মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
বৃহস্পতিবার, ৬ জানুয়ারী ২০১১, ২৩ পৌষ ১৪১৭
আকস্মিক আমদানি কমে গেছে ভোজ্যতেলের, উদ্দেশ্য কী!
সরকারকে আগাম সতর্ক করেছে শীর্ষ একটি গোয়েন্দা সংস্থা
মিজান চৌধুরী ॥ ভোজ্যতেলের আকস্মিকভাবে আমদানি কমেছে। গত দুই মাসে এক লাখ ৬ হাজার মেট্রিক টন ভোজ্যতেলের এলসি কম খোলা হয়েছে। টাকার অঙ্কে ৩১০ কোটি টাকার ভোজ্যতেল আমদানি কমেছে। মিল মালিকদের আকস্মিক এই আমদানি কমিয়ে দেয়ার পিছনে কৃত্রিম সঙ্কট সৃষ্টি করার উদ্দেশ্য কিনা তা খতিয়ে দেখতে মাঠে নেমেছে গোয়েন্দা সংস্থা।
মোটা দাগের আমদানি কমিয়ে দেয়ার ফলে ভোজ্যতেলের বাজার নিয়ে সরকারকে আগাম সতর্ক করেছে শীর্ষ পর্যায়ের একটি গোয়েন্দা সংস্থা। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে বিষয়টি ক্লোজ মনিটরিং করছে।
গোয়েন্দা সংস্থার আগাম সতর্ক করে দেয়ার বিষয়টি স্বীকার করেছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল উর্ধতন এক কর্মকর্তা। তিনি জনকণ্ঠকে জানান, বিষয়টি নিয়ে আমরাও আশঙ্কায় আছি। তবে পাইপলাইনে আড়াই লাখ মেট্রিক টন ভোজ্যতেল রয়েছে। এছাড়া আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্য বৃদ্ধির বিষয়টিও এর সঙ্গে জড়িত থাকতে পারে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে নিবিড়ভাবে পর্যবেৰণ করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ আমদানির পরিসংখ্যান থেকে দেখা গেছে, ২০০৯ সালের তুলনায় গত নবেম্বর ও ডিসেম্বর এই দুই মাসে ভোজ্যতেলের কাঁচামাল অপরিশোধিত আমদানি মোটা দাগে কম হয়েছে।
গত নবেম্বর ক্রুড আমদানির এলসি খোলা হয় ৭০ হাজার মেট্রিক টন। বিগত ২০০৯ সালের নবেম্বরে এলসি খোলা হয় এক লাখ ৬ হাজার টন। শুধু নবেম্বরেই ৩৬ হাজার মেট্রিক টন অপরিশোধিত ভোজ্যতেল আমদানির এলসি কম খোলা হয়েছে। ডিসেম্বরে এসে এলসি খোলার হার আরও নিচে নামে। ওই মাসে এলসি খোলা হয় ১১ হাজার মেট্রিক টন। ২০০৯ সালে একই সময়ে এলসি খোলা হয় ৮১ হাজার মেট্রিক টন। ডিসেম্বরে ৭১ হাজার মেট্রিক টন অপরিশোধিত তেল আমদানির এলসি কম খোলা হয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সূত্র মতে, টাকার অঙ্কে গত নবেম্বর ও ডিসেম্বরে অপরিশোধিত ভোজ্যতেলের অপরিশোধিত আমদানি এলসি খোলা হয়েছে সাড়ে ১০ কোটি ডলারের। ২০০৯ সালের একই সময়ে ১৪ কোটি ১১ লাখ ডলারের এলসি খোলা হয়। ফলে ২০০৯ এর তুলনায় গেল দুই মাসে ৪ কোটি ৪১ লাখ ডলার বা ৩১০ কোটি টাকার অপরিশোধিত ভোজ্যতেল কম আমদানি হয়।
সূত্র মতে, রিফাইনারিদের এই আমদানি কমিয়ে দেয়ার বিষয়টি শীর্ষ পর্যায়ের একটি গোয়েন্দা সংস্থা রিপোর্ট দিয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে শীর্ষ পর্যায়ের ওই গোয়েন্দা সংস্থার উর্ধতন কর্মকর্তা জানান, এলসি খোলার হার সম্প্রতি সময়ে কমে যাওয়ার বিষয়টি আমাদের পৰ থেকে সরকারকে অবহিত করা হয়। তেল আমদানি কমে যাওয়ায় সরবরাহে সঙ্কট সৃষ্টি হবে কিনা তা নজরে রাখা হচ্ছে।
বর্তমানে ১২ থেকে ১৪ লাখ মেট্রিক টন ভোজ্যতেলের চাহিদা রয়েছে দেশে। ওই হিসাবে প্রতিমাসের চাহিদা হচ্ছে এক লাখ থেকে এক লাখ ১০ হাজার মেট্রিক টন। কিন্তু গত দুই মাসে এক লাখ ৬ হাজার মেট্রিক টন অপরিশোধিত ভোজ্য তেল কম আমদানির কারণে সরবরাহে ঘাটতির আশঙ্কা রয়েছে।
এ ব্যাপারে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে সংশিস্নষ্ট উর্ধতন কর্মকর্তা ভোজ্যতেলের এলসি খোলার হার কমে যাওয়া ও গোয়েন্দা সংস্থার সতর্ক করে দেয়ার বিষয়টি স্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, আনত্মর্জাতিক বাজারে বর্তমান এক মেট্রিক টন অপরিশোধিত ভোজ্যতেল দাম ১২শ' ৮০ ডলার চলছে। এছাড়া সরকার ভোজ্যতেল ও চিনি বাজারজাতের ৰেত্রে নতুন বিতরণ পদ্ধতি চালু করতে যাচ্ছে। রিফাইনারি মালিকরা এতে লোকসানের আশঙ্কা থেকে এলসি খোলা কমিয়ে দিতে পারে। তবে বিষয়টি বাণিজ্যমন্ত্রী মুহাম্মদ ফারম্নক খানের কাছে অবহিত করা হয়েছে। তিনি বিদেশ থেকে ফিরেই এ ব্যাপারে রিফাইনারি মালিকদের নিয়ে বসবেন।
তিনি আরও বলেন, এই মুহূর্তে পাইপলাইনে আড়াই লাখ মেট্রিক টন ভোজ্যতেল আসার অপেৰায় রয়েছে। তবে বাজার পর্যবেৰণ করা হচ্ছে কোনভাবেই যেন অস্থিতিশীল না হয়। কৃত্রিম সঙ্কট সৃষ্টির উদ্দেশ্যে রিফাইনারিদের কারসাজি রয়েছে কিনা তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
ভোজ্যতেল আমদানির এলসি কম খোলার কারণ জানতে রিফাইনারি মিল মালিক এ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি রউফ চৌধুরীর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করে পাওয়া যায়নি।
অন্য একটি সূত্র জানায়, ডিও প্রথা বাতিল হবে এমন আশঙ্কা থেকে ভোজ্যতেল রিফাইনারি মালিকরা আমদানি কমিয়েছে। কারণ ডিও প্রথার সময় ইচ্ছে মতো দাম নির্ধারণ করা হয়। আগামী তিন মাস পর নতুন পদ্ধতিতে ভোজ্যতেল বাজারজাত করা হবে। যেখানে মূল্য নির্ধারণের কমিটি থাকবে। ফলে অতিমুনাফা কিছুটা বন্ধ হবে। এছাড়া আনত্মর্জাতিক বাজারে ভোজ্যতেলের মূল্য বেশি। এসব হিসাব করেই আমদানি কম করা হচ্ছে।