মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
বৃহস্পতিবার, ১৫ ডিসেম্বর ২০১১, ১ পৌষ ১৪১৮
সংরক্ষণের অভাবে পাবনায় বধ্যভূমি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে
নিজস্ব সংবাদদাতা, পাবনা, ১৪ ডিসেম্বর ॥ দেশের স্বাধীনতা অর্জনের জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করতে যারা পিছু পা হয়নি- সেই সব শহীদ মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিকামী সাধারণ মানুষ স্বাধীনতার ৪০ বছরেও যথাযথ মর্যাদা পায়নি। পাবনা জেলার বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে সেইসব বীর শহীদ মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিকামী সাধারণ মানুষের গণকবর আর বধ্যভূমি। সারাবছর অযত্ন অবহেলায় পড়ে থাকে সকলেরই দৃষ্টি সীমার মধ্যে। এসব গণকবরগুলোর বেশ কয়টি বর্তমানে গো-চারণ ভূমিতে পরিণত হয়েছে। স্বাধীনতার দীর্ঘ ৪০ বছর পেরিয়ে গেলেও কোন সরকার শহীদদের স্মৃতির প্রতি যথাযথ সম্মান দেখায়নি। সেই সব স্থানে কোন স্মৃতিসৌধ, স্মৃতিসত্মম্ভ নির্মাণ করা হয়নি।
সদর উপজেলার বাবুর বাগান গণকবর ॥ পাবনা সদর উপজেলার দাপুনিয়া ইউনিয়নের নাজিরপুর বাবুর বাগান (স্থানীয়ভাবে লিচু বাগান হিসেবে পরিচিত)। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালে পাবনার শানত্মি কমিটির প্রধান রাজাকার আলবদর মাওলানা আব্দুস সুবহানের পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষ ইঙ্গিতে পাকিসত্মান হানাদার বাহিনী ওই বাগানে গর্ত করে পাবনার মহররমসহ কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা ও গ্রামবাসীকে গুলি করে ও বেয়োনেট দিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করে ফেলে রেখে যায়। পরে স্থানীয় গ্রামবাসী ওই বাগানের কয়েকটি স্থানে তাদের গণকবর দিয়ে মাটি চাপা দেয়।
টেবুনিয়া কৃষি খামারে গণকবর ॥ দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম পাবনার টেবুনিয়া কৃষি খামার। স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালে পাবনা শহরের নূরপুর ডাকবাংলো থেকে রাজাকার ও পিস কমিটির চেয়ারম্যান মাওলানা আব্দুস সুবহানের খবরের ভিত্তিতে আকবর হোসেন আকু, হাসান খাঁ, দুলাল, হায়দার আলী, পুলিশ সিহাহী আলস্না রাখা, মন্টু মিয়া ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের জনৈক শিক্ষকসহ ২০ জনকে পাকিসত্মানী হানাদারবাহিনী কালো কাপড়ে চোখ ও মুুখ বেঁধে নিয়ে যাওয়া হয় টেবুনিয়া ডাল ও তৈল বীজ খামারের শেষ প্রানত্মের একটি জঙ্গলের মধ্যে। পাকবাহিনী নিষ্ঠুর ও নির্মমভাবে ওই ২০ জনকে গুলি করে ও বেয়োনেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করে। ভাগ্যক্রমে বেঁচে যায় পাবনা শহরের আরিফপুর মহলস্নার পানের দোকানদার বাদশা মিয়া। সেখানে বর্তমানে কোন শহীদদের গণকবরের স্মৃতি চিহ্ন নেই।
আটঘরিয়া উপজেলার বংশীপাড়া গণকবর ॥ পাবনা জেলার আটঘরিয়া উপজেলার মাজপাড়া বংশীপাড়া ঘাট (শহীদ কালামনগর)। ৬ নবেম্বর মুক্তিযোদ্ধা, গ্রামবাসীর সঙ্গে পাকিসত্মানী হানাদার বাহিনীর সম্মুখ যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এ যুদ্ধে ১২ জন বীর মুক্তিযোদ্ধাসহ মোট ৪৩ জন সাধারণ গ্রামবাসী শহীদ হন। দীর্ঘদিন অযত্ন, অবহেলায় গোচারণ ভূমিতে পরিণত ছিল ওই স্থান। তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার ৰমতায় থাকাকালে সেখানে কয়েক লাখ টাকা ব্যয়ে শহীদদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে একটি স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করে। যথাযথ পরিচর্যা আর অবহেলায় পড়ে আছে স্মৃতি সৌধস্থান।
সাঁথিয়া উপজেলার ধুলাউড়ি গণহত্যা ও গণকবর ॥ পাবনা জেলার সাঁথিয়া উপজেলার ধুলাউড়ি গণহত্যা চালায় ১৯৭১ সালের ২৭ নবেম্বর। জেলার অন্য এলাকার একদল মুক্তিযোদ্ধা ধুলাউড়ি গ্রামে আশ্রয় নেয় এবং একই দিন ওই গ্রামে পাকবাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধ করার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। এমন সময় তৎকালীন আলবদর, আলশামস প্রধান মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীর পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষ নির্দেশে এবং তাদের সহযোগিতায় পাকিসত্মানী হানাদার বাহিনী ওই গ্রামের চারিদিক ঘিরে ফেলে মুক্তিযোদ্ধাদের এ্যাম্বুস করে নির্বিচারে গুলি বর্ষণ করে হত্যা করে। পাকিসত্মানী বাহিনীর নেতৃত্ব দেয় রাজাকার কমান্ডার সাঁথিয়ার আব্দুস সাত্তার । এখানে পাকিসত্মানী বাহিনীর হাতে ১৮ জন মুক্তিযোদ্ধাসহ অর্ধশত গ্রামবাসী শহীদ হন। গণকবরটিতে স্মৃতিসত্মম্ভ নির্মাণ করার দীর্ঘদিনের দাবি থাকলেও তা আজও হয়নি। সীমানা প্রাচীর দিয়ে গণকবরটি ঘিরে দেয়া হলেও তা চুনকাম না করায় নস্ট হয়ে যাচ্ছে।
ডেমড়া-বাউশগাড়ি গণকবর ॥ পাবনা জেলার সাঁথিয়া উপজেলার শেষ সীমানা এবং বনওয়ারীনগর ফরিদপুর উপজেলার সীমানত্মবতর্ী এলাকা ডেমড়া। এলাকাটি নিরাপদ ভেবে বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা থেকে হিন্দু মুসলমান ধর্ণাঢ্য ব্যবসায়ীরা এ গ্রামে আশ্রয় নেয়। ৩০ বৈশাখ শুক্রবার তৎকালীন আলবদর, আলশামস প্রধান মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহযোগিতায় এবং নির্দেশে তার স্থানীয় দোসর আসাদ রাজাকারের নেতৃত্বে এ গ্রামে ২শ' ৫০ জন হিন্দু ধর্নাঢ্য ব্যবসায়ীসহ প্রায় সাড়ে ৮শ' মুক্তিযোদ্ধা এবং স্থানীয় গ্রামবাসীকে নিষ্ঠুর ও নির্মমভাবে নির্বিচারে গুলি করে হত্যা করে পাকিসত্মান হানাদার বাহিনী। সেই সঙ্গে তারা এই এলাকায় ব্যাপক লুটতরাজ ও নারী ধর্ষণ করে। স্থানীয়দের কাছ থেকে জানা গেছে, উত্তরাঞ্চলের দ্বিতীয় বৃহৎ গণহত্যা চালায় পাকিসত্মানী হানাদার বাহিনী এই ডেমড়া গ্রামে। বর্তমানে ঝোঁপ আর জঙ্গলে পরিপূর্ণ এ গণকবরটি। ডেমড়া গ্রামে আরও যে গণকবর রয়েছে এখন তার স্মৃতি চিহ্ন খুঁজে পাওয়া কষ্টকর। যা দেখে নতুন প্রজন্ম জানতে পারবে এ স্থানের নৃংশস হত্যাকা-ের কাহিনী। দেশের ক্ষমতা বদল হয়েছে। দীর্ঘ ৩৮ বছর পর বাউশগাড়ী গণকবরটি চিহৃিত হয়েছে এবং সেখানে একটি স্মৃতিফলক তৈরি করা হয়েছে। ডেমড়ার গণকবর তিনটি চিহ্নিত পর্যনত্ম করা হয়নি।
শহীদনগর ডাব বাগান গণকবর ॥ রাজধানীর ঢাকা ও উত্তরাঞ্চলের প্রবেশদ্বার হিসেবে খ্যাত পাবনা জেলার সাঁথিয়া উপজেলার শহীদনগর ডাববাগান। এ স্থানে ১৯৭১ সালের ১৯ এপ্রিল মুক্তিযোদ্ধা, স্থানীয় গ্রামবাসীর সঙ্গে পাকিসত্মানী হানাদার বাহিনীর সম্মুখ যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এ যুদ্ধে ১৯ জন ইপিআরসহ প্রায় ২ শতাধিক মুক্তিযোদ্ধা, হিন্দু ব্যবসায়ী ও নিরীহ গ্রামবাসীকে নির্মমভাবে হত্যা করে এ দেশীয় দোসরদের সহযোগিতায় পাকিসত্মানী হানাদার বাহিনীর। ডাববাগানের এ যুদ্ধের স্মৃতি ধরে রাখতে এ গ্রামকে শহীদনগর নামকরণ করা হয়েছে। শহীদদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধার্থে তৎকালীন আওয়ামী লীগের তথ্যপ্রতিমন্ত্রী অধ্যাপক আবু সাইয়িদ ও স্থানীয় বিভিন্ন ইউপি চেয়ারম্যানদের আর্থিক সহযোগিতায় 'বীরবাঙ্গালী' নামে একটি স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করা হয়েছে। তবে এর কাজ এখনও করা সম্ভব হয়নি। অবহেলা আর অযত্নে স্মৃতিসৌধটি গো-চারণ ভূমিতে পরিণত হয়েছে। স্থানীয় গ্রামবাসীর দাবি অসমাপ্ত 'বীরবাঙ্গালীর' কাজ সমাপ্ত করে শহীদের প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করবে বর্তমান সরকার। পাবনা জেলার বিভিন্ন উপজেলার আনাচে কানাচে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা মহান মুক্তিযুদ্ধের সময়ে পাকিসত্মানী হানাদার বাহিনী ও এদেশীয় দোসর রাজাকার, আলবদর, আলশামসদের হাতে নির্মমভাবে নিহত ও শহীদদের গণকবরগুলো অবহেলা আর অযত্নে বর্তমানে নিশ্চিহ্ন হওয়ার পথে। জেলার বিভিন্ন স্থানের গণকবরগুলো ওই সময়ের বয়োজ্যেষ্ঠদের সহযোগিতা ছাড়া সহজে চেনার উপায় নেই। বিভিন্ন এলাকার এসব গণকবরগুলো চিহ্নিত করা হোক এমন দাবি রয়েছে পাবনাবাসী।

কিশোরগঞ্জে ১২ বধ্যভূমি অরক্ষিত
নিজস্ব সংবাদদাতা, কিশোরগঞ্জ, ১৪ ডিসেম্বর ॥ একাত্তরে বহু মুক্তিযোদ্ধা ও নিরীহ মানুষকে নৃশংস হত্যার স্থান হিসেবে পরিচিত কিশোরগঞ্জের ১২টি বধ্যভূমির সুষ্ঠু সংরক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে না উঠার কারণে এখন গোচারণ ভূমিতে পরিণত হয়েছে। বিজয় লাভের ৪০ বছরেও চিহ্নিত করা হয়নি অর্ধশতাধিক বধ্যভূমিগুলো। এখনও অরক্ষিত সংরক্ষণযোগ্য ১২টি বধ্যভূমি। এসব বধ্যভূমিতে মিশে আছে দেড় হাজারেরও বেশি মুক্তিকামী বাঙালীর রক্ত। সরেজমিনে সদর উপজেলার মহিনন্দ ইউনিয়নের শোলমারা ব্রিজসংলগ্ন বধ্যভূমিতে দেখা গেছে, নামফলক একটি স্মৃতিসত্মম্ভ থাকলেও বধ্যভূমিটি অত্যনত্ম অপরিষ্কার-অপরিচ্ছন্নতা অবস্থায় রয়েছে। এখানে প্রতিদিন অবাধে চষে বেড়াচ্ছে গরম্ন-ছাগল। সংরক্ষণের অভাবে এ ভূমিটি যেন গোচারণ ভূমিতে পরিণত হয়েছে। এদিকে শহীদদের স্মরণে গত বছর জেলা সদরের বিন্নাটী মোড়ে একটি স্মৃতিসৌধের কাজ শুরম্ন হলেও এখন তা শেষ হয়নি। সংশিস্নষ্ট একাধিক সূত্রে জানা গেছে, মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকসেনা ও এদেশীয় দালাল রাজাকার, আলবদর, আলশামস ও মুজাহিদ বাহিনী সারাদেশের মতো কিশোরগঞ্জেও ব্যাপক অগি্নকাণ্ড, হত্যাযজ্ঞ ও ধর্ষণ-নির্যাতনের চিহ্ন রেখে গেছে।
জানা গেছে, ১৯৭১ সালে দখলদার বর্বর পাকহানাদার বাহিনী জেলার ১২টি স্থানে অসংখ্য মুক্তিযোদ্ধা ও নিরীহ মানুষকে হত্যা করে। সদর উপজেলার বড়ইতলা বধ্যভূমিতে ১৮৭ জন, শোলমারা ব্রিজসংলগ্ন বধ্যভূমিতে ৩০ জন, সিদ্বেশ্বরী বাড়িঘাট বধ্যভূমিতে ১০০ জন, যশোদল টেঙ্টাইল মিলসংলগ্ন নদীরপাড় বধ্যভূমিতে ১৫০ জন, মণিপুরঘাট ব্রিজসংলগ্ন বধ্যভূমিতে ১০০ জন, লতিবাবাদ ইউনিয়নের বড়পুলের নিচের বধ্যভূমিতে ৫০ জন, কিশোরগঞ্জ রেলস্টেশন মাস্টারের সরকারী বাসভবনসংলগ্ন বধ্যভূমিতে ১৫০, দানাপাটুলি ইউয়িনের ধুলদিয়া ব্রিজসংলগ্ন বধ্যভূমিতে ২০০ জন, হোসেনপুর উপজেলার কুড়িঘাট বধ্যভূমিতে ৫০ জন, ভৈরব উপজেলার পানউলস্নারচর শিবপুর (আলগারচর) বধ্যভূমিতে ৭০০ জন, কটিয়াদী উপজেলার সদর বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়সংলগ্ন বধ্যভূমিতে ৪০ জন ও মানিকখালী রেলস্টেশনসংলগ্ন বধ্যভূমিতে ৫০ জন মুক্তিযোদ্ধা-জনতাকে গুলি করে নৃশংসভাবে হত্যা করে। এই ১২টি বধ্যভূমির মধ্যে শুধু সদর উপজেলার কর্শাকড়িয়াইল ইউনিয়নের বড়ইতলা ও ভৈরব উপজেলার পানউলস্নারচর শিবপুর (আলগারচর) বধ্যভূমিতে দুটি স্মৃতিসত্মম্ভ স্থাপন করে সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে।