মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
সোমবার, ১ ডিসেম্বর ২০১৪, ১৭ অগ্রহায়ন ১৪২১
প্রধানমন্ত্রী অনাবশ্যক পাবলিক পরীক্ষা বন্ধ করুন
মমতাজ লতিফ
আগেও প্রশ্ন ফাঁস সংক্রান্ত জাতীয় জীবনের জন্য অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কলাম লিখেছি। বিজি প্রেস, আমলা-কর্মকর্তা, লাখো শিক্ষক, কোটি শিক্ষার্থীকে কোটি কোটি প্রশ্ন পৌঁছানো, তাদের উত্তরপত্র ঠিকমতো দেখা, ফল প্রকাশ- এই বিপুল কর্মযজ্ঞটি প্রাথমিক স্তরের পঞ্চম শ্রেণীর প্রায় কোটি শিশুর জন্য প্রয়োজন নেই বলেই আমার মতো অনেক শিক্ষা বিষয়ে নিয়োজিত থাকা ব্যক্তিবর্গ মনে করেন। আজকে আবার আরেকবার এই জাতি বিধ্বংসী প্রশ্ন ফাঁস প্রতিরোধের প্রথম বাধা এত বেশি পাবলিক পরীক্ষার প্রয়োজন নেই বলে মত প্রকাশ করছি এবং এ বিষয় নিয়ে আলোচনা করছি।
এ প্রসঙ্গে সূচনাতে কয়েকটি বিষয়, বিশেষত প্রাথমিক শিক্ষার সর্বজনীন হয়ে ওঠার ইতিহাস, এ পথে নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষার কথা স্মরণ করব। ১৯৮০ সালে আমাদের দেশের প্রাথমিক শিক্ষাকে সর্বজনীন করার লক্ষ্যে বিশ্বব্যাংকের অর্থ সহায়তায় ও উদ্যোগে সর্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষা পাইলট প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। এই প্রকল্পের প্রধান উন্নয়ন পদক্ষেপগুলো ছিল- এলাকার সব ৫+ বয়সী শিশুদের ভর্তি করা। এলাকার সব শিশুকে বিদ্যালয়ে আনার উপযুক্ত শ্রেণীকক্ষের সংখ্যা বাড়ানোসহ বিদ্যালয় সংস্কার, টয়লেট, টিউবওয়েল বসানো, শিক্ষক সংখ্যা বাড়ানো এবং বিদ্যালয়ের পড়ালেখার মানোন্নয়নের লক্ষ্যে, একাডেমিক সুপারভিশন করার লক্ষ্যে সব থানায় এ্যাসিস্টেন্ট থানা শিক্ষা অফিসারের পদ সৃষ্টি ও বিএড, এমএড ডিগ্রী গ্রহণকারীদের এ পদে নিয়োগদান। শিক্ষকের শিক্ষকতার মানোন্নয়নের লক্ষ্যে ক্লাস্টার ট্রেনিং অর্থাৎ এক এলাকার শিক্ষকদের সপ্তাহের শেষদিনে একাডেমিক সুপারভাইজারের নেতৃত্বে নিয়মিত প্রশিক্ষণ প্রদান। পিটিআই শিক্ষক প্রশিক্ষণের মানোন্নয়ন করে ‘সার্টিফিকেট ইন এডুকেশন’ নামের নতুনভাবে পরিমার্জিত আধুনিক শিক্ষাতত্ত্বসমৃদ্ধ বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণ কোর্স চালু। ’৯০ সালে এ প্রকল্প সারাদেশের সব প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চালু হয় এবং ৯০-এর দশকে প্রাথমিক স্তরের জন্য ‘যোগ্যতাভিত্তিক শিক্ষাক্রম’ প্রণয়নের কাজ শুরু হয় ও নতুন যোগ্যতাভিত্তিক শিক্ষাক্রমের প্রতিফলন ঘটাতে প্রাথমিক পর্যায়ের সব বিষয়ের জন্য নতুন পাঠ্যপুস্তক প্রণয়নের কাজ শুরু হয় এবং ’৯৩ সাল থেকে ১ম শ্রেণীতে এই নতুন বই ব্যবহার শুরু হয়, যা ক্রমান্বয়ে চলতে থাকে। অবশ্য এর আগে যোগ্যতাভিত্তিক শিক্ষাক্রমের ওপর সারাদেশের প্রাথমিক স্তরের শিক্ষক প্রশিক্ষক, সুপারভাইজার এবং শিক্ষকদের বছরব্যাপী বিষয়ভিত্তিক অবহিতকরণ ও এতে দক্ষতা অর্জনের প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়। উল্লেখ্য, এই শিক্ষাক্রমের অংশ হিসেবে ১ম শ্রেণী ও ২য় শ্রেণীর জন্য গ্রহণ করা হয় ধারাবাহিক মূল্যায়ন পদ্ধতি, যা প্রথমে লিবারেল প্রমোশন নামে পরিচিত হয়ে পরে শিক্ষার্থীর কৃতিত্ব অর্জনকে বছরব্যাপী ধারাবাহিক মূল্যায়নের নামে চিহ্নিত করা হয়। এই নতুন পাঠ্যবইতে সর্বপ্রথম লিঙ্গবৈষম্য দূর করার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয় যেখানে বিষয়ে, ছবিতে, গল্পে, অঙ্কের প্রশ্নে বালকের বা পুরুষের পাশে নারী, বালিকার চরিত্র যোগ করা হয়। প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষাকে নীতিগত অনুমোদন প্রদান।
যাই হোক, এ নিবন্ধে স্কুলের শ্রেণীকক্ষে ধারাবাহিক মূল্যায়ন ও সম্প্রতি প্রণীত জাতীয় শিক্ষানীতির প্রধান নীতির ওপর মূলত আলোচনা করব। যোগ্যতাভিত্তিক শিক্ষাক্রম প্রণয়নের সময় যুক্তরাজ্যে বা পূর্ব এশিয়া কিংবা ভারতে প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা বিশেষ করে এসব দেশের প্রাথমিক স্তরের পাঠ্যপুস্তক ও মূল্যায়ন সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে দেখা গেছেÑ ওইসব দেশের পাঠ্যপুস্তকের বিষয় ও পাঠে তাৎপর্যপূর্ণ পার্থক্য নেই, কিন্তু পাঠ উপস্থাপনে ব্যবহার করা হয় নানা বৈচিত্র্যপূর্ণ উপকরণ ও পদ্ধতি-বর্ণ-শব্দ কার্ড, ফ্ল্যাশ কার্ড, প্রজেক্ট তৈরি অর্থাৎ নিজে নিজে চিন্তা করে কোন বিষয়ে প্রজেক্ট তৈরি করে শিশুরা সৃজনশীল ও স্থায়ী শিক্ষা অর্জন করে থাকে। এর সঙ্গে শিশুর শিক্ষা অর্জনের মূল্যায়নটি হয় ধারাবাহিকভাবে শ্রেণীকক্ষে শিক্ষকের দ্বারা প্রায় প্রতিদিন। বছর শেষে ক, খ, গ, ঘ গ্রেডপ্রাপ্ত শিশুরা সবাই পরের শ্রেণীতে উত্তীর্ণ হয়। ১ম, ২য় শ্রেণীতে কোন শিশুকে সাধারণত আটকে পড়তে দেখা যায় না, যদি না তার গুরুতর মানসিক প্রতিবন্ধিতা থাকে। তবে, সাধারণভাবে এটি আজ স্বীকৃত যে, একই শ্রেণীর সঙ্গীদের ছেড়ে বাদ পড়া শিশুটির মানসিক কষ্ট তাকে শিক্ষা গ্রহণের প্রতি আরও অমনোযোগী করে। সেজন্য প্রতিবন্ধী হলেও, কম নম্বর পেলেও শিশুর শিক্ষা গ্রহণের আকাক্সক্ষাটিকে রক্ষার্থে নমনীয় প্রমোশননীতি শিশুবান্ধব নীতি বলে দেখা যাচ্ছে যা উন্নত দেশে প্রচলিত আছে।
পাশ্চাত্যে সাধারণভাবে ৫, ৬ ক্লাস পর্যন্ত প্রাথমিক স্তরের পাঠ গ্রহণ করা শিশুদের ফেল করা, পুনরায় একই ক্লাসে পড়ার দৃশ্য প্রায় অনুপস্থিত। তাই বলে ওদের দেশেও একটি শ্রেণীতে খুব ভাল, ভাল, দুর্বল শিশুরা অবশ্যই রয়েছে। খুব ভাল এবং ভালরা সব দেশে, আমাদের দেশেও সবরকম বাধা অতিক্রম করে উচ্চ শিক্ষাস্তরে প্রবেশ করবে, সন্দেহ নেই। দুর্বল শিশুরা প্রতি শ্রেণীতে বাধা না পেলেও তাদের নিচু ‘গ্রেড’ তাদের আরও পরিশ্রম করার তাগিদ দেবে এবং সত্য এই যে, এদের মধ্য থেকেও একটা দল শিক্ষক, বাবা-মার সহায়তায়, নিজের শ্রমে-উদ্যমে ‘মোটামুটি’ মান অর্জনে সক্ষম হয় এবং এরাও উচ্চশিক্ষা বা বৃত্তি শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে। এটাই শিক্ষা ব্যবস্থার অন্যতম সার্থকতা। সব দেশে, সব শ্রেণীতে ২-৩% শিশু পারিবারিক, সামাজিক, মানসিক কারণে কখনোই তাদের বয়সোপযোগী শিক্ষার মান আয়ত্ত করতে পারে নাÑ দেশে, বিদেশে এরা আছে, থাকবে। বিদেশে এদের মানসিক অভিরুচি অনুযায়ী শিক্ষা, বৃত্তি বা দক্ষতা শিক্ষার ব্যবস্থা রয়েছে।
যতই বিদেশের উদাহরণ দেই না কেন আমাদের নীতি-নির্ধারকসহ অভিভাবক-শিক্ষকদের স্মরণ রাখা প্রয়োজন- আমাদের যে কোন সেবা-শিক্ষা বা স্বাস্থ্য-খাদ্য, বাসস্থান, জীবিকার প্রশ্ন উঠলেই তা কোটি কোটি জনসংখ্যার কাছে পৌঁছানোর কথা ভাবতে হয়। বিদেশের কোন কোন দেশে ঢাকার সমান জনসংখ্যাও নেই। সুতরাং প্রাথমিক স্তরের কোটি শিশুর কোটি অভিভাবক একটি পাবলিক পরীক্ষার মুখোমুখি হওয়াটা আমাদের জন্য, শিশুদের জন্য এমন কিছু তাৎপর্যপূর্ণ লাভ বয়ে আনে না অথচ এটি যে বিপুল ব্যয় ও প্রশ্ন ফাঁসের মতো লজ্জাজনক, অবমাননাকর এক দুর্নীতির উত্থানের সুযোগ তৈরি করে সেটি করারও কোন অধিকার কিন্তু আমাদের কারও নেই!
এবার আসা যাক বর্তমান সরকার কর্তৃক প্রণীত জাতীয় শিক্ষানীতির গুরুত্বপূর্ণ নীতি প্রসঙ্গে। শিক্ষার প্রথম স্তর প্রাথমিক শিক্ষাকে এই নীতিতে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত উন্নীত করার ঘোষণা করা হয়েছে। এ নীতি অনুসারে কিন্তু সরকারের বা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ৫ম শ্রেণী অন্তে কোন পাবলিক পরীক্ষা গ্রহণের কোন সুযোগ নেই। সে হিসেবে তারা আইনী একটি বাধার সম্মুখীন হচ্ছে যদি কেউ শিক্ষানীতির ওই ঘোষণার প্রেক্ষিতে ৫ম শ্রেণী শেষে পাবলিক পরীক্ষাকে চ্যালেঞ্জ করেন! আমাদের বক্তব্য হচ্ছে- প্রাথমিক স্তর শেষ হচ্ছে ৮ম শ্রেণী শেষে। তাহলে প্রাথমিকের মধ্য পর্যায়ে শিক্ষানীতির পরিপন্থী এই শিশুদের, নিরক্ষর বা অল্প শিক্ষিত বাবা-মায়েদের, অভিভাবকদের অন্যায় ‘পরীক্ষা’ নামক এক নির্যাতনের মুখে ঠেলে দেয়া বন্ধ করা হোক এবং তা দ্রুত করা দরকার। স্মরণ রাখতে হবে- প্রাথমিক স্তরের অধিকাংশ শিশুর বাবা-মা নিরক্ষর অথবা অল্প শিক্ষিত। এই পরীক্ষার নামে কোচিং, প্রশ্ন ফাঁস, উচ্চ গ্রেড ও ফেল ইত্যাদি চালু হওয়া নতুন নির্যাতনের হাত থেকে এই অসুবিধাগ্রস্ত বিপুল জনগোষ্ঠীকে রক্ষা করা সরকারের দায়িত্ব। তাছাড়া একটি বড় প্রশ্ন উঠেছে- কোন ইংরেজী মাধ্যমের স্কুলের উচ্চ ও মধ্যবিত্তের শিশুরা এই ধরনের পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে না, এমনকি ৮ম শ্রেণী শেষের কোন পরীক্ষায়ও তারা অংশগ্রহণ করে না, কারণ এ দুটো পরীক্ষার কোন প্রয়োজন নেই। ওরা এসএসসির বদলে ও লেভেল, এইচএসসির বদলে ‘এ’ লেভেল পরীক্ষায় বসে তাদের স্কুল ও কলেজের লেখাপড়া শেষ করে কি ভাল মানের শিক্ষা অর্জন করছে না? ওদের শিক্ষার্থীদের তো কোচিংয়ের দরকার হয় না।
প্রসঙ্গে ফিরে আসি। আমরা, প্রধানমন্ত্রী, শিক্ষামন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্ট সবাই কতগুলো বিষয় সম্পর্কে অবগত, তাই না? যেমন- প্রশ্ন ছাপা হওয়ার স্থান বিজি প্রেসে প্রশ্ন ফাঁসজনিত অপরাধ সংঘটিত হতে পারে। কোচিং সেন্টারের সঙ্গে সংযুক্ত ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর মাধ্যমে প্রশ্ন ফাঁস হতে পারে। স্কুল শিক্ষকদের মাধ্যমে প্রশ্ন ফাঁস হতে পারে। শিক্ষার সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তি-কর্মকর্তাদের মাধ্যমে প্রশ্ন ফাঁস হতে পারে। অভিভাবকদের একটি গোষ্ঠী শিক্ষক ও কোচিং কেন্দ্রের সঙ্গে আঁতাত করে প্রশ্ন ফাঁস করতে পারে। প্রযুক্তির সাহায্যে প্রশ্ন ফাঁস হচ্ছে, প্রাচীন পদ্ধতিতেও প্রশ্ন ফাঁস হচ্ছে। দেখা যাচ্ছে উচ্চশিক্ষা ক্ষেত্রে পরীক্ষা পরিচালনা কমিটিতে যুক্ত শিক্ষক তার পছন্দের পরীক্ষার্থীদের প্রশ্নের সঙ্গে উত্তরপত্রও প্রদান করে অযোগ্য শিক্ষার্থীকে ফার্স্ট হতে, উত্তীর্ণ হতে সাহায্য করতে পারে! একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের এ পদ্ধতি সদ্যসমাপ্ত ভর্তি পরীক্ষার ফল বিপর্যয় ঘটিয়েছে বলে সচেতন ব্যক্তিরা মনে করেন। বিদেশে, ভারত, পাকিস্তানে প্রাথমিক পর্যায় শেষে কোন পাবলিক পরীক্ষা নেই, তাহলে বাংলাদেশ এত জনবহুল দেশে ৫ম শ্রেণী অন্তে, ৮ম শ্রেণী অন্তে দুটো পাবলিক পরীক্ষা গ্রহণ সম্পূর্ণ অযৌক্তিক নয় কি? শুধু অযৌক্তিক নয়, এ দুটো পরীক্ষা সফলভাবে পরিচালনা করা এক কথায় অসম্ভব। এর চেয়েও বড় কথা, এ দুটো পরীক্ষার প্রকৃত অর্থে কোন প্রয়োজন নেই এবং অপ্রয়োজনীয় এই কাজে বিপুল অর্থ ব্যয় করে সরকারকে প্রশ্ন ফাঁসের মতো অবমাননাকর পরিস্থিতিতে বার বার কোন একটি গোষ্ঠী ফেলে দিচ্ছে, তাই নয় কি? তারা এ অপকর্মটি করার সুযোগ লাভ করছে বলে অপকর্মটি করেই যাবে।
সরকার কেন এ অপকর্ম করার সুযোগ তৈরি করে নিজের ভাবমূর্তি বিনষ্ট করছে-তা আমি বুঝতে অপারগ। বরং সরকার যদি ১০ম শ্রেণী পর্যন্ত লেখাপড়ার মান বৃদ্ধির কাজে নানারকম উদ্যোগ গ্রহণ করে, শিক্ষার্থীদের ক, খ, গ, ঘ গ্রেড নিয়ে স্কুল পরীক্ষার মাধ্যমে কাক্সিক্ষত মানসম্মত শিক্ষা অর্জনের পথের সব অন্তরায় দূর করে দিয়ে একবারে ১০ম শ্রেণী অন্তে পূর্বের নিয়মে প্রশ্ন ফাঁসের সব পথ বন্ধ করে এসএসসি পাবলিক পরীক্ষাটি সফলভাবে পরিচালনা করে এবং এর দু’বছর পর উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষাটিও একইভাবে প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধ করে পরিচালনা করে, তাহলে একদিকে যেমন প্রশ্ন ফাঁসের দুটা সুবর্ণ সুযোগ বন্ধ হবে, অপরদিকে এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা দুটোতে সবরকম দুর্নীতি বন্ধের পদক্ষেপ সুষ্ঠুভাবে গ্রহণ করাও সম্ভব হবে। ফলে কোচিং গ্রহণের প্রয়োজনীয়তাও অনেক কমে যাবে। শিক্ষার্থীরা এবং অভিভাবকরা ‘জিপিএ-৫’ নামক এক দানবীয় অকাজের জিনিসকে ‘মহামূল্যবান’ জ্ঞান করে যেনতেন পন্থায় সেটি অর্জনের ‘লোভ’ থেকে রক্ষা পাবে। শিশু, শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষকে অসৎ পন্থা গ্রহণে আমরা কিছুতেই সুযোগ দিতে পারি না।
তাছাড়া, প্রযুক্তি ব্যবহার করে নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে, মোবাইল বা ফেসবুক বন্ধ করে জিপিএ-৫ লাভের লোভ দমানো যাবে না। হাজী দানেশ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তিচ্ছু ৪৭ জন ছাত্র অভিনব প্রযুক্তি ব্যবহার করেছিল এবং প্রযুক্তির মাধ্যমে যদি হ্যাকাররা প্রশ্নগুলো ব্লাকআউট করে বা অন্য কোনভাবে বিনষ্ট করে দেয়, তখন পরীক্ষার হলে পরীক্ষার দিনে শিশু বা বয়স্ক শিক্ষার্থীরা এবং শিক্ষা পরিচালকরা কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে কি করবেন? প্রযুক্তির মন্দ ব্যবহার বন্ধ করার প্রচেষ্টা গ্রহণ করার পেছনে বিপুল অর্থ ও সময় অপচয় না করাই হবে সরকারের পক্ষে যুক্তিযুক্ত অবস্থান। এ সঙ্গে বলব, এতে কিন্তু কোন পরাজয় নেই, হেরে যাওয়া নেই, বরং বুদ্ধিমানের প্রমাণ মিলবে যে, ভুল ও অপকর্ম রোধ করতে প্রয়োজনে সরকার সিদ্ধান্ত বদল করে সঠিক পদক্ষেপ নিতে সক্ষম।
সবশেষে, প্রধানমন্ত্রীকে অগতির গতি হিসেবে অনুরোধ করব ৫ম ও ৮ম শ্রেণীর শেষের একদম অনাবশ্যক, ব্যয়বহুল পাবলিক পরীক্ষা দুটোকে বন্ধ অথবা আপাতত স্থগিত ঘোষণা করুন এবং নিরপরাধ শিক্ষার্থীদের প্রকৃত শিক্ষা গ্রহণ করে ‘নীতিবান’ মানুষ হওয়ার সুযোগ প্রদান করুন। অবশ্যই মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিকের প্রশ্ন ফাঁস রোধের প্রযুক্তিসহ সবরকম ব্যবস্থা গ্রহণের কোন বিকল্প নেই এবং মিত্র ও শত্রুর সমালোচনা বন্ধ করার পথই তো গ্রহণ করতে হবে এবং এতেই নিহিত আছে সরকার ও জাতির স্বার্থ।

লেখক : গবেষক ও শিক্ষাবিদ