি বিবেচনায় আনা হয় তাহলে তারা খুশি মনেই সংসদে যোগ দেবে। আর তা না হলেও তারা এ অধিবেশনেই সংসদে যোগ দিয়ে সদস্যপদ নিশ্চিত করে আবার হৈচৈ বাধিয়ে বাইরে চলে আসবে।
উলেস্নখ্য, সংসদে যোগদানের ব্যাপারে বিএনপির দেয়া ১২ দফা দাবির মধ্যে রয়েছে- বিরোধী দলের নেতা খালেদা জিয়ার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ও তাঁর বাড়িতে সংসদের কর্মসূচী পেঁৗছানো, দ্রব্যমূল্য ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিসহ বিভিন্ন ইসু্যতে দেয়া মুলতবি প্রসত্মাব গ্রহণ করে আলোচনার ব্যবস্থা করা, বিএনপির নেতাকর্মীদের রিমান্ডের নামে পুলিশী নির্যাতন বন্ধ করা, ভারতের সঙ্গে করা চুক্তিগুলো সংসদে উপস্থাপন, ওয়ান-ইলেভেনের সময় বিএনপি নেতাকর্মীদের নামে দায়েরকৃত মামলাগুলো প্রত্যাহার, বিএনপিকে সামনের সারিতে দেয়া আসন সমস্যার সমাধান, বিডিআর বিদ্রোহের বিচার করা, টিপাইমুখ বাঁধ নির্মাণ বন্ধ করার ব্যবন্থা করা, কারাগারে বন্দী দলীয় নেতাদের মুক্তি, সীমানত্ম বিরোধ নিরসন, খালেদা জিয়ার ছোট ছেলে কোকোর প্যারোল বাতিলের আদেশ প্রত্যাহার ও যুদ্ধাপরাধের বিচারের নামে বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের হয়রানি বন্ধ করা।
সূত্র মতে, স্পীকার কার্যালয়ের সামনে অবস্থান ও স্মারকলিপি পেশের নামে প্রকৃতপৰে সংসদে যোগদানের ৰেত্র তৈরি করছে বিএনপি। এর পর সরকারী দল কিংবা স্পীকারের পৰ থেকে দলীয় সংসদ সদস্যদের ডাকা হলে তাঁরা সে ডাকে সাড়া দিয়ে একটি সমঝোতায় পেঁৗছার চেষ্টা করবেন। অবশ্য এর আগে বিএনপি কারাবন্দী দলীয় নেতা সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীকে নিয়ে সংসদে যাওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছিল। কিন্তু সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে কারাবন্দী থাকায় বিএনপির এ আগ্রহে সাড়া দেয়নি সরকারী দল কিংবা জাতীয় সংসদের স্পীকার।
সংসদ সচিবালয় সূত্রে জানা গেছে, নবম জাতীয় সংসদ এ যাবত ১৮২ কার্যদিবস চলেছে। এর মধ্যে বিএনপি সংসদে উপস্থিত ছিল মাত্র ৪৬ কার্যদিবস। গত বছর ২ জুন সর্বশেষ সংসদে যোগ দিয়েছিল বিএনপি ও চারদলীয় জোটের শরিক দল জামায়াত ও বিজেপি। এর পর থেকে বিএনপিসহ বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যদের একটানা গড় অনুপস্থিতি ৫৬ কার্যদিবস। তবে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার একটানা অনুপস্থিতি ৬০ কার্যদিবস। সংবিধানিক বাধ্যবাধকতায় একটানা ৯০ কার্যদিবস অনুপস্থিত থাকলে জাতীয় সংসদে সদস্যপদ বাতিল হয়ে যায়। তাই আর মাত্র ৩০ কার্যদিবস অনুপস্থিত থাকলে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া এবং ৩৪ কার্যদিবস অনুপস্থিত থাকলে দলীয় অন্য ৩৪ জনের সদস্য পদ বাতিল হবে। আর গত ২৭ জানুয়ারি হবিগঞ্জ-১ আসনের উপনির্বাচনে বিজয়ী সংসদ সদস্য শেখ সুজাত মিয়ার সদস্য পদ বাতিল হবে আরও ৮৩ কার্যদিবস অনুপস্থিত থাকলে। কারণ তিনি শপথই নিয়েছেন চলতি ৮ম অধিবেশন চলাকালে গত ১ ফেব্রম্নয়ারি। তাঁর শপথ গ্রহণের পর মাত্র ৭ কার্যদিবস সংসদ চলেছে।
নবম জাতীয় সংসদের চলতি ৮ম অধিবেশন চলবে ৪৪ কার্যদিবস। তবে ২৫ জানুয়ারি থেকে শুরম্ন হয়ে এ যাবত এ অধিবেশন চলেছে ৮ কার্যদিবস। বাকি আছে ৩৬ কার্যদিবস। কাজেই সদস্যপদ রৰা করতে হলে এই অধিবেশনে বিএনপিকে যোগ দিতেই হবে। তাই বিএনপি সংসদে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকলেও যোগ দিয়ে যাতে সরকারী দলের সদস্যদের তোপের মুখে পড়তে না হয় সেজন্যই তারা এর আগে একটি সমঝোতায় আসতে চাচ্ছে। আর এ ব্যাপারে জাতীয় সংসদে বিরোধী দলের চীফ হুইপ জয়নাল আবদিন ফারম্নক সরকারী দলের চীফ হুইপ উপাধ্যৰ আবদুস শহীদ ও স্পীকার আবদুল হামিদ এ্যাডভোকেটের সঙ্গে যোগাযোগ রৰা করে চলছেন বলে সংশিস্নষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
উলেস্নখ্য, ২০০৯ সালের ২৫ জানুয়ারি নবম জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের শুরম্নর দিনেই চারদলীয় জোটের শরিক জামায়াত ও বিজেপিকে নিয়ে সংসদে যোগ দেয় বিএনপি। কিন্তু ২৮ জানুয়ারি দ্বিতীয় কার্যদিবস থেকে সামনের সারিতে আসন বাড়ানোর দাবিতে সংসদ বর্জন শুরম্ন করে। ১৭ কার্যদিবস অনুপস্থিত থাকার পর ২৩ ফেব্রম্নয়ারি আবার তারা সংসদে ফিরে আসে। ৩৯ কার্যদিবস চলার পর নবম জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন শেষ হয় ৭ এপ্রিল। ৪ জুন থেকে শুরম্ন হয় নবম জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশন। ২৫ কার্যদিবস চলার পর ৯ জুলাই এই অধিবেশন শেষ হয়। কিন্তু বিএনপি তাতে যোগ দেয়নি। ৯ সেপ্টেম্বর থেকে তৃতীয় অধিবেশন শুরম্ন হয়ে ৫ নবেম্বর শেষ হয় ২২ কার্যদিবস চলার পর। তাতেও যোগ দেয়নি বিএনপি।
২০১০ সালের ৪ জানুয়ারি থেকে শুরম্ন হয় নবম জাতীয় সংসদের চতুর্থ অধিবেশন। ৫ এপ্রিল পর্যনত্ম ৩৯ কার্যদিবস চলে এই অধিবেশন। দীর্ঘ ১০ মাস পর এই অধিবেশনের মধ্যভাগে যোগ দেয় বিএনপি। আর ৫ম অধিবেশন শুরম্ন হয় গত বছর ২ জুন থেকে। তবে ২ জুন সংসদে যোগ দিয়ে মাত্র ১৫ মিনিট পর আবার সংসদ বর্জন শুরম্ন করে বিএনপি। ৩৩ কার্যদিবস চলার পর ২২ জুলাই এ অধিবেশন শেষ হয়। কিন্তু এ অধিবেশনে আর সংসদে ফিরে যায়নি তারা। ২০ সেপ্টেম্বর থেকে শুরম্ন হয় ৬ষ্ঠ অধিবেশন যা চলে ৬ অক্টোবর পর্যনত্ম ১১ কার্যদিবস। এ অধিবেশনেও যোগ দেয়নি বিএনপি। গত বছর ৫ ডিসেম্বর থেকে শুরম্ন হয়ে ৯ ডিসেম্বর পর্যনত্ম ৫ কার্যদিবস চলে ৭ম অধিবেশন তাতেও যোগ দেয়নি বিএনপি। আর গত ২৫ জানুয়ারি থেকে শুরম্ন হয়ে নবম জাতীয় সংসদের চলতি ৮ম অধিবেশন গতকাল পর্যনত্ম ৮ কার্যদিবস চলেছে। কিন্তু বিএনপি তাতে এখনও যোগ দেয়নি।
এ ব্যাপারে জানতে চাওয়া হলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য এম কে আনোয়ার বলেন, সংসদে যাওয়ার পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারছে না সরকার। তাই আমরা সংসদে যাচ্ছি না। তবে পরিবেশ নিশ্চিত করলে আমরা অবশ্যই সংসদে যাব। তাই সরকার পরিবেশ সৃষ্টি করবে বলে আমরা অপেৰায় রইলাম।
বিএনপির আরেক স্থায়ী কমিটির সদস্য লে. জেনারেল (অব) মাহবুবুর রহমান বলেন, বিএনপিকে সংসদে ফিরিয়ে নিতে হলে সরকারকেও পদৰেপ নিতে হবে। সরকার ইচ্ছে করলে আলাপআলোচনার মাধ্যমে সমঝোতা করে বিএনপিকে সংসদে ফিরিয়ে নিতে পারে। আর তা করলে গণতস্ত্র আরও শক্তিশালী হবে। দেশের জন্যও মঙ্গলজনক হবে।
জাতীয় সংসদে বিরোধী দলের চীফ হুইপ জয়নুল আবদিন ফারম্নক বলেন, আমরা সবসময়ই সংসদে যাওয়ার পৰে। কিন্তু আমরা যেতে চেয়েও সংসদে যেতে পারছি না। আমরা যে দাবিগুলো দিয়েছি সেগুলোর ব্যাপারে কোন কর্নপাতই করছে না সরকারী দল। তাই সরকারী দল বা স্পীকার আমাদের সংসদে ফিরিয়ে নেয়ার ব্যাপারে কি করে আমরা তা দেখতে চাচ্ছি।