মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
শুক্রবার, ১১ অক্টোবর ২০১৩, ২৬ আশ্বিন ১৪২০
প্রসঙ্গ ইসলাম
কুরবানী যুগে যুগে
অধ্যাপক হাসান আবদুল কাইয়ূম
আরবী কুরবান শব্দের শব্দমূল র্কুব। এর অর্থ কুরবত, নৈকট্য, সান্নিধ্য। কুরবানীর আর এক অর্থ উৎসর্গ। ইসলামে আল্লাহ্্র র্কুবত ও রিযামন্দী অর্থাৎ নৈকট্য ও সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে আল্লাহ্্র নামে যা কিছু উৎসর্গ করা হয় সেটাই কুরবানী। আমার সালাত ও আমার কুরবানী এবং আমার জীবন ও আমার মরণ আল্লাহ্্ রব্বুল আলামীনের জন্য-এই দৃঢ় প্রত্যয়ের মধ্যেই কুরবানীর মর্মার্থ নিহিত রয়েছে। আল্লাহ্্ জাল্লা শানুহু ইরশাদ করেন : আমি প্রত্যেক জাতির জন্য কুরবানীর নিয়ম করে দিয়েছি। (সূরা হজ্জ : আয়াত ৩৪)
কুরবান করবার বা কুরবানী দেবার রীতি মানব জাতির আদি পিতা হযরত আদম আলায়হিস্্ সালামের কাল থেকেই চলে আসছে। লক্ষ্য করা যায়, মানব সভ্যতার ইতিহাসে প্রথম কুরবানীর ঘটনা ঘটে একজন নারীকে কেন্দ্র করে।
কুরআন মজীদে হযরত আদম আলায়হিস্্ সালামের দুই পুত্রের কুরবানীর উল্লেখ রয়েছে। ইরশাদ হয়েছে : আদমের দুই পুত্রের বৃত্তান্ত তুমি তাদেরকে যথাযথভাবে শোনাও। যখন তারা উভয়েই কুরবানী করেছিল তখন একজনের কুরবানী কবুল হয়েছিল এবং অন্যজনের কবুল হয়নি। (যার কুরবানী কবুল হয়নি) সে বললো, আমি তোমাকে হত্যা করবোই। অপরজন বললো : অবশ্যই আল্লাহ্্ মুত্তাকীদের কুরবানী কবুল করেন। আমাকে হত্যা করার জন্য তুমি হাত তুললেও আমি তোমাকে হত্যা করার জন্য হাত তুলবো না। নিশ্চয়ই আমি রব্বুল আলামীন আল্লাহ্কে ভয় করি। (সূরা মায়িদা : আয়াত ২৭-২৮)
হযরত আদম আলায়হিস্্ সালামের দুই পুত্রের নাম ছিল হাবিল ও কাবিল। হযরত আদম আলায়হিস সালাম ও মা হাওয়া আলায়হাস্্ সালাম জান্নাত থেকে পৃথিবীতে এসে সংসার গড়ে তোলেন মক্কা মুকাররমায়। তাঁদের জোড়ায় জোড়ায় সন্তান হতে থাকে। তখন এক জোড়ার ছেলের সঙ্গে অন্য জোড়ার মেয়ের বিয়ে হবার বিধান ছিল। কিন্তু এই বিধান মানতে চাইলো না কাবিল। সে নিজের যমজ বোন আকলিমাকেই বিয়ে করবে অথচ বিধান অনুযায়ী আকলিমার বিয়ে হবার কথা হাবিলের সঙ্গে। হযরত আদম আলায়হিস্্ সালাম কোন অবস্থাতেই বিধান ভাঙতে রাজি হলেন না। অবশেষে তিনি তাঁর দুই পুত্রকে বললেন : তোমরা আল্লাহ্র নামে কুরবানী দাও। যার কুরবানী কবুল হবে তার সঙ্গে আকলিমার বিয়ে হবে। তখন নিয়ম ছিল পাহাড়ের ওপর কুরবানীর জিনিস রেখে আসতে হবে। আকাশ থেকে অগ্নিবর্ষণ হয়ে যদি কুরবানীর জিনিস পুড়ে যায় তাহলে বুঝতে হবে কুরবানী কবুল হয়েছে। পিতার এই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কাবিল কিছু ফসল সামগ্রী কুরবানীর জন্য রেখে আসলো আর হাবিল রেখে আসলো একটা হৃষ্টপুষ্ট ভেড়া। যথাসময়ে আকাশ থেকে অগ্নি বর্ষিত হয়ে হাবিলের রেখে আসা ভেড়াটি পুড়িয়ে দিল। স্বাভাবিকভাবেই হাবিলের আকলিমার সঙ্গেই বিয়ের সিদ্ধান্ত দিলেন হযরত আদম আলায়হিস সালাম। কিন্তু এটা মানতে রাজি হলো না কাবিল। সে হাবিলকে হত্যা করলো। এটাই পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথম নরহত্যা আর তাও একজন নারীকে কেন্দ্র করে।
কুরআন মজীদে আহ্কাফবাসীর কুরবানীর উল্লেখ আছে। এছাড়াও হযরত মূসা আলায়হিস্্ সালামের সময়ে একটা গরু কুরবানীর ঘটনাও কুরআন মজীদে রয়েছে। সূরা বাকারাতে এই ঘটনা রয়েছে। বাকারা মানে গরু বা গাভী।
কুরআন মজীদে ইরশাদ হয়েছে : আর যখন মূসা তার কওমকে বলেছিল : আল্লাহ্্ তোমাদেরকে একটি গরু যবেহ্্ করতে আদেশ করেছেন। তারা বলেছিল : তুমি আমাদের সঙ্গে ঠাট্টা করছো? মূসা বললো : আমি আল্লাহ্র আশ্রয় গ্রহণ করছি যাতে আমি যেন মূর্খদের অন্তর্ভুক্ত না হই। তারা বললো : তুমি তোমার রবকে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিতে বলো তা (গরুটি) কিরূপ হতে হবে। মূসা বললো : আল্লাহ্্ বলছেন গরুটি এমন হতে হবে যা পূর্ণ বয়স্কও নয় এবং অল্প বয়স্কও নয়, তা হতে হবে মধ্যবয়সী। সুতরাং তোমরা যা আদিষ্ট হয়েছো তা পালন করো। তারা বললো : আমাদের জন্য তোমার রব্্কে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিতে বলো তার রং কেমন হতে হবে। মূসা বললো : আল্লাহ্্ বলছেন : সেই গরুর রং হতে হবে হলদে বর্ণের, সেটার রং উজ্জ্বল গাঢ় যা দর্শকদের আনন্দিত করে। তারা বললো : আমাদের জন্য তোমার রবকে জানিয়ে দিতে বলো গরুটি ঠিক কি ধরনের হবে, কেননা আমরা এ সম্পর্কে সন্দেহে পতিত হয়েছি এবং আল্লাহ ইচ্ছে করলে নিশ্চয়ই আমরা দিশা লাভ করবো। মূসা বললো : সেটা এমন এক গরু যা জমি চাষে এবং ক্ষেতে পানি সেচের কাজে ব্যবহৃত হয়নি। সেটা সুস্থ ও নিখুঁত। (সূরা বাকারা : আয়াত ৬৭-৭১)।
এতো সব কথাবার্তার পর মূসা আলায়হিস্্ সালামের কওম শেষমেশ গরু কুরবানী দিয়েছিল। এখানে উল্লেখ্য যে, ইতোপূর্বে হযরত মূসা আলায়হিস্্ সালামের অনুপস্থিতিতে তাঁর কওম বনী ইসরাইল একটি স্বর্ণনির্মিত গরু পুজো করেছিল। তিনি ফিরে এসে তা বন্ধ করে দেন এবং স্বর্ণের গরুটি ভেঙ্গে চুরমার করে দেন।
হযরত ইব্্রাহীম আলায়হিস্্ সালাম স্বপ্ন দেখে তাঁর পুত্র হযরত ইসমাইল আলায়হিস্্ সালামকে মক্কার মিনা নামক স্থানে নিয়ে গিয়ে কুরবানী করতে উদ্যত হয়েছিলেন কিন্তু আল্লাহ্্র আদেশে তিনি পুত্রের বদলে একটি দুম্বা কুরবানী দিয়েছিলেন। তারপর থেকে প্রতিবছর সেই কুরবানীর স্মরণে পশু কুরবানী দেয়া হয় ১০ জিলহজ তারিখে ঈদ-উল-আয্্হার দিনে।

লেখক : পীর সাহেব দ্বারিয়াপুর শরীফ, উপদেষ্টা ইনস্টিটিউট অব হযরত মুহম্মদ (সা.), সাবেক পরিচালক ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ।