মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
বৃহস্পতিবার, ৬ জানুয়ারী ২০১১, ২৩ পৌষ ১৪১৭
চলতি মাসেই বিদ্যুতের দাম বাড়ছে
স্টাফ রিপোর্টার ॥ চলতি মাসেই বিদ্যুতের বাল্ক মূল্যহার (পাইকারি দাম) বৃদ্ধি করা হচ্ছে। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) বিদু্যত উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) বাল্ক মূল্যহার বৃদ্ধির প্রস্তামাবটি আমলে নিয়েছে। বুধবার রাজধানীর কারওয়ানবাজারে বিইআরসি কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত উন্মুক্ত সভায় জানানো হয়েছে, আগামী ১৬ জানুয়ারি পর্যন্ত মূল্য বৃদ্ধির ওপর স্টেকহোল্ডার মতামত নেয়া হবে। মতামতগুলো যাচাই-বাছাই করে ২৭ জানুয়ারি গণশুনানি করার পর দাম বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।
বিইআরসি চেয়ারম্যান সৈয়দ ইউসুফ হোসেনের সভাপতিত্বে বৈঠকে বিইআরসি সদস্য সেলিম মাহমুদ, ইমদাদুল হক, পিডিবি চেয়ারম্যান এসএম আলমগীর কবীরসহ পিডিবি, বিভিন্ন বিদু্যত বিতরণ কোম্পানি, বিদ্যুত মন্ত্রণালয়, ব্যবসায়ী প্রতিনিধি, বিশেষজ্ঞরা উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠকে পিডিবির পক্ষ থেকে দাম বৃদ্ধির প্রস্তাবনা সবার সামনে উপস্থাপন করা হয়। এতে ২০১৩ সাল পর্যন্ত বিদ্যুত উৎপাদন চিত্রের সঙ্গে উৎপাদন ব্যয় তুলে ধরা হয়। গ্যাসের ওপর একক নির্ভরতা কমিয়ে জ্বালানি হিসেবে তেলকে প্রাধান্য দেয়ায় উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি পাচ্ছে বলে জানানো হয়। দাম বৃদ্ধি না করলে আগামী ২০১৩ সাল পর্যনত্ম সরকারকে ২০ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হবে। আগামী পাঁচ বছরে ভতর্ুকির পরিমাণ দাঁড়াবে ৪২ হাজার কোটি টাকা। বিপুল পরিমাণ ভতর্ুকি দিয়ে সরকারের পৰে বিদু্যত খাত টিকিয়ে রাখা সম্ভব হবে না। প্রসত্মাবটিতে বলা হয়েছে, এখনকার দামে বিদু্যত বিক্রি করলে চলতি বছর ভতর্ুকি দিতে হবে তিন হাজার ৪০০ কোটি টাকা। আগামী বছর যা হবে ছয় হাজার কোটি টাকা। ২০১৩ সালে এর পরিমাণ দাঁড়াবে ১০ হাজার কোটি টাকা। সরবরাহ ব্যয়ের তুলনায় বিদু্যতের মূল্যহার বৃদ্ধি না পাওয়ায় ২০০৬-০৭ থেকে পরবর্তী তিন বছর ৬০০ কোটি টাকা এবং গত অর্থবছরে রেন্টাল বিদু্যত কেনার জন্য পিডিবি'কে ৩৯৪ কোটি টাকা ঋণ দেয়া হয়। সরকারী ঋণের কিসত্মির পরিমাণ বৃদ্ধি পাওয়ায় ব্যয়ের পরিমাণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। পিডিবির প্রসত্মাবে বলা হয়েছে, সরবরাহ ব্যয় ও পিডিবির লোকসানের পরিমাণ হ্রাসের জন্য ২০১১-১২ সালের প্রাক্কলিত ব্যয়ের ভিত্তিতে মূল্যহার বৃদ্ধি করা প্রয়োজন।
গ্রাহক পর্যায়ে দাম বৃদ্ধি সহনীয় পর্যায়ে রাখতে পিডিবি প্রতি ৬ মাস অনত্মর বিদু্যতের পাইকারি দাম ১২ শতাংশ হারে বাড়ানোর প্রসত্মাব করেছে। প্রসত্মাবে বলা হয়েছে, প্রতিবছর পাইকারি পর্যায়ে বিদু্যতের দাম বৃদ্ধির হার দাঁড়াবে ২৫ দশমিক ৩০ শতাংশ। সে অনুযায়ী, বর্তমানে প্রতি ইউনিট পাইকারি বিদু্যতের দাম যেখানে দুই টাকা ৩৭ পয়সা, সেখানে ১ জানুয়ারি ২০১১ থেকে তা হবে ২ টাকা ৯৭ পয়সা, ১ জুলাই ২০১১ থেকে তা হবে ৩ টাকা ৩৩ পয়সা, ১ জানুয়ারি ২০১২ থেকে হবে ৩ টাকা ৭২ পয়সা, ১ জুলাই ২০১২ থেকে হবে ৪ টাকা ১৭ পয়সা এবং ১ জানুয়ারি ২০১৩ থেকে ৪ টাকা ৬৮ পয়সা।
প্রসত্মাবিত দাম বৃদ্ধির পরেও ট্যারিফ মূল্য ও সরবরাহ ব্যয়ের পার্থক্যের কারণে ২০১০-১১ অর্থবছরে পিডিবি'কে দুই হাজার ৩৩৪ কোটি, ২০১১-১২তে দুই হাজার ৯৫৯ কোটি, ২০১২-১৩তে দুই হাজার ৫৭ কোটি টাকা ভতর্ুকি দিতে হবে।
বৈঠকে পিডিবি চেয়ারম্যান বলেন, শীঘ্রই রেন্টাল বিদু্যত কেন্দ্রগুলো উৎপাদনে আসছে। রেন্টাল বিদু্যত কেন্দ্রের কাছ থেকে বিদু্যত কেনার জন্য অতিরিক্ত অর্থের প্রয়োজন হবে। এ জন্য যত দ্রম্নত সম্ভব বিদু্যতের বাল্ক মূল্যহার বৃদ্ধির প্রসত্মাব করেন তিনি। একই সঙ্গে জ্বালানি মূল্য ১০ ভাগের বেশি বৃদ্ধি পেলে তা মূল্য বৃদ্ধির সঙ্গে সমন্বয় করার পৃথক একটি প্রসত্মাব দেয়া হবে বলে জানান।
বৈঠকে ভোক্তা এবং ব্যবসায়ীদের পৰ থেকে বিদু্যতের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ দেয়ার আগে বিদু্যতের দাম বৃদ্ধির যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। দাম বৃদ্ধি পেলে শিল্পে বিনিয়োগ কম হবে এবং জাতীয় প্রবৃদ্ধি অর্জন বিঘি্নত হবে বলে ঢাকা চেম্বারের প্রতিনিধি অভিযোগ করেন।
বিইআরসি চেয়ারম্যান এর জবাবে বলেন, দাম না বৃদ্ধি করলে ভর্তুকি দিতে দিতে বিদু্যত খাত ধ্বংস হয়ে যাবে। এছাড়া দাম না বাড়লে বিনিয়োগ বেশি হবে_ এমনটা ভাবা ঠিক নয়। পৃথিবীর উন্নত দেশে কোথাও সাবসিডি দিয়ে শিল্প টিকিয়ে রাখার নজির নেই। চেয়ারম্যান বলেন, দাম বাড়লে সেবার মান অবশ্যই বৃদ্ধি করতে হবে। দাম বৃদ্ধি না করা হলে সেবার মান বৃদ্ধির জন্য অর্থের যোগান কোত্থেকে আসবে বলেও তিনি ব্যবসায়ীদের প্রশ্ন করেন।
একই প্রসঙ্গে পিডিবি চেয়ারম্যান বলেন, অধিকাংশ শিল্প প্রতিষ্ঠানে বিদু্যতের খরচ মোট ব্যয়ের ১০ ভাগের বেশি নয়। কিন্তু যখনই বিদু্যতের দাম বৃদ্ধি করা হয়, তখন একই হারে শিল্প পণ্যের দাম বৃদ্ধি পায়, যা দুঃখজনক। সেবার মান বৃদ্ধি এবং জনগণকে বেশি সময় ধরে বিদু্যত দেয়ার জন্য সরকার বিদু্যত উৎপাদন করছে বলে উলেস্নখ করেন চেয়ারম্যান। সেদিক দিয়ে সেবার মান বৃদ্ধি পাবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। বিতরণ কোম্পানিগুলোর 'সিস্টেম লস' (কারিগরি এবং বিতরণ ৰতি) আনত্মর্জাতিক মানে এক সংখ্যায় নামিয়ে আনার চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে এর জন্য বিতরণ উপকরণও আনত্মর্জাতিক মানে উন্নীত করা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।
বিদু্যত বিতরণ কোম্পানিগুলো বাল্ক মূল্যহার বৃদ্ধির সঙ্গে ভোক্তা পর্যায়ে (খুচরা) দাম বৃদ্ধির সুপারিশ করে। বাল্কের সঙ্গে খুচরা দর বৃদ্ধি না করলে বিতরণ কোম্পানিগুলো আর্থিক ৰতির সম্মুখীন হবে বলে জানায় তারা। প্রসঙ্গত, সর্বশেষ ২০০৮ সালের ১ অক্টোবর থেকে পাইকারি পর্যায়ে বিদু্যতের বাল্ক মূল্যহার ১৬ ভাগ বৃদ্ধি করা হয়।