মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
শুক্রবার, ১১ ফেব্রুয়ারী ২০১১, ২৯ মাঘ ১৪১৭
নিপাহ ভাইরাস আপাতত নিয়ন্ত্রণে ॥ স্বাস্থ্য ডিজি
এ পর্যন্ত মৃত ১৮
স্টাফ রিপোর্টার ॥ নিপাহ ভাইরাস সংক্রমণ আপাতত নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে জানালেন স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. খন্দকার মোঃ সিফায়েত উলস্নাহ। বৃহস্পতিবার স্বাস্থ্য অধিদফতরে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা বলেন। সরকারী হিসাবে, হাতীবান্ধায় ৩১ জানুয়ারি নিপাহ ভাইরাসজনিত জ্বরে আক্রানত্ম হয়ে মৃতু্যর প্রথম ঘটনার পর শনিবার পর্যনত্ম মোট ২৪ জন এ রোগে আক্রানত্ম হয়েছেন। এর মধ্যে মারা গেছেন ১৭ জন। তবে স্থানীয়দের হিসাবে, এই সময়ে মৃতু্যর সংখ্যা আরও বেশি। নিপাহ ভাইরাস ছড়ায় মূলত বাদুড়ের মাধ্যমে। এ ভাইরাসে আক্রানত্ম হলে প্রথমে প্রচ- জ্বর, মাথাব্যথা, খিচুনি ও শ্বাসকষ্ট দেখা দিতে পারে। এক পর্যায়ে রোগী প্রলাপ বকতে শুরম্ন করে এবং অজ্ঞান হয়ে পড়ে। এ রোগে আক্রানত্মদের পরিচর্যার ক্ষেত্রেও সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন চিকিৎসকরা।
এদিকে দিনাজপুরের পার্বতীপুরে বৃহস্পতিবার মাহফুজা আক্তার মামনি নামে ১০ বছরের এক শিশুর মৃতু্য হয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. খন্দকার মোঃ সিফায়েত উলস্নাহ সংবাদ সম্মেলনে বলেন, সঙ্কট চলছিল তা এই মুহূর্তে কেটে গেছে। সামগ্রিক পরিস্থিতি আমাদের নিয়ন্ত্রণে চলে এসেছে। লালমনিরহাটের হাতীবান্ধায় নতুন করে আর কোন আক্রানত্মের খবর পাওয়া যায়নি। রংপুর জেলায় বুধবার নতুন করে একজন নিপাহ ভাইরাসে আক্রানত্ম হয়েছে জানিয়ে তিনি এ নিয়ে আতঙ্কিত না হয়ে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন।
আইইডিসিআর সূত্র জানায়, গত সপ্তাহের শুরম্নতেই হাতীবান্ধায় এ জ্বরের প্রাদুর্ভাব দেখা যায়। এতে কয়েকজনের মৃতু্যর পর জ্বর তদনত্ম্তে রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) এক দল গবেষক আক্রানত্ম এলাকায় কাজ শুরম্ন করে। লালমনিরহাটের হাতীবান্ধায় 'জ্বরে' এগারোজনের মৃতু্যর ঘটনায় উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা। এ রোগের জন্য নিপাহ ভাইরাস দায়ী কি না তা খতিয়ে দেখতে শুরম্ন করেন। অবশেষে তাঁরা নিশ্চিত হন যে, লালমনিরহাটের হাতীবান্ধায় জ্বরের কারণ নিপাহ ভাইরাস। রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) পরিচালক অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান বলেন, নিপাহ ভাইরাস নিয়ে সচেতনতা শুধু গণমাধ্যমেই সীমাবদ্ধ। স্থানীয় পর্যায়ে এর সচেতনতা বাড়াতে হবে। আইইডিসিআরের হিসাবে, হাতীবান্ধায় ৩১ জানুয়ারি নিপাহ ভাইরাসজনিত জ্বরে আক্রানত্ম হয়ে মৃতু্যর প্রথম ঘটনার পর শনিবার পর্যনত্ম মোট ২৪ জন এ রোগে আক্রানত্ম হয়েছেন। এর মধ্যে মারা গেছেন ১৭ জন।
এদিকে প্রতিবছরই কিছু লোক নিপাহ ভাইরাসে আক্রানত্ম হলেও চিকিৎসকরা খেজুরের রস খাওয়ার ক্ষেত্রে সাবধান হওয়ার পরামর্শ দেয়া ছাড়া এ রোগ প্রতিরোধে কার্যকর কিছু করতে পারেননি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ভাইরাস ছড়ায় মূলত বাদুড়ের মাধ্যমে। শীতের সময় খেজুর গাছে বাঁধা রসের হাঁড়িতে বাদুড় মুখ দেয় বলে বাংলাদেশে এভাবেই রোগটি মানুষে ছড়ায় বলে চিকিৎসকদের ধারণা। এ রোগে আক্রানত্মদের মসত্মিষ্কে ভয়াবহ প্রদাহ দেখা দেয়। চিকিৎসকরা জানান, বাংলাদেশে সাধারণত ডিসেম্বর থেকে এপ্রিলের মধ্যে নিপাহ ভাইরাসে আক্রানত্ম হওয়ার খবর পাওয়া যায়। এই সময়টাতেই খেজুরের রস সংগ্রহ করা হয়। আর বাদুড় গাছে বাঁধা হাঁড়ি থেকে রস খাওয়ার চেষ্টা করে বলে ওই রসের সঙ্গে তাদের লালা মিশে যায়। আর সেই বাদুড় নিপাহ ভাইরাসে আক্রানত্ম হয়ে থাকলে এবং সেই রস খেলে মানুষের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়তে পারে এ ভাইরাস। আক্রানত্ম মানুষ থেকে মানুষেও ছড়াতে পারে এ রোগ। জ্বরে আক্রানত্ম হওয়ার পর রোগীরা এক পর্যায়ে সংজ্ঞা হারাচ্ছেন এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে তাদের মৃতু্য হয়েছে।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিন বিভাগের ডিন অধ্যাপক ডা. এবিএম আব্দুলস্নাহ বলেন, বলতে গেলে রোগটি পুরোপুরি ছোঁয়াচে। এ জ্বরে আক্রানত্মকে জরম্নরী ভিত্তিতে হাসপাতালে নিতে হবে। আর চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী এন্টিভাইরাস ওষুধ খাওয়ানো যেতে পারে। প্রয়োজনে রোগীকে আইসিইউতে রাখার ব্যবস্থা করতে হবে। রোগীর লালা, কফ-কাশি এমনকি কাপড়-চোপড়ের বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। কাঁচা খেজুরের রস এবং বাদুড় খাওয়া ফলমূলের অংশবিশেষ না খাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
নিজস্ব সংবাদদাতা দিনাজপুরের পার্বতীপুর থেকে জানান, উপজেলার বেলাইচ-ী ইউনিয়নের হাজীপাড়া গ্রামের আরিফউদ্দিনের শিশুকন্যা মাহফুজা আক্তার মামনি (১০) নিপাহ ভাইরাসে আক্রানত্ম হয়ে বৃহস্পতিবার রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে মারা গেছে। বিকেলে দিনাজপুরের সিভিল সার্জন ডাক্তার মনসুর আলী সরকার, উপজেলা হেলথ কমপেস্নঙ্রে স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাক্তার ইফনুস আলী, ডা. আমির ডা. জিয়াসহ একদল স্বাস্থ্য মাঠকর্মী হাজীপাড়া গ্রামে বিকেলে যান। সেখানে তারা সাংবাদিকদের জানান, যেহেতু এখানে নিপাহ ভাইরাস পরীক্ষার কোন যন্ত্রপাতি ও সুযোগ নেই, তাই কেস হিস্ট্রি ও রোগের লক্ষণ পর্যালোচনা করে এই শিশুর নিপাহ ভাইরাসে মৃতু্য হয়েছে বলে তাদের সন্দেহ।
সূত্রমতে, শিশুটি তার মায়ের সঙ্গে জয়পুরহাট খালার বাড়ি যায় ১৫ দিন আগে। বাড়ি ফিরে আসে ২৯ জানুয়ারি। খালার বাড়িতে খেজুরের রসের পায়েশ ও খেজুরের রস খায়। বাড়িতে এসেও সেখান থেকে নিয়ে আসা পায়েস খায়। এ কয়েক দিন সুস্থ থাকার পর ৫ ফেব্রম্নয়ারি সঙ্গে বমি ও মাথাব্যথাসহ জ্বরে আক্রানত্ম হয়। এ অবস্থায় ৫,৬,৭ ফেব্রম্নয়ারি স্থানীয় গ্রাম্য ডাক্তারের পরামর্শে ওষুধ সেবন করে। ৮ ফেব্রম্নয়ারি শ্বাসকষ্ট অবস্থায় অজ্ঞান হয়ে পড়ে। তখন তাকে বিকেলে সৈয়দপুর ৫০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। রাত পর্যনত্ম থাকার পর তাকে ৯ ফেব্রম্নয়ারি বুধবার সকালে পার্বতীপুর ল্যাম্ব হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়। রোগীর লক্ষণ খারাপ দেখে রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে রেফার্ড করা হয়। সেখানে রাত্রিযাপন করে বৃহস্পতিবার ১১টা ৪৫ মিনিটে রোগীর মৃতু্য হয়।