মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
শুক্রবার, ১০ জানুয়ারী ২০১৪, ২৭ পৌষ ১৪২০
গণমানুষের রাজনীতিক ও মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড্যান্ট মানিক চৌধুরী
কেয়া চৌধুরী
আব্বাকে নিয়ে আমার জীবনের অনুভূতি জড়িত স্মৃতি খুবই অল্প সময়ের। আব্বা, যাঁকে সকলেই চেনেন বা জানেন কমান্ড্যান্ট মানিক চৌধুরী নামে। শুধু বাবা হিসেবেই নন, একজন শুদ্ধ-সমৃদ্ধ মানুষ হিসেবে আমার সমস্ত অস্তিত্ব জুড়ে আছেন তিনি, এক বিশাল আকৃতির শেকড়ের মতো।
১৯৯১ সালের ১০ জানুয়ারি তিনি না-ফেরার দেশে চলে গেছেন। পরিচিতরা তাঁর স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেন, একজন পরিপূর্ণ মানবিক বোধসম্পন্ন সত্তার মানুষ মানিক চৌধুরী। তিনি তাঁর সারা জীবনে কেবল মানুষের তরে নিজেকে বিলিয়ে দেবার চর্চাই করেছেন, বিপরীতে কিছু পাবার চিন্তাটুকুও করেনি। তাঁর গোটা জীবন মূল্যায়ন করলে দেখা যাবেÑ ব্যক্তি হিসেবে মানিক চৌধুরী একদিনে কমান্ড্যান্ট মানিক চৌধুরী হয়ে উঠেননি, বরং সারাটা জীবনে সর্বোচ্চ ত্যাগ-সংগ্রামে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন একজন দেশপ্রমিক, সমাজকর্মী, মুক্তিযোদ্ধা ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বে। দীর্ঘায়ু না হলেও, মানিক চৌধুরীর বণার্ঢ্যময় জীবনের ইতিকথা দেশজুড়ে জানতে বাকি ছিল না কারও।
পিতা হিসেবে জীবনের মাত্র ১২ বছরে তাঁকে যতটুকু না আমি জেনেছি, তার চেয়ে বেশি জানার সুযোগ হয় তাঁকে চিরতরে হারিয়ে যাওয়ার পর। মুক্তিযুদ্ধকালীন তাঁর সহযোদ্ধা ও রাজনৈতিক সতীর্থদের বরাতে মধ্য দিয়ে এই জানা।
জন্মভূমি হবিগঞ্জই ছিল তাঁর কর্মক্ষেত্র। অতি অল্প বয়সেই তিনি রাজনীতির প্রতি আকৃষ্ট হন। দেশকে পরাধীনতার গ্লানি থেকে মুক্তি দেবার লক্ষে নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতিক আন্দোলনের মাধ্যমে তাঁর রাজনীতির চর্চা। তিনি ছিলেন সত্যিকার অর্থেই অসাম্প্রদায়িক একজন শুদ্ধ রাজনৈতিক নেতা ও সোনার বাংলা গড়ার খাঁটি কর্মী। রাজনীতিকে তিনি সমাজসেবা হিসেবেই দেখেছেন। আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা হওয়া সত্ত্বেও নিজেকে একজন সাধারণ কর্মী হিসেবে উপস্থাপন করে গেছে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত।
এর প্রতিফলন ঘটে হবিগঞ্জ বৃন্দাবন কলেজের দ্বাদশ শ্রেণীর ছাত্র থাকা কালে ’৫২-এর ভাষা আন্দোলনের পক্ষে সক্রিয় ভূমিকা পালনের মধ্য দিয়ে। মাতৃভাষার আন্দোলনে একজন কর্মী হিসেবে তৎকালীন মন্ত্রী নুরুল আমিনকে কালো পতাকা প্রদর্শন করার অপরাধে কারাবরণও করেন তিনি। তবু দমে যাননি , পরের বছরই ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে প্রভাতফেরিসহ আয়োজন করেছেন অনুষ্ঠানের। এর জন্য তাঁকে ২০ ফেব্রুয়ারি ফের গ্রেফতার করা হয়ছ সামরিক সরকারের নির্দেশে। এভাবেই ‘৬২-এর শিক্ষা আন্দোলন, বিশেষ করে ৬ দফাকে সাধারণ্যে তুলে ধরতে তিনি ছিলেন অগ্রসৈনিক। আওয়ামী লীগকে হবিগঞ্জ মহকুমায় তৃণমূল থেকে সুসংগঠিত করতে তিনি অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন সারা জীবন। তাঁরই প্রচেষ্টায় সে সময়ে হবিগঞ্জ মহুকুমা ছাত্রলীগ সাংগঠনিক রূপ পায়। প্রথম ছাত্রলীগ অফিস প্রতিষ্ঠিত হয় তাঁর পৈত্রিক ভিটা হবিগঞ্জের হাসপাতাল সড়কে অবস্থিত কাছারি ঘরে।
’৬৯-এ গণ-অভ্যুত্থানে তিনি তাঁর তৃণমূল পর্যায়ের সাংগঠনিক কর্মকা-কে সফলভাবে কাজে লাগাতে সচেষ্ট হন। সাংগঠনিক কারিশমার জন্যই ’৭০-এর নির্বাচনে পাকিস্তানের গণপরিষদে ও ’৭৩-এ স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম নির্বাচনে তিনি বিপুল ভোটে জয়লাভ করেন।
তাঁর জীবনে সবচেয়ে গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় রচিত হয় মহান মুক্তিযুদ্ধে। ৭ মার্চের বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণের প্রতিটি নির্দেশনাকে তিনি তাঁর জীবনের লক্ষ্য হিসেবে স্থির করেছিলেন। পরবর্তীতে তিনি এ নির্দেশনাকে বাস্তবায়িত করতে তাঁর নির্বাচনী এলাকায় দুর্বার প্রতিরোধ যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে থাকেন। বিশেষ করে চুনারুঘাট-মাধবপুরে অবস্থিত চা শ্রমিকদের দিয়ে তীরন্দাজ বাহিনী গঠন ও তাদের মধ্য দিয়ে প্রতিরোধ যুদ্ধের সূচনা সিলেট যুদ্ধে এক উল্লেখযোগ্য অধ্যায়। ২৬ র্মাচ, ১৯৭১ দিবাগত রাতে বঙ্গবন্ধুর কাছ থেকে (ওয়ারলেসের মাধ্যমে) পাওয়া তারবার্তা যাকে ঐতিহাসিক দলিল হিসেবে ‘বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা’পত্র বলা হয়, তা গ্রহণ করে হবিগঞ্জের অন্যান্য নেতা-কর্মীদের এ বিষয়ে অবগত করে তিনি সম্মুখসমরের প্রস্তুতি নেন। একটি দক্ষ সামরিক বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধ করতে যে অস্ত্রের প্রয়োজন, তা বুঝতে পেরে তিনি হবিগঞ্জ সরকারী অস্ত্রাগার হতে অস্ত্র লুট করে, এগিয়ে যান এপ্রিলের প্রথমদিকে শেরপুর-সাদিপুর যুদ্ধক্ষেত্রে। মেজর জেনারেল সি আর দত্ত বীরউত্তমসহ অনেকের সাক্ষাতকার হতে জানা যায়, তিনি একাধারে একজন সম্মুখ যোদ্ধা এবং ৩ নং, ৪ নং সেক্টরে সৈন্য, অস্ত্র, খাদ্য সরবরাহসহ ভারতের খোয়াই ও কৈলাশহরের মুক্তিযোদ্ধাদের যুদ্ধ প্রশিক্ষণের কাজে দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁর এ বীরত্বপূর্ণ অবদানের জন্য মুক্তিযুদ্ধকালীন চীফ-অব স্টাফ মেজর জেনারেল এমএ রব তাঁকে ‘কমান্ড্যান্ট’ উপাধিতে ভূষিত করেছিলেন। তিনিই একমাত্র সিভিলিয়ান মুক্তিযোদ্ধা, যিনি মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে ‘কমান্ড্যান্ট’ উপাধিতে সর্বজনের কাছে স্বীকৃত ও পরিচিত একজন মুক্তিযোদ্ধা।
যুদ্ধপরবর্তীতে তিনি বঙ্গবন্ধুর একজন বিশ্বস্ত সৈনিক হিসেবে দেশকে ‘সোনার বাংলা’ গড়ার কাজে আত্মনিয়োগ করেন। ’৭৩-এ তাঁর র্নিবাচিত এলাকা মাধুবপুর বঙ্গবন্ধুর ‘সবুজ বিপ্লবের’ মডেল হিসেবে নির্বাচিত হয়। যার জন্য তিনি ’৭৪-এ বঙ্গবন্ধু কৃষিপদকে ভূষিত হন। ’৭৫ এর ফেব্রুয়ারি, তিনি হবিগঞ্জ মহকুমার গবর্নর হিসেবে নিয়োগ হন। ’৭৫-এর ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর রাজপথে মিছিলের উদ্যোগ নেয়ার কারণে তাঁর বিরুদ্ধে হুলিয়া জারি হয়। খন্দকার মুশতাকের মন্ত্রিসভায় যোগ দেবার প্রস্তাব তীব্রভাবে প্রত্যাখ্যান করায় তাঁকে বিভিন্ন মিথ্যা মামলায় জড়িয়ে দীর্ঘকাল কারাবাসে রাখা হয়। এ সময় মানসিক ও শারীরিক নির্যাতনের শিকার হন তিনি।
মানিক চৌধুরী আজন্ম একজন শুদ্ধ মানুষ হিসেবেই পরিচিত মহলে সমাদৃত ছিলেন। শুদ্ধতা ও সমৃদ্ধ কর্মময় জীবনের অধিকারী একজন সফল মানুষ হিসেবে ইতিহাস তাঁকে সব সময় মূল্যায়ন করবে। সিলেটের গণমানুষের কাছে তিনি চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন অনন্য এক ব্যক্তি হিসেবেই। মৃত্যুদিনে তাঁর প্রতি রইল গভীর শ্রদ্ধা ও ভালবাসা।

লেখক : সমাজকর্মী ও কমান্ড্যান্ট মানিক চৌধুরীর কণ্যা