মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
শুক্রবার, ১১ অক্টোবর ২০১৩, ২৬ আশ্বিন ১৪২০
আলীমের আমৃত্যু কারাদণ্ড
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধকালে মানবতাবিরোধী অপরাধ-হত্যা, গণহত্যা, নির্যাতন, লুণ্ঠন, দেশত্যাগে বাধ্য করা ইত্যাদির দায়ে অভিযুক্ত আরও এক যুদ্ধাপরাধী বিএনপির সাবেক মন্ত্রী আবদুল আলীমের বিচারের রায় ঘোষিত হয়েছে বুধবার। বিচারপতি ওবায়দুল হাসানের নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ আবদুল আলীমের আমৃত্যু কারাদণ্ডের আদেশ দিয়েছে। এ নিয়ে দুটি ট্রাইব্যুনাল থেকে মোট ৮ যুদ্ধাপরাধীর বিরুদ্ধে রায় ঘোষণা করা হলো। আলীমের রায় ঘোষণার সময় ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বিচারপতি ওবায়দুল হাসান উল্লেখ করেন, মানবতাবিরোধী অপরাধের ১৭টি অভিযোগের মধ্যে ৯টির সঙ্গে তার সংশ্লিষ্টতা প্রমাণিত। এর মধ্যে চারটি ঘটনায় আলীম যেভাবে গণহত্যা ও হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছিলেন, তা অত্যন্ত জঘন্য অপরাধ। তাঁর অপরাধ মৃত্যুদ-তুল্য হলেও মানসিক ও শারীরিক অসামর্থের কারণে মৃত্যুদণ্ডের পরিবর্তে আমৃত্যু কারাদ-ের আদেশ দেয় ট্রাইব্যুনাল। রায়ে বলা হয়: ‘কোন মানুষ, যে ফিজিক্যালি ও মেন্টালি আনফিট, তাকে ফাঁসিতে ঝুলানো যায় না। কিন্তু আবদুল আলীমের অপরাধ এতটাই ঘৃণ্য, তাকে মুক্ত রাখলে মানবতার অবমাননা হবে। এ কারণে তাকে কারাগারের চার দেয়ালের মধ্যে বাকি জীবন কাটাতে হবে। তাহলে হয়ত কৃতকর্মের জন্য তার ভেতরে অনুশোচনা সৃষ্টি হবে।’
মানবতাবিরোধী অপরাধে আমৃত্যু কারাদণ্ডে দণ্ডিত তিরাশি বছর বয়সী আবদুল আলীম একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় ছিলেন কনভেনশন মুসলিম লীগের নেতা এবং পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর ঘনিষ্ঠ সহযোগী। শুধু সহযোগীই নন, নিজ এলাকা সাবেক জয়পুরহাট মহকুমায় মুক্তিযুদ্ধবিরোধী তৎপরতা পরিচালনা এবং বহুমুখী অপরাধ সংঘটনের কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন তিনি। রাষ্ট্রপক্ষের প্রসিকিউটর ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজের ভাষায়: ‘একাত্তরে আবদুল আলীম ছিলেন জয়পুরহাটে অপরাধের কম্পাস। তিনিই ঠিক করে দিতেন কাকে নির্যাতন করতে হবে, কাকে হত্যা করতে হবে। পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের মানবতাবিরোধী অপরাধের দিকনির্দেশনা দিতেন আলীম।’ তাঁর বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালে যেসব অভিযোগ উত্থাপিত হয় তার মধ্যে রয়েছে: হিন্দু অধ্যুষিত জয়পুরহাটের কড়ইকাদিপুর গ্রামে হামলা চালিয়ে ৩৭০ জনকে গুলি করে হত্যা, একাত্তরের ১৮ জুন নওয়াপাড়া, চরবরকত ও চিলোরা গ্রামের ২২ জনকে হত্যা, মে মাসের প্রথম দিকে কোকতারা, ঘোড়াপা, বাগজানা ও কুটাহারা গ্রামে লুটপাট, অগ্নিসংযোগ ও ১৯ জনকে হত্যা, একাত্তরের ৯ থেকে ১৫ মে জয়পুরহাটের পাহুনন্দা মিশন স্কুলে ৬৭ হিন্দুকে হত্যা, ২৫ জুন থেকে ৩০ জুনের মধ্যে ২৬ জনকে খঞ্জনপুরের কুঠিবাড়ি ব্রিজের নিচে গুলি করে হত্যা, ২৬ জুলাই ডা. আবুল কাশেমকে পূর্বোক্ত ব্রিজের নিচে গুলি করে হত্যা, সেপ্টেম্বর মাসে ১১ জনকে গুলি করে হত্যা এ ধরনের নৃশংস হত্যাকা-সহ নির্যাতন, লুণ্ঠন ও অগ্নিসংযোগ। এসব অপরাধের সঙ্গে আলীমের সম্পৃক্ততা ছিল সরাসরি। মুক্তিযুদ্ধকালে জয়পুরহাট এলাকায় তিনি ছিলেন মূর্তিমান আতঙ্ক। এক দাপুটে নৃশংস খলনায়কের মতো তিনি বিচরণ করেছেন এলাকাজুড়ে এবং মুক্তিযুদ্ধ ও মানবতাবিরোধী সমস্ত অপকর্মকা- নিয়ন্ত্রণ করেছেন। তাঁর এসব অপকর্মের বিস্তারিত বিবরণ উঠে এসেছে তাঁর বিরুদ্ধে দেয়া ৩৫ সাক্ষীর মর্মস্পর্শী জবানবন্দীর মধ্য দিয়ে।
উত্থাপিত অভিযোগসমূহ, প্রসিকিউশনের আইনজীবীদের যুক্তিতর্ক ও সাক্ষীদের জবানবন্দীর মধ্য দিয়ে আবদুল আলীমের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের যে ব্যাপকতা ও বহুমাত্রিকতা প্রকাশিত হয়েছে, তাতে তাঁর শাস্তি মৃত্যুদ-ই ছিল প্রত্যাশিত। কিন্তু অধিক বয়সের কারণে তিনি মৃত্যুদণ্ডাদেশ থেকে রেহাই পেলেও তাঁকে আমৃত্যু কারাগারের সেলে কাটাতে হবে। তিনি যেভাবে মুক্তিযুদ্ধকালে শত শত মানুষের অপূরণীয় ক্ষতি আর দুঃখ-যন্ত্রণার কারণ হয়েছিলেন, নির্জন কারান্তরালে তাঁকেও তেমনি বাকি জীবন নিঃসঙ্গ অবস্থায় অশেষ মর্মযাতনার মধ্য দিয়ে কাটাতে হবে। তাঁর হাতে নির্যাতিত, স্বজন হারানোরা এতে কিছুটা হলেও শান্তি পাবেন বলে আশা করা যায়।