মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
বৃহস্পতিবার, ৬ জানুয়ারী ২০১১, ২৩ পৌষ ১৪১৭
দিনবদলের কঠিন সংগ্রামে ॥ দু'বছর পেরিয়ে
০ কৃষি শিক্ষা কূটনীতি অর্থনীতিতে এসেছে সাফল্য
০ বিদ্যুত পায়নি কাঙ্কিত গতি
০ সরকারের ওপর দেশের মানুষের আস্থা এখনও অটুট
উত্তম চক্রবর্তী ॥ আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারের দু'বছর পূর্তি হচ্ছে আজ। পাঁচ বছর মেয়াদের তৃতীয় বর্ষে পা রাখছে এ সরকার। ২০০৯-এর ৬ জানুয়ারি যে সরকার দিন বদলের অঙ্গীকারের পানসিতে চড়ে সোনালি ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল, সে সরকারের সাফল্য-ব্যর্থতা, প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির হিসাবনিকাশের খেরো খাতা খুলে বসেছেন রাজনৈতিক বিশেস্নষক, সুশীল সমাজসহ দেশের মানুষ। আর সেই খেরো খাতায় উঠে এসেছে মহাজোট সরকারের দু'বছরে মানুষের আশাভঙ্গ ঘটেনি, তবে আত্মতুষ্টিরও সুযোগ নেই।
বিশেস্নষকদের মতে, সাফল্য-ব্যর্থতার হিসাবনিকাশ করলে ২৪ মাসের এ সরকারের পালস্না সফলতায় ভারি, তবে ব্যর্থতার পাল্লা কম হলেও গুরুত্বহীন নয়। মানুষের প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির মধ্যে ব্যবধান রয়েছে। তবে তা দুসত্মর নয়। সামগ্রিকভাবে সরকারের ওপর দেশের মানুষের আস্থা এখনও অটুট রয়েছে। সর্বোপরি দুই বছরের মাথায় মানুষ হিসাব মেলাতে চাইবে, সরকার তার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি কতটা পূরণ করতে পেরেছে বা করেনি। তাদের আশাবাদ, আগামী এক বছরেই পরিস্থিতির আরও উন্নতি ঘটবে।
মহাজোট সরকারের হাতে সময় আছে মাত্র তিন বছর। এর মধ্যে শেষ বছরটি নির্বাচনী ডামাডোলে চলে যাবে। সে ৰেত্রে আগামী দুই বছরের মধ্যে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে হলে সরকারকে সর্বাগ্রে জনগণের সমর্থন ধরে রাখতে হবে। যার প্রস্তুতি শুরু করার সময় এখনই। তবে দু'বছর পূর্তিকালে রাজনৈতিক বিশেস্নষক, সমাজচিন্তক বা সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা অনেকটা এক বাক্যেই স্বীকার করেছেন, ১৯৯৬ বা ২০০১-এর শেখ হাসিনা এবং ২০০৮-এর শেখ হাসিনার মধ্যে পার্থক্য আকাশ-পাতাল। এখনকার শেখ হাসিনা অনেক বেশি সাহসী, দ্রম্নত সিদ্ধানত্ম নিতে পারেন এবং নেতা হিসাবে ঝুঁকি নিতে অভ্যসত্ম হয়েছেন।
তাঁদের মতে, এ দেশে সাধ ও সাধ্যে, চাওয়া ও পাওয়ার মধ্যে সেতুবন্ধ রচনা সহজ নয়। দিন বদলের কঠিন অঙ্গীকার দিয়ে মহাজোট সরকার ৰমতায় এসে গত দুই বছরে এ সত্য মর্মে মর্মে অনুধাবন করতে পেরেছে যে, পথ কুসুমাসত্মীর্ণ নয়, কণ্টকাকীর্ণ। অগি্নপরীৰার মধ্য দিয়ে যে সরকারের যাত্রা শুরম্ন, দু'বছর পূর্তিতে সে সরকারকেও যথানিয়মে কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয়। দু'বছর পূর্তিতে দেশের মানুষ এখন সরকারের কাছ থেকে প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির হিসাব শুরম্ন করেছে। তাই দু'বছর পূর্তিকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজেই মন্ত্রিসভার সদস্যদের সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, "মধুচন্দ্রিমার দিন শেষ হয়েছে। এখন জনগণ কাজের ফল দেখতে চাইবে।"
বিশেস্নষকরা বলছেন, দু'বছরের সরকার জোর গলায় বেশকিছু সাফল্যের কথা বলতেই পারে। যেমন- কৃষি, শিৰা, কূটনীতি ও অর্থনীতি। মাত্র দু'বছরেই কৃষি ও শিৰাৰেত্রে রীতিমতো বিপস্নব ঘটিয়েছে মহাজোট সরকার। স্বাধীনতার ৩৯ বছরের মাথায় সর্বজনীন শিৰানীতি প্রণয়ন, প্রথম থেকে দশম শ্রেণী পর্যনত্ম শিৰাথর্ীদের মাঝে বছরের শুরম্নতেই বিনামূল্যে বই বিতরণ, প্রাথমিক ও জুনিয়র সমাপনী পরীৰার প্রবর্তন, দীর্ঘদিন পর শিল্পনীতি প্রণয়ন, সন্ত্রাস-ধমর্ীয় জঙ্গীবাদ দমন, আনত্মর্জাতিক পরিম-লে দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল এবং কৃষিতে রীতিমতো বিপস্নবের সূচনা সরকারের বড় দাগের সাফল্যের হিসাবেই দেখছেন তাঁরা।
মাত্র ১০ টাকায় কৃষকের ব্যাংক হিসাব খোলা, কৃষি কার্ডের মাধ্যমে কৃষকদের কৃষি ভতর্ুকি প্রদান, বিনাসুদে সরকারী-বেসরকারী ব্যাংকের কৃষিঋণ প্রদান, তিন দফা সারের দাম কমানো, সেচপাম্পে নিরবচ্ছিন্ন বিদু্যত প্রদান, সার-বীজ-ডিজেলসহ বিভিন্ন কৃষি উপকরণে বিশ্বব্যাংক বা আইএমএফের বাধা উপেৰা করে শুধু নন-ইউরিয়া সারের জন্য ৩ হাজার কোটিরও বেশি টাকার ভতর্ুকি, কৃষি যন্ত্রপাতিতে ২৫ শতাংশ ভতর্ুকিসহ কৃষক কল্যাণে সরকারের নানা পদৰেপ কৃষি উৎপাদনে বিপস্নবের সূচনা নিঃশর্ত প্রশংসা অর্জন করেছে। এসব সাফল্যে জাতিকে আশান্বিত করেছে।
আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারের অন্যতম অঙ্গীকার ছিল ৰমতায় গেলে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর হত্যা মামলার রায় কার্যকর এবং একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ব্যবস্থা করা। মহাজোট সরকার দু'বছরের সূচনাপর্বেই সর্বোচ্চ আদালতের রায় অনুযায়ী বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত খুনীদের ফাঁসির রায় কার্যকর করে জাতিকে কলঙ্কমুক্ত করেছে। কিছুটা দেরিতে হলেও ৰমতার দু'বছরের মাঝামাঝি অবস্থায় এসে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারপর্ব শুরম্ন করেছে। দেশের মানুষের প্রত্যাশা, অনত্মত মূল যুদ্ধাপরাধীদের বিচার কাজ বর্তমান সরকারের আমলেই শেষ হবে।
সমাজচিনত্মকদের মতে, শেখ হাসিনার সরকার গত দু'বছরে দেশের মানুষকে খুব একটা হতাশ করেননি। জঙ্গীবাদ-সন্ত্রাসবাদ দমনে সফলতা এসেছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও আরও উন্নতি হওয়ার দাবি রাখে। কৃষি উৎপাদনে অগ্রগতি অব্যাহত রেখেছে। গত দু'বছরে বর্তমান সরকারের বড় সফলতা ছিল বিডিআর বিদ্রোহ এবং আইলার মতো দুর্যোগের চ্যালেঞ্জ সফলতার সঙ্গে মোকাবেলা করা। বিদু্যত উৎপাদনে বিগত জোট সরকারের আমলে যে বিপর্যয় সৃষ্টি হয়েছিল, তা থেকে উত্তরণে সরকার চেষ্টা করে যাচ্ছে। আশা করা যাচ্ছে আগামী গ্রীষ্মকালেই তা সহনীয় পর্যায়ে পৌঁছাবে। অর্থনৈতিক মন্দার কারণে আশপাশের দেশগুলো কাবু হয়ে গেলেও বাংলাদেশ তা থেকে অনেকটা রৰা পেয়েছে। প্রবৃদ্ধির হার ৬ শতাংশের উপরে ধরে রাখতে সৰম হয়েছে। অভ্যনত্মরীণ রাজস্ব সংগ্রহ বৃদ্ধি পেয়েছে। বিদেশী মুদ্রার রিজার্ভ সর্বকালের রেকর্ড ভঙ্গ করেছে, পুঁজিবাজারে গতির আবেগ ছিল বিগত দু'বছরেই।
এছাড়া মিলেনিয়াম ডেভেলপমেন্ট লৰ্য অর্জনে বাংলাদেশের সফলতা ইতোমধ্যে স্বীকৃতি পেয়েছে। বাংলাদেশ তার প্রতিবেশীদের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নে সফলতা দেখাতে পেরেছে। ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহারে সরকার এখন আগের চাইতে আরও বেশি সচেতন হয়েছে। বিগত বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের পুরো পাঁচ বছরেই যেখানে ছিল দুনর্ীতিই নিয়মক, রাষ্ট্র পরিচালনার নীতি; সেখানে বর্তমান মহাজোট সরকারের দু'বছরে মন্ত্রীদের বিরম্নদ্ধে বড়মাপের কোন দুনর্ীতির অভিযোগ এখনও শোনা যায়নি। মহাজোট সরকার মাত্র দু'বছরেই আনত্মর্জাতিক পরিম-লে সন্ত্রাসী-জঙ্গীবাদী বা দুনর্ীতিগ্রসত্ম দেশের কালো তালিকা থেকে বাংলাদেশকে মুক্ত করেছে। এলডিসির অবিসংবাদী নেতা হিসাবে প্রধানমন্ত্রী নিজেকে এবং বাংলাদেশকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।
বিশেস্নষকদের মতে, মহাজোট সরকারের দু'বছর কার্যপরিচালনায় সফলতার পালস্না ভারি হলেও ব্যর্থতার পালস্নাও খুব একটা কম নয়। তাঁরা বর্তমান মহাজোট সরকারের দু'বছর রাষ্ট্র পরিচালনায় ব্যর্থতার ৰেত্রে সর্বাগ্রে চিহ্নিত করেছে দ্রব্যমূল্যের পাগলা ঘোড়ার লাগাম শক্ত হাতে টেনে ধরতে না পারা। সরকারের দু'বছর মেয়াদ শেষে এ দ্রব্যমূল্য নিয়েই দুশ্চিনত্মায় সরকার। বাজার নিয়ন্ত্রণে গত দু'বছরে নেয়া হয়েছে অনেক উদ্যোগ; হয়েছে বাজার ও দাম নিয়ন্ত্রণের পরীৰা-নিরীৰা। কখনও বেঁধে দেয়া হয়েছে নির্ধারিত পণ্যের দাম। আবার কখনও নেয়া হয়েছে বাজার পর্যবেৰণের সিদ্ধানত্ম। কিন্তু দু'বছর পর বাজার পরিস্থিতি বলে দিচ্ছে এসবের কিছুই কাজে আসেনি। নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেনি বাজারের অসাধু সিন্ডিকেটকে। দ্রব্যমূল্যের উর্ধগতিই সরকারের সাফল্যগুলোকে মস্নান করে দিচ্ছে। দ্রম্নত এর লাগাম টেনে ধরতে না পারলে সরকারের বিশাল জনসমর্থন ধরে রাখাই কঠিন হবে বলে মনত্মব্য বিশেস্নষকদের।
তাঁদের মতে, মহাজোট সরকারের আরেকটি বড় ব্যর্থতা হচ্ছে দেশব্যাপী ছাত্রলীগ ও যুবলীগ নামধারী কিছু দুবর্ৃত্তের বেপরোয়া দুবর্ৃত্তপনা। দুটি বছর ধরেই এদের কারণে সরকারকে বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে হয়েছে। সরকারের অনেক সাফল্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। বিশেস্নষকদের মতে, আগামী দিনে আওয়ামী লীগ বা মহাজোটকে যদি কোন বিপর্যয়ের মুখোমুখি হতে হয়, তাহলে তা হবে এদের কারণেই। এছাড়া মন্ত্রিসভা, সংসদ সদস্য ও তাঁদের পরিবারের সম্পদের পরিমাণ ও আয়ের উৎস প্রতিবছর জনসমৰে প্রকাশের অঙ্গীকার থাকলেও গত দু'বছরে সে প্রতিশ্রম্নতি পালিত হয়নি।
বর্তমান সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকার ছিল ৰমতায় গেলে বিচারবহিভর্ূত হত্যাকা- বন্ধ করা। কিন্তু তা হয়নি। বরং বিচারবহিভর্ূত হত্যাকা- বা ক্রসফায়ার নিয়ে মানবাধিকার সংস্থা, সুশীল সমাজ ও মিডিয়ার কঠোর সমালোচনা সরকারকে হজম করতে হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও প্রতিদিন হত্যা, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি বা ডাকাতির ঘটনার কমতি নেই। রাজধানীর অসহনীয় যানজট নিরসনের ব্যর্থতার অভিযোগও সরকারের দিকে। যানজট নিরসনে উড়াল সেতু, এলিভেটেড এঙ্প্রেস ওয়ে ও পাতাল রেল ইত্যাদি নির্মাণের নানা প্রতিশ্রম্নতি দেয়া হলেও একমাত্র সায়েদাবাদ-গুলিসত্মান ফ্লাইওভার নির্মাণ ছাড়া বাকি কাজগুলোর কোনকিছুই হয়নি।
এছাড়া ঢিলেতালে চলছে জ্বালানি খাত। নির্বাচনী ইশতেহারে জ্বালানি খাতের উন্নয়ন প্রাধান্য পেলেও সরকারের দুই বছরে এ খাতের উন্নয়নে প্রয়োজনীয় গতি পায়নি। সরকার কিছু মৌলিক সিদ্ধানত্ম ও পদৰেপ নিতে ব্যর্থ হয়েছে। জ্বালানি খাতের কার্যক্রম চলছে আগের মতোই ঢিমেতালে। ফলে জ্বালানির সঙ্কটে বিদু্যত-সার-শিল্প উৎপাদন দারম্নণভাবে ব্যাহত হচ্ছে; উন্নয়নের গতিধারাকে স্থবির করে দিচ্ছে। মানবসম্পদ রফতানির হারও তুলনামূলকভাবে কমে যাচ্ছে।
রাজনৈতিক বিশেস্নষকদের মতে, মহাজোট সরকারের দুই বছর পার হলেও গতি আসেনি জনপ্রশাসনে। রূপকল্প-২০২১ বাসত্মবায়নে প্রশাসনকে দলীয়করণমুক্ত ও দৰ করে তোলার যে প্রতিশ্রম্নতি সরকার দিয়েছিল, তা পুরোপুরি বাসত্মবায়িত হয়নি। তাঁদের মতে, শুধু একজন প্রধানমন্ত্রীই দেশ পরিচালনা করেন না। সমষ্টির প্রয়াসে সৃষ্ট ঐক্যতানই সরকারের সাফল্যের চাবিকাঠি। সরকার পরিচালনায় দিন বদলের বিশাল অঙ্গীকার প্রতিপালনে যে গতিশীল প্রশাসন প্রয়োজন, গত দু'বছরে সে প্রশাসন প্রত্যৰ করা যায়নি। মাঠ থেকে শুরম্ন করে প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায়ের অনেক ৰেত্রেই সরকারের অনেক সিদ্ধানত্ম থমকে গেছে। প্রধানমন্ত্রী নিজেও বিভিন্ন সময়ে প্রশাসনের অদৰতা ও গতিহীনতা প্রসঙ্গে অসনত্মোষ প্রকাশ করেছেন।
এছাড়া সরকারের দু'বছর পূর্তিতে অনেক মন্ত্রীর যোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন কেউ কেউ। অনেকের মতে, মন্ত্রিসভায় নবীনের প্রাচুর্য, বেশকিছু প্রবীণও রয়েছেন। তাঁদের সততা নিয়ে এখনও তেমন গুরম্নতর প্রশ্ন না উঠলেও সরকার পরিচালনায় সততাই প্রথম ও শেষ কথা নয়। কিছু মন্ত্রীর অতিকথন, কাজের চেয়ে 'অন্য কাজে' মনযোগী হওয়া এবং দৰভাবে নিজ মন্ত্রণালয়ের প্রশাসন পরিচালনা না করার অভিযোগ রয়েছে।
সব মিলিয়ে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, বিদু্যত ও জ্বালানি সমস্যার অগ্রগতি, নির্বাচনী অঙ্গীকার বাসত্মবায়ন, যুদ্ধাপরাধের বিচারে কার্যকর অগ্রগতি, রাজধানীর যানজট নিরসন, সংসদ কার্যকর, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং দুনর্ীতি দমনে সদিচ্ছার প্রমাণ_ বর্তমান মহাজোট সরকারের মেয়াদে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসাবেই দেখছেন রাজনৈতিক পর্যবেৰকরা। বাকি তিন বছরে বর্তমান সরকারকে এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করেই জনসমর্থন ধরে রাখতে হবে বলেই মনে করছেন তাঁরা।
হতাশার প্রতীক সংসদ ॥ মহাজোট সরকারের মতো চলতি নবম জাতীয় সংসদেরও দুই বছর পূর্তি হচ্ছে। বিশেস্নষকদের মতে, সরকারের দুই বছরে হতাশার মূর্ত প্রতীক জাতীয় সংসদ। অতীতের মতোই নির্বাচনী ওয়াদা ভঙ্গ করেছেন বিরোধী দল। বিএনপির নির্বাচনী ওয়াদা ছিল ইসু্যভিত্তিক ওয়াকআউট ছাড়া কোন দল বা জোট অধিবেশন বর্জন করতে পারবে না। ৩০ দিনের বেশি অনুপস্থিত থাকলে সংসদ সদস্যপদ থাকবে না। কিন্তু নির্বাচন শেষ, বিএনপির নির্বাচনী অঙ্গীকারও অাঁসত্মাকুড়ে। বিএনপি সংসদে যাচ্ছেন, কমিটির কাজে অংশ নিচ্ছেন, বিদেশে যাচ্ছেন, বেতন-ভাতাসহ যাবতীয় সুযোগসুবিধা নিচ্ছেন, শুধু অংশ নিচ্ছেন না অধিবেশনে। প্রধানমন্ত্রী, স্পীকারের বার বার আহ্বানেও নিস্পৃহ বিএনপি। গত টানা ছয় মাসেরও বেশি সময় ধরে সংসদে যাচ্ছে না বিএনপি। সরকারপৰেও বিরোধী দলকে সংসদে ফিরে আনার ৰেত্রে জোরালো উদ্যোগ চোখে পড়েনি। ফলে দু'বছরে নিয়ম বেঁধে সংসদ বসলেও বিরোধী দলের অনুপস্থিতির কারণে পুরোপুরি তা কার্যকর হচ্ছে না বলেই মনে করছেন তাঁরা।
রাজনীতির গুণগত পরিবর্তন শূন্যের
কোঠায় মহাজোট সরকারের দু'বছরের হিসাবনিকাশের পাশাপাশি এ দু'বছরে রাজনৈতিক দলগুলোর সফলতা-ব্যর্থতারও হিসাবনিকাশ শুরম্ন করেছে দেশের মানুষ। রাজনৈতিক বিশেস্নষকদের মতে, রাজনৈতিক দলগুলো এক-এগারো থেকে কোন শিৰাই নেয়নি। রাজনীতিতে যে গুণগত পরিবর্তন আশা করেছিল দেশের মানুষ, তার কিছুই হয়নি।
বুদ্ধিজীবী, সুশীল সমাজ, রাজনৈতিক বিশেস্নষক থেকে শুরম্ন করে দেশের সাধারণ মানুষ পর্যনত্ম মনে করছেন, দেশকে এগিয়ে নিতে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা সবচেয়ে জরম্নরী। এজন্য সরকারী দলকে সহনশীল ও বিরোধী দলকে সহযোগিতামূলক আচরণ করতে হবে। সংসদকে কার্যকর করে রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন আনতে হবে। সরকার ও বিরোধী দলের দুই শীর্ষ নেত্রীকে মুখ দেখাদেখি বন্ধের অবস্থান থেকে সরে এসে দেশের যে কোন বড় ইসু্যতে এক টেবিলে বসতে হবে। তবেই গণতন্ত্রের অগ্রযাত্রা নিরঙ্কুশ হবে। নইলে আবারও জনগণের ভাগ্যবিপর্যয় অবশ্যম্ভাবী।
বিশেস্নষকদের মতে, ৰমতাসীন সরকার গত দু'বছরেও আওয়ামী লীগকে আলাদা সত্তায় রাখতে ব্যর্থ হয়েছে। বরং সরকারের মধ্যেই যেন ঢুকে পড়েছে ৰমতাসীন দলটি। প্রানত্ম থেকে কেন্দ্র পর্যনত্ম দলের নেতাকমর্ীদের ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণই যেন হারিয়ে ফেলেছে দলটি। দলের অধিকাংশ সিনিয়র নেতার সাইডলাইনে বসিয়ে রেখে অপেৰাকৃত নবীনদের হাতে সাংগঠনিক ভার তুলে দিয়ে চমক দেখানো হলেও তা খুব একটা কাজে আসেনি। গত দু'বছরে সাংগঠনিক স্থবিরতা কাটাতে পারেনি সরকারের কর্তাব্যক্তিরা। আর সে কারণে দুটি বছর ধরেই দলের একশ্রেণীর সুযোগসন্ধানী দুবৃর্ত্তদের দুবর্ৃত্তপনা সরকারকে মাঝেমধ্যেই বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে হয়েছে। মানসিক পরিবর্তন দেখা যায়নি দলটির তৃণমূল নেতাদের মধ্যেও। অনেক সংসদ সদস্যের গত দু'বছরের নানা প্রশ্নবিদ্ধ কর্মকা- সরকারের ভাবমূর্তি ৰুণ্ন্ন করেছে। মহাজোটকে নিষ্ক্রিয় রেখে আওয়ামী লীগের একলা চলো নীতির কারণে সরকারের অনেক উন্নয়নমূলক কর্মকা- জনগণের মাঝে প্রচার পায়নি বলেও মনে করেন তাঁরা।
অন্যদিকে দুনর্ীতি, সন্ত্রাস ও দুঃশাসনের কারণে জনগণ থেকে প্রত্যাখ্যাত হওয়া বিএনপির কোনই পরিবর্তন হয়নি গত দু'বছরে। যে বল্গাহীন দুনর্ীতি, সন্ত্রাস, দুঃশাসন এবং যুদ্ধাপরাধী ও জঙ্গীবাদের মদদদানের কারণে নির্বাচনে জনগণ এ দলকে প্রত্যাখ্যান করেছে_ সেই পুরনো নষ্ট রাজনৈতিক সংস্কৃতি থেকে বিন্দুমাত্র বের হতে পারেনি বিএনপি। বরং পাঁচটি বছর যেসব ব্যক্তি 'দুনর্ীতির বরপুত্র' হিসাবে আখ্যায়িত হয়েছে, খালেদা জিয়ার তত্ত্বাবধানে তারেক রহমানসহ সেসব দুনর্ীতিবাজ, সন্ত্রাসী ও জঙ্গীবাদের মদদদানের অভিযোগ থাকা সাবেক মন্ত্রী-এমপি-নেতারাই আবারও চালকের আসনে অধিষ্ঠিত হয়েছেন বিএনপির রাজনীতিতে। অন্যদিকে সাম্প্রদায়িক ও যুদ্ধাপরাধীদের লীলাভূমি বলে খ্যাত জামায়াতসহ উগ্র সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে দহরম ছাড়তে পারেননি বর্তমান বিরোধীদলীয় নেত্রী।
বার বার সরকার পতন আন্দোলনের ঘোষণা দিয়ে দুই বছরে বিএনপি রাজপথে থাকলেও আন্দোলন জমাতে পারেনি। জাতীয় ইসু্যতে আন্দোলনের কথা বললেও দলটির সব কর্মকা- ছিল মূলত খালেদা জিয়ার বাড়ি রৰা আর দুই ছেলে তারেক রহমান ও আরাফাত রহমানের মামলাকে ঘিরে। 'হরতাল' না করার নির্বাচনী প্রতিশ্রম্নতি দিলেও এখন বিএনপি এ 'হরতাল'কেই যে কোন ইসু্যতে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করছে। তাই গণতন্ত্রে প্রত্যাবর্তনের দুই বছর পূর্তিতে এ দিকগুলোও গভীরভাবে পর্যবেৰণ করছেন দেশের সচেতন মানুষ।
পাদটীকায় রাজনৈতিক বিশেস্নষকরা মহাজোট সরকারের দু'বছরের সার্বিক মূল্যায়ন করতে গিয়ে মনত্মব্য করেন, কোন সরকারই এ দেশে দুই বছর পরও একই মাত্রায় জনপ্রিয় থাকে না। সরকারকে বুঝতে হবে, এ জনপ্রিয়তা ধরে রাখতে হলে দেশের মানুষের জীবন-জীবিকার সমস্যাগুলো সমাধানের চেষ্টা করতে হবে। জনসাধারণের ধৈর্য-সহিষ্ণুতা সীমাহীন নয়। দুই বছর ইতোমধ্যে চলে গেছে, জনজীবনের সমস্যাগুলোর উলেস্নখযোগ্য সমাধান হয়নি। তাই তাদের ধৈর্যের সীমা অতিক্রম করার আগেই সরকারকে সর্বৰেত্রে ফলপ্রসূ কাজ করতে হবে। সব ৰেত্রে স্বচ্ছতা রাখতে হবে, যেন জনগণের স্পষ্ট ধারণা থাকে সরকার কী করছে এবং আরও কী করতে যাচ্ছে।