মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
রবিবার, ১০ জুলাই ২০১১, ২৬ আষাঢ় ১৪১৮
পদ্মার শিবচরে দেড় শতাধিক অবৈধ বাঁধ দিয়ে পোনাসহ মা মাছ নিধন
নিজস্ব সংবাদদাতা, মাদারীপুর, ৯ জুলাই ॥ পদ্মা নদীর মাদারীপুরের শিবচর অংশে অনত্মত দেড় শতাধিক অবৈধ বাঁধসহ উপজেলার আড়িয়াল খা, বিল পদ্মাসহ সকল নদনদীতে স্থাপন করা হয়েছে অন্তত ৩ শতাধিক অবৈধ বাঁধ। এসকল বাঁধে ধরা পড়ছে পোনামাছ, মা মাছসহ সকল প্রজাতির ছোট-বড় মাছ। সকল আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে প্রতিদিনই বাড়ছে অবৈধ বাঁধের সংখ্যা। কিন্তু দেখার কেউ নেই! গত ৭-১০দিনে পানি বৃদ্ধির ফলে এখন মাদারীপুরের শিবচরের পদ্মাসহ সকল নদ-নদীতে অবৈধ নদীজুড়ে আড়াআড়ি বাঁধ দিয়ে পোনামাছ, ডিমওয়ালা মাছ, জাটকাসহ সকল প্রজাতির মাছ নিধনের মহোৎসব শুরম্ন হয়েছে।
সরেজমিনে পদ্মা নদী ঘুরে দেখা গেছে, কাওড়াকান্দি ফেরিঘাট সংলগ্ন পদ্মায়, চরজানাজানাজাতের কাওলিপাড়া, চরচান্দ্রা, জলসন, নেপালের হাওড়, পোড়াকান্দিরখোল, মীর আলী সরদারকান্দি, বাড়ইকান্দি, চানবেপারিকান্দি, কাঁঠালবাড়ি, মাগুরখ-, মাদবরচর, বন্দখোলা ইউনিয়নের চরাঞ্চলজুড়ে প্রায় দেড়শতাধিক নদীজুড়ে আড়াআড়ি বাঁধ দিয়ে ডিমওয়ালা মাছসহ সকল প্রজাতির মাছ নির্বিচারে নিধন শুরম্ন হয়েছে। এছাড়া আড়িয়াল খাঁ নদের নিলুখী, পৌর এলাকার বিল পদ্মা ক, খ শেখপুরের বিল পদ্মাসহ সকল নদনদী, খাল বিলে নদীজুড়ে আড়াআড়ি বাঁধ তৈরি করা হয়েছে। এক একটি বাঁধ ২শ' মিটার থেকে ৮শ' মিটার পর্যনত্ম বিসত্মৃত। বাঁধগুলো অসংখ্য বাঁশ গেড়ে মশারি, ছালা বা কারেন্ট জাল দিয়ে ঘেরা । নিচে মাছ আটকানোর দোয়াইর ও বড়শি। ফলে জাটকা, চিংড়ি, রম্নই, কাতলা, আইড়, পাঙ্গাস, বোয়ালের মা মাছ ও পোনাসহ সকল মাছ আটকা পড়ছে। বাঁধগুলোতে ব্যবহৃত জালগুলো দিয়ে এক ইঞ্চির পোনা মাছ বের হওয়ারও সুযোগ নেই।
অথচ সাড়ে ৪ সেন্টিমিটার ফাঁসযুক্ত জালের নিচে জাল ব্যবহার ও নদীতে কোন ধরনের প্রতিবন্ধকতামূলক বাঁধ আইনত সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ রয়েছে। নদীতে আরও অনত্মত সহশ্রাধিক চিংড়ি ধরার ডুবনত্ম বাঁধ দেখা গেছে। এ সকল বাঁধের সঙ্গে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের স্থানীয় প্রভাবশালীরা জড়িত বলে সাধারণ জেলেরা অভিযোগ করেন।
ওই একই এলাকার স্থানীয় বাসিন্দা রাহেলা বেগম বলেন, প্রতিবছর বর্ষায় নদীতে পানি বাড়ার সময় বিভিন্ন জায়গার থিকা মাইনষেরা আইয়া এই বান দিয়া ছোট-বড় সব মাছ মারে। এতে চরের মাইনষেগো জ্বালা বাইরা যায়। ভয়ে কেউ কিছু কইতে পারে না। কবির মিয়াসহ অসংখ্য জেলে ভয়ার্ত চোখে বলেন, যে বানগুলা (বাঁধ) দেহেন। এগুলা সব বাইরের মাইনষে দিছে। চরের মাইষের কি এত টাহা আছে?
চন্দ্রপাড়া এলাকায় জেলে দলের সর্দার গিয়াসউদ্দিন বলেন, মূল পদ্মায়ও বান আছে। ফেরিতে যে মন্ত্রী/অফিসাররা যায় তারা কি চোখে দেহে না? নদীতে কি হইতাছে। এই বাঁধগুলার ফলে নদী মাছশূন্য হইয়া গেছে। সবার সামনে তাও তো বাঁধ আছে। কেউ কিছু করে না। সবাই এই মাছের ভাগ পায়।
দক্ষিণ চরজানাজাত এলাকার একটি অবৈধ বাঁধের জেলে কাদির বেপারি বলেন, সেখপুরের এক লোক এই বানডা দিছে । নামডা মনে পড়ে না। আমারে দৈনিক বেতনে বান্ধে রাখছে। এই বানে ছোট বড় সব মাছই ধরা পড়ে।
আলী হোসেন নামের এক বাঁধ মালিক বলেন, জানি এই বান দেয়া নিষেধ। সবাই দেয় তাই আমিও দেই। কেউ না দিলে আমিও দিমু না। বানগুলার মাছ সবাই ভাগ পায় তাই কেউ কিছু বলে না বলে তিনি দাবি করেন। শিবচর উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মনিরম্নল মামুন বলেন, আমরা মৎস্য অধিদফতরের প্রথম শ্রেণীর কর্মকর্তা হলেও কোন অভিযান চালাতে হলে মেজিস্ট্রেট ও পুলিশের জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হয়। আইনগতভাবে মৎস্য বিভাগ অভিযান চালাতে পারে না। এছাড়াও বাঁধ অপসারণের জন্য বাজেটও অপ্রতুল।
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা ড. একেএম আমিনুল হক সত্যতা স্বীকার করে বাঁধগুলোকে ভয়াবহ আখ্যা দিয়ে বলেন, শত শত বাঁধ দিয়ে শুধু মাছ ধ্বংসই করা হচ্ছে না, এটি নদী দখলের একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া। এগুলো অপসারণের ভার শুধু মৎস্য বিভাগের নয়, নৌ পরিবহনসহ প্রশাসনেরও। তাদেরও ভয়াবহ এ বাঁধগুলো অপসারণে দ্রম্নত পদক্ষেপ নিতে হবে।