মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
সোমবার, ১ ডিসেম্বর ২০১৪, ১৭ অগ্রহায়ন ১৪২১
শীতের পদধ্বনি
শীতের পদধ্বনি সর্বত্র। বেশ ঠাণ্ডা শীতল বাতাস বইছে গত ক’দিন ধরেই। সূর্য প্রায়শই আড়ালে নিচ্ছে আশ্রয়। রাতে ঝরছে শিশির। আর ভোরে কুয়াশায় ঢাকা পড়ছে সবকিছু। সব মিলিয়ে ঋতুর আগমনের আগেই জেঁকে বসছে শীত। চলছে লেপ-তোশক তৈরি ও মেরামতের কাজও। ধুনুরিদের মৌসুম এখন। শহর নগরের পথে পথে শোনা যায় তাদের হাঁকডাক। শীতের কাঁপন বৃক্ষের পাতায় পাতায়। শীতবস্ত্র নামানো হচ্ছে। শীত ও শীত ঋতুর সঙ্গে মানুষের সম্পর্কটা অনাদিকাল হতেই বন্ধু ও বন্ধুর উভয় ধরনেরই। শীতের নানা উপহার ও উপাচার মানুষকে যেমন দেয় পরম প্রশান্তি, তেমনি তীব্র শীত নিয়ে আসে দুঃসহ কষ্ট ও যাতনা। প্রশাস্তি ও কষ্টের শীত নিয়ে রচিত হয়েছে এবং এখনও হচ্ছে বহু কাব্যগাথা।
হেমন্তের রেশ না কাটতেই শীত উড়ে এসে জুড়ে বসতে শুরু করছে। শীত মানেই হাল্কা রোদের আনাগোনা। শীত মানেই পাতা ঝরার দিন। পত্রপুষ্পশূন্য নানা বৃক্ষের ঠায় দাঁড়িয়ে থাকা। হিম হিম বাতাস শরীরে কাঁপন ধরায়। কখনও প্রবল বাতাস এসে হাড় কাঁপায়। আর ছড়ায় হাঁচি-সর্দি-কাশিসহ নানা রোগবালাই। গায়ে জড়াতে হয় ভারি ও মোটা বস্ত্র। তারই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে শীত আসে নলেন গুড়ের মৌ মৌ গন্ধ নিয়ে। আসে পিঠে-পুলির আয়োজন নিয়ে। নানান ধরনের পিঠে মানেই শীতের আমেজে আন্দোলিত হয়ে ওঠা। নগরে নগরে দেখা মেলে পিঠা উৎসবের। পৌষের রোদ পোহানো দুপুর, মাঘের কনকনে হাওয়া আর কুয়াশা-শিশিরের পরিবেশে শীত হয়ে ওঠে কখনও ভয়ঙ্কর। শীতের স্পর্শে উত্তুরে হাড় কাঁপানো বাতাসের ছোঁয়ায় জীবের ভয়াবহ রূপও দেখা যায়। দরিদ্র মানুষের কাছে শীত আসে ভয়াবহতা নিয়ে। সূর্য যেন শীতের হাত থেকে বাঁচার জন্য উত্তাপ দেয় মানুষকে। দরিদ্রজনের আগুন জ্বেলে সম্মিলিতভাবে উত্তপ্ত হওয়ার দৃশ্য বাংলাদেশের চিরপরিচিত, চিরচেনা। শীতের আছে নিজস্ব আমেজ। সেই আমেজে আয়োজন হয় নানাস্থানে মেলার। পৌষ সংক্রান্তির মেলা বসে গ্রামে গ্রামে। সংস্কৃতির অঙ্গনে নিয়ে আসে অন্যতম আবাহন। যাত্রা-পালাগানের আসরজুড়ে চাদর জড়ানো দর্শকের ভিড় নামে। নগরজীবনেও বসে গানের নানা আসর। খাবার-দাবারেও আসে বৈচিত্র্য। টাটকা শাকসবজি, তরি-তরকারির ব্যঞ্জন রন্ধন শিল্পের স্বাদকে করে মোহময় ও সুস্বাদু। গন্ধে বর্ণে স্বাদে এ এক অতুলনীয় সময়।
কনকনে হাওয়া এসে শরীরে বিঁধে। বয়স্ক মানুষের পক্ষেও শীত সহ্য করা দুরূহ হয়ে পড়ে। প্রতিবছর শীত ও শৈত্যপ্রবাহে মৃত্যুর খবর শোনা যায়। তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে আসে নানা রোগ। অসুখ-বিসুখ হয়ে ওঠে পীড়াদায়ক।
শীতে খেজুর রস খুবই সুস্বাদু। কিন্তু সে রসও এখন হয়ে উঠছে প্রাণঘাতী। গত তিন বছরে খেজুর রস পান করে কোন কোন এলাকায় নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে প্রায় অর্ধশত মানুষ মৃত্যুবরণ করেছে। শীতে বাদুড় বা পরিযায়ী পাখিরা এ রোগ ছড়ায়।
দরিদ্র মানুষের জীবনযাপনে শীত যেন ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’। শীতার্তদের পাশে বিত্তবানদের এগিয়ে আসার আহ্বান শোনা যায়, স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে অনেকে শীতবস্ত্র বিতরণ করেন। গৃহহীন, ছিন্নমূল, নদী সিকস্তি মানুষের জীবনে শীত দারুণ কষ্ট এনে দেয়।
শীত কবিদের সৃষ্টিশীল চেতনা বিকাশে পালন করে বহুমাত্রিক ভূমিকা। শীতের ভোরে কুয়াশার মধ্য দিয়ে মানুষ ছুটে চলে কর্মক্ষেত্রে, জীবন-জীবিকার টানে শৈত্যপ্রবাহ উপেক্ষা করে। থেমে থাকে না জীবনযাত্রা।