মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
শুক্রবার, ১১ ফেব্রুয়ারী ২০১১, ২৯ মাঘ ১৪১৭
চার পিএসআই কোম্পানি লুটে খাচ্ছে ১১ কোটির কাজ ৩৫০ কোটিতে!
অর্থমন্ত্রীর ঘোষণাও অকার্যকর ॥ রাজস্ব আয়ে ব্যাপক ক্ষতি
মোয়াজ্জেমুল হক, চট্টগ্রাম অফিস॥ অবিশ্বাস্য হলেও সত্য যে, মাত্র ১১ কোটি টাকারও কাজ প্রতিবছর করানো হচ্ছে ৩৫০ কোটি টাকারও বেশি ব্যয়ে। তাও আবার মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রায়। দেশের আমদানি বাণিজ্যে শুল্ক আহরণে সঠিকীকরণ ও পণ্যের খালাস কাজ দ্রম্নত ও নিশ্চিতকরণ প্রক্রিয়ায় ৪টি পিএসআই (প্রিশিপমেন্ট ইন্সপেকশন) কোম্পানি লুটেপুটে খাচ্ছে মূল্যবান এ বৈদেশিক মুদ্রা। শুধু তাই নয়, নানা জালিয়াতির মাধ্যমে এসব পিএসআই কোম্পানি আরও শত শত কোটি টাকার নিশ্চিত রাজস্ব আয় সংহার করছে। বিষয়টি নিশ্চিতভাবে অনুধাবনের পর বর্তমান সরকার পণ্যের শুল্কায়নযোগ্য মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে পিএসআই ব্যবস্থার বিকল্প হিসেবে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের শুল্ক বিভাগ নিয়ে যে পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে তা দেশী-বিদেশী স্বার্থান্বেষী মহলের চাপে ঝুলে রয়েছে।
রাজস্ব বোর্ডের দায়িত্বশীল একটি সূত্রে জানানো হয়, সমগ্র বিশ্বের পণ্য মূল্যায়ন ও পরীক্ষণ কাজে শুল্ক কর্মকর্তাদের বিকল্প হিসেবে দেশে মোট ৪টি পিএসআই কোম্পানি কাজ করছে। তারা তাদের ফি বাবদ সরকারের কোষাগার থেকে প্রতিবছর গড়ে ৩৫০ কোটি টাকারও বেশি গ্রহণ করছে। এ ছাড়া মিথ্যা ঘোষণা, আন্ডার ভ্যালুয়েশন, ভুল এইচএস কোড এবং এক পণ্যকে আরেক পণ্যের শ্রেণী বিন্যাসকরণের মাধ্যমে আরও শত শত কোটি টাকার রাজস্ব আয়কে ব্যাহত করছে। দেশে বর্তমানে ৪টি পিএসআই কোম্পানি সিআরএফ (ক্লিন রিপোর্ট অন ফাইন্ডিংস) রিপোর্ট প্রদানে নিয়োজিত। মূলত এদের মাধ্যমে চারটি কাজ সম্পাদিত হচ্ছে। এগুলো হচ্ছে পণ্যের গুণগত মান, পরিমাণ, মূল্য ও এইচএস কোড নির্ধারণ। স্বল্পোন্নত হাতেগোনা কয়েকটি ছাড়া বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বর্তমানে পিএসআই ব্যবস্থা যেখানে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে সেখানে বাংলাদেশে বছরের পর বছর বিভিন্ন পিএসআই কোম্পানি তাদের এক শতাংশ ফি হিসেবে বছরে গড়ে ৩৫০ কোটি টাকারও বেশি বৈদেশিক মুদ্রায় পেয়ে যাচ্ছে। রাজস্ব বোর্ড সূত্রে জানানো হয়, ৩৫০ কোটি টাকার এ কাজ মাত্র ১১ কোটি টাকার সম্পন্ন করা যায় নিশ্চিতভাবে। এ লক্ষ্যে বর্তমান সরকারের অর্থমন্ত্রী গত দুই অর্থবছরের বাজেট ঘোষণাকালে এ সংক্রানত্ম দিকনির্দেশনা প্রদান করলেও তা আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কবলে পড়ে ঝুলে গেছে।
সূত্র জানায়, আগামী ডিসেম্বর মাসের পর বাংলাদেশ থেকে পিএসআই ব্যবস্থা সম্পূর্ণভাবে উঠিয়ে দেয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এ লক্ষ্যে চলতি অর্থবছর বেশকিছু পণ্যকে পিএসআই থেকে বাদ দেয়াও হয়েছে। বর্তমানে এর আওতা আরও হ্রাস করার চিনত্মাভাবনা চলছে। গেল দুই অর্থবছরে অর্থমন্ত্রীর বাজেট ঘোষণায় এ সংক্রানত্ম দিকনির্দেশনা আসার পর জাতীয় রাজস্ব বোর্ড থেকে এ নিয়ে প্রসত্মাবনা প্রেরণ করা হয়, যাতে বলা হয়েছে সমগ্র বিশ্বকে সুবিধাজনক দশটি আঞ্চলিক এলাকায় ভাগ করতে হবে। এসব এলাকা হচ্ছে ভারত, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, চীন, নিউইয়র্ক, জাপান, ইতালি, দক্ষিণ কোরিয়া ও সংযুক্ত আরব আমিরাত। এসব এলাকার বাংলাদেশী মিশন ও দূতাবাসগুলোতে ১০টি উইং সৃষ্টি করে তাতে শুল্ক কর্মকর্তাদের পদ সৃষ্টি করতে হবে। এতে অতিরিক্ত কমিশনার পদমর্যাদার ৪ এবং যুগ্ম কমিশনার পদমর্যাদার ১০ জনকে পদায়ন করতে হবে। যারা পিএসআইর বিকল্প হিসেবে এ সংক্রানত্ম কার্যক্রম সম্পাদন করবে। এর বিপরীতে সরকারের ব্যয় হবে মাত্র ১১ কোটি টাকা। পিএসআই ব্যবস্থার বিকল্প হিসেবে বিদেশে বাংলাদেশী মিশন ও দূতাবাসগুলোতে শুল্ক বিভাগীয় জনবল নিয়োগের গুরম্নত্বও অর্থমন্ত্রী বিগত দু'বছরের বাজেট বক্তৃতায় তুলে ধরেন। ২০০৯ সালের ২৯ ডিসেম্বর অর্থমন্ত্রী একটি সারসংক্ষেপে স্থলপথে পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে কলকাতায় শুল্ক কর্মকর্তাদের পদ সৃষ্টির বিষয়ে দ্রম্নত ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশনা প্রদান করেন। এ ছাড়া পিএসআই পরবতর্ী সময়ে বিদেশে কর্মকর্তাদের ইউনিট গঠন এবং প্রয়োজনীয় জনবল সৃষ্টির রূপরেখার অগ্রগতি জানানোর নির্দেশনা দেন, যা গত দুই অর্থবছরে ঘোষিত বাজেটের সারসংক্ষেপেও এসব পদ সৃষ্টির বিষয়ে তিনি অনুমোদন প্রদান করেন।
সূত্র জানায়, সরকার যেখানে পিএসআই ফি বাবদ সরকারী অর্থ ব্যয় হ্রাস এবং বিকল্প হিসেবে শুল্ক কর্মকর্তাদের ক্ষমতা তৈরির লক্ষ্যে নীতিগত সিদ্ধানত্ম নিয়েছে সেখানে আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় তা ঝুলে থাকে কিভাবে। এ পরিস্থিতিতে বিদেশে ১০টি মিশন ও দূতাবাসে শুল্ক কর্মকর্তাদের পদ সৃষ্টির বিষয়টি জরম্নরী। কেননা, চলতি বছরের ডিসেম্বরের পর সরকারী সিদ্ধানত্ম অনুযায়ী পিএসআই ব্যবস্থা বিলুপ্ত হলে রাজস্ব আয় ও পণ্যের খালাস কাজ দ্রম্নত ও সহজকরণে শুল্ক কর্মকর্তাদের বিকল্প হিসেবে কাজ করতে হবে। নচেত পণ্যের শুল্কায়নযোগ্য মূল্য নির্ধারণে জটিলতা এবং পণ্যের খালাস কাজ বিলম্বিত হতে পারে। সূত্র জানায়, পিএসআই পদ্ধতি প্রত্যাহারের পর থেকে দশটি আঞ্চলিক এলাকায় এ জাতীয় পদ প্রতিষ্ঠিত হলে তা থেকে আমদানি পণ্যের মূল্যায়নে সংশিস্নষ্ট শুল্ক আদায় কেন্দ্রগুলোতে তথ্য সরবরাহ ছাড়াও চোরাচালান সম্পর্কিত তথ্যসহ বাংলাদেশে রফতানির পণ্যের প্রিশিপমেন্ট ইন্সপেকশন কাজ সম্পাদন করতে পারবে। পাশাপাশি সংশিস্নষ্ট রফতানির দেশগুলোর বিশ্ব বাণিজ্যের সর্বশেষ অবস্থান, নীতি ও ধারার তথ্য দেশে সরবরাহ করে দেশীয় পণ্যে ও বাণিজ্য সম্প্রসারণে সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারবে। এ ছাড়াও এসব কর্মকর্তা সংশিস্নষ্ট দেশ থেকে আধুনিকায়নের নো-হাউ ট্রান্সফার করার বিষয়ে প্রয়োজনীয় তথ্য সরবরাহ দিতে সক্ষম হবে।
এদিকে, প্রতিবছর মোটা অঙ্কের বৈদেশিক মুদ্রার অর্থ ফি বাবদ গ্রহণ করার পাশাপাশি পিএসআই কোম্পানিগুলোর নানা অনিয়মের কারণে সরকারের মোটা অঙ্কের রাজস্ব প্রতিনিয়ত হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে। এর পরিমাণ সুনির্দিষ্ট অঙ্কে বলা না গেলেও তা শত শত কোটি টাকা। পিএসআই কোম্পানিগুলোর মিথ্যা ঘোষণা, আন্ডারভ্যালু, এইচএস কোড ভুল দেয়া, এক পণ্যকে অন্য পণ্যে শ্রেণীবিন্যাস করার কারণে সরকার মোটা অঙ্কের নিশ্চিত রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, সুবিধাবাদী ও অতি মুনাফালোভী আমদানিকারকদের সঙ্গে যোগসাজশে পিএসআই কোম্পানিগুলো এ জাতীয় কাজে লিপ্ত রয়েছে বহু আগে থেকে। আবার যেসব আমদানিকারক তাদের সঙ্গে দফারফা করে না তাদের নানাভাবে হয়রানিতে ফেলছে। এসব প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন কাস্টমস হাউস বিভিন্ন পিএসআই কোম্পানিকে নানা অঙ্কের জরিমানাও করছে। আবার আমদানিকারকরা পিএসআই কোম্পানিগুলোর চাপিয়ে দেয়া সিদ্ধানত্মের বিরম্নদ্ধে আদালতে যাচ্ছে। এ নিয়ে বর্তমানে পিএসআই কোম্পানিগুলোকে নিয়ে উচ্চ আদালতে মামলার সংখ্যা ৮ হাজারেরও বেশি বলে শুল্ক বিভাগীয় সূত্রে জানা গেছে। উলেস্নখ্য, বাংলাদেশে বর্তমানে যে চারটি পিএসআই কোম্পানি কাজ করছে সেগুলো হচ্ছে বু্যরো ভেরিটাস, এসজিএস, অমিক ও আইটিএস (ইন্টারটেক টেস্টিং সার্ভিস)।