মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
শনিবার, ১৭ জুলাই ২০১০, ২ শ্রাবণ ১৪১৭
বালুতে শ্বাসমূল আটকে উপকূল বিরানভূমিতে পরিণত হচ্ছে
সতেজ সবুজ গাছগুলো দাঁড়িয়ে আছে কঙ্কালের মতো
মেজবাহউদ্দিন মাননু, কলাপাড়া ॥ সবুজের সমারোহে বিমোহিত সাগর পারের জনপদের উপকূল যেন বিবর্ণ হয়ে গেছে। যাচ্ছে বিরাণভূমি হয়ে। সতেজ সবুজ গাছগুলো দাঁড়িয়ে আছে ঠায় কঙ্কালের মতো। প্রায় তিন বছরের ব্যবধানে উপকূলের এই জনপদ যেন এখন পরিচিত মানুষের কাছে পরিণত হয়েছে অচেনা জনপদে। মড়া গাছেরা যেন দাঁড়িয়ে জানান দিচ্ছে আমরা তোমাদের জীবন সম্পদকে আর ঝড়-জলোচ্ছ্বাস থেকে প্রাথমিকভাবে রক্ষা করতে পারব না। পারব না সবুজ দেয়াল হিসেবে ঝড় কিংবা সাগরের জলোচ্ছ্বাস থেকে রক্ষার জন্য কোন বাধা হতে। মানুষকে লক্ষ্য করে যেন তাদের আকুতি বাঁচাও আমাদের, তাহলে আমরাও বাঁচাব তোমাদের। এমন দৃশ্য বৃহত্তর পটুয়াখালীর সাগর উপকূলের চিত্র। দেখলে মনে হবে যেন মড়ক লেগেছে। সংরক্ষিত বনাঞ্চলের সর্বত্র হাজার হাজার গাছ মরে গেছে। সিডর এবং আইলার তা-বের পরে ছইলা, কেওড়া ও গেওয়া প্রজাতির হাজার হাজার গাছের শ্বসমূল জলোচ্ছ্বাসে বালুর আসত্মরণের নিচে আটকা পড়ে যায়। দেখলে মনে হয় গাছগুলো কোমর সমান বালুর নিচে আটকা আছে। বালুর আসত্মরণ পড়ে গাছের শ্বাসমূল ঢাকা পড়ার কারণ ছাড়াও সাগরের পানিতে লবণাক্ততার পরিমাণ মাত্রাতিরিক্ত বেড়ে যাওয়া গাছ মরার আর একটি কারণ। জলবায়ুর দ্রম্নত পরিবর্তনে প্রকৃতিও হামলে পড়ছে মানুষ বসবাসের জনপদে। তছনছ করে দিচ্ছে মানুষের বসবাসের চিরচেনা পরিবেশ ও প্রতিবেশ। তবে বিশাল এই সংরক্ষিত বনাঞ্চল রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে থাকা বন বিভাগের কর্মকর্তারা দাবি করেছেন শ্বাসমূল বালুর আসত্মরণে ঢাকা পড়া ছাড়াও মাত্রাতিরিক্ত লবণাক্ততাও গাছ মরার প্রধান কারণ।
যেভাবেই হোক না কেন সবুজ দেয়ালখ্যাত এই বনাঞ্চলের বিপন্নতা দেখে সাগর পারের মানুষ উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন। কারণ উপকূলের লাখ লাখ মানুষকে ঝড়-জলোচ্ছ্বাসের কবল থেকে প্রাথমিকভাবে রক্ষার অবলম্বন সবুজ দেয়ালখ্যাত বনাঞ্চল দ্রম্নত বিলীন হওয়ায় গোটা উপকূলের মানুষের জীবন ও সম্পদ চরম হুমকির মুখে পড়েছে। একটু দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া দেখলেই এসব মানুষের মুখ মলিন হয়ে যায়।
দেশ স্বাধীনের পরে সংরক্ষিত বনাঞ্চল ছাড়াও পাঁচসালা পরিকল্পনায় উপকূলীয় বনায়ন প্রকল্প করা হয়। '৮২-৮৩ সালের তথ্য অনুসারে তখন উপকূলীয় এলাকায় বনভূমির পরিমাণ এক লাখ ১২ হাজার একরে পরিণত করার সিদ্ধানত্ম গৃহীত হয়। ১৯৬৫-৬৬ অর্থবছরে শুধু পানি উন্নয়ন বোর্ডের বাঁধের কাছেই ম্যানগ্রোভ জাতীয় বৃক্ষরোপণের কাজ সীমিত থাকে। '৭৭ সালে চরাঞ্চলে সাত হাজার সাত শ' নয় একর জমিতে বনায়ন করা হয়। বন বিভাগ পটুয়াখালী অঞ্চলে কাগজপত্রে ছয়টি রেঞ্জ রয়েছে। কলাপাড়া রেঞ্জ, মহীপুর রেঞ্জ, গলাচিপা রেঞ্জ, আমতলী রেঞ্জ, পাথরঘাটা রেঞ্জ ও চরমোনত্মাজ রেঞ্জ। এসব বনাঞ্চল রক্ষার জন্য রয়েছে বিভিন্ন রেঞ্জ অফিস। রেঞ্জ কর্মকর্তার অধীনে রয়েছে আবার বিট অঞ্চল। পটুয়াখালী জেলা শহরে রয়েছে বরগুনা ও পটুয়াখালী জেলার বিভাগীয় বন কর্মকর্তার কার্যালয়। তাদের দেয়া তথ্যমতে, এই দুই জেলায় প্রায় ৫০ হাজার একরজুড়ে সংরক্ষিত বনায়ন রয়েছে। সবুজের সমারোহে এই বনাঞ্চলের অধিকাংশই বন বিভাগের উদ্যোগে সৃজন করা। আবার সাগরের বিভিন্ন মোহনায় জেগে ওঠা চরে প্রাকৃতিকভাবে জন্মানো এই গাছ। বনের গাছের বীজ ভেসে এসেও বিসত্মার ঘটেছে বনাঞ্চলের।
এসব রেঞ্জে '৮০-র দশক থেকে শুরম্ন হয় বনদসু্যদের বননিধনের তা-ব, যা চরম পর্যায় পেঁৗছে চারদলীয় জোটের সময়। এমনকি বনের মধ্যে স মিল বসিয়ে পর্যনত্ম বনাঞ্চল নিধনের প্রতিযোগিতা চলতে থাকে। ধুলাসার, গঙ্গামতি, কুয়াকাটা, খাজুরা, মহীপুর ও ফাতড়া এলাকার বনাঞ্চল নিধনের ভয়াবহ তা-ব চালানো হয়। এমন সব মনুষ্য তা-ব এখন রয়েছে সমানতালে অব্যাহত। কিন্তু এখন চলছে প্রকৃতির তা-ব। জলবায়ুর দ্রম্নত পরিবর্তনজনিত কারণে সিডর ও আইলার মতো ভয়াল তা-বে যেন ল-ভ- হয়ে যায় সবুজ এই প্রকৃতি। হাজার হাজার গাছ মরে বনভূমি যাচ্ছে বিরাণভূমিতে পরিণত হয়ে। সরেজমিনে না দেখলে বোঝা যায় না যে কীভাবে মরে যাচ্ছে বন বিভাগের গাছপালা। খাজুরার বিসত্মীর্ণ বন এলাকায় ৫-৭ বছর আগেও বনের মধ্যে দিনের বেলা প্রবেশ করতে গা ছম ছম করত ভয়ে। ছিল গহীন অরণ্য। আর এখন তা হয়ে গেছে বিরাণভূমি। অনত্মত এক হাজার একর এরিয়া কমে গেছে। একই দৃশ্য কুয়াকাটা ও গঙ্গামতির। সারি সারি মরা গাছ দাঁড়িয়ে আছে। ধুলাসার বনাঞ্চল আছে নামেমাত্র। দেড় হাজার একর আয়তনের বনাঞ্চলটির আছে মাত্র তিন শ' একর। বাহেরচর, ক্রাফটল্যান্ডের (তুফাইন্যার চর) বনাঞ্চল, ফাতড়ার বনের এখন শুধু সাগর ও নদীর চারদিকে আছে বনাঞ্চল। বাকিসব উজাড় হয়ে গেছে। সাগরের কোল ঘেঁষে কোনটি বিচ্ছিন্ন, আবার কোনটি সংযুক্ত এই বনাঞ্চল। প্রধানত ছইলা, কেওড়া, গড়ান, গেওয়া, ঝাউ, বাইনসহ বিভিন্ন লতাগুল্মে ভরা বনাঞ্চল এলাকা। সাগর নদী ভাঙনের কারণ ছাড়াও প্রকৃতি এখন যেন ধ্বংসে নেমেছে সবুজ দেয়ালখ্যাত উপকূলের বনাঞ্চল। তবে সবচেয়ে অবাক হওয়ার বিষয় কী পরিমাণ বনভূমি কমে গেছে তার কোন সঠিক তথ্য নেই বনাঞ্চলের কোন অফিসে।
কুয়াকাটার জেলে, স্থানীয় বাসিন্দা নূর আলম গাজী (৩৪) বলেন, 'মোর আট বছরের জাইল্যার অভিজ্ঞতায় কইতে পারি কতুটু বাগান আছেল, এহন দুই মিনিটে সাগরপারে যাইতে পারি। আর তহন (১০-১২ বছর আগে) আধাঘণ্টা সময় লাগতে বাগান ভাড়াইতে। তয় এহন কুয়াকাটায় যা বাগান আছে তা আগের পাঁচ ভাগের একভাগ মাত্র। আর ব্যাবাক শ্যাষ অইয়া গ্যাছে।' এই জেলেরও মতামত শেকড় অর্থাৎ শ্বাসমূল বালুর আসত্মরণে ঢাকা পড়ায় গাছ মারা যাচ্ছে। এসব মানুষের মনত্মব্য শুধু কলাপাড়ায় অনত্মত দুই হাজার একর সংরক্ষিত বনাঞ্চল বিরাণভূমি হয়ে গেছে। আর যেভাবে এই গাছের মরণের তা-ব শুরম্ন হয়েছে তাতে আগামী পাঁচ বছরে সংরক্ষিত বাগানের পরিমাণ অর্ধেকে এসে পেঁৗছার আশঙ্কা রয়েছে।
এ ব্যাপারে পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগের চেয়ারম্যান প্রফেসর আ. ক. ম. মোসত্মফা জামান জনকণ্ঠকে জানান, কোথাও কোথাও রোগবালাইয়ে গাছ মারা যাচ্ছে। কিন্তু সাগর পারের এই এলাকায় সিডর ও আইলার পরে বালুর আসত্মরণে শ্বাসমূল ঢাকা পড়ে সংরক্ষিত বনাঞ্চলের গাছ ব্যাপকভাবে মারা যাওয়ার প্রধান কারণ। এক্ষেত্রে সরকারী উদ্যোগের পাশাপাশি এলাকার স্থানীয় জনগণের এগিয়ে আশা জরম্নরী বলে তিনি মনে করেন। এসব পরিপক্ব গাছ বাঁচাতে বালুর আসত্মরণ সরিয়ে ফেলতে হবে। এছাড়া নতুন করে দুই তিন লাইনে সারিবদ্ধভাবে গাছ লাগানো জরম্নরী বলেও তিনি মনে করেন।
বেসরকারী স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা কুয়াকাটা ডেভেলপমেন্ট সোসাইটির নির্বাহী পরিচালক রম্নমান ইমতিয়াজ তুষার বলেন, সংরক্ষিত এই সব বনাঞ্চল প্রথমে রক্ষা করতে হবে। গাছ মারা যাওয়ার পরে ভূমিদসু্যদের কবল থেকে বিরাণভূমি মুক্ত করে নতুন করে বনায়ন করা জরম্নরী। মোটকথা সংরক্ষিত বনাঞ্চল রক্ষা করতে না পারলে উপকূলের লাখ লাখ মানুষ ঝড়-জলোচ্ছ্বাসে হারাবে তাদের জীবন ও সম্পদ।