মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
শুক্রবার, ১ জানুয়ারী ২০১০, ১৮ পৌষ ১৪১৬
টঙ্ক আন্দোলন
সংবাদদাতা, দুর্গাপুর, নেত্রকোনা নেত্রকোনার সীমানত্মবতর্ী গারো পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত প্রাকৃতিক অপরূপ সৌন্দর্যে শোভিত সুসঙ্গ দুর্গাপুর। ঐতিহাসিক টঙ্ক আন্দোলনের তীর্থস্থানখ্যাত এই দুর্গাপুর। বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক সভাপতি, মুক্তিযুদ্ধকালীন প্রবাসী সরকারের উপদেষ্টা, মেহনতি মানুষের মুক্তি সংগ্রামের কিংবদনত্মি বিপস্নবী নেতা মণিসিংহ। এই বিপস্নবী মহানায়ক জন্মেছিলেন ১৯০১ সালের ২৮ জুলাই। আর প্রয়াত হয়েছেন ১৯৯০ সালের ৩১ ডিসেম্বর। টঙ্ক আন্দোলনে শহীদ হয়েছিলেন নারীসহ ৩১ বীর কৃষক ও মেহনতি মানুষ। ওই শহীদদের স্মরণে দুর্গাপুরে নির্মাণ করা হয়েছে টঙ্ক শহীদ স্মৃতিসত্মম্ভ।

টঙ্ক প্রথা কি?

টঙ্ক মানে ধান করারি খাজনা প্রথা। ফসল হোক বা না হোক করার মতো ধান দিতে হবে। টঙ্গ জমির ওপর কৃষকের কোন স্বত্ব ছিল না। তৎকালীন ময়মনসিংহ জেলার উত্তরে কলমাকান্দা, সুসঙ্গ দুর্গাপুর, হালুয়াঘাট, নালিতাবাড়ী ও শ্রীবদীসহ সুসঙ্গ জমিদারি এলাকায় সর্বত্র এই প্রথার ব্যাপক প্রচলন ছিল।
টঙ্ক প্রথানুযায়ী সোয়া একর জমির জন্য ধান দিতে হতো সাত থেকে পনের মণ অথচ সে সময় জোতজমির খাজনা ছিল সোয়া একরে পাঁচ থেকে সাত টাকা মাত্র। প্রতিমণ ধানের দাম ছিল সোয়া দুই টাকা। ফলে সোয়া একরে অতিরিক্ত খাজনা দিতে হতো এগার টাকা থেকে সতের টাকা। এই প্রথা শুধু জমিদারদেরই ছিল তা নয়, মধ্যবিত্ত মহাজনরাও এই প্রথায় লাভবান হতেন। একমাত্র সুসঙ্গ জমিদারই টঙ্ক প্রথায় দুই লাখ মণ ধান আদায় করতেন। এটা ছিল জঘন্যতম সামনত্মতান্ত্রিক শোষণ ব্যবস্থা। এ শোষণের হাত থেকে ওইসব এলাকার কৃষক ও মেহনতি মানুষদের রৰা করতে মনিসিংহের নেতৃত্বে ১৯৩৭ থেকে ১৯৪৯ সাল পর্যনত্ম আন্দোলন সংগঠিত ও পরিচালিত হয়। এতে মণিসিংহের সহযোগী হিসেবে আন্দোলন সংগঠকের ভূমিকা পালন করেন লেংগুরা অঞ্চলের ললিত সরকার ও ভূপেন ভট্টাচার্য, হালুয়াঘাটের প্রথম গুপ্ত ও নালিতাবাড়ী জলধর পাল। সে সময়ের আন্দোলন-সংগ্রামকে ঘিরে আজও এ অঞ্চলের মানুষ স্মরণ করে আত্মত্যাগী শহীদদের কথা। তাদের স্মরণেই এই স্মৃতিসত্মম্ভ প্রাঙ্গণে প্রতিবছর জমে ওঠে ৩১ ডিসেম্বর থেকে মণিসিংহ মেলা। এবারও মণিসিংহের ১৯ তম মৃতু্যবার্ষিকী উপলৰে সর্বদলীয়ভাবে সপ্তাহব্যাপী পালিত হচ্ছে এই মেলা। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে অসংখ্য মানুষ এই মেলা উপভোগ করতে দুর্গাপুরে আসেন। দিনে দিনে ব্যাপ্তি পাচ্ছে।
টঙ্ক আন্দোলনে শহীদ হন রাশিমনি হাজং, সুরেন্দ্র হাজং, মঙ্গল সরকার, অগেন্দ্র, সুরেন্দ্র, শঙ্খমণি, রেবতি, যোগেন ও স্বরাজ, শচি রায়, দুবরাজ, রবি দাম, মাহতাব উদ্দিনসহ অজ্ঞাত অনেক।
তাঁদের স্মৃতির উদ্দেশে সুসঙ্গ দুর্গাপুরে স্থাপন করা হয়েছে 'টঙ্ক শহীদ স্মৃতিসত্মম্ভ। প্রয়াত রবি নিয়োগী ১৯৯৩ সালের ৩১ ডিসেম্বর (বাংলা ১৪০০ সনের ১৭ পৌষ) শুক্রবার সংসদ স্মৃতিসত্মম্ভ ফলক উন্মোচন করেন। যে জমির ওপর টঙ্ক শহীদ স্মৃতিসত্মম্ভটি স্থাপিত হয় সেই জমি দান করেন সাবেক সাংসদ জালাল উদ্দিন তালুকদার। স্মৃতিসত্মম্ভের স্থাপত্য শিল্পী হচ্ছেন রবিউল হুসাইন। এর নির্মাণ প্রকৌশলী শেখ মুঃ শহীদুলস্নাহ্। নির্মাণ কাজ তত্ত্বাবধান করেন শেখ মুঃ মুনিরম্নজ্জামান। তেভাগা টঙ্ক নানকার আন্দোলনের স্মৃতিরৰা জাতীয় কমিটির উদ্যোগেই তৈরি হয় এই 'টঙ্ক শহীদ স্মৃতিসত্মম্ভ'।
স্মৃতিসত্মম্ভের কাজ এখনও পুরোপুরি শেষ হয়নি। স্মৃতিসত্মম্ভকে ঘিরে এখানে একটি লাইব্রেরী ও একটি মিউজিয়াম নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে বলে প্রয়াত মণিসিংহের উত্তরাধিকারী পুত্র ডা. দিবালোক সিংহের কাছ থেকে জানা গেছে। নির্মিতব্য লাইব্রেরী ও মিউজিয়ামসহ পূর্ণাঙ্গ স্মৃতিসত্মম্ভটিই তেভাগা টঙ্ক আন্দোলনের বীর শহীদদের চিরদিন অমর করে রাখবে সর্বসত্মরের মানুষের কাছে।