মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
সোমবার, ১৬ আগষ্ট ২০১০, ১ ভাদ্র ১৪১৭
ভূঞাপুরে যমুনার ভাঙ্গনে দশ স্কুলসহ তিন হাজার পরিবার গৃহহীন
খোলা আকাশের নিচে মানবেতর জীবনযাপন করছে বহু মানুষ
নিজস্ব সংবাদদাতা, টাঙ্গাইল ॥ প্রমত্তা যমুনার ভয়াবহ ভাঙনে টাঙ্গাইলের ভূঞাপুর উপজেলার ৪টি ইউনিয়নের ২৫টি গ্রামের ৩ হাজারের অধিক পরিবার গৃহহীন হয়ে পড়েছে। বিলীন হয়ে গেছে ১০টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ১৭টি মসজিদ, ২টি ব্রিজসহ হাজার হাজার একর ফসলী জমি। ভেসে গেছে শতশত গাছপালা। খোলা আকাশের নিচে মানবেতর জীবনযাপন করছে শতাধিক পরিবার।
সরেজমিন জানা যায়, ভূঞাপুর উপজেলার ৪টি ইউনিয়ন অজর্ুনা, গাবসারা, নিকরাইল ও গোবিন্দাসীর ২৫টি গ্রামে ভয়াবহ ভাঙ্গন দেখা দিয়েছে। ইতোমধ্যেই অজর্ুনা ইউনয়িনের শুশুয়া, তালতলা, বাসুদেবকোল, রামাইল, বরম্নয়া, বোরার বয়ড়া, চর গোবিন্দপুর, খাস বোরার বয়ড়া ও বানিয়াবাড়ী গ্রামের ২ হাজারের অধিক পরিবার। গাবসারা ইউনিয়নের ছোট নলছিয়া, রামপুর, জংগীপুর, রেহাই গাবসারা, রম্নলিপাড়া, গোবিন্দপুর, বিশ্বনাথপুর, ছোট জয়পুর, সরইপাড়া, ভূইয়াপাড়া, মেঘারপটল, উত্তর বিহারী, চর বিহারী ও নূরপুর গ্রামের ৮ শতাধিক পরিবার। নিকরাইল ইউনিয়নের নলছিয়া গ্রামের ২৮০টি পরিবার এবং গোবিন্দাসী ইউনিয়নের চিতুলিয়াপাড়া, খানুরবাড়ী ও ভালকুটিয়া গ্রামের ৭১টি পরিবারসহ ৩ হাজারের অধিক পরিবার গৃহহীন হয়ে পড়েছে। প্রতিদিন গৃহহীন হয়ে পড়ছে নতুন নতুন পরিবার। এছাড়া ভাঙ্গনে বিলীন হয়ে গেছে জংগীপুর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, সরইপাড়া সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, রম্নলিপাড়া রেজিঃ বেসরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, উত্তর গাবাসার হাফিজিয়া মাদরাসা, শুশুয়া উচ্চ বিদ্যালয়, শুশুয়া সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, তালতলা সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, খাস বোরার বয়ড়া সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, জোমার বয়ড়া রেজিঃ বেসরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, বোরার বয়ড়া রেজিঃ বেসরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ ১০টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও ৬টি প্রতিষ্ঠানের পাকা ভবন, ২টি ব্রিজ ও বিভিন্ন গ্রামের ১৭টি মসজিদ এবং হাজার হাজার একর ফসলী জমি। ভেসে গেছে বসতভিটার শত শত গাছপালা। যমুনার ভাঙনে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রসত্ম হয়েছে অজর্ুনা ইউনিয়ন। এ ইউনিয়নের তালতলা গ্রামটি সম্পূর্ণভাবে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। এছাড়া অর্ধ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত শুশুয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের দ্বিতল ভবন, ২২ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত শুশুয়া সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাকা ভবন, প্রায় ৪০ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত এলজিইডির ২টি ব্রিজ নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে।
গ্রামগুলোতে ভাঙ্গনের তীব্রতা এতই ব্যাপক যে ক্ষতিগ্রসত্মরা ঘরবাড়ি সরিয়ে নিতেও হিমশিম খাচ্ছে। বসতভিটা হারানো পরিবারগুলোর মধ্যে কেউ কেউ গবাদি পশু নিয়ে আশ্রয় নিয়েছে আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে। কেউবা অস্থায়ীভাবে অন্যের জমিতে খোলা আকাশের নিচে মানবেতর জীবনযাপন করছে। প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে অনেকের ঘরে কয়েক দিন চুলা পর্যনত্ম জ্বলেনি। বিলীন হয়ে যাওয়া ১০টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শত শত ছাত্র-ছাত্রীর পড়াশোনা বন্ধ হয়ে গেছে। শুশুয়া গ্রামের নূরম্নল ইসলাম (৫০) বলেন, বাপের জন্মেও এমন ভাঙ্গন দেখিনি। কয়েক লাখ টাকা মূল্যের ২৮০টি ইউক্যালিপটাস গাছ ক্রেতার অভাবে নামমাত্র ১৬ হাজার টাকায় বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছি।
তালতলা গ্রামের আব্দুল আজিজ (৪০) বলেন, পুরাতন গাছপালায় ঘেরা সাজানো বাড়িটি দেখতে দেখতে বিলীন হয়ে গেল। পরিবার পরিজন নিয়ে ৪/৫ দিন যাবত খোলা আকাশের নিচে কষ্টের মধ্যে রয়েছি। অজর্ুনা ইউপি চেয়ারম্যান আয়ুব আলী মোলস্না জানান, ভাঙ্গনে ক্ষতিগ্রসত্ম পরিবারগুলোর জন্য জরম্নরীভিত্তিতে প্রয়োজন খাদ্যসামগ্রী, গৃহ নির্মাণ, বিশুদ্ধ পানির জন্য নলকূপ স্থাপন এবং স্যানিটেশনের ব্যবস্থা করা।
গাবসারা ইউপি চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন তালুকদার জিন্নাহ জানান, ত্রাণসামগ্রী হিসেবে কিছু চাল বিতরণ করা হলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই অপ্রতুল। এ বিষয়ে ভূঞাপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার কে.এম. আব্দুল ওয়াদুদ জানান, ভাঙ্গনকবলিত এলাকাগুলোর জন্য জরম্নরীভিত্তিতে ত্রাণসামগ্রী প্রেরণের আবেদন জানানো হয়েছে। ইতোমধ্যেই জি.আর হিসেবে ৪৮ টন চাল ও নগদ ৬০ হাজার টাকা বরাদ্দ পাওয়া গেছে। ২১ টন চাল বিতরণ করা হয়েছে। এছাড়া উপজেলা পরিষদের নিজস্ব ফান্ড থেকে ১শ'টি নলকূপ স্থাপন এবং স্যানিটেশনের জন্য ৩১৪ সেট ও জেলা পরিষদের অর্থায়নে ১৩৮ সেট রিং সস্নাব বিতরণ করা হবে।