মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
শনিবার, ১৭ জুলাই ২০১০, ২ শ্রাবণ ১৪১৭
ময়মনসিংহ মেডিক্যালে দালালের খপ্পরে পড়ে গৃহবধূর মৃত্যু
স্বজনদের প্রশ্ন আর কত লাশ হলে দালালমুক্ত হবে হাসপাতাল
স্টাফ রিপোর্টার, ময়মনসিংহ ॥ মারাত্মক রক্তক্ষরণ সমস্যা নিয়ে ময়মনসিংহ মেডিক্যালে চিকিৎসা নিতে এসে দালালের খপ্পরে পড়ে প্রাণ গেছে নেত্রকোনার গৃহবধূ ময়নার। দালালরা কেবল ময়নার প্রাণই কেড়ে নেয়নি, সেই সঙ্গে ময়নার চিকিৎসার জন্য নেত্রকোনা থেকে চাঁদা তুলে আনা টাকাও কেড়ে নিয়েছে দালাল আর হাসপাতালের ডাক্তার কর্মচারী! বুধবার রাতের এই ঘটনায় ময়নার দিনমজুর বাবা কালাচান আর মা জামেলার বুকফাটা আহাজারিতে ময়মনসিংহ মেডিক্যালের রাতের বাতাস ছিল ভারি। হাসপাতালের বারান্দায় হতদরিদ্র বাবা-মায়ের এই আহাজারিতে থমকে যাওয়া রোগীর স্বজনের মুখে মুখে প্রশ্ন ছিল, আর কত লাশ হলে দালালমুক্ত হবে ময়মনসিংহ মেডিক্যাল? জানা যায়, নেত্রকোনার মোহনগঞ্জ থানার নাগডরা গ্রামের দিনমজুর কালাচানের কন্যা ময়নাকে রক্তক্ষরণ সমস্যার জন্য বুধবার সকালে নেত্রকোনা সদর হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়। এখানে অবস্থার অবনতি ঘটলে কর্তব্যরত ডাক্তার ময়নাকে ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে রেফার্ড করেন। কিন্তু ময়নাকে ময়মনসিংহ মেডিক্যালে নিয়ে যাওয়ার মতো প্রয়োজনীয় টাকা ছিল না দিনমজুর বাবার কাছে। কন্যার চিকিৎসার জন্য কালাচানের কাকুতি মিনতি শুনে হাসপাতালের কর্তব্যরত ডাক্তার ও স্থানীয় লোকজন দয়াপরবশ হয়ে ময়নার চিকিৎসার জন্য চাঁদা তুলে চার হাজার টাকা দেয়। সরকারী এ্যাম্বুলেন্সে করে ময়নাকে নিয়ে ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের জরম্নরী বিভাগে পেঁৗছামাত্রই বুধবার বিকেলে দালালের খপ্পরে পড়ে বাবা কালাচান ও তার মা জামেলা। এ্যাম্বুলেন্স থেকে নামিয়ে ময়নাকে হাসপাতালের ট্রলিতে করে জরম্নরী বিভাগে নেয়ার সময় দু'দালাল ট্রলি থামিয়ে কালাচান ও জামেলাকে নিয়ে যায় সিসিইউতে। বলা হয়, জরম্নরী বিভাগের ডাক্তার এই মাত্র চলে গেছেন। রোগীকে তার চেম্বারে নিয়ে যেতে হবে বলে ট্রলি থেকে নামিয়ে তোলা হয় রিঙ্ায়।
এরপর মরণাপন্ন ময়নাকে নিয়ে যাওয়া হয় প্রথমে শহরের ভাটিকাশর ও পরে বাঘমারা এলাকার নেত্রকোনার ব্যক্তিমালিকানার একটি প্রাইভেট হাসপাতালে। সেখানে স্যালাইন পুশ করে অপারেশনের জন্য দাবি করা হয় নগদ ২০ হাজার টাকা। কিন্তু দাবি করা টাকা কালাচানের পকেটে না থাকায় ও একপর্যায়ে ঘটনা অাঁচ করতে পেরে জামেলা ও কালাচান চিৎকার শুরম্ন করলে অবস্থা বেগতিক দেখে দালালরা ৬শ' টাকা কেড়ে নিয়ে ফের রিঙ্ায় তুলে দেয় ময়নাকে। কিন্তু ততক্ষণে পার হয়ে গেছে দু'ঘণ্টার ওপরে। অর্থলোভী দালাল আর প্রাইভেট হাসপাতাল মালিকদের এসব নানা বাধাবিঘ্ন পেরিয়ে অবশেষে বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে ময়নাকে ভর্তি করা হয় ময়মনসিংহ মেডিক্যালের লেবার ওয়ার্ডে। কর্তব্যরত ডাক্তার ময়নাকে দেখে প্রয়োজনীয় রক্ত, স্যালাইন ও ওষুধ কিনতে বলেন কালাচানকে। নগদ ৩৪২০ টাকার ওষুধ ও ৩শ' টাকার স্যালাইন কিনে অপারেশন থিয়েটারে পেঁৗছে দিয়ে ফের কালাচান ছোটেন ময়নার রক্তের সন্ধানে। ৬শ' টাকায় দু'ব্যাগ রক্ত নিয়ে অপারেশন থিয়েটারে ঢুকতেই শুনতে হয় ময়না চলে গেছে। অপারেশন থিয়েটার থেকে এ সময় বেঁচে যাওয়া কিছু ওষুধও ধরিয়ে দেয়া হয় কালাচানের হাতে।
ততক্ষণে ময়নার মা জামেলার আহাজারিতে গোটা গাইনি বিভাগের বাতাস ভারি হয়ে ওঠে। ওষুধ আর রক্তের ব্যাগ হাতে নিয়ে জামেলার পাশে নির্বাক নিথর হয়ে পড়েন কালাচান। একপর্যায়ে ময়নাকে হাসপাতালের গাইনি বিভাগের গেটের বাইরে রাখা হলে কালাচানও ভেঙ্গে পড়েন বুকভাঙ্গা আহাজারিতে। কালাচান অভিযোগ করে জানান, হাসপাতালের জরম্নরী বিভাগে দালালের খপ্পরে পড়েই ময়নার মৃতু্য হয়েছে।
গাইনি বিভাগের অপারেশন থিয়েটার থেকে ফেরত পাওয়া ওষুধ বিক্রি করে পেয়েছেন মাত্র ৭শ' টাকা। বাকি ওষুধের হদিস নেই! জামেলার অভিযোগ, মেয়েকে বাঁচাতে নেত্রকোনার ডাক্তার আর স্থানীয় লোকজনের তুলে দেয়া চাঁদার টাকায় চিকিৎসা করাতে ময়মনসিংহ এসেও ময়নাকে সুস্থ করা যায়নি। ময়না মারা গেলেও কিনে দেওয়া ওষুধও ফেরত মেলেনি বলে অভিযোগ করেন তিনি।
কীভাবে এখন ময়নার লাশ নিয়ে যাবেন নেত্রকোনায়_ প্রশ্নের সঙ্গে এই হতদরিদ্র বাবা-মায়ের আহাজারি বুধবার রাতে থামিয়ে দিচ্ছিল হাসপাতালে রোগী ও স্বজনদের। এ সময় জটলা থেকে প্রশ্ন ওঠে আর কত লাশ হলে দালালমুক্ত হবে ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল?