মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
সোমবার, ২৮ জুন ২০১০, ১৪ আষাঢ় ১৪১৭
মির্জা আব্বাস, মবিন, এ্যানিসহ দু'শতাধিক আটক
স্টাফ রিপোর্টার ॥ সরকারী কাজে বাধা দেয়ায় বিএনপির হরতালের সময় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, বিএনপির ছাত্রবিষয়ক সম্পাদক শহীদউদ্দিন চৌধুরী এ্যানি এমপি, ভাইস চেয়ারম্যান অধ্যাপক এমএ মান্নান, শমসের মবিন চৌধুরী, বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা সদস্য এ্যাডভোকেট আহমেদ আজম খান, সাবেক প্রতিমন্ত্রী আব্দুল হাই ও স্বেচ্ছাসেবক দলের সাধারণ সম্পাদক মীর শরাফত আলী সপু এবং তিন মহিলা ওয়ার্ড কমিশনার রাজিয়া হালিম, সুরাইয়া বেগম ও পেয়ারা মোস্তফাসহ সারাদেশে দুই শতাধিক নেতাকর্মীকে আটক করেছে পুলিশ। গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার উপদেষ্টা অধ্যাপক এমএ মান্নান ও এ্যাডভোকেট আহমেদ আজম খানকে জামিনে মুক্তি দিয়েছে আদালত। পরবর্তীতে আটককৃতদের মধ্যে বেশিরভাগকেই ছেড়ে দেয়া হয়েছে। রবিবার বেলা ১১টার দিকে শাজাহানপুরের বাসা থেকে হরতালের সমর্থনে দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে মিছিল নিয়ে বের হওয়ার চেষ্টা করেন মির্জা আব্বাস। এর আগে ছোট ছোট মিছিল আলাদা আলাদাভাবে গিয়ে মির্জা আব্বাসের বাসায় হাজির হয়। পরে মিছিলটি বাড়ির সামনে বের হয়। এর আগে বিপুল পরিমাণ পুলিশ ও RAB মির্জা আব্বাসের বাড়ির সামনে অবস্থান নেয়। সোয়া ১১টার দিকে মির্জা আব্বাসের নেতৃত্বে মিছিলটি বাসা থেকে বের হয়ে রাস্তায় নামার চেষ্টা করলে পুলিশ বাধা দেয়। পুলিশের বাধা উপেক্ষা করে বিৰোভকারীরা রাস্তায় বেরুনোর চেষ্টা করে। এ সময় পুলিশের সঙ্গে হরতাল সমর্থকদের ধাওয়া পাল্টাধাওয়া ও ইটপাটকেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে। পুলিশ মিছিলকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে হালকা লাঠিচার্জ করে। এরপর শুরম্ন হয় মির্জা আব্বাসের লোকজনের চোরাগুপ্তা হামলা। বিৰোভকারীরা বিভিন্ন গলিতে অবস্থান করে হঠাৎ হঠাৎ পুলিশ ও র্যাবের ওপর আক্রমণ চালায়। এমন আক্রমণে দিশেহারা হয়ে পড়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। পরে অতিরিক্ত পুলিশ গিয়ে পুরো এলাকা কর্ডন করে ফেলে। বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ মৃদু লাঠিচার্জ করে। এরপর পুলিশ মির্জা আব্বাসের বাড়ির দিকে রওনা হয়। পরে পুলিশ মির্জা আব্বাসসহ অনত্মত ১৫ জনকে আটক করে। এ সময় RAB মির্জা আব্বাসের বাড়িতে অবস্থান নেয়া বিএনপি কর্মীদের বেধড়ক মারধর করে র্যাব বাড়ির ভেতর প্রবেশ করে। মতিঝিল থানার ওসি তোফাজ্জল হোসেন জানান, শনিবার রাতে নয়াপল্টন মোড়ে গাড়ি পোড়ানো মামলায় মির্জা আব্বাস আসামি। এজন্য তাঁকে গ্রেফতার করা হয়েছে। পরে তাঁকে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ কার্যালয়ে পাঠানো হয়। গ্রেফতারের পর থেকেই মির্জা আব্বাস শ্বাসকষ্টে ভুগছিলেন। পরে তাঁকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউতে ভর্তি করা হয়।
এদিকে মির্জা আব্বাসের স্ত্রী আফরোজা আব্বাস বাসায় সংবাদ সম্মেলনে তাঁর বাসায় র্যাব ও স্থানীয় যুবলীগসহ ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা হামলা চালিয়ে অনত্মত ৪০ জনকে আহত এবং বাড়িঘরের জিনিসপত্র তছনছ ও লুটপাট করেছে বলে অভিযোগ করেছেন। তিনি বলেন, সকাল থেকেই পুলিশ বাড়িটি ঘিরে রেখেছিল। কিনত্ম বাড়ির ভেতরে ঢোকেনি পুলিশ। মিছিল নিয়ে শহীদবাগ মসজিদের কাছে গেলে পুলিশ মির্জা আব্বাসসহ অন্তত ২০/২৫ জনকে গ্রেফতার করে। এরপর RAB ও স্থানীয় যুবলীগসহ ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা মির্জা আব্বাসের বাড়ির ভেতরে ঢুকে তা-ব চালায়। তারা অস্ত্রহাতে বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করে। বাড়ির সবাইকে মারধর করতে থাকে। এতে মির্জা আব্বাসের মাসহ বাড়ির ভেতরে থাকা অন্তত ৪০ জন আহত হয়েছে। মির্জা আব্বাসের মেয়ে বর্ষা অভিযোগ করেন, ওয়ান ইলেভেনের সময়ও তাদের বাড়িতে একাধিকবার অভিযান চালানো হয়েছে। কিন্তু বাড়িতে ঢুকে এমন হামলার নজির সাধারণত দেখা যায় না। বিষয়টি ওয়ান ইলেভেনকেও হার মানিয়েছে বলে দাবি করেছেন তিনি। মির্জা আব্বাসের স্ত্রী আফরোজা আব্বাস দ্রুত তাঁর স্বামীসহ গ্রেফতারকৃতদের মুক্তি দাবি করেছেন। একই সঙ্গে বাড়িতে ঢুকে এ ধরনের ন্যক্কারজনক হামলার তদন্তও দাবি করেন তিনি।
অন্যদিকে সকাল সাড়ে ১০টার দিকে শাহবাগ মোড়ে শহিদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানির নেতৃত্বে ছাত্রদলের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার নেতাকর্মীদের নিয়ে একটি মিছিল বের হয়। মিছিলটি শাহবাগ মোড় ঘুরে বারডেম হাসপাতালের সামনে অবস্থান নেয়ার চেষ্টা করে। এ সময় যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরাও হরতালের বিরোধিতা করে একটি মিছিল বের করে। দুইটি মিছিলই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে পেঁৗছলে শুরম্ন হয় ধাওয়া পাল্টাধাওয়া। এ সময় পুলিশ দ্রম্নত ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেয়ার চেষ্টা করলে শুরু হয় ইটপাটকেল নিক্ষেপ। যুবলীগ, ছাত্রলীগ ও পুলিশের বাধার মুখে এ্যানির নেতৃত্বে বিৰোভ মিছিলটি পিজি হাসপাতালের ভেতরে অবস্থান নেয়। এরপর শুরু হয় হাঙ্গামা। পুলিশ পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে লাঠিচার্জ করে। এ সময় এ্যানিসহ অনত্মত ৬ জনকে গ্রেফতার করা হয়। হাঙ্গামার এক পর্যায়ে দূর থেকে ছোড়া একটি ইটের আঘাতে এ্যানির মাথা ফেটে যায়। পরে দ্রুত তাঁকে পিজি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে তাঁকে গুলশান ইউনাইটেড হাসপাতালের আইসিইউতে ভর্তি করা হয়। আইসিইউতে ভর্তি এ্যানি অক্সিজেন মাস্ক পরেই কথা বলেন।
সকাল সাড়ে ৯টার দিকে তেজগাঁও থানাধীন কাওরান বাজারে একটি মিছিলসহ রাসত্মা অবরোধের চেষ্টাকালে অধ্যাপক এমএ মান্নান ও এ্যাডভোকেট আহমেদ আজম খানসহ অন্তত ১০ পিকেটারকে গ্রেফতার করে পুলিশ। পরে তাদের থানা হেফাজতে রাখা হয়।
বেলা ১১টার দিকে সাবেক প্রতিমন্ত্রী আব্দুল হাইয়ের নেতৃত্বে একদল হরতাল সমর্থক রাসত্মায় ব্যারিকেড দেয়ার চেষ্টা করে। এতে পুলিশ বাধা দিলে বিৰোভকারীরা পুলিশকে লৰ্য করে ইটপাটকেল নিৰেপ করতে থাকে। প্রায় ঘণ্টাখানেক ধরে থেমে থেমে ধাওয়া পাল্টাধাওয়া ইটপাটকেল নিৰেপের পর আব্দুল হাইসহ ৫/৬ জনকে আটক করে পুলিশ।
বেলা সাড়ে ১২টার দিকে গুলশান থানাধীন মহাখালী ওয়ারলেস গেট এলাকায় রাসত্মা অবরোধ করে বিৰোভকালে পুলিশের সঙ্গে ধাওয়া পাল্টাধাওয়া ইটপাটকেল নিৰেপের পর শমশের মবীন চৌধুরীসহ ৫ জনকে গ্রেফতার করে পুলিশ। সকালে বাড্ডায় হরতালের সর্মথনে বিৰোভ মিছিল শেষে রাস্তা অবরোধ ও পুলিশের কাজে বাধা দেয়ায় ঢাকা সিটি করপোরেশনের ২১ নম্বর ওয়ার্ডের কমিশনার এমএ কাইয়ুম ও মহিলা কাউন্সিলর পেয়ারা মোস্তফাকে আটক করা হয়। সেগুনবাগিচা থেকে বেলা ১১টায় স্বেচ্ছাসেবক দলের সাধারণ সম্পাদক মীর শরাফত আলী সপুকে আটক করা হয়। এছাড়া কাপ্তানবাজার থেকে ঢাকা সিটি করপোরেশনের ৬৮, ৭৯, ৭০ নম্বর ওয়ার্ডের সংরক্ষিত আসনের ওয়ার্ড কমিশনার রাজিয়া হালিম ও দলীয় কর্মী সুরাইয়া বেগমসহ ৬ মহিলা নেতাকর্মীকে বেলা ১১টার দিকে আটক করে পুলিশ।
নোয়াখালী থেকে আমাদের নিজস্ব সংবাদদাতা জানান, সকালে জেলার মাইজদী বাজার এলাকা, সুধারামসহ বিভিন্ন জায়গায় বিৰোভ করে হরতাল সমর্থকরা। বিৰোভকারীরা এ সময় বিআরটিসি বাস, পুলিশ বহনকারী যানবাহনসহ বিভিন্ন ধরনের যানবাহন ভাংচুর ও অগি্নসংযোগ করে। সরকারী কাজে বাধা দেয়া ও ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডের জন্য ১২ জনকে গ্রেফতার করে পুলিশ। নাটোর থেকে আমাদের নিজস্ব সংবাদদাতা জানান, সকাল ৮টার দিকে বিক্ষোভকারীরা নাটোর-রাজশাহী মহাসড়কে ব্যারিকেড সৃষ্টি করে। বিৰোভকারীরা যানবাহনে ভাংচুর করে। এ সময় পুলিশ নাটোর জেলা বিএনপির দফতর সম্পাদক আলী আকমল বাপ্পীসহ ১২ জনকে গ্রেফতার করে। তবে হরতাল চলাকালে সরকারী আধা সরকারীসহ গুরুত্বপূর্ণ অফিস আদালত খোলা ছিল। তবে অফিসে উপস্থিতির হার ছিল কম। এছাড়া দেশের অন্যান্য জেলাতেও ঢিলেঢালা হরতাল পালিত হয়েছে। অন্যান্য জেলা থেকে প্রায় ৫০ নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।