মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
শুক্রবার, ১১ ফেব্রুয়ারী ২০১১, ২৯ মাঘ ১৪১৭
মোবারক যাচ্ছে
০ ক্ষমতা হস্তান্তর হচ্ছে ভাইস প্রেসিডেন্টের কাছে
০ জনতার দাবিতে প্রতি সেনা সমর্থন
০ তাহরির চত্বরে প্রতীক্ষায় লাক্ষো মানুষ
জনকণ্ঠ ডেস্ক ॥ প্রবল গণআন্দোলনের মুখে বিদায়ঘণ্টা বেজে গেছে মিসরের একনায়ক হোসনি মোবারকের। মোবারক রাতেই পদত্যাগ করতে পারেন_ বিশ্বজুড়ে চলছে এমন জল্পনাকল্পনা। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে মোবারকের বিদায়ঘণ্টা বেছে গেছে। মোবারকবিরোধী টানা আন্দোলনের ১৭তম দিন গড়িয়ে সন্ধ্যা নামার আগেই দেশজুড়ে মোবারকের পদত্যাগের গুজব ছড়িয়ে পড়ে। সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে গুজব ডালপালা মেলতে থাকে। শাসক দল ন্যাশনাল ডেমোক্র্যাটিক পার্টির (এনডিপি) মহাসচিব হোসেন বাদরাবি প্রথম প্রেসিডেন্ট মোবারকের পদত্যাগের ইঙ্গিত দিয়ে পত্রিকায় বক্তব্য দেন। তিনি বিবিসি ও চ্যানেল-ফোর-কে বলেন, মোবারক তাঁর ভাইস প্রেসিডেন্ট ওমর সুলেইমানের কাছে ৰমতা হস্তান্তর করতে পারেন। তার এ বক্তব্য আরও জোরদার হয় প্রধানমন্ত্রী আহমেদ সাইফের বক্তব্যে। তিনি বিবিসিকে বলেছেন, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় মোবারক ক্ষমতা থেকে সরে দাঁড়াবেন। সার্বিক পরিস্থিতি শীঘ্রই ব্যাখ্যা করা হবে। বাংলাদেশ সময় রাত ১০টার দিকে বিভিন্ন অনলাইন সংবাদ মাধ্যমের খবরে বলা হয়, মোবারক রাতে টেলিভিশনে জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেবেন এবং সেখানে তিনি ক্ষমতা হস্তান্তরের বিষয়টি পরিষ্কার করবেন। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ'র পরিচালক লিওন পানেত্তার বরাত দিয়ে অপর এক খবরেও মোবারকের পদত্যাগের বিষয়টি আরও পরিষ্কায় হয়ে যায়। তিনি বলেছেন, বৃহস্পতিবার রাতেই ক্ষমতা থেকে মোবারকের সরে দাঁড়ানোর ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। অবিলম্বে মোবারকের পদত্যাগের এক দফা দাবিতে গণআন্দোলনের ১৭তম দিনে অনেকটা নিরুপায় হয়ে নড়েচড়ে বসে মোবারকের নিজ হাতে গড়া সেনাবাহিনীর শীর্ষ জেনারেলরা। দেশের প্রতিরৰামন্ত্রী মোহাম্মদ তানতাবিরের সভাপতিত্বে বৃহস্পতিবার বিকেলে মিসরের সশস্ত্র বাহিনীর সুপ্রীম কাউন্সিলের জরুরী বৈঠক হয় এবং গত ৩০ বছরের ইতিহাসে এই প্রথম প্রেসিডেন্টকে বাদ দিয়ে এ ধরনের বৈঠক হয়। আর এ খবর বাইরে ছড়িয়ে পড়ার পরই দেশজুড়ে রব ওঠে গণবিস্ফোরণের কাছে মাথা নত করে শেষ পর্যনত্ম ৰমতা ছাড়তে বাধ্য হচ্ছেন মোবারক। গত কয়েকদিন ধরে নানা টালবাহানার মাধ্যমে ৰমতা অাঁকড়ে থাকতে বেশ কিছু লোক দেখানো পদৰেপ নিলেও তাতে বিৰুব্ধ জনতাকে সামলানো যাচ্ছিল না। বুধবার থেকেই তারা নতুন করে আন্দোলনের ডাক দেয়। এ আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে গোটা দেশে। গণআন্দোলনের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে বৃহস্পতিবার হাসপাতাল ছেড়ে রাজপথে নেমে আসে শত শত চিকিৎসক, আইনজীবী, মেডিক্যালের ছাত্র থেকে শুরু করে পরিবহন শ্রমিকরাও। আর এর পরই মিসরের পরিস্থিতিতে নাটকীয় পরিবর্তন ঘটতে থাকে। চূড়ান্ত আন্দোলনের অংশ হিসেবে বৃহস্পতিবার কায়রোর একটি বিরাট অংশের নিয়ন্ত্রণ চলে যায় আন্দোলনকারীদের দখলে। গত কয়েকদিন ধরে বিৰোভকারীদের ওপর সেনাবাহিনীর নির্যাতনের নানা অভিযোগ শোনা গেলেও বৃহস্পতিবার সেনাবাহিনীর আচরণে ব্যাপক পরিবর্তন লৰ্য করা যায়। সেনাবাহিনী বৃহস্পতিবার এক বিবৃতিতে বলেছে, জনগণের বৈধ দাবিদাওয়ার প্রতি সাড়া দিতে তারা প্রস্তুত। মিসরের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেয়া এ বিবৃতিতে বলা হয় জনগণের নিরাপত্তা বিধানই সেনাবাহিনীর সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। গত কয়েকদিন মিসরের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের নানা ইস্যুতে ব্যাপক মতপার্থক্য ফুটে উঠতে থাকে। গভীর রাত পর্যন্ত রাজধানী কায়রোর রাজপথে লাখ লাখ লোক মোবারকের ভাষণ শোনার অপেক্ষায় প্রহর গুনছিল। তবে মোবারকের তথ্যমন্ত্রী রাতেও বলেছেন, না মোবারক পদত্যাগ করছেন না। কায়রোর ভাইস প্রেসিডেন্ট ওমর সুলেইমানের সঙ্গে প্রেসিডেন্ট হোসনি মোবারকের বৈঠকের দৃশ্য রাতে রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেখানো হলেও কখন এ বৈঠক হয় তার দিনৰণ বলা হয়নি।
যুক্তরাষ্ট্র ও মিসর দৃশ্যত মুখোমুখি অবস্থানে দাঁড়িয়ে যায়। যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত দেশটি উল্টো যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর সমালোচনায় মুখর হয়ে ওঠে। মিসরের ভাইস প্রেসিডেন্ট ওমর সুলেইমানের পর সর্বশেষ মিসরের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আহমেদ আবুল গেইত জরম্নরী আইন তুলে নেয়ার মার্কিন দাবি সরাসরি নাকচ করে দিয়ে বৃহস্পতিবার বলেছেন, বন্ধুপ্রতিম একটি বড় দেশের ওপর যুক্তরাষ্ট্র যেভাবে তার ইচ্ছা চাপিয়ে দিচ্ছে তা উচিত নয়। বিশেস্নষকরা এসব ঘটনাকে যুক্তরাষ্ট্রের বিরম্নদ্ধে মিসরের এক ধরনের চ্যালেঞ্জ হিসেবে মনে করছে। দেশের রাজনৈতিক সংস্কার আরও গতিশীল করার মার্কিন দাবিও পররাষ্ট্রমন্ত্রী নাকচ করে দেন। ওমর সুলেইমান ওবামা প্রশাসনকে সামরিক অভু্যত্থানের হুমকি দেয়ার পর মোবারক সরকারের আরেক গুরম্নত্বপূর্ণ মন্ত্রীর এ মনত্মব্যে দেশে ব্যাপক বিতর্কের ঝড় ওঠে। বৃহস্পতিবার দ্বিতীয় দিনের মতো মিসরের শ্রমিক ইউনিয়নের ডাকা সাধারণ ধর্মঘট অব্যাহত থাকে। বৃহত্তম কারখানার শ্রমিকরা তিন সপ্তাহব্যাপী চলমান বিক্ষোভে সংহতি জানাতে এবং বেতন বাড়ানোর দাবিতে ধর্মঘটের ডাক দেয়। আন্দোলনের ১৭তম দিনে বৃহস্পতিবার শত শত ডাক্তার হাসপাতাল ছেড়ে আন্দোলনের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করে রাসত্মায় বেরিয়ে আসেন। তিন সহস্রাধিক আইনজীবীও একই দিন কায়রোর রাসত্মায় নেমে মোবারকের পদত্যাগের দাবিতে মিছিল করে। বাসচালক, হেলপার থেকে শুরম্ন করে পরিবহন শ্রমিকরাও মোবারকবিরোধী আন্দোলনের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করে রাসত্মায় মিছিল করে। এসব আন্দোলন মোবারকের ওপর যে বাড়তি চাপ সৃষ্টি করবে এতে কোন সন্দেহ নেই। সেনাবাহিনীর বিরম্নদ্ধে নির্যাতনের অভিযোগ ক্রমেই বাড়ছে। ইতোমধ্যেই সাংবাদিকসহ বহু নাগরিককে গ্রেফতার করা হলেও পরে তাদের আর খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না বলে মানবাধিকার সংস্থাগুলো অভিযোগ করেছে। সম্প্রতি বহু আন্দোলনকারীকে গ্রেফতার করা হয়েছে এবং এ সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে।
মিসরের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আহমেদ আবুল গেইত বৃহস্পতিবার বলেন, তড়িঘড়ি করে কোন রাজনৈতিক পরিবর্তন নিয়ে আসা অত্যনত্ম ঝুঁকিপূর্ণ হবে। এক সাক্ষাতকারে গেইত বলেন, "মিসরের মতো এত বড় একটি বন্ধু দেশ যে কিনা সবসময় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সবচেয়ে বেশি সুসম্পর্ক বজায় রেখে চলেছে, তাকে যখন আপনারা বলেন_ এখনই, এ মুহূর্তে, অবিলম্বে এটা বা সেটা করতে হবে তখন তা কোন কিছু চাপিয়ে দেয়ার মতোই মনে হয়_ আপনারা তার ওপর আপনাদের ইচ্ছা চাপিয়ে দিচ্ছেন।" যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের মিসরে অবিলম্বে জরম্নরী অবস্থা তুলে নেয়ার আহ্বানেরও তীব্র সমালোচনা করে গেইত বলেন, এতে তিনি 'বিস্মিত' হয়েছেন। আন্দোলনের দু'সপ্তাহে কায়রোর দৃশ্যপট কতখানি বদলে গেছে আর দেশটির ভবিষ্যতসহ মধ্যপ্রাচ্যে আগামীতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব কতটা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে সে কথাই মনে করিয়ে দিচ্ছে মিসরের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের এই নতুন সংঘাত। মিসরে আন্দোলন জোরদার হতে থাকায় যুক্তরাষ্ট্র বারবারই কায়রোয় সরকারকে আরও বেশি কিছু করার জন্য চাপ দিচ্ছে। 'প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ' নেয়ার জন্য মিসর সরকারের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র রবার্ট গিবস বলেছেন, সরকার এমন কোন 'প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ' গ্রহণ করেনি যাতে করে জনগণ আশ্বসত্ম হতে পারে। আর এ দুঃখবোধ থেকেই বাইরে প্রতিবাদী মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। গিবস আরও বলেন, মিসরে পরিচালিত যুক্তরাষ্ট্রের সাহায্য সংস্থাগুলোর কর্মকা- পর্যালোচনা করবে মার্কিন সরকার।