মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
বৃহস্পতিবার, ৬ জানুয়ারী ২০১১, ২৩ পৌষ ১৪১৭
২৪ হাজার কোটি টাকার উদ্বৃত্ত তারল্য, তবুও অর্থসঙ্কট কেন?
খতিয়ে দেখছে বাংলাদেশ ব্যাংক
শফিকুল ইসলাম জীবন ॥ ব্যাংকে ২৪ হাজার কোটি টাকার উদ্বৃত্ত তারল্য থাকার পরও কতিপয় ব্যাংকের আর্থিক সঙ্কট কেন কাটছে না কেন্দ্রীয় ব্যাংক সেটি খতিয়ে দেখছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, বর্তমানে তারল্যের কোন ঘাটতি নেই। উদ্বৃত্ত তারল্য থাকার পরও কিছু ডিলার ব্যাংককে পুনঃক্রয় চুক্তির (রেপো) আওতায় ১ হাজার ৭২৪ কোটি টাকা সরবরাহ দেয়া হয়েছে। সতর্কতামূলক মুদ্রানীতি গ্রহণের ফলে ব্যাংকগুলোর আন্তলেনদেন সংশিস্নষ্ট কলমানির সুদের হার ১৫ শতাংশে নেমে এসেছে। তার পরও কয়েকটি ব্যাংকের তারল্য সঙ্কট কাটছে না। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের গবর্নর ড. আতিউর রহমান ওই ব্যাংকগুলোর তহবিল ব্যবস্থাপনা জোরদার করার জন্য আবারও পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি বলেন, তহবিল ব্যবস্থাপনায় সতর্ক হলে তারল্য সঙ্কট থাকবে না।
এদিকে মুদ্রাবাজার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নতুন প্রজন্মের কিছু ছোট ব্যাংক বরাবরই বড় ব্যাংকগুলোর সম্পদের ওপর ভর করে ব্যাংকিং কার্যক্রম চালিয়ে আসছিল। এখন তারা ওই সব ব্যাংকের কাছ থেকে প্রয়োজনের মুহূর্তে সমর্থন পাচ্ছে না। আর এর দায় গিয়ে পড়ছে বাংলাদেশ ব্যাংকের ওপর। ছোট ব্যাংকগুলোর মধ্যে কিছু ব্যাংকের অবস্থা এতটাই নাজুক যে, তারা এককভাবে বাজারে টিকে থাকার মতো অবস্থানে নেই। বর্তমান মুদ্রা বাজারের টালমাটাল পরিস্থিতি দীর্ঘ হলে একাধিক ব্যাংক যে কোন সময় বড় ধরনের প্রতিকূলতার মুখে পড়তে পারে। অতীতে বিভিন্ন সময়ে তাদের বিভিন্ন ব্যাংকের সঙ্গে মার্জ কিংবা একীভূত হয়ে যাওয়ার জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তরফ থেকে পরামর্শ দেয়া হয়েছে। তবে এই পরামর্শে তারা কর্ণপাত করেনি। এখন এদের এই দায় কে গ্রহণ করবে? এই প্রশ্নের সঠিক জবাব খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। মুক্তবাজার এবং উদার বাণিজ্য নীতিতে বাংলাদেশ ব্যাংক কোন বাণিজ্যিক ব্যাংকের অসত্মিত্ব রক্ষায় সরাসরি হসত্মক্ষেপ করতে পারে না। প্রতিযোগিতায় টিকতে হলে যার যার অবস্থানকে মজবুত করে তৈরি করতে হবে। আর এই বিষয়টি কেন্দ্রীয় ব্যাংক গত এক দশক ধরেই বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ওপর ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা আরোপসহ ১৭টি নিয়ম নীতি মেনে চলার জন্য চাপ দিয়ে আসছে। খুব কম সংখ্যক ব্যাংকই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এ সব নিয়ম নীতির তোয়াক্কা করে থাকে।
সাবেক অর্থমন্ত্রী প্রয়াত সাইফুর রহমান প্রায়ই বলতেন, মুক্তবাজার অর্থনীতির সুযোগ নিয়ে কিছু বাণিজ্যিক ব্যাংক ফ্রি স্টাইলে ব্যবসা করছে। এক লাখ টাকা বিনিয়োগ করে ওরা পাঁচ লাখ টাকার মুনাফা করতে চায়। সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এ এমএস কিবরিয়াও কখনও কখনও বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর অনৈতিক কর্মকা-েরও কঠোর সমালোচনা করে গেছেন। সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. ফখরম্নদ্দীন আহমেদ বাংলাদেশ ব্যাংকের গবর্নর থাকাকালে কতিপয় ব্যাংকের সম্পদ ব্যবস্থাপনা, বৈদেশিক মুদ্রা বিভাগের অদক্ষতা, কিছু ব্যাংক পরিচালকের নিয়মবহিভর্ূত ঋণ গ্রহণ, শেয়ার ধারণ ও পরিচালক পদে আজীবন বহাল থাকার মনমানসিকতার বিরম্নদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছিলেন। ফখরম্নদ্দীন আহমদের আমলেই বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে সবচেয়ে বড় পরিবর্তনের সূচনা হয়েছিল। যদিও সেই পরিবর্তনের সুফল ব্যাংকিং খাতে এখনও প্রতিফলিত হয়নি বলে মুদ্রা বাজার বিশেষজ্ঞরা এখনও মনে করেন। তথাকথিত সংস্কারের ফলে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের নামের শেষে লিমিটেড যুক্ত হওয়া ছাড়া তাদের সার্বিক ব্যবস্থাপনার মান সেই তিমিরেই রয়ে গেছে। তেমনি মুক্তবাজার এবং উদার বাণিজ্যনীতির আওতায় বৈদেশিক মুদ্রার ভাসমান বিনিময় হার চালু, সুদের হার নির্ধারণসহ বিভিন্ন নীতি গ্রহণে বেসরকারী ব্যাংকগুলোর স্বাধীনতা তাদের মুনাফা এবং ব্যাংক কর্মকর্তাদের বেতন ভাতা বৃদ্ধির সুযোগই সৃষ্টি করেছে সবচেয়ে বেশি। যা মূলত ব্যাংকগুলোর বিভিন্ন ধরনের ঋণের সুদ থেকে অর্জিত মুনাফারই অংশ। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলেন, একটি ব্যাংকের মুনাফা বাড়ানোই মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত নয়।
বাসত্মবতা হচ্ছে, এখন ব্যাংকগুলো মুনাফা ছাড়া বিনিয়োগ কিংবা ঋণের প্রবাহ সৃষ্টিতে মাথা ঘামায় না। এর প্রমাণ হিসেবে বলা যায়, ট্রেজারি বিল ও সরকারী বন্ড খাতে ঝুঁকিমুক্ত বিনিয়োগে বাড়তি ঝোঁক, কলমানি বাজার সৃষ্টি, ডলারের সঙ্কট তৈরি, গ্রাহকদের সাধারণ লেনদেনের সার্ভিস চার্জ বাড়ানো নিয়ে কখনও কখনও ব্যাংকগুলোকে কঠোর সমালোচনার মুখে পড়তে হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ট্রেজারি বিভাগের শীতাংসু সুর চৌধুরীর কাছ থেকে জানা যায়, বর্তমানে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোয় ২৪ হাজার কোটি টাকার উদ্বৃত্ত তারল্য আছে। এর ওপর বুধবার কিছু ডিলার ব্যাংককে দেয়া হয়েছে ১ হাজার ৭২৪ কোটি টাকার রেপো। রেপো হচ্ছে পুনঃক্রয় চুক্তি, যা ব্যাংকগুলোর প্রয়োজনে স্বল্পমেয়াদী তারল্য সরবরাহ দেয়া হয়। এতে ব্যাংকগুলোর তারল্য আরও বেড়ে যায়। ধাই ধাই করে কলমানির সুদ বেড়ে সর্বকালের রেকর্ড গড়ে। কলমানি নিয়ে হাহাকার দেখা দেয়া। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার পর কলমানির সুদ এখন ১৫ শতাংশে নেমে এসেছে। তার পরও রেপো ইসু্য করা হচ্ছে। এত কিছুর পরও ব্যাংকের নগদ অর্থ সঙ্কট যে কেন কাটছে না, তা বোধগম্য নয়।
এ প্রসঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গবর্নর ড. আতিউর রহমান বলেন, দক্ষ ব্যবস্থাপনা ছাড়া কোন ব্যাংকের পক্ষেই আধুনিক বিশ্বে টিকে থাকা সম্ভব নয়। তিনি আবারও সোচ্চার কণ্ঠে বলেন, ব্যাংকিং খাতের এখন যে সব সমস্যার কথা বলা হচ্ছে-তার মূলে রয়েছে অব্যবস্থাপনা। এর অবসান হওয়া খুবই জরুরী।