মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
শুক্রবার, ১১ ফেব্রুয়ারী ২০১১, ২৯ মাঘ ১৪১৭
বঙ্গবন্ধুর খুনী নূর চৌধুরীকে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ
সোহেল রহমান ॥ কানাডায় পালিয়ে থাকা বঙ্গবন্ধুর খুনী পলাতক নূর চৌধুরীকে দেশে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। দ্বিপাৰিক সমঝোতার মাধ্যমে খুনী নূর চৌধুরীকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছে সরকার। পাশাপাশি কানাডার সঙ্গে সঙ্গে একটি বন্দী প্রত্যর্পণ চুক্তি স্বাৰরেরও চেষ্টা চলছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সম্ভাব্য কানাডা সফরের আগেই নূর চৌধুরীকে দেশে ফিরিয়ে আনার সব আইনগত জটিলতার অবসান চায় সরকার। এ লৰ্যে কূটনৈতিক তৎপরতা নিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপু মনি শনিবার কানাডা সফরে যাচ্ছেন। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আত্মস্বীকৃত খুনী নূর চৌধুরী দীর্ঘদিন ধরেই কানাডায় পালিয়ে রয়েছেন। অবৈধভাবে বসবাসের অভিযোগে ২০০৯ সালের ডিসেম্বরে তার পাসপোর্ট বাতিল করে অটোয়ায় বাংলাদেশ দূতাবাসে জমা দেয় সেখানকার আইনশৃঙ্খলা রৰাকারী বাহিনী। এর আগে নূর চৌধুরী কানাডায় স্থায়ী বসবাসের অনুমতি চেয়ে আবেদন করলেও তা প্রত্যাখ্যান করে দেশটির সরকার।
বর্তমানে তার পাসপোর্ট বাংলাদেশ মিশনের জিম্মায় রয়েছে। নূর চৌধুরীকে দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়ার অংশ হিসাবে সে সময় আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদও কানাডা সফর করেন। তবে তার আগেই ধূর্ত নূর চৌধুরী তার স্থায়ী বসবাসের আবেদন খারিজের বিরম্নদ্ধে শেষবারের মতো আপীল করেন। তার আপীলটি এখনও বিচারাধীন রয়েছে। এই আপীলটি খারিজ হলেই নূর চৌধুরীকে প্রচলিত আইন অনুযায়ী কানাডা থেকে বহিষ্কার করা হবে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানিয়েছে, বঙ্গবন্ধুর বুকে সরাসরি গুলি বর্ষণকারী এই ঘাতকদের যে কোন মূল্যে দেশে ফেরত এনে মৃতু্যদ- কার্যকর করতে চায় সরকার। তাকে ফেরত আনতে সম্ভাব্য সব ধরনের পদৰেপ নেয়ার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অনুরোধে এর আগে কানাডা সরকার তাকে ফেরত দেয়ার উদ্যোগ নিলেও আইনী বাধার কারণে তা সম্ভব হয়নি। প্রধানমন্ত্রী এ নিয়ে কানাডা সরকারের সঙ্গে কথা বললেও দেশটি জানিয়েছে, আইনী প্রক্রিয়া সম্পন্ন না হওয়া পর্যনত্ম কিছুই করণীয় নেই। তবে মৃতু্যদ-প্রাপ্ত এক খুনীকে কানাডা কোনভাবেই আশ্রয় দেবে না। মৃতু্যদ-ের বিরোধী দেশ থাকায় নূর চৌধুরীর ফাঁসির দ- কমিয়ে তাকে যাবজ্জীবন কারাদ- দেয়া যায় কিনা সে বিষয় বিবেচনার জন্য কানাডা সরকারের পৰ থেকে বিকল্প একটি প্রসত্মাবও দেয়া হয় বলে জানা গেছে। কিন্তু বিষয়টি কোনভাবেই বিবেচনায় আনা সম্ভব নয় বলে কানাডার প্রসত্মাব সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে বাংলাদেশ।
ধূর্ত ঘাতক নূর চৌধুরী বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার সাৰ্য প্রমাণের ভিত্তিতে নিশ্চিত হওয়া গেছে, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট কালো রাতে ধানম-ির ৩২ নম্বরের বাড়িতে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে মেজর নূর চৌধুরী এবং মেজর ডালিম সরাসরি স্টেনগান দিয়ে গুলি করে। এই দুই ঘাতকের গুলিতেই বঙ্গবন্ধু শহীদ হন। তাই দুই ঘাতককে যে কোন মূল্যে দেশে ফিরিয়ে এনে মৃতু্যদ- কার্যকরে বদ্ধপরিকর সরকার। জানা গেছে, '৭৫-এর ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর নবেম্বরের প্রথম সপ্তাহ পর্যনত্ম অন্য ঘাতকদের মতো দেশে অবস্থান করেন নূর চৌধুরী। তবে ১৯৭৫-এর ৩ নবেম্বর কেন্দ্রীয় কারাগারে জাতীয় চার নেতাকে হত্যার পর দিন অন্য ঘাতকদের মতো খুনী নূর চৌধুরীও বিশেষ বিমানে ঢাকা থেকে রেঙ্গুন হয়ে ব্যাঙ্কক চলে যান। সেখান থেকে পাকিসত্মান সরকারের দেয়া বিশেষ বিমানে তারা লিবিয়ায় চলে যান। ১৯৭৬ সালের ৮ জুন নূর চৌধুরীসহ ১২ খুনীকে বিদেশে বাংলাদেশী বিভিন্ন দূতাবাসে চাকরি দেয়া হয়। ইরানে বাংলাদেশ দূতাবাসের সেকেন্ড সেক্রেটারি হিসাবে নিয়োগ পান নূর চৌধুরী। এরপর তিনি ব্রাজিলে চার্জ্য দ্য এ্যাফেয়ার্স হিসাবেও দায়িত্ব পালন করেন। আশির দশকের গোড়ার দিকে এরশাদ সরকারের শাসনামলে নূর চৌধুরী আলজিরিয়ায় বাংলাদেশ দূতাবাসের কাউন্সিলর হিসাবে নিয়োগ পান। এরপর বেশ কয়েক বছর তিনি জার্মানিতে অবস্থান করেন। পরে স্থায়ী বসবাসের আশায় শরণাথর্ী হিসাবে স্বীকৃতি পেতে কানাডা সরকারের কাছে আবেদন করে। জানা গেছে, ভিজিটর ভিসা নিয়ে ১৯৯৬ সালের মাঝামাঝি কানাডায় যায় নূর চৌধুরী। তবে কানাডায় নূর চৌধুরীর স্থায়ীভাবে বসবাসের অনত্মত পাঁচটি আবেদন প্রত্যাখ্যাত হয়। ১৯৯৯ সালে প্রথম তার আবেদনের ওপর শুনানি হয় এবং প্রাথমিক শুনানিতেই তার আবেদন বাতিল হয়। এরপর ২০০২ সালে আরেক দফা শুনানিতেও তার আবেদন গ্রহণ হয়নি। পরে ২০০৪, ২০০৫ এবং ২০০৬ সালে তার তিনটি আবেদন নাকচ করে দেয়া হয়। সর্বশেষ ২০০৭ সালের এপ্রিলে ইমিগ্রেশন এ্যান্ড রিফিউজি আপীল বোর্ড বাংলাদেশের হত্যা মামলার মৃতু্যদ-ে দ-িত হওয়ার কারণে তার আপীল নাকচ করে দেয়।
পলাতক অন্য খুনীদের অবস্থান পলাতক খুনীদের দেশে ফিরিয়ে আনতে কূটনৈতিক তৎপরতার পাশাপাশি আনত্মর্জাতিক পুলিশ সংস্থা ইন্টারপোলের মাধ্যমেও চেষ্টা চলছে। জানা গেছে, পলাতক খুনীদের মধ্যে আবদুর রশিদ লিবিয়ায়, শরিফুল হক ডালিম পাকিসত্মানে অবস্থান করছেন। অন্যরা দ্রম্নত অবস্থান পাল্টাচ্ছেন। এর মধ্যে রাশেদ চৌধুরী যুক্তরাষ্ট্র, আব্দুল মাজেদ ও মোসেলেমউদ্দিন ভারতে অবস্থান করছেন। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী শরিফুল হক ডালিম পাকিসত্মান ছাড়াও হংকংয়ে বসবাস করেন। এই খুনী বর্তমানে পাকিসত্মানের পাসপোর্ট ব্যবহার করে বিভিন্ন দেশে যাতায়াত করেন। সরকারী পৃষ্ঠপোষকতায় সে পাকিসত্মানে স্থায়ী বসতি গড়ে তুলছে। ভারতের পলাতক খুনী আব্দুল মাজেদ ও মোসলেম উদ্দিনকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনতে ভারত সরকারের সহায়তা চাওয়া হয়েছে। গত মাসে ঢাকায় বাংলাদেশ-ভারত স্বরাষ্ট্রসচিব পর্যায়ের বৈঠক চলাকালে ভারতের স্বরাষ্ট্রসচিব জি কে পিলস্নাই দুই খুনীকে ফেরত পাঠানোর বিষয়ে সহায়তার আশ্বাস দিয়েছেন। খুনী রশিদ লিবিয়ায় স্থায়ীভাবে বসবাস করলেও পাকিসত্মান এবং মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশে তার অবাধ যাতায়াত রয়েছে বলে জানা গেছে। বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে রশিদ পাকিসত্মানে অবস্থান করে বলে খবর রয়েছে। এমনকি ঘৃণীত এই খুনী সে সময় গোপনে বাংলাদেশে আসে বলেও সংবাদ মাধ্যমে প্রচারিত হয়। সূত্র জানায়, দীর্ঘদিন লিবিয়ায় অবস্থান করায় রশিদ সেখানকার মাদক ও অস্ত্র চোরাচালান ব্যবসায় জড়িত হয়। সিসিলি দ্বীপের মাফিয়া ডনদের আসত্মানায়ও তার নিয়মিত যাতায়াত রয়েছে। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ৰমতা গ্রহণের পর দেশ থেকে পালিয়ে যায় এই খুনী। একই বছরের ১৫ ফেব্রম্নয়ারি কলঙ্কিত ৬ষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কুমিলস্নার একটি আসন থেকে তাকে বিজয়ী করে সংসদে বিরোধী দলের নেতা নির্বাচিত করে বিএনপি। খুনীদের একজন আজিজ পাশা ২০০১ সালে পলাতক অবস্থায় জিম্বাবুইয়েতে মারা যায়।