মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
সোমবার, ২৮ জুন ২০১০, ১৪ আষাঢ় ১৪১৭
শান্তিপূর্ণ হরতাল! ॥ 'মাগো ওরা আমার ভাইকে জ্বালিয়ে দিয়েছে'
পেট্রোলে ৬০ ভাগ পুড়ে গেছে ফারম্নকের
ফজলে নোমানী॥ এই কান্নার শেষ কোথায়! নাকি নতুন করে আবার দেশে জ্বালাও পোড়াও প্রতিহিংসার রাজনীতি শুরু হয়েছে! ঢাকা মেডিক্যালের বার্ন ইউনিটের সিসিইউ'র বারান্দায় চিৎকার করে বুক চাপড়ে হাহাকার করছে আয়েশা। তার চিৎকার আর পরিবারের সদস্যদের একে অপরকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভারি হয়ে উঠেছে পরিবেশ। সেই বারান্দাতেই একপাশে শুয়ে আগুনে পোড়ার যন্ত্রণায় ছটফট করছে সুমন নামের একজন। ভেতরে সিসিইউতে মা শিরিন আখতারের পাশে শুয়ে মৃত্যুর প্রহর গুনছে আয়েশার ভাই ফারুক হোসেন। হরতাল নামের সেই দুষ্ট দৈত্যের অশুভ প্রকোপের শিকার এই ফারুক হেসেন ও সুমন নামের দুই বন্ধু। শনিবার রাতে হরতালের সমর্থনে পিকেটাররা রাজধানীতে যে ৮/১০টি গাড়ি ভাংচুর ও জ্বালিয়ে দিয়ে জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টির অপচেষ্টায় মেতেছিল তারই নির্মম শিকার এরা। অথচ বিরোধীদলীয় নেত্রী এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম জিয়া আর হরতাল করবেন না বলে অতীতে বহুবার ঘোষণার পরেও সরকারের জন্য সতর্কবাণী হিসেবে হরতালের ডাক দিয়েছেন বলে শুক্রবার এক সংবাদ সম্মেলনে শান্তিপূর্ণভাবে হরতাল পালনের কথা বলেন। মেডিক্যালের বার্ন ইউনিটে অগ্নিদগ্ধদের আর্তনাদ বলে দিচ্ছে, তিনি কথা রাখেননি। অনত্মত, বিরোধী নেত্রী বা তাঁর দল তো নয়ই।
'মাগো ওরা আমার ভাইকে জ্বালিয়ে দিয়েছে' বলে চিৎকার করে কাঁদছে ছোট বোন আয়েশা। বার্ন ইউনিটের সিসিইউতে শয্যাশায়ী ফারুকের দিকে তাকালে আঁৎকে উঠতে হয়। পুরো মুখমণ্ডলসহ শরীরের শতকরা ৬০ ভাগই পেট্রোলের আগুনে ঝলসে গেছে। একট আধটু কথা বলতে পারেন। তাঁর ক্ষীণকণ্ঠের আওয়াজে যা বোঝা গেল তা হচ্ছে_ তারা গাড়িতে বসে থাকা অবস্থাতেই মগবাজার রেলগেট মোড়ে ২/৩ যুবক পেট্রোল ছুড়ে গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়। সিগারেট কেনার জন্য গাড়িটি সেখানে থামানো হলে এই কাণ্ড ঘটানো হয়। শিয়রে বসে অশ্রু বিসর্জন দেয়া মা শিরিন আখতার জানান, ফারুক বলেছে, এটি হরতালকারীদেরই কাণ্ড।' বাবা এ কোন রাজনীতি। আমার ছেলে তো চাকরি করে, কোন রাজনীতি করে না। সে কি দোষ করেছে? শিরিন আখতারের এসব প্রশ্নের কোন উত্তর না থাকায় বার্ন ইউনিটের সিসিইউ থেকে বেরিয়ে বাইরেই দেখা হয় সুমনের সঙ্গে। সুমনই বিস্তারিত জানাল। তার হাত, কান ও মাথার কিয়দংশ আগুনে পুড়লেও তার বিপদ কেটে গেছে বলে কর্তব্যরত চিকিৎসক বিধান চন্দ্র সরকার জানালেন। সুমন জানায়, তাদের দু'জনের বাড়িই গেন্ডারিয়া ডিস্টিলারি রোডে। ফারুক জিএফসি ফ্যানের কারখানায় নবাবপুরে চাকরি করে আর তার নিজের সুমাইয়া মোটরস নামে ধোলাইখালে মোটর পার্টসের দোকান রয়েছে। বিকালে ডিস্টিলারি রোডে তাদের বাড়ির পাশেরই পরিচিত গাড়ির গ্যারেজে ফয়সল নামের পরিচিত এক ব্যক্তি গাড়ি সারাতে নিয়ে আসে। গাড়িটি ঠিক করার পরে সুমন তাকে জানায়, মিরপুর এবং মহাখালীতে তার দুই বিজনেস পার্টির কাছ থেকে টাকা আনতে যাবে। গাড়িটিরও টেস্ট ড্রাইভ হয়ে যাবে বিধায় ফয়সল রাজি হয়। ফয়সলকে সামনের বামপাশে বসিয়ে সুমনই গাড়ি চালাচ্ছিল। তারা পেছনের সিটে বসায় ফারুককে। মিরপুর এবং মহাখালী থেকে ১৫ হাজার টাকা নিয়ে তারা মগবাজার রেলগেট পার হবার আগে ফয়সল সিগারেট নেবে বলে গাড়ি থামাতে বলে। তখন রাত ৯টার মতো বাজে। গাড়ি থামালে ফয়সল নামার পরই ২/৩ যুবক গাড়িতে প্লাস্টিকের জার থেকে পেট্রোল ছুড়ে মারতে শুরু করে। সুমন চিৎকার দেয়ার আগেই ম্যাচের কাঠি ছুড়ে মারলে আগুন ধরে যায়। ফয়সল সঙ্গে সঙ্গে দৌড় দেয়। ড্রাইভিং সিটে বসা সুমনের গায়ে এবং মাথায় পেট্রোলের ছিটা লাগায় তার গায়েও মুহূর্তেই আগুন ধরে যায়। সে তাড়াতাড়ি কাপড় চোপড় খুলে ফেলে দরজা দিয়ে বাইরে পড়ে দেখে পেছনের সিটের দরজা লক থাকায় ফারুক বের হতে পারেনি। ততক্ষণে ফারুক প্রাণপণ চেষ্টা করে লাথি দিয়ে জানালার কাঁচ ভেঙ্গে বের হয়ে পড়লেও তার গায়ের আগুন জ্বলতেই থাকে। সে চিৎকার করে মাটিতে গড়াগড়ি গেলেও তাদের সাহায্যে কেউ এগিয়ে আসেনি। মুহূর্তেই পুরো গাড়িটি ঢাকা মেট্রো-ক-০৩-৯৩৭১ আগুনে জ্বলে অঙ্গার হয়ে যায়। তাদের এলাকাবাসী পরে এগিয়ে এসে হাসপাতালে নিয়ে যায়। মগবাজার রেলগেট সংলগ্ন এলাকায় গেলে রাতের ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীর্ এক ব্যক্তি জানান, হরতালের সমর্থনে এই আগুন দেয়ার ঘটনার কিছুক্ষণ আগেই পিকেটাররা ইট মেরে একটি বাস ভাংচুর করে। কিন্তু বাসটি দ্রুতবেগে টান দিয়ে চলে যাওয়ায় বেশি ক্ষতি করতে পারেনি। প্রাইভেট কারটিতে লোক বসা থাকা অবস্থাতেই তারা আগুন জ্বালিয়ে দিয়ে পাশের গলি দিয়েই দৌড়ে পালিয়ে যায় বলেও জানান। বার্ন ইউনিটের সিসিইউ'র কর্মরত চিকিৎসক মলয় কুমার জানান, ফারুকের শতকরা ৬০ভাগ আগ্নিদগ্ধ হবার পাশাপাশি ইনহেলেশন ইনজুরিও রয়েছে। তার বাঁচার আশঙ্কা কম। তবে, সুমন এখন বিপদ মুক্ত। সুমন জানায়, তার স্ত্রী এবং ৫ বছরের একটি কন্যা সন্তান রয়েছে, সুমাইয়া, যার নামেই তার মোটর পার্টসের দোকান। আর ফারুকরা দুই ভাই তিন বোন। তবে সে বিয়ে করেনি। ফারুকের ভাই সেলিম অভিযোগ করেন, হরতালকারীদের আগুনে তার ভাই পুড়লেও বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে এটি গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে ঘটেছে বলে প্রচার করা হচ্ছে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, বেগম জিয়া চারদলীয় জোট ক্ষমতাসীন থাকার সময় এই হরতাল প্রসঙ্গেই বলেছিলেন, 'সত্যিকার অর্থে দেশের উন্নয়ন চাইলে রাজনৈতিক ডিকশনারি থেকে হরতাল শব্দটি মুছে ফেলতে হবে।' আর বিএনপি নেতা মওদুদ বলেছিলেন- 'প্রয়োজনে সংবিধান সংশোধন করে আইন প্রণয়নের মাধ্যমে হরতাল বন্ধ করা হবে। শুধু বক্তৃতা-বিবৃতি বা সংসদে দাঁড়িয়েই নয়, বিগত নির্বাচনের আগেও বিএনপি বলেছিল, তারা আর হরতাল বা সংসদ বর্জনের রাজনীতি করবেন না। 'হরতাল' নামক কর্মসূচী প্রায় ভুলেই যেতে বসেছিলেন দেশের মানুষ। প্রায় চার বছর দেশ হরতালবিহীনভাবেই থেকেছে। ওয়ান ইলেভেন পরবর্তী প্রেক্ষাপটে সাধারণ মানুষের মনে কিছুটা ধারণাও জন্মেছিল, অতীত থেকে বোধ হয় শিক্ষা নেবে রাজনৈতিক দলগুলো। কিন্তু, রাজনৈতিক প্রতিহিংসার মূল উৎপাটন যে হয়নি সেটাই যেন প্রমাণের জন্য এবার উঠেপড়ে লেগেছে সরকার বিরোধীরা।